বাংলারজমিন
তালিকা তৈরিতে জালিয়াতি, গুদাম ভরাচ্ছে সিন্ডিকেট, জানেন না কৃষক
প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে
১৫ জুন ২০২৪, শনিবারসরকারি খাদ্য গোডাউনে ধান দিতে সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। তথ্য গোপন করে ভুয়া নামের তালিকা অনুমোদন দিয়েছে খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা। একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে সঙ্গে নিয়ে অনিয়ম করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভুয়া তালিকার ওইসব কৃষকের ব্যাংক একাউন্টও জালিয়াতির মাধ্যমে খোলা হয়েছে। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে একাউন্ট খোলা হয়েছে। এমন অভিযোগ উঠেছে প্রকৃত কৃষকদের পক্ষ থেকে।
ঘটনা বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলা খাদ্য অফিসে। এখানে সরকারিভাবে কৃষকদের থেকে ধান ক্রয়ে কৃষকদের সঙ্গে জালিয়াতি করা হয়েছে। তাদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে একটি চক্র সরকারি গোডাউনে ৩০০ কেজি করে ধান দিয়ে রীতিমতো টাকাও তুলেছে।
উপজেলায় প্রায় ৫৬ হাজার কৃষক রয়েছেন। তার মধ্যে কৃষি অ্যাপসের মাধ্যমে সরকারি খাদ্য গোডাউনে ধান সরবরাহের জন্য ১২ হাজার কৃষক আবেদন কারেন। তার মধ্যে ২১৫জন কৃষকের নাম লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সরজমিন মানবজমিন’র অনুসন্ধানে দেখা যায় মূল তালিকায় ওঠা নামের পাশে মোবাইল নম্বরের মালিকের কোনো মিল নেই। নামের ব্যক্তিদের বেশিরভাগই জানে না তাদের নামের তালিকা হয়েছে। তাদের নামে গোডাউনে ধান দেয়া হয়েছে সেটিও জানা নেই। এমনকি তারা নিজেরা ধান দেয়ার জন্য আবেদন পর্যন্ত করেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেছেন- সোনাতলার কয়েকজন ধান ব্যবসায়ী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে নিজেরাই ব্যাংকে একাউন্ট খুলেছে। দুই-একজন ব্যক্তি স্বশরীরে ব্যাংকে এলেও বেশির ভাগ একাউন্টধারী ব্যাংকে আসেননি। ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে ব্যাংক কর্মকর্তারা বাধ্য হয়েছেন ব্যক্তি ছাড়াই একাউন্টগুলো খুলতে। তিনি বলেন, জনতা এবং অগ্রণী ব্যাংক সোনাতলা শাখায় অধিকাংশ একাউন্টগুলো খোলা হয়েছে।
ওই ব্যাংক কর্মকর্তা আরও বলেন, একাউন্ট খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই-বাছাই করার সুযোগ দেয়নি সিন্ডিকেটগুলো। তার কাছে ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, সোনাতলা পৌরসভার চেয়ারম্যানের ভাই আবুল কালাম পুটু, পল্লবসহ আরও বেশক’জন। পরে পুটু এবং পল্লবের সঙ্গে কথা বললে তারা এসবের মধ্যে নেই বলে নিজেদেরকে নির্দোষ উল্লেখ করেছেন।
কথা হয় তালিকায় নাম থাকা সোনাতলা বালুয়া এলাকার নয়ামিয়ার মোবাইল ফোন নম্বরে। ফোনের ওপার থেকে রিসিভ করেন শাখাওয়াত নামের একজন রেল কর্মকর্তা। তার বাড়ি উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। তিনি বলেন, আমিতো আবাদই করি না। ধান দিবো কোথা থেকে। আর ফোন নম্বরইরা ওই তালিকায় গেল কি করে?
সোনাতলার ঈমান উদ্দিন সরকারকে ফোন দিলে ওই নম্বর রিসিভ করেন সুখানপুকুর এলাকার গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, সরকারি গোডাউনে ধান দেয়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
উপজেলার শাজাহান আলীকে ফোন দিলে তিনি বলেন, আমি মুর্খ মানুষ। জীবনে কোনোদিন সরকারকে ধান দেইনি। আমার নামে হয়তো প্রতারকরা ধান দিয়ে টাকা তুলেছে।
এভাবেই প্রায় তালিকার সব নম্বরের ব্যক্তির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। চরম পর্যায়ের জালিয়াতি করে কার ধান- কে দিয়েছে সরকারি খাদ্য গুদামে, আর টাকা যাচ্ছে কার অ্যাকাউন্টে সেই খবর কেউ জানে না। অনুসন্ধানে এমন সীমাহীন দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এলে এর দায় কোনো দপ্তর নিতে চাচ্ছে না। অ্যাপসের দোহাই দিয়ে সবাই নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
সোনাতলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, অনেক কৃষক পুরো উপজেলাজুড়ে। তাদের একটা একটা করে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব না। তিনি বলেন, কেউ যদি ভুয়া তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু নেই। তবে ধান গ্রহণের সময় খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে তালিকার ব্যক্তির মিল আছে কিনা, মোবাইল নম্বর মিল আছে কিনা এসব দেখে মিল পেলে তারপর ধান নেয়া দরকার ছিল। রেজিস্ট্র্রেশনের সময় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে এসএমএস’র মাধ্যমে ওটিপি কোর্ড যাওয়ার কথা থাকলেও কীভাবে অন্যের ফোন ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো অ্যাপসের নিয়ন্ত্রকরা কোনোভাবে এসএমএস বন্ধ রেখেছিল।
সরকারি খাদ্য গোডাউনে ধান প্রদানে কৃষক যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর সদস্য সচিব উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। কৃষি বিভাগ সদস্য হিসেবে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে প্রকৃত কৃষক বাছাই হওয়ার কথা। এতোগুলো ধাপ কীভাবে ভুয়া তথ্যে পার হলো জানতে চাইলে সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন মানবজমিনকে বলেন, এমনটা হওয়ার কথা নয়। কোথায় কীভাবে এমন হলো সেটা তদন্ত না করে কিছু বলা যাবে না। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতে আছেন এজন্য বেশি কথা বলতে পারবেন না বলে ফোন রেখে দেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার সোনাতলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাহ মো. শাহেদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) হুমায়ুন কবির মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি মাত্র। দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।