ঢাকা, ২৩ জুন ২০২৪, রবিবার, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

ঈদ সংখ্যা ২০২৪

সমুদ্র আর পাহাড়ের খাঁজে গড়ে ওঠা এক শহর

মিলা মাহফুজা

(২ মাস আগে) ১৩ এপ্রিল ২০২৪, শনিবার, ৮:১১ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৪:৪৯ অপরাহ্ন

mzamin

আকাশের উপর থেকে অন্ধকারের ভেতর সূর্যের একটু একটু করে আলো ফেলে ফেলে এগিয়ে আসা দেখতে বেশ লাগে। চেষ্টা করলাম কিন্তু সেই সৌন্দর্য ক্যামেরা বন্দি করতে পারলাম না। রাত শেষ হয়নি আবার বাকিও নেই- সেই আধো ভোরে ক্যাথে প্যাসিফিকের বিমানটা এত অনায়াসে মাটি স্পর্শ করল যে টেরই পেলাম না। বিমান ক্রুরা দরজা খুলে দিলে বেরিয়ে এলাম ছয় ঘণ্টার বন্দি দশা থেকে। বিমানে উঠলেই নিজেকে আমার বন্দি বন্দি লাগে। তাই বিমান থেকে বের হলেই মুক্তির আনন্দ। স্থানীয় সময় ছয়টা পঁয়ত্রিশ।
প্রথমবারের মতো হংকং এসেছি। ছেলে অমিয় আর বৌমা ফারিহা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন, পাছে এয়ারপোর্টে আমার কোনো অসুবিধা হয়। সে জন্যে গত রাতেও নানারকম বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছে। কীভাবে লাগেজ বেল্টের কাছে পৌঁছানো যাবে তার লিখিত নির্দেশনাও ছিল তার মধ্যে।

বিজ্ঞাপন
তার কোনোই দরকার পড়ল না। চোখের সামনে সারি সারি মনিটরে কোনো ফ্লাইটের কোথাকার যাত্রীর মালপত্র কত নম্বর বেল্টে পাওয়া যাবে তা লেখা বারবার দেখানো হচ্ছে। রেসিডেন্ট আর নন রেসিডেন্ট সব আলাদা। আমি ভ্রামণিক স্বল্প সময়ের জন্যে এসেছি। মনিটর জানাল আমার বেল্ট নম্বর-২। একেবারে শেষ প্রান্তে। অন্য কয়েকটা বেল্টে লাইন দিয়ে লোকে মালপত্র সংগ্রহ করছে দেখতে দেখতে আমি হাঁটতে থাকি শেষ দিকে। মাঝখানে কয়েকটা বেল্ট ভোর রাতে গভীর নিদ্রামগ্ন ব্যক্তির মতো একদম নিঃসাড়। তখনই খেয়াল করলাম একমাত্র আমিই দু নম্বরের দিকে যাচ্ছি। ঠিক যাচ্ছি কিনা তা নিয়ে একটু চিন্তা হলো। ভাবলাম যাই তো আগে পরে দেখা যাবে। আমার একমাত্র চিন্তা লাগেজ বেল্ট থেকে ভারি সুটকেস নামানো নিয়ে। আশেপাশে লোক থাকলে ঠিক সাহায্য পেয়ে যাই। একা কী করব কে জানে। যেতে যেতে একটা ট্রলি টেনে নিলাম। একটু পরে দেখি এক নাক বোঁচা মেয়ে হনহন করে হেঁটে আমার সামনে চলে এসেছে। মানুষের চেহারা দেখে জাত চেনা আমার আসে না। ধারনা করলাম চীনা বা মালয় হতে পারে।
মোবাইলে ওয়াইফাই সংযোগ ঠিক করে অমিয়কে ফোন করলাম। বার কয়েক ফোন বাজল কিন্তু সে ধরল না। সামনের মেয়েটি এখন কাছাকাছি চলে এসেছে। জিজ্ঞেস করল, বাংলাদেশ থেকে আসছেন? কেউ রিসিভ করতে আসবে?
আমি থ। আরে এতো দেখি পুরাই বাঙালি। সে হেসে বলল, আমি রাঙামাটির মেয়ে। নাম রূপা। এখানে আমিও প্রথম আসছি। আমার বয়ফ্রেন্ড নিতে আসবে। আপনি?
- আমার ছেলে এখানে থাকে। ওদের কাছে বেড়াতে এসেছি। আমাকে নিতে আসবে বলেছে, কিন্তু এখন ফোন ধরছে না। 
- আপনি যদি চান আমরা আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি।
ততক্ষণে আমরা বেল্টের কাছে চলে এসেছি। রূপা কিছু জিজ্ঞেস না করেই হাত লাগাল সুটকেস দুটো নামাতে। ওর চোখে কৌতূহল দেখে বললাম, আমার বৌমা পেনটিং খুব পছন্দ করে। কয়েকটা পেনটিং আছে এখানে।
তখনও অমিয়র ফোন নীরব। রূপার বয়ফ্রেন্ড কাছাকাছি চলে এসেছে। সে আবার জিজ্ঞেস করল পৌঁছে দেবে কিনা। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। রূপা বলল, অসুবিধা নেই আপনি বসে অপেক্ষা করেন। ভালোই লাগবে বসে থাকতে।
সত্যি এমন ঝকঝকে জায়গায় বসে থাকতে খারাপ লাগার কথা না। হংকং এয়ারপোর্ট অতো বড় নয়, আবার ছোটও নয়। মজা পেলাম উত্তল লেন্সের এক বিশালাকার আয়না দেখে। যাত্রীদের অধিকাংশই চীনা চেহারার। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে কেউ ছুটছে, কেউ ধীরে সুস্থে হাঁটছে। মানুষের উপস্থিতিরই একটা স্বস্তিমাখা আনন্দ আছে হোক সে চেনা বা অচেনা। এই সময় ছোট একটা বাচ্চা ঢোকার গেটের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে এসে এক লোককে জড়িয়ে ধরে পাপা বলে ডেকে উঠল। লোকটি হাঁটু ভাঁজ করে শিশুর গলা জড়িয়ে ভেজা চোখে হাসতে থাকল। সেই চিরন্তনী স্নেহ ভালবাসার সেলুলয়েড! পৃথিবীতে ভালোবাসা অফুরান।
অমিয় ফোন করল। তার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে, সে রওনা করেছে মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে যাবে। আমি যেন কফি খেয়ে নিই এক কাপ।
যখন এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম তখন ঢাকার সময় পাঁচটা দশ, হংকং সময় সাতটা দশ। সকালের মিঠে আলোর ভেতর সুনির্মিত হংকংয়ের পথে চলা শুরু হলো। বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তায় মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জ্যাম পেলাম। অফিসের সময় বলে নাকি এই জ্যাম। প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে অমিয়দের Tsim Sha Tsui এলাকার বাসায় পৌঁছলাম। ৪৫ তলা ভবনের ৩৩ তলায় ওদের ফ্ল্যাট। তবে এই সব ভবনের তলা গোনা বেশ একটা হিসেবের ব্যাপার। কারণ চাইনিজরা চার সংখ্যাকে অশুভ  মনে করে। চার মৃত্যুর সমার্থক। তাই এসব ভবনে চার, চৌদ্দ, চব্বিশ, চৌত্রিশ এসব নম্বর নেই। তিনের পরে পাঁচ বা তেরোর পরে পনের তলা। তবে চল্লিশ থেকে আবার ঠিক থাকে। সম্ভবত উচ্চারণ গত বিভেদ রয়েছে এই সংখ্যাগুলোয়। ফারিহার শরীর একটু খারাপ ছিল, আর ওদের ছেলে যাইম ঘুম ভাঙা চোখে আমাকে দেখল চুপচাপ। ফারিহা অমিয় বলল, নাস্তা খেয়ে ঘুমিয়ে নিতে। বিমানে আমার ঘুম হয় না ওরা জানে, কিন্তু তখন আমার ঘুম আসছে না। ওরা বলল, তাহলে চলো ঘুরতে যাই, তাও কেন যেন ভাল লাগল না। আমার কোথাও গিয়ে খুব ছোটাছুটি করে ঘুরতে ভালো লাগে না। সুটকেস খুলে দেখলাম পেনটিংগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা।


সেন্ট্রাল হংকং
দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেবার পর শরীর ঝরঝরে লাগলে আমরা গেলাম সেন্ট্রাল হংকং। সমুদ্রের ধারে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে জায়গাটা। সুউচ্চ অবজারভেশন হুইলে চড়ে হংকং দেখা যায়। বেশ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে হুইলে ওঠার সুযোগ মেলে। টিকিট মূল্যও বেশ চড়া। তবে যে কোনো শহরই অতটা উপর থেকে দেখার মজাই আলাদা। সমুদ্রে কিছু পুরনো ছোট ট্রলার দেখলাম। আগে এসব ট্রলারে করে জলদস্যুরা হামলা চালাত। এখন দ্বীপ থেকে দ্বীপে যাতায়াতে ব্যবহার করা হয়। ট্রলারগুলোর চেহারা সুরত পাল্টায়নি। দেখলেই মনে হয় অনেক পুরনো জিনিস। হুইল থেকে নেমে অরিজিনাল হংকানিজ পোশাক পরে ছবি তুললাম। ১০০ হং ডলার খরচ হলো। এ ব্যবসা সব দেশের ট্যুরিস্ট স্পটেই আছে। তবে ছবিটা মোটেই ভালো হলো না। আরও একটু ঘোরাঘুরি করে আমরা একটা মলে চলে গেলাম। সন্ধ্যার পরে সেন্ট্রাল হংকংয়ের কিছু নির্দিষ্ট ভবনকে আলোকিত করা হয় বিশেষ ভাবে। কাছের দ্বীপগুলো থেকে তা দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আমরা অতোটা সময় থাকতে পারব না তাই মল ঘুরে ফিরে এলাম বাসায়। ঘুরতে ঘুরতে কিছু স্ট্রিট ফুড আর ফলের রস খেয়েছিলাম। রাতে বাসায় ডিম ভুনা, ডাল সবজি ভাত খেলাম তৃপ্তি নিয়ে।


 

বুদ্ধের সোনার মূর্তি
পরদিন সকালে এগ রোল দিয়ে নাস্তা সারলাম। ফারিহা নিয়ে গেল ঈযর খরহ ঘঁহহবৎু বৌদ্ধ মন্দির দেখাতে। এই মন্দিরের অবস্থান কাউলুনের ডায়মন্ড হিলে। ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মন্দির ১৯৯৮ সালে নুতন রূপ পায় সংস্কারের বদৌলতে। এখানে শাক্যমুনি বুদ্ধের বিশাল সোনার মূর্তি আছে। কাঠ, মাটি ও সোনার তৈরি আরও মূর্তি আছে। মন্দির প্রাঙ্গণটা এত শান্ত আর এতো পরিষ্কার যে মনে হয় না হংকংয়ে ধুলো বলে কিছু আছে। ভক্তরা নম্র পায়ে ধীরে ধীরে গিয়ে মূর্তির সামনে প্রার্থনা মগ্ন হচ্ছে। মন্দিরের ঘন্টাটাও বাজাল নিম্নলয়ে। মন্দির প্রাঙ্গণে প্রচুর বনসাই গাছ রয়েছে। বনসাই ব্যাপারটা আমার পছন্দ হয় না। জোর করে দমিয়ে রাখা। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে বনসাই মাননসই হয় কীভাবে? 
হংকং মূলত একটি দ্বীপ। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে সাউথ চায়না সী বা দক্ষিণ-চীন সাগরের ভেতর প্রসারিত ও অবস্থিত। হংকংয়ের উত্তরে চীনের কুয়াতাং প্রদেশ আর পূর্ব, পশ্চিম আর দক্ষিণে চীন সাগর। ২৬০টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। যার মধ্যে অন্যতম দ্বীপ হলো হংকং। হংকংয়ের উত্তর পশ্চিম তীরে ভিক্টোরিয়া এলাকাটি হংকংয়ের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানেই রয়েছে ১১৮ তলা উঁচু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। কাউলুন উপদ্বীপ হংকংয়ের আর একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা।
হংকং পৃথিবীর মধ্যে একটি অতি উন্নত অঞ্চল। তাই এখানে জীবনযাপন বেশ ব্যয়বহুল। সব কিছুরই দাম অনেক। এখন এক হংকং ডলার মানে আমাদের ১৪ টাকা। কেনাকাটা করার আগে পকেটের ওজন খেয়াল রাখতে হয়। সুবিশাল ঝকঝকে শপিং মলগুলোতে নজরকাড়া জিনিষ খুব হাতছানি দিলেও।
পাহাড় আর সমুদ্র নিয়ে হংকং। সমুদ্রও যেমন ব্যবহার করে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে, তেমনি পাহাড়কেও জয় করেছে নানা ভাবে। পাহাড় কেটে বাড়ি বানিয়েছে। রাস্তা তৈরি করেছে। এত অসংখ্য রাস্তা, ফ্লাইওভার বা গুহা। যেখানে যেমন দরকার পড়েছে সেরকম করে নেয়া হয়েছে। একদম চূড়ো পর্যন্ত দখলে নিয়ে সেখানেও এলাহি কারবার করেছে।  যেন পাহাড় আর সমুদ্রের খাঁজে খাঁজে গড়ে উঠেছে সুরম্য অট্টলিকার শহর হংকং। রাস্তার পাশে উঁচু উঁচু ভবন। ভবনগুলো চিকনচাকন। দেখে মনে হচ্ছে, এই বুঝি ভেঙে পড়ল ঘাড়ে। তবে ভবনগুলো কোনোটাই গায়ে গায়ে নয়। একটা থেকে আরেকটা যথেষ্ট ব্যবধানে। ঝা চকচকে এই শহরে আমি দশ দিনের জন্যে ছেলের কাছে বেড়াতে এসেছি। তারা স্বামী স্ত্রী দুজনেই ব্যাংকে কাজ করে। একটি মাত্র সন্তান, যাইম, বয়স চার বছর।


মেইড ইন বাংলাদেশ
একদিন যাইমের শরীর ভাল না থাকায় স্কুল বাদ দিল, অমিয় ফারিহা অফিসে চলে গেল। আমি আর যাইম খেলা করলাম। দুপুরের দিকে ফারিহা যাইমের শরীর কিছুটা ভালো জেনে বলল, মা, আমি আসছি, আপনি ওকে নিয়ে নিচে চলে আসেন, ঘুরতে যাই কোথাও। ৩৩ তলা থেকে দু দফা লিফট বদল করে উঠতে নামতে হয়। আমরা নেমে গিয়ে শাটল বাস ওয়েটিং রুমে বসলাম। পনের মিনিট পর পর বাস আসে। বাস একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত নিয়ে যায়, যেখান থেকে রেলস্টেশন কাছে। Olimpian city mall নামে একটা মলও কাছে। আমরা বাস থেকে নেমে মলে ঢুকলাম। চোখ ঝলসানো পণ্যে ভরা দোকানের সারি। মল এতো বড় যে প্রচুর হাঁটতে হয়। সুগন্ধিসহ কিছু কেনাকাটা করে গরম পোশাকে দোকানে ঢুকলাম। ‘জাস্ট এরাইভড’ লেখা জ্যাকেট সোয়েটারগুলো বাংলাদেশে তৈরি। একেকটার দাম ৫ হাজারের উপরে।  অমিয় বলল, চলো আমরা আজ জাপানি খাবার খাই। ছোট ছিমছাম এক দোকানে আমি ইল রাইস খেলাম। যাইম ইল রাইস আর টমাটো, শামুক আর নুডুলস দিয়ে তৈরি স্যুপ খেলো জমিয়ে। এবার ট্যাক্সি চেপে বাসায় ফিরলাম। সাধারণত আমরা ট্যাক্সিতে যাতায়াত করেছি। ট্যাক্সি ড্রাইভাররা হাতের তালুর রেখার মতো রাস্তা চেনে। তবে সবাই ইংরেজি বোঝে না। ওরা ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বলে। তরুণ প্রজন্ম আবার ইংরেজি ভালোই জানে।
ফারিহা আমার জন্যে ঘোরাঘুরির একটা পরিকল্পনা করে রেখেছিল। আবার আমার পছন্দকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টাও ছিল। তাই প্রতিদিনের ঘোরাঘুরিতে তিন চারটে অপশন থাকত। আমি খানিকটা আন্দাজে একটা পছন্দ করতাম।


হংকং পিক
হংকংয়ের পিক নামে পরিচিত জায়গাটা আসলে পাহাড়ের চূড়া। সাটল ট্রেন বা টয় ট্রেন, যা ট্রাম নামে পরিচিত তাতে চড়ে হেলতে দুলতে উপরে উঠতে হয়। দুঃসাহসীরা ট্র্যাকিংও করে এসব পাহাড়ে। একদিন আমরাও গেলাম ট্রামে চেপে হংকংয়ের পিকে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ ফুট উচ্চতায় উঠতে হবে। মিনিট কুড়ির জার্নি। শেষে ট্রাম থেকে নেমেই ঢুকে পড়লাম হকার্স মার্কেট টাইপ মার্কেটের ভেতর। সেটা পার হয়ে  এক্সেলেটর বেয়ে বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে একসময় থামলাম পিক টাওয়ারের মাথায়। থামলাম মানে নিঃশ্বাসও যেন থেমে গেল। আশ্চর্য সুন্দরতা চারদিকে। উপরে সুনীল আকাশ, নিচে পাহাড়ের সারি, আর সাগরের জলরাশি। সব একসঙ্গে দেখার আনন্দের কোনো বর্ণনা হয় না। পলক না ফেলে তাকিয়ে দেখেই গেলাম কতক্ষণ। একসময় টের পেলাম ঠান্ডায় গলা জমে গেছে। চিল ঠান্ডা যাকে বলে তেমন হিম বাতাস বয়ে যাচ্ছে তীব্র বেগে। অথচ রোদের কমতি নেই। আর সময়টাও মধ্য দুপুর। তবু সে ঠান্ডায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যায় না। 
অত সুন্দরের কাছে বেশিক্ষণ থাকতে নেই। তাতে বিভ্রম তৈরি হয়। তাই বাতাসের হিম, আকাশের সুতীব্র নীল আর প্রকৃতির প্রগাঢ় সবুজ মনের দরজায় ভালো করে লেপে নিয়ে নেমে আসলাম। তবে দেখার ছিল আরও অনেক কিছু। পিক টাওয়ারের বিভিন্ন তলায় রয়েছে মাদাম তুসোর মিউজিয়াম, Amusing Moment selfie Studio, Madnes 3D Adventure ইত্যাদি।
রয়েছে নামি, দামি সব রোস্তোরা। একটায় তো রীতিমতো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সিট পেতে। তবে খাবার সত্যি তেমনি সুস্বাদু। খেয়ে দেয়ে সোজা নেমে গেলাম নিচে। সেখানে একটা বিশাল শপিং মল রয়েছে। আর তার সামনে বিশাল ও গোলাকার সবুজ ঘাসের কার্পেট বিছানো রয়েছে, যেটাকে বলে পিক টেরেস, সেখানে সবাই বসে রোদ পোহাচ্ছে। শিশুরা গড়াগড়ি দিচ্ছে। তরুণ ও বৃদ্ধরা ছবি তুলছে। কোনো কোনো বৃদ্ধ মানুষ একা বসে আছে প্রায় নিশ্চল।
বিকেল হয়ে এসেছে। পিকে প্রচুর লোক। রাত দশটা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তারপর সবাইকে  ট্রামে চেপেই নিচে নেমে যেতে হবে। রাতে উপরে থাকার নিয়ম নেই। দিনের আলো নিভে গেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখা যাবে না, তাই শেষ সময়টুকুও পর্যন্ত প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ দেখার ইচ্ছে যেন সবার। তবু একসময় ধীরে ধীরে ফেরার যাত্রীর লাইন লম্বা হতে শুরু করে। সবাই জানালার ধারের সিটে বসতে চায়, তাই কিছুটা হুড়োতাড়া দেখা যায়। ট্রামে চেপে পাহাড়ে ওঠার সময় মনে হয় ট্রাম লাইনের দুপাশের গাছ ও বাড়িগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। নামার সময় মনে হয় ভুইফোঁড়ের মতো হঠাৎই গাছ আর বাড়িগুলো উঠে দাঁড়াচ্ছে দুপাশে। 
ভারি অদ্ভূত এক অভিজ্ঞতা।


কাউলুন পার্ক
কাউলুন পার্ক অমিয়দের বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। যাইম গাছ পালা খুব পছন্দ করে। একেবারে শিশু থাকতেই সে পথে পড়ে থাকা পাতা কুড়িয়ে নিয়ে আসত বাড়িতে। ওর সঙ্গে গাছ দেখব বলেই পার্কে গেলাম। ৩.৩ একর জায়গা নিয়ে তৈরি পার্কটি চমৎকারভাবে সাজানো গোছানো। প্রাচীন বৃক্ষ আর নতুন তরুলতায়। পার্ক জুড়েই রয়েছে বসার জায়গা। কিছু বয়স্ক একাকী মানুষ চুপচাপ বসে আছেন এখানে ওখানে। আছে ঝর্না, এক বৃদ্ধা নানা ভঙিমায় ছবির পর ছবি তুলছেন সেই ঝর্নার সামনে। হাসিমুখে তার ছবি তুলছেন অপেক্ষাকৃত এক প্রবীণ নারী। পুকুরে কাছিমের দল দেখে যাইম আপ্লুত। এক জলাশয়ের পাড়ে ফ্লেমিংগো পাখি হাঁটছে আপন মনে, মানুষ থেকে বেশ দূরে রাখা হয়েছে তাদের। এক জায়গায় গানে আর নাচে মেতে আছে তরুণ তরুণীর দল। একটা খোলা চত্বরে গোল বৃত্তের নানা জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু বয়স্ক নারী পুরুষ কোনো বিষদ আলোচনায় মগ্ন। স্ট্রলারে বাচ্চা নিয়ে তরুণী মায়েরাও এসেছে পার্কে। টিলাভূমির এই পার্কে প্রচুর প্রাচীন বৃক্ষ সযত্নে রাখা হয়েছে। যাইম বড় বড় পাতা কুড়িয়ে হাত ভর্তি করেছে। বার্ক গাছের বাকলহীন সরু কাণ্ড আর লেবক গাছের এয়া মোটা কা- আমার নজর কাঁড়ল। নানা রকম ফুল রয়েছে। লাল কাঞ্চন ফুলে ভরা গাছটা মুগ্ধ করল। লক্ষ করলাম দর্শনার্থীদের কারও হাতে কোনো রকম খাবার নেই। নেই কোনো পলিথিন। পুরো পার্কটা এতটাই পরিষ্কার যে ভাবতেই হয় অমনটা রাখতে কত লোক লাগে? প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে পার্কে ঘুরে বেড়ালাম আমরা। আরও থাকতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু যাইম আর আমি দুজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি ততক্ষণে।


রোববারের হংকং
অনেক ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা থাকলেও বাধ সাধল আমার শরীর। গত রাতের ঘুমহীনতায় প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাই ফারিহার পরামর্শে নাস্তা সেরে শুয়ে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। দুপুরে উঠে ভালো লাগছিল। তাই ট্যাক্সি নিয়ে আমরা চলে গেলাম চৎধঃ আবহঁব এর অহলধঢ়ঢ়ধৎ  রেস্তোরাঁয় সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার খেতে। এ শহরে পুরনো কোনো ট্যাক্সি চোখে পড়েনি। ঝকঝকে ট্যাক্সিগুলো চলে মাখনে চাকু চালানোর মতো শব্দহীন। ড্রাইভাররা সিট ছেড়ে নামে না। কোনো বাড়তি কথা বলে না। আর শহরটা চেনে নিজের হাতের তালুর মতো।
প্রাচীন এই রেস্তোরাঁয় আজ বেশ ভিড়। তবে পছন্দের খাবার দিতে বেশি দেরি করল না। খাবার স্বাদু। এখানের চায়ের খুব প্রশংসা করছিল ফারিহা। সবার আগে সেই চা দিতে বলা হলো। সত্যি খুব ভালো ছিল চা টা। খাওয়ার শেষ দিকে আবার অর্ডার করা হলো, কিন্তু ততক্ষণে ভিড় আরও বাড়ায় চা আর দিতে পারল না। 
ওখান থেকে ফারিহা নিয়ে গেল লেডিস মার্কেটে। রাস্তায় দুপাশে অস্থায়ী দোকানের মালিক মহিলারা। তারা কিছুটা অর্থনৈতিক সমস্যাগ্রস্থ, তাদের পাশে সরকার এই ভাবে দাঁড়িয়েছে। দোকানের খরচ কম বলেই হয়ত জিনিসপত্রের দামও কম। যাকে বলে সস্তার বাজার। তবে বেশ কিছু দরকারি জিনিস কিনতে পেলাম সেখানে। গরীব দেশে মানুষ ডলার ভেঙে কেনাকাটা করা বেশ কষ্টের। ওখান থেকে গেলাম চড়ৎঃষধহফ ংঃৎববঃ এজাপানিমল উঅওঝঙ। পায়ে ব্যথার কারণে বেশি হাঁটাহাটি করতে পারলাম না। সে কারণেই আজকের ঝঃধহষবু যাওয়ার প্রোগ্রাম বাদ দেয়া হলো। সুস্থ সবল শরীর না থাকলে যত ভালো ব্যবস্থাপনাই হোক ঘুরে বেড়ানো বেশ কঠিন। আর বয়স অনুযায়ী বেড়ানো পরিকল্পনা করাও দরকার। আমি জোর করে কিছু করার লোক না।  হলোই না হয় কিছু কম দেখা। 
আজ আবহাওয়া চমৎকার। হালকা ঠান্ডা। রোদ আছে আর বাতাসে তোড় নেই। আজ বেড়াবারই দিন। তাতে আজ রোববার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন, রাস্তায় মানুষের উপচেপড়া ভিড়। অধিবাসী ৭০ লক্ষ মানুষের অল্প সংখ্যকই হয়ত আজ বাড়ি থেকে বের হয়নি। তবে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি নেই কোথাও। ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করছে না কোনো গাড়ি বা মানুষ। হংকংয়ের মানুষ হালকা রঙের পোশাক পরে। তাই ভিড়ও চোখে কেমন আরাম আরাম লাগে। আমরা কিছুক্ষণ ইতস্তত ঘুরে বাড়ি ফিরে এলাম।
ফিরে আসা
আকাশ পথে আমার কিছুতেই ঘুম আসে না। টানটান শোয়ার ব্যবস্থা থাকলেও না। মুভি দেখাও বিরক্তকর হয়ে ওঠে অল্পক্ষণ পরেই। তাই রাতের আকাশ দেখে সময় পার করি। এবারে হঠাৎ দেখি আধখানা চাঁদ আকাশে। বাঁশি বাজল না, তবে চাঁদ মামা আমাকে সঙ্গ দিলো অনেকটা সময়। চাঁদের এমন রূপ আমি আগে কখনও দেখিনি। নিজস্ব আলো না থাকলেও সূর্যের মতো চাঁদের চারপাশে আলোকরশ্মির বিকিরণ রেখা স্পষ্ট  দেখা যাচ্ছিল।  সে অদ্ভুত আলোকচ্ছটার সৌন্দর্য একদমই ধরা পড়ল না ক্যামেরায়। তবে আমার নির্ঘুম বিষাদমাখা জার্নিটা আনন্দময় হয়ে উঠল কিছুটা।
নাতি যাইম একদম শেষ মুহূর্তে আমার সাথে ঢাকা চলে আসতে চাচ্ছিল। তার আগে ‘নেক্সট উইকের টিউজডে’ তে আমার ফেরার কতা সেটা কেন আমরা ভুলে গেছি বারবার মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। বিষণ্ন থেকেছে। 
স্নেহ নিম্নগামী এ প্রায় সতত সিদ্ধ আবেগ। আমি আবেগাক্রান্ত হয়ে বিষণ্ন মনে ঢাকার মটিতে পা রাখলাম রাত ১টায় দশ দিনের হংকং সফর শেষে। চমৎকার অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে। হংকং যাত্রার সব ব্যবস্থাই করেছে ফারিহা আর অমিয়। অনেক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার মধ্যে আমি পুলকিত হয়েছি অনলাইনে ভিসা ফর্মে মাউস দিয়ে স্বাক্ষর করে।
আর প্রতিবারের মতো ঢাকার দুষিত বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে মনে হয়- আহা আমার দেশ, আমার মাটি। 

 

 

পাঠকের মতামত

সুন্দর দেশগুলো ভ্রমণের পরে বা ভ্রমণ কাহিনী পড়ার পরে মনে হয়, আমার দেশটা যদি এমন সুন্দর হতো, লেখককে ধন্যবাদ

Z. Alam
১৫ এপ্রিল ২০২৪, সোমবার, ৯:৪৩ পূর্বাহ্ন

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ থেকে আরও পড়ুন

   

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status