ঢাকা, ২৩ জুন ২০২৪, রবিবার, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

ঈদ সংখ্যা ২০২৪

লর্ড কার্জন

দি গুড দি ব্যাড অ্যান্ড দি আগলি

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

(২ মাস আগে) ১৭ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার, ৫:২২ অপরাহ্ন

mzamin

বৃটেনের কনজারভেটিভ অর্থাৎ রক্ষণশীল পার্টি যা টোরি পার্টি নামে বেশি পরিচিতি তার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন রাজনীতিবিদ জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন। তিনি লর্ড কার্জন নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তাকে ১৮৯৮ সালে বৃটেনের রানী ভিক্টোরিয়া ভারতের ‘গভর্নর জেনারেল অ্যান্ড ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়া’- পদে নিয়োগ দেন। সংক্ষেপে এই পদটি ভাইসরয় নামে পরিচিত ছিল। ভাইসরয়দের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে লর্ড কার্জন মাত্র ৩৯ বছর বয়সে বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে কলকাতায় আসেন। এর আগে ভারতের বিভিন্ন জায়গা ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে ও বই পড়ে এই অঞ্চলের রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে তার ধারণা ও জ্ঞান অনেকের চেয়ে বেশি ছিল। তিনি একজন পার্লামেন্ট মেম্বার হলেও ভারতে আসার আগে তেমন সামাজিক পরিচিতি পাননি। তার প্রথম স্ত্রী ম্যারি কার্জন একজন অভিজাত বংশীয় নারী ছিলেন। ক্যারিয়ারের সূচনাতে কার্জনের বড় অবলম্বন ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী। লর্ড কার্জনের বাবা ডার্বিশায়ারের ব্যারন স্কারসডেল এবং মা ব্ল্যানচের ১১ ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান এবং বড় ছেলে।

বিজ্ঞাপন
১১ই জানুয়ারি ১৮৬৯ সালে লর্ড কার্জনের জন্ম হয়। পরবর্তীতে তার পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত আরও নয়জন সন্তান জন্ম দিয়ে তার মা মারা যান। মা- বাবার মমতার মধ্যে তিনি বড় হননি। একজন বদরাগী ও কঠোর গৃহপরিচারিকার তত্ত্বাবধানে তিনি বড় হন। পারিবারিক আভিজাত্যের অহঙ্কার ও গৃহপরিচারিকার উগ্রব্যবহার তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। আঘাতজনিত কারণে শারীরিক সমস্যাও তার ছিল। এছাড়া তিনি ছিলেন ইনসমনিয়া বা অনিদ্রায় ভোগা ব্যক্তি। লর্ড কার্জন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভারত থেকে ফেরার পর বৃটিশ সরকার তাকে অক্সফোর্ডের চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ দেয়। সম্প্রতি অক্সফোর্ডেরই স্লিপ রিসার্চ সোসাইটির ২০২২ সালের এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, ‘স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে ইনসমনিয়ায় ভোগা রোগীদের শতকরা ১৮ দশমিক ৮ ভাগ বেশি ঝুঁকি থাকে অ্যাবনরমাল থট বা অস্বাভাবিক চিন্তা করার।’ 
লর্ড কার্জন সব সময়ই নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। তার জীবনীকার ডেভিড গিলমার ‘কার্জন: ইম্পেরিয়াল স্টেটসম্যান’ বইয়ে জানিয়েছেন অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করার সময় নিজের সম্পর্কে এক কবিতায় জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন লেখেন-

“My name is George Nathaniel Curzon,   

I am a most superior person,  

My cheek is pink, my hair is sleek,   

I dine at Blenheim once a week.”
আমার নাম জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন
আমি হচ্ছি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি
আমার গাল গোলাপি, আমার চুল মসৃণ
আমি সপ্তাহে একদিন ব্লেনহেমে রাতে খাই।
অভিজাত এলাকা ব্লেনহেমে একটি রাজপ্রাসাদ আছে। জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জনের প্রতি সপ্তাহে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু অন্যদের কাছে নিজেকে জাহির করতে তিনি এই লাইনটি ব্যবহার করেন।

মিশন ডিভাইড অ্যান্ড রুল
সে সময়ের ভারতের রাজধানী কলকাতায় লর্ড কার্জন অল্প সময়েই তার কাজের দক্ষতা দিয়ে নিজেকে পরিচিত করে তোলেন। তার অনুরক্তরা তাকে ‘ঐশ্বরিক শাসক’- হিসেবে বর্ণনা করেন। দুই দফায় ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত শাসনকারী লর্ড কার্জন ভারতের প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে চান এবং ভারতীয় উপমহাদেশকে বিশেষ করে বাংলাকে শক্ত আঁটুনির মধ্যে রাখতে উদ্যোগী হন। ১৯০১ সালে বৃটিশ শাসকদের উদ্দেশ্যে লর্ড কার্জন ঘোষণা করেন, ‘আমরা যতদিন ভারত শাসন করতে পারবো, ততোদিন আমরা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে বিরাজ করতে পারবো, কিন্তু ভারত হাতছাড়া হয়ে গেলে আমাদের ক্ষমতা তৃতীয় স্তরে নেমে আসবে।’
অর্থনীতি, প্রশাসন, পরিবেশ, শিক্ষা, কৃষি, সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, সীমান্ত রেখা নির্ধারণসহ নানা ক্ষেত্রে লর্ড কার্জন অনেক সংস্কার করেন। ১৫ রুপির সমান এক পাউন্ড ধরে ১৮৯৯ সালে তিনি প্রথম ভারতে বৃটিশ মুদ্রার প্রচলন ঘটান। প্রশাসনকে গতিশীল, অনুগত ও নিরাপদ রাখতে তিনি নানা কার্যক্রম হাতে নেন। বাংলায় তখন স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দানা বাঁধছে। রাজধানী কলকাতায় বাঙালি কর্মচারীরা সরকারি নথি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা যেন স্বাধীনতাকামীদের হাতে দিতে না পারেন তা বন্ধ করতে লর্ড কার্জন ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট প্রণয়ন’ করেন। এই আইনে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ ও ‘সরকারের গোপন নথি ফাঁস’ করার দায়ে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়। ১৯২৩ সালে আইনটিতে আরও পরিবর্তন এনে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। শত বছর পেরিয়ে ২০২১ সালে বাংলাদেশের প্রভাবশালী দৈনিক প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে লর্ড কার্জনের করা এই আইন প্রয়োগ করা হয়। 

ভাইসরয় হিসেবে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে লর্ড কার্জন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ দূর করার চেষ্টা করেন যেন তা বড় আকার ধারণ করে বিদ্রোহে রূপ না নেয়। তবে বাংলা সম্পর্কে তিনি বরাবরই সচেতন ছিলেন। তিনি পুরো ভারতের মধ্যে বাংলাকে সবচেয়ে বেশি অনমনীয় মনে করতেন। বাংলায় স্বায়ত্তশাসনের ভাবনাকে দমিয়ে রাখতে ১৮৯৯ সালে তিনি ক্যালকাটা করপোরেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কমিয়ে মনোনীত প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ান। এর প্রতিবাদে ২৮জন নির্বাচিত প্রতিনিধি পদত্যাগ করলে লর্ড কার্জন সে জায়গায় তার পছন্দমতো ব্যক্তিদের মনোনীত করেন।

বাংলাকে নিয়ে লর্ড কার্জন যে সবচেয়ে বেশি সতর্ক ছিলেন তার প্রমাণ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। বাংলাই ছিল বৃটিশদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সূতিকাগার, তাই এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি ছিল না। আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের হত্যা করে ইউরোপিয়ান শ্বেতাঙ্গরা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে বাংলায় বা ভারতে তা সম্ভব হয়নি। কারণ বাংলার বিপুল জনসংখ্যা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। দুর্ভিক্ষ, অভাব নানা কিছু সৃষ্টি করে মানব হত্যা করেও বৃটিশ শাসকরা বাংলার মানুষকে কমাতে বা দমাতে পারেনি। তখন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’- অর্থাৎ বিভক্তির মাধ্যমে দুর্বল করে তারপর শাসন করার যে উদ্যোগ বৃটিশরা নিয়েছিল লর্ড কার্জনকে দিয়ে তার পরিপূর্ণ রূপ দেয়া হয়।

তিনি তার পূর্ববর্তী শাসকদের মতোই স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়কে সামনে নিয়ে আসেন। যে বাংলায় কখনো সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ছিল না, সেখানে হিন্দু-মুসলসমানের বৈরিতাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে লর্ড কার্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইংরেজদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’- বাস্তবায়িত করে তিনি বাংলাকে খণ্ডিত করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান। লর্ড কার্জন পূর্ব-বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে মুসলমান নেতাদের হিন্দুদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলেন। তিনি তাদের বোঝান হিন্দুদের কারণে মুসলমানরা অবহেলিত হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের মধ্যে বিষয়টি আলোড়ন তৈরি করে। এর আগে প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে বৃটিশরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের মানসিকতা তৈরি ও দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। হিন্দুদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তারা এটা প্রমাণ করতে চায় যে, বৃটিশরা হিন্দুদের পক্ষে আছে। এই দ্বিমুখী আচরণ তাদের প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যের অংশ। পুরো দেশের শাসক হিসেবে বৃটিশদেরই দায়িত্ব ছিল হিন্দু-মুসলমান সবাইকে সমভাবে এগিয়ে আসতে সাহায্য করা। সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বৃটিশ শাসকরা রোপণ করেছিল লর্ড কার্জনের সময় থেকে তা পত্রপল্লবে বিকশিত হতে থাকে।

বঙ্গভঙ্গের ভাইসরয়
‘প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য’ বাংলাকে ভাগ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত বৃটিশরা আগেই নিয়ে ফেলেছিল। তবে বাংলার ভাগ নিয়ে লর্ড কার্জনের কোনো পরিকল্পিত চিন্তা ছিল না। তিনি নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না কীভাবে তিনি এ কাজ করবেন।তিনি শুধু জানতেন বাংলাকে ভাগ করতে হবে এবং এ বিষয়ে জনমনকে কোনোগুরুত্ব দেন নি। ৩০ এপ্রিল ১৯০২ সালে ভারত সচিবকে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি নিশ্চিত না এটা স্থানীয় সরকারগুলোর, অন্তত কয়েকটির সীমানা নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় কিনা। কোনো সন্দেহ নেই বাংলার দায়িত্ব পালন একজন প্রশাসকের পক্ষে কঠিন। চট্টগ্রাম কি বাংলাতেই থাকবে? নাকি আমরা আসামকে একটা সাগর দুয়ার (সমুদ্র বন্দর) দেবো? উড়িষ্যা কি কলকাতা থেকে শাসন করা সহজ? গানজাম কি মাদ্রাজকে দেয়া উচিত?’ 
এর আগে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহকে আসামের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১৮৯৬ সালে আসামের চিফ কমিশনার স্যার উইলিয়াম ওয়ার্ড প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান কেউই এ প্রস্তাবে সাড়া দেননি। ইংরেজ শাসক শ্রেণি ও লর্ড কার্জন মুসলমানদের ভালোবেসে বঙ্গভঙ্গ করেননি। এটা বৃটিশদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন। লর্ড কার্জন ছিলেন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। পূর্ববঙ্গে ভ্রমণের সময় ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ট্রেনে ফেরার পথে ভারত সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘বাঙালিরা, নিজেদের যারা একটি জাতি বলে ভাবতে পছন্দ করে এবং যারা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যখন ইংরেজদের বিদায় করে দিয়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট হাউজে একজন বাঙালি বাবুকে অধিষ্ঠিত করবে, তারা অবশ্যই তাদের ওই স্বপ্ন বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপ ঘটাতে পারে এমন যে কোনো প্রতিবন্ধকের ব্যাপারে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করবে। আমরা যদি তাদের হইচই-এর কাছে নতি স্বীকার করার মতো দুর্বলতা প্রকাশ করি, তাহলে আগামীতে বাংলাকে কখনোই খণ্ডিত বা দুর্বল করতে পারবো না এবং ভারতের পূর্ব-পাশে আপনি এমন একটি শক্তিকে সংযুক্ত ও দৃঢ় করবেন যেটি ইতিমধ্যেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে তা ক্রমবর্ধমান গোলযোগের নিশ্চিত উৎস হয়ে দাঁড়াবে।’
বঙ্গভঙ্গের আগে বৃটিশদের নিয়ন্ত্রিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি অনেক বড় ছিল। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, আসামের কিছু অংশ এবং আরও কিছু এলাকা নিয়ে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গঠিত ছিল। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বিশাল এই এলাকাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, আসাম, জলপাইগুড়ি, পার্বত্য ত্রিপুরা, মালদহ ও আরও কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত হয় ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ। এর রাজধানী হয় ঢাকা। অপরদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে হয় পশ্চিম বাংলা প্রদেশ। যার রাজধানী থাকে কলকাতা। ১৬ই অক্টোবর ১৯০৫ সালে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ ঘটে। 

নানা কারণে বঙ্গভঙ্গ জটিল সমীকরণের জন্ম দেয়। যার প্রভাব স্থায়ী রূপ লাভ করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও ইতিহাসবিদ ড. সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন স্বদেশি ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে রূপ নেয়। বলা বাহুল্য, এ  স্বদেশি ও বিপ্লবী আন্দোলন ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ভারতীয়দের মোকাবিলায় তিনি সিদ্ধহস্ত, এ বলে লর্ড কার্জন গর্ববোধ করতেন।... সে আত্মবিশ্বাসী লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গকে ঘিরে জ্বলে ওঠা স্বদেশি ও বিপ্লবী আন্দোলনের মুখে হতাশ ও বিচলিত বোধ করতে থাকেন। এমনকি সসম্মানে পদত্যাগের কথাও ভাবছিলেন তিনি। ভারতীয় বাহিনীর প্রধান সেনাপতি লর্ড কিচেনার তাকে সে সুযোগ এনে দেন। সেনাবাহিনীর সংস্কার প্রসঙ্গে লর্ড কিচেনারের সঙ্গে তার গভীর মতপার্থক্য দেখা দেয়। কার্জন অনুভব করেন, ‘ইন্ডিয়া অফিস’ কিচেনারের পক্ষাবলম্বন করছে। এ পরিস্থিতিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের আগস্টে পদত্যাগ করেন এবং ইন্ডিয়া অফিসও তাৎক্ষণিকভাবে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে।’

এই ঘটনা আরও প্রমাণ করে বৃটিশ শাসক যন্ত্রের কাছে লর্ড কার্জন যেমন পছন্দের ছিলেন, তেমনি প্রয়োজন শেষে তাকে ছুঁড়ে ফেলতেও তারা দ্বিধা করেনি। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বৃটিশ শাসকরা বাধ্য হয় বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রোধ হলেও মানুষের মনে যে বিভেদের সৃষ্টি তারা তৈরি করে সেটা নতুনমাত্রা লাভ করে। একই সঙ্গে বৃটিশরা অগ্নিগর্ভ বাংলায় তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম রাখতে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। রাজধানী স্থানান্তরিত হয় কলকাতা থেকে দিল্লিতে।

দ্বিচারিতা: মুখোশের আড়ালের মুখ 
মেধাবী লর্ড কার্জন নিজেকে এমন ভাবে উপস্থাপন করেন যে, তিনি সবার মঙ্গলকামী। অন্যের কাছে নিজেকে ‘ত্রাণকর্তা’- হিসেবে প্রমাণ করতে তিনি ছিলেন খুবই পটু। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ শামসুল হুদা যেমন তার গুণগ্রাহী ছিলেন তেমনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহ্রু প্রশংসাসূচক বাক্যের মাধ্যমে অন্য সব ভাইসরয়দের চেয়ে কার্জনকে আলাদা ভাবে দেখতে চেয়েছেন। অথচ পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু যে দলটির নেতা ছিলেন সেই কংগ্রেস দলের আন্দোলনরত জাতীয়তাবাদী নেতাদের সম্পর্কে বিদ্রুপ করে লর্ড কার্জন মন্তব্য করেন, ‘তারা গঙ্গায় তো আর আগুন লাগাতে পারবে না’।

কংগ্রেস দলটি নিয়ে লর্ড কার্জনের সবচেয়ে সমালোচিত বাক্যটি হলো, তার সহায়তার দলটি ‘শান্তিপূর্ণ মৃত্যুবরণের পথ খুঁজে পাবে।’
লর্ড কার্জন তার শাসনকালে প্রশাসনিক সাফল্য আনলেও সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও করের হার ৫৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। তার করা চা আইনে শ্রমিকদের জীবন পরিণত হয় দাসের জীবনে। বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যায়। প্লেগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, কৃষকদের নিঃস্ব হয়ে যাওয়াসহ অনেক ঘটনার প্রতিনায়ক এই লর্ড কার্জন। 
রানী ভিক্টোরিয়ার সময়কালটি বৃটিশ ইতিহাসে ‘ভিক্টোরিয়ান এরা’ বা ভিক্টোরিয়ান যুগ নামে পরিচিত। এই সময়টিকে পুরো বৃটেনের ইতিহাসে আভিজাত্য, পোশাকে মার্জিত ভাব, নীতি নৈতিকতা, পরিশীলিত আচরণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রতীক হিসেবে অনেকে বর্ণনা করেন। লর্ড কার্জন ছিলেন ভারতের শেষ ভিক্টোরিয়ান ভাইসরয়। ‘ঐতিহ্যপ্রেমী ও সংস্কৃতমনা’ লর্ড কার্জন ভারতের প্রত্নসম্পদ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, এএসআই-এর সংস্কার করে প্রশংসিত হন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান করে তিনি নিয়ে আসেন ক্যামব্রিজের প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শালকে। এএসআই-এর একজন কর্মী হিসেবে বাংলার ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার প্রত্নঅঞ্চল মহেঞ্জোদারো নিজস্ব চেষ্টায় আবিষ্কার করেন। কিন্তু মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের কৃতিত্ব চুরি করে রাখালদাসের বদলে নিজের নাম প্রচার করেন এই জন মার্শাল। বঞ্চিত রাখালদাসকে প্রথমে বদলি ও পরে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। নীরবে অসুস্থ রাখালদাস মৃত্যুবরণ করেন। 

বিপুল অংকের অর্থসম্পদের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অনেক দুর্লভ প্রত্নসম্পদ, শিল্প ও চিত্রকলা লর্ড কার্জন পাচার করেছেন। বৃটেনে তার বাড়ির শুধুমাত্র নিচতলা থেকেই এক হাজারের বেশি এই ধরনের অমূল্য আইটেম তিনি স্থানীয় জাদুঘরে ‘দান’ করেন। শুধু ঐতিহ্য পাচার করাই নয়, দেশের বাইরেও বাংলার সংস্কৃতি বিরোধী মনোভাব তার অব্যাহত ছিল। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা থেকে প্রথম কেউ নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবে মানুষের উৎসাহ ছিল প্রবল। বিদেশিদের মধ্যেও তার অনেক ভক্ত ছিলেন। বৃটিশ প্রভাবশালী সঙ্গীতজ্ঞ, সাহিত্য সমালোচক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আর্থার হেনরি ফক্স স্ট্র্যাঞ্জওয়েজ ছিলেন এমন একজন। তিনি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজের একজন সফল প্রচারক ছিলেন। কবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে স্ট্র্যাঞ্জওয়েজ আশা করেছিলেন অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর তখন লর্ড কার্জন। বঙ্গভঙ্গ নিয়ে তার পদক্ষেপ যাদের কারণে সফল হয়নি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাদের অন্যতম। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করেই কবি ররীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে ‘আমার সোনার বাংলা’- গানটি লিখেছিলেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। হেনরি ফক্স স্ট্র্যাঞ্জওয়েজ যখন লর্ড কার্জনের কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্মাননা জানানোর কথা বলেন তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সে প্রস্তাব বাতিল করে দেন। স্ট্র্যাঞ্জওয়েজকে হতবাক করে লর্ড কার্জন মন্তব্য করেন, ‘ভারতে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি আছেন।’

একজন বন্যপ্রাণী দরদি ব্যক্তি হিসেবেও লর্ড কার্জন পরিচিত। তার প্রথম স্ত্রী লেডি কার্জনের অনুরোধে তিনি আসামের কাজিরাঙা এলাকায় এক শিংওয়ালা গণ্ডার রক্ষায় উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে দুর্লভ সিংহ ও নানা বিরল প্রাণী রক্ষায় তার উদ্যোগের কথা নানা ভাবে প্রকাশ পায়। এই লর্ড কার্জনই চরম নির্মমতা প্রকাশ করেন বাংলার সবচেয়ে মূল্যবান প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতি। 
রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যা করা সব বাঘের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ মনে করে শাসকদের একটি অংশ আড়ম্বরের সঙ্গে বাঘ শিকারে যেতেন। মোগলদের মধ্যে এই চর্চা বিকাশ পেলেও বৃটিশ শাসন আমলে তা মহামারির আকার ধারণ করে। ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫ সাল মাত্র ৫০ বছরে সারা ভারতে বাঘ মারা পড়ে ৮০,০০০ (আশি হাজার)। যার বড় অংশই হচ্ছে বৃহত্তর বাংলায়। শুধু ১৮৭৯ সালে এক বছরে সারা ভারতে ১,৫৭৯টি বাঘ হত্যা করা হয়। এর মধ্যে বাংলায় ৪২৬ এবং আসামে ৩৭৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা পড়ে। লর্ড কার্জনের মাত্র ছয় বছরের শাসনকালে ১৮৯৯-১৯০৫ সালে রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যার পরিমাণ সবচেয়ে বেড়ে যায়। তিনি নিজেও অসংখ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যা করেন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বিষয়ক জটিলতা সমাধান ও কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করতে আসা বৃটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ বাংলার উত্তরে বর্তমান নেপালের তেরাই অঞ্চলে শিকার করতে গিয়ে একাই ৩৯টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার গুলি করে হত্যা করেন। ২০১৯ সালের এক অত্যাধুনিক জরিপে দেখা যায় সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে রয়েল বেঙ্গল টাইগার মিলেছে মাত্র ১০৬টি!

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশে প্রাণী রক্ষায় এগিয়ে এলেও স্ত্রীর প্রতি লর্ড কার্জন মোটেও বিশ্বস্ত ছিলেন না। ২৯ জুন ২০০৩ সালে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ‘টু দি ইম্পেরিয়াল ম্যানার বর্ন’- শিরোনামে লর্ড কার্জনের ওপর প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনের একটি অংশে তার তীব্র নারী আসক্তির কথাও বলা হয়। দি নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, নারীবাদীদের কাছে লর্ড কার্জন অজনপ্রিয় ছিলেন কারণ তিনি নারীদের ভোটাধিকারের বিরুদ্ধে ছিলেন। নারীদের অধিকারের বিরুদ্ধে থাকলেও তিনি নারীদের সঙ্গ পছন্দ করতেন। অসংখ্য নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা জানা যায়। লর্ড কার্জনের বন্য আচরণের কারণে অনেক সংসার ভেঙেছে এবং একবার এক ক্ষতিগ্রস্ত স্বামী তালাকনামায় অভিযুক্ত হিসেবে তার নাম উল্লেখ করার হুমকিও দিয়েছিলেন। 
প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর লর্ড কার্জন দীর্ঘ সময় প্রেম করেন জনপ্রিয় বৃটিশ রোমান্টিক লেখিকা এলিনর গ্লিনের সঙ্গে। তারা একসঙ্গে থাকতেন। বৃটেনে একদিন এলিনর গ্লিন নাস্তার টেবিলে কার্জনের পাশে বসেই পত্রিকায় খবর পড়েন, লর্ড কার্জন আরেক নারী গ্রেস ইনভিনা হিন্ডসকে বিয়ে করেছেন!

কার্জন স্মারক
কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এটি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন লর্ড কার্জন। এ কারণে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে লর্ড কার্জনের গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো একটি ভাস্কর্য রাখা আছে। ২২ জানুয়ারি ১৯০১ সালে বৃটেনের রানী ভিক্টোরিয়া মারা যান। লর্ড কার্জন ছিলেন রানীর নিয়োগকৃত ভাইসরয়। তিনি দ্রুত একটি বৈঠক ডেকে কলকাতাতে রানীর স্মরণে একটি স্থাপনা নির্মাণ করতে চাইলেন। তিনি চাইলেন সবার কাছে তাক লাগানো এই স্থাপনা দিয়ে তাজমহলকে টেক্কা দেয়া যাবে। যার জন্য রাজস্থান থেকে তাজমহলের মতোই মারকানা শ্বেতপাথর আনা হয়। পুরো পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগটি লর্ড কার্জন নিয়েছিলেন। এর জন্য শুরুতেই রাজবন্দিদের আটকে রাখার জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জেলখানা স্থানান্তর করা হয় আলীপুরে। রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুতে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ স্মৃতিস্মারক তৈরি করবে- অথচ তার সমস্ত ব্যয়ভার চাপিয়ে দেয়া হলো বাংলার মানুষের ওপর। লর্ড কার্জন স্থানীয় রাজা, জমিদার, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের আয়করের টাকায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের নির্মাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। সেই অর্থের পরিমাণ ছিল এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। নিয়তির পরিহাস হচ্ছে- যে স্থাপনা তৈরির জন্য তিনি এতো আগ্রহী ছিলেন ১৯০৬ সালে যখন রাজা পঞ্চম জর্জ কলকাতায় এসে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তখন তিনি সেখানে থাকতে পারেননি। পরবর্তী ২০ বছরে তৈরি হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। 

লর্ড কার্জনের স্মারক হিসেবে কয়েকটি স্থাপনা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমানে ‘কার্জন গেট’ তৈরি হয় ১৯০২ সালে। ১৯০৪ সালে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ‘বড়লাট বাহাদুর’ কার্জন ঢাকায় আসেন। সে সময়ের রীতি অনুসারে তার আগমন উপলক্ষেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল একটি স্মারক স্থাপনা তৈরিতে আগ্রহী হন। এই নির্মাণ কাজে লর্ড কার্জনের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। এ প্রসঙ্গে ১৯০৪ সালে ঢাকাপ্রকাশ পত্রিকা লেখে, ‘ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এই কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল ডাক্তার রায় মহাশয় যত্নবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমন উপলক্ষে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড কার্জন বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে ‘কার্জন হল’ নামে একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন।’

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত কার্জন হল ঢাকা কলেজের অংশ ছিল। লর্ড কার্জন এই হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই হলেই ১৯৪৮ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র বক্তব্যে ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। 
ঢাকাতে রানী ভিক্টোরিয়ার নামে রাখা পার্কের নামবদলে বাহাদুর শাহ পার্ক করার নজির আছে। সারা পৃথিবী জুড়ে এমন কী খোদ বৃটেনেই সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনে তরুণ বৃটিশরা সাম্র্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্টদের সহায়ক ব্যক্তিদের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে বা তাদের হামলার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে। বৃটিশ শাসক রবার্ট ক্লাইভ, প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল থেকে শুরু করে অক্সফোর্ডের রোডস স্কলারের প্রবর্তক সিসিল রোডস বা বয় স্কাউটের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাটেন পাওয়েলসহ অনেকের নামই এসেছে এই আন্দোলনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এতো গৌরবময় একটি ভবনের নাম একজন সাম্রাজ্যবাদী, সাম্প্রদায়িক, বিভেদ সৃষ্টিকারী ও নির্বিচারে রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যাকারী ব্যক্তির নামে রাখা কতটা যৌক্তিক- সে প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক।

সেহেতু ভবনটিতে সায়েন্স ফ্যাকালটির বিষয়গুলো পড়ানো হয় সে কারণে এর নাম করণে বাংলার অসামান্য বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু অথবা সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্তঃপ্রাণ জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের নামে হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন।
ইতালিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা সার্জিও লিওন পরিচালিত ও হলিউডের সুপারস্টার ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনীত ১৯৬৬ সালের একটি জনপ্রিয় ওয়েস্টার্ন মুভির নাম ‘দি গুড দি ব্যাড অ্যান্ড দি আগলি’। ১৮৬২ সালের আমেরিকায় রুক্ষ পশ্চিমি সমাজের প্রেক্ষাপট নিয়ে বানানো ‘স্প্যাগিটি ওয়েস্টার্ন’ বা মূলত ইউরোপে চিত্রায়িত ও নির্মিত এই মুভিতে এক ভালো, এক মন্দ ও এক কুৎসিত মনের চরিত্রে তিনজন অভিনেতার অনবদ্য অভিনয় সিনেমাটিকে কালজয়ী করে তোলে। বাস্তব জীবনে বৃটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির অন্যতম কুশীলব, ভারতে ভাইসরয় পদে লর্ড কার্জন একাই তিন চরিত্রকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। 

লেখক: সাংবাদিক ও অ্যাসোসিয়েট ফেলো, রয়্যাল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ থেকে আরও পড়ুন

   

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status