ঢাকা, ২৩ জুন ২০২৪, রবিবার, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

ঈদ সংখ্যা ২০২৪

পাঁচ রমণীর কাসিদা

আমীরুল ইসলাম

(২ মাস আগে) ১৪ এপ্রিল ২০২৪, রবিবার, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১:০০ অপরাহ্ন

mzamin

বন্ধু শিরীন বকুল 

তাকে নিয়ে স্মৃতি গদ্য লেখা খুব মুশকিল। আমাদের যৌবনের উজ্জ্বল বন্ধু, প্রিয় বন্ধুর পত্নী এবং তার নিজেরও পরিচয় আছে। তিনি স্বনামধন্য অভিনেত্রী। মঞ্চে তুখোড় শৈলী প্রদর্শন করেছেন। গত ত্রিশ বছর ধরে মঞ্চ, টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের একনিষ্ঠ ও কর্মিষ্ঠ এক অভিনেত্রী। বহুগুণে গুণান্বিতা। ভালো আবৃত্তিশিল্পী। লিখেনও ভালো। দশটা বইও আছে তার। শিশুসাহিত্যে দৃপ্ত পদচারণা।

বিজ্ঞাপন
অনায়াস দক্ষতায় দ্রুতগতিতে লিখতে পারেন। তার নাম শিরীন বকুল। আমাদের সকলের প্রিয় বন্ধু। কখনো তিনি বড়বোন।  কখনো তিনি ছোটবোনের মতো। কখনো বন্ধু। সবসময় পাশে থেকেছেন। যেমন গাঢ় বন্ধুত্ব তেমনই অনেক মান অভিমান নিয়ে দীর্ঘ পথচলা আমাদের।  অনেক আন্তরিক সম্পর্ক। শুধু বন্ধুত্ব নয় এ সম্পর্ক। শুধু বন্ধুত্ব নয়- এ সম্পর্ক নিবিড় পারিবারিক। বকুল বাংলায় এমএ। কিছুদিন এক কলেজে শিক্ষকতা করেছে। নিয়মিত নাট্য চর্চার সঙ্গে জড়িত থেকেছে। আর নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী সে। নাটকের জন্যই জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করেছে। তার স্বামী প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার। সন্তান সুদীপ্ত প্রিয় দর্শন। আমাদের এত স্মৃতি যে এইসব লিখতে গেলে পূর্ণাঙ্গ একটি বই হয়ে যাবে। 

আমাদের জীবন দেখা ও শিল্পের সংগ্রাম শুরু হয়েছে। বকুলের বাসায় দিনের পর দিন কতো যে অত্যাচার করেছি তার কোনো হিসাব নেই। রাত জেগে বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট দেখার স্মৃতি, পান ও আহার, বকুলের খিঁচুড়ি, প্রতি শুক্রবার ধ্রুব এষসহ আড্ডা, দলেবলে ভালো অনুষ্ঠান উপভোগ করা, নাটক দেখা, কোনো বন্ধুর বাড়ি পার্টিতে যাওয়া, নিজেদের কাজকর্ম করা জীবনটা কতো আনন্দময় ছিল। কত দূরে সরে গেল সেই আনন্দময় জীবন। কোনো চাইনিজে আড্ডা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে আড্ডা, বকুল- মাযহারের ছোট্ট বাসায় আড্ডা। অনন্ত ও সীমাহীন আড্ডার মধ্যে আমাদের জীবন কেটেছে। কতো ছোট্ট ও সামান্য জীবন ছিল আমাদের। প্রতি শুক্রবার নির্ধারিত আড্ডা ছিল বকুলের ছোট বাসায়। ধ্রুব এষ, নাট্যজন মামুনুর রশিদ, পাভেল আজাদ প্রমুখ নিয়মিত আসতেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও বকুল সেই আড্ডার রসদ জোগান দিয়েছে। মুখ বুজে আমাদের সকল অত্যাচার সহ্য করেছে। দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। স্বপ্ন মনে হয়। আমাদের জীবনে এত আনন্দ ছিল। বকুলের সস্নেহ প্রশ্রয়ে আমাদের পরম গুরু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার মাঝে মাঝে আসতেন। পানাহারে আমাদের আড্ডা অন্য মাত্রা পেতো।  মাযহার-বকুলের সঙ্গে অনেক আনন্দময় ভ্রমণ স্মৃতি আছে। বকুল ঘুরতে পছন্দ করতো। আমরা কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, চট্টগাম ছাড়াও সেই অভাবের দিনে কলকাতা, বোম্বে, অজন্তা ইলোরা গিয়েছি বন্ধুবান্ধব মিলে। মাযহার-বকুল ছাড়াও সফরসঙ্গী ছিলাম ইসমাইল আর মোহসিনসহ আমি। চয়নদা, লিলিদি, ফরিদ আহমেদসহ একবার সুন্দরবন গিয়েছিলাম। সে ছিল এক আশ্চর্য ভ্রমণ। তখন মাত্র প্রিয় জন্মগ্রহণ করেছে। মনে পড়ে চয়ন ইসলামের সঙ্গে বহুবার তেপান্তর শুটিং কমপ্লেক্সে আড্ডা দেয়া। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।  চয়ন ইসলামের নির্বাচনী এলাকা শাহজাদপুরেও আমরা কতোবার গিয়েছি। তখন আমাদের ছিল যৌবনের শক্তি।  পরে মাযহার-বকুলের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া ভ্রমণ করেছি। প্রিয় তখন বড় হয়েছে।

 আমার ভ্রাতুষ্পুত্র রিফাত কামাল সাইফ তখন আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সে আমার পুত্রবৎ। আমরা ঘুরেছি দার্জিলিং, দিল্লি, আগ্রা, বোম্বে, গোয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান- ইত্যাদি ভ্রমণবান্ধব স্থানে। সেসব আনন্দের স্মৃতি অক্ষয় হয়ে আছে। প্রিয়, অমিও বড় হয়েছে। ওদেরও কি মনে আছে। আমাদের নাট্যচর্চার ইতিহাসে শিরীন বকুল মঞ্চে, টেলিভিশনে অক্ষয় নাম। সহজাত অভিনয় প্রতিভা তার। মঞ্চে দপুটে অভিনয়। বাংলাদেশের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী সুবর্না মুস্তাফা বলেছিলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনেত্রীর নাম শিরীন বকুল। থিয়েটার স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী তিনি। বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল মামুন এক টিভি অনুষ্ঠানে তার প্রিয় শিষ্যের সঙ্গে আলাপচারিতা করবেন। প্রিয় শিষ্য হিসাবে তিনি শিরীন বকুলকে নির্বাচন করলেন। আবদুল্লাহ আল মামুন এর মতো বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের নির্বাচনে বকুলের যে সম্মানপ্রাপ্তি হয়েছিল তা বিশাল।  এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় নানা পুরস্কারে তিনি সমৃদ্ধ। টেনাশিনাস পদক নাট্যসভা পুরস্কার.. আরও কতো পুরস্কারে তিনি ধন্য। বকুল নাট্য অঙ্গনে শিল্পীদের ভালোবাসা পেয়েছেন। তিনি নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত। ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান তিনি উপস্থাপনা করেছেন।  আমাদের জীবনের গত ত্রিশ বছরে যেকোনো পার্টি বা পারিবারিক উৎসবে বকুল হচ্ছে প্রধান নিয়ন্ত্রক। বকুলকে কেন্দ্র করেই আনন্দ আড্ডা জমে ইঠতো। এ প্রসঙ্গে মাযহারের অবদানও স্বীকার করতে হবে। মাযহারের উদারতা ও প্রশ্রয় ছাড়া বকুলের সঠিক আত্মবিকাশ হতো কিনা জানি না। মাযহার সর্বদা পেছন থেকে সকল কিছুর উৎসাহদাতা। বকুল তার স্ত্রী হিসাবে উদার সুবিধা পেয়েছে। বকুলের ভাষায় -আমরা বিয়ে করেছি কমিটেড বিয়ে।

 আমি আমার ক্ষেত্রে কাজ করবো। মাযহারের ক্ষেত্রে মাযহার কাজ করবে। কাজের ক্ষেত্রে তাদের কোনো সংকট দেখিনি। সহজ সুন্দর ও আড়ম্বরহীন জীবন তাদের। আনন্দ নিয়ে একটা জীবন তো আমাদের কেটেই গেল। ওস্তাদ রবিশঙ্কর, নৃত্যাচার্য বিরজু মহারাজ, যশস্বী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কনিকা বন্দোপাধ্যায়, তীজন বাঈয়ের নাট্যাভিনয়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের শেষ সাক্ষাৎকার এসব অনুষ্ঠান সরাসরি উপভোগ করেছি বকুলের কল্যাণে। বকুলদের থিয়েটারের নাটক তখন নিয়মিত মঞ্চায়ন হতো। দুইবোন, উজীর ঘোড়ার গপ্পো, আন্তিগোনে- এসব দেখার স্মৃতি এখনো ভুলিনি। ‘এখনই সময়’ আবদুল্লাহ আল মামুনের নাটকের মাধ্যমে উত্থান। টেলিভিশনে আনোয়ারা, সংসপ্তক, গ্রন্থিকগণ কহে, এখন ইতিহাস হয়ে আছে।  বকুলের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বয়ান খুব বেশি করা হলো না। বন্ধুত্ব নিয়ে কিছু লেখাও যায় না। তা শুধুই অনুভবের বিষয়। সেদিন ধ্রুব এষ আমাকে বলছিল আমাদের জীবনে বকুল আপার অবদান কোনোদিন ভোলার নয়। কতো অত্যাচার করেছি তাকে। কোনোদিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়নি। আমাদের আড্ডার উৎস ছিল বকুল আপা। তার প্রেরণা ছাড়া আমরা হয়তো আড্ডাবাজই হয়ে উঠতাম না। ধ্রুব’র কথা সত্য। ধ্রুব আর প্রিয়র জন্মদিন একই তারিখে। ১৭ই জানুয়ারি। প্রিয় জন্ম নেয় ধানমণ্ডির এক ক্লিনিকে। শীতের দিনটা স্পষ্ট মনে আছে। আমি আর ধ্রুব ক্লিনিকের মাঠে দাঁড়িয়ে আছি। সেই সুদীপ্ত প্রিয়দর্শন এখন নিউ ইয়র্ক প্রবাসী। সেখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।  বকুলের বড়ভাই ড. নজরুল ইসলাম। নামী অর্থনীতিবিদ। থাকেন নিউ ইয়র্কে। তিনি তার পুরো পরিবারকে গ্রিনকার্ডধারী আমেরিকান বানিয়েছেন। মাযহার, বকুল, প্রিয়ও সেই সুবাদে নিউ ইয়র্কবাসী হয়ে গেল। ঢাকায় বকুলরা থাকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজস্ব বাড়িতে। বাড়িতে পেইন্টিং আর বই সংগ্রহ আছে বিস্তর। সেগুলো সেই অবস্থায় রেখে নিউ ইয়র্ক পাড়ি দিলো বকুল আর মাযহার। যখন নিউ ইয়র্ক যাচ্ছে ওরা তখন আমি আর অমিও ওদের সফরসঙ্গী। পাঁচজন মিলে কাতার এয়ারওয়েজে নিউ ইয়র্ক বইমেলায় অংশ নেবো। আমি আর অমি ফিরে আসবো। মাযহার-বকুলরা রয়ে যাবে। 

খুব সুন্দর এক নিউ ইয়র্ক ভ্রমণ হয়েছিল সেবার। বইমেলার তিনদিন উড়ে গেল। তারপর আমাদের ঘোরাঘুরি। অদ্ভুত আনন্দের স্মৃতি। বিশেষ করে প্রিয় আর অমিকে সঙ্গে করে ঘুরে বেড়ানো। নিউ ইয়র্কের সব মিউজিয়াম চষে বেড়ালাম। গেলাম নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে। স্বাতীদের বাফেলোর বাসায়। স্নিগ্ধ সময় কাটালাম। স্বাতী আমার ভাইয়ের মেয়ে। হিমেল ওর বর। গাড়ি দিয়ে আমাদের ঘোরালো।  ফিরে এসে আবার ঘোরাঘুরি। সে ২০১৭ সালের ঘটনা। ২০১৮তে বইমেলায় গেলাম। আমি লিলিদি ঋষভ, অমি। নিউ ইয়র্কে যুক্ত হলো মাযহার বকুল আর প্রিয়। নিউ ইয়র্কের মাটিতে তৈরি করলাম ঢাকা শহর। আড্ডায় ভ্রমণে তা এখন ইতিহাস। মাঝে ওয়াশিংটনও গেলাম। ২০১৯-এ আবার যাওয়া হলো নিউ ইয়র্কে। অমি এখন পড়াশোনা করছে সুইডেনে। ঋষভও চলে গেছে কানাডায়। জীবন কতো অদ্ভুত। কত দ্রুত সময় চলে যায়। বদলে যায় সব। কতো অকারণ ব্যস্ততা আমাদের। এবার একুশে বইমেলায় বকুল এসেছিল। ওর পারিবারিক নানা কাজকর্ম ছিল। মাযহার নিউ ইয়র্কবাসী হলেও মেলায় প্রতিবছর আসে। বকুল নিউ ইয়র্কেও শিক্ষকতার পাশাপাশি নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। জীবন বহমান। এবার বকুলের সংক্ষিপ্ত সফরে খুব বেশি দেখা হয়নি। বকুলের বোন জুবিলির বাসায় এক সন্ধ্যায় ভোজ। আর মার্চের প্রথম সপ্তাহে মাযহার ফিরে যাওয়ার আগের দিন চয়ন-লিলিদির বাসায় আড্ডা।  জীবনের বাস্তব ঘটনাগুলো একসময় স্মৃতি হয়ে যায়। আমাদের জীবনও কি স্মৃতি হয়ে গেল? জানি বকুল যদি স্মৃতিগদ্য লেখে সেটাও ভালো লেখা হবে। আমরাও ক্রমে ক্রমে পঞ্চাশোর্ধ হয়ে গেলাম। এখন ষাটের উপান্তে। তবে আফসোস নাই কোনো- কারণ আমরা জীবনকে উপভোগ করেছি সর্বস্ব নিংড়ে। জীবন আমাদের প্রতিমুহূর্তে আনন্দময়।   

 

লিলি ইসলাম 

আমাদের আপন দিদি বলতে যাকে বোঝায় তার নাম লিলি ইসলাম। ছিলেন লিলি গঙ্গোপাধ্যায়। বিশ্বভারতীর সহপাঠী চয়ন ইসলামের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে তিনি ঢাকার অধিবাসী। আমাদের লিলিদি। লিলিদি’ শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন। বাল্যকাল থেকে তিনি কলকাতায় রবীন্দ্র সঙ্গীতের নানা স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত তার রক্তের নেশা। তাই দীর্ঘদিন শান্তি নিকেতনে অধ্যয়ন করেছেন। কনিকা বন্দোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, নীলিমা সেন, গোরা সর্বাধিকারি প্রমুখের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের অগ্রজ ও সহপাঠীদের সঙ্গে সেখানেই পরিচয়। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদী মহম্মদ, মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী, আমিনুর রহমান নিঝু প্রমুখ।  চয়ন ইসলামের সঙ্গে প্রেম। পরে পরিণয়। চয়ন ইসলামের পরিচয় একটু দেয়া যাক। শিক্ষাবিদ ড. মযহারুল ইসলামের জ্যেষ্ঠপুত্র। বিশ্বভারতীতে সঙ্গীতের ওপর অধ্যয়ন। এখন শিল্পপতি। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শাহজাদপুর নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। আনন্দময়, ফূর্তিবাজ, আড্ডাবাজ ও সরল প্রাণ অসাধারণ এক ব্যক্তি। ভালুকায় তার তেপান্তর নামে একটা শুটিং কমপ্লেক্স নামে একটা শুটিং জোন ছিল। কতো আড্ডাই না হয়েছে সেখানে। আমাদের আনন্দময় জীবনের পূর্ণতা এনে দিয়েছেন চয়ন ইসলাম। কতো অভিনব উপায়ে পার্টি হতে পারে, রাত্রি জাগরণ হতে পারে তার কোনো সীমা পরিসীমা নাই। চয়ন-লিলি এক অনিন্দ্য উদাহরণ যোগ্য দম্পতি। তারা বন্ধু। পরস্পরকে ‘তুই’ সম্বোধন করে। তাদের একমাত্র সন্তান ঋষভ ইসলাম। এখন বড় হয়ে গেছে। কানাডার কোনো এক কলেজে লেখাপড়া করছে। ফুটবলে পারদর্শী সুযোগ্য সন্তান।  একদা লিলি চয়নের বাসায় আমাদের জন্য রুম ছিল। আমি, কবি আসলাম সানী, শিরীন বকুল, আহমাদ মাযহার আমরা যেন এক পরিবারের সদস্য ছিলাম। সেই রুমে আমার আর সানী ভাইয়ের পোশাক আশাকও থাকতো।  সে এক প্রাণবন্ত আড্ডাময় জীবন। নব্বই দশকের সেই আড্ডায় কে থাকেনি? অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ইমদাদুল হক মিলন, খায়রুল আলম সবুজ, প্রয়াত খালেদ খান, মিতা হক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, আলী ইমাম, হাবীব আহসান, আল মনসুর, মুজিবুর রহমান দিলু, লুৎফর রহমান রিটন, শহিদুল আলম সাচ্চু, কাওসার চৌধুরী, কিরণ চন্দ্র রায়, বারী সিদ্দিকী, ডলি সায়ন্তনী, বাদশা বুলবুল, শাহ আলম সারোয়ার, মিতালী হোসেন, ডিআইজি খন্দকার মোজাম্মেল হক, অণিমা রায়, তানভীর তারেক, সাদী মহম্মদ, শিবলী মহম্মদ, মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী- কতো মুখ মনে পড়ে। সেই আড্ডার মুখ। আর রাতের আড্ডার প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন লিলি ইসলাম। অর্থাৎ লিলিদি। খাবারের জোগান দেয়া, মাতাল সামলানো সব তত্ত্বাবধান করতেন  লিলিদি। হায়রে যৌবনের সেইসব বাঁধন ছেড়া দিন। এমন বিস্ময়কর আনন্দ উদ্‌যাপন করেছি যা এখন কল্পনাও করা যায় না।

 আমাদের শারীরিক শক্তির পাশাপাশি তীব্র মানসিক শক্তি ছিল, সেই শক্তির জোরে প্রতিদিন প্রতিরাত আমরা আড্ডা দিয়েছি। পানাহার করেছি। তেপান্তর শুটিং কমপ্লেক্সে রাত জেগে আড্ডা দিয়েছি। আর এসবের পেছনে প্রধান শক্তিদাতা ছিলেন লিলিদি। মনে পড়ে, একবার দলবেঁধে আমরা সুন্দরবন গেলাম। আমি চয়নদা, লিলিদি, মাযহার, বকুল, ফরিদ আহমেদ, তানি ভাবি, আওলাদ হোসেন রুহুল। প্রিয় তখন সদ্য জন্ম নিয়েছে। চয়নদা পুরো জাহাজ মাতিয়ে রাখলেন একাই। বাঘের সঙ্গে সেবার দেখা হয়নি। তবে বাঘের গন্ধ পেয়েছিলাম। এমন আশ্চর্য ভ্রমণ একজীবনে দুইবার হয় না।  ২০১৮ সালে নিউ ইয়র্ক বইমেলা গেলাম। আমি, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র রিফাত কামাল সাইফ অমি, লিলিদি আর ঋষভ। নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, মিউজিয়াম দর্শন, ভ্রমণ আড্ডা সে কী জীবন্ত সময়। বইমেলায় লিলিদি গান গাইলেন। আমরা প্রতিদিন কোনো না কোনো ইভেন্টে অংশ নিলাম। ৩ জুলাই ঋষভের জন্মদিন পালন করলাম ওয়াশিংটনে। নিউ ইয়র্ক থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো মাযহার-বকুল আর প্রিয়। ১৫টা দিন যেন উড়ে গেল। অমি আমার পুত্রবৎ। কতো দেশ ওর সঙ্গে ঘোরা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক গিয়েছি অনেকবার। এইসব এখন স্মৃতি। যাহোক আমরা চারজনের এই আমেরিকা দর্শন আজীবন মনে রাখবো। প্রিয়, ওদের বাসা ছেড়ে আমাদের সঙ্গে হোটেলেই ছিল।

   সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি চলতো আমাদের ঘোরাঘুরি। এরকম টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি। লিলিদির সঙ্গে শাহাজাদপুর যাওয়া। এসব স্মৃতি তো হাজার হাজার।  খুব মনে পড়ে- লিলিদি যখন মাতৃসম্ভবা হলেন। প্রাথমিককালেই লিলিদি চলে গেলেন কলকাতায়। চিকিৎসকের নিবিড় পরিচর্যায় থাকতে হবে তাকে। তখন অনেক কয়বার আমি কলকাতায় গেলাম। লিলিদির সঙ্গে থাকার জন্য। সল্টলেকে লিলিদি বাড়ি ভাড়া করেছিলেন। সানী ভাই, মাযহার, রুহুল আমরা বেশ কয়েকবার কলকাতা গেলাম।  চয়নদা তখন শাহজাদপুরের সংসদ সদস্য। লিলিদি যেদিন মা হলেন অর্থাৎ কোল আলো করে ঋষভ জন্ম নিলো সেদিন আমরা সদলবলে কলকাতা রওনা দিলাম চয়নদার গাড়িতে। আমি মাযহার বকুলসহ। ঋষভের জন্ম উপলক্ষে বিশাল পার্টি হলো সল্টলেকের সেই বাসায়। পানের বন্যা বয়ে গেল। কলকাতার বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন। লিলিদির পিতৃবাসাগৃহে হলো ঋষভের অন্নপ্রাশন। ব্যাপক খাবারের আয়োজন। শ্যামবাজারে লিলিদির বাসায়। দেখতে দেখতে সেই সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া ঋষভ এখন পূর্ণ যুবক। আঠারো পেরিয়ে সে এখন সাবালক।  এখনো চয়নদার বাসায় প্রায়শ পার্টি হয়। লিলিদি তার কোকিলকণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন। পানাহার করে আমরা সবাই ঢুলুঢুলু। অমি, প্রিয়, ঋষভ আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। ওরাও মত্ত থাকে পার্টিতে। চয়নদা- লিলিদি আধুনিক মনের উদারতা। আমরা ছোটবড় ভেদ জ্ঞান করি না।  বাবুর্চির রান্নার পাশাপাশি আমিও দুএকটা ডিশ রান্না করি। চয়নদা, ঋষভ আমার রান্নার ভক্ত। ঋষভ বড় হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেহের বয়স বাড়ছে। কিন্তু মনের বয়স কখনোই বাড়বে না। লিলিদি হাসি আনন্দে একটা জীবন তো কেটেই গেল আমাদের। জীবনের কাছে কোনো প্রত্যাশা নাই আর...।   

 

আফসানা মিমি 

বাইরে মাতাল বৃষ্টি। নগর যেন ভেসে যাচ্ছে। পথে পথে জল জমেছে। চ্যানেল আই প্রাঙ্গণের ছাতিম গাছ বৃষ্টির প্রাণে সবুজ হয়ে উঠেছে। আকাশের রং কালো। গর্জন হচ্ছে। পথে গাড়ি ঘোড়া আটকে যাচ্ছে। আমি তখন অফিসে। আমার নির্জন কক্ষে তুমুল আড্ডায় ব্যস্ত। বাইরের বৃষ্টির কোনো খবর আমাদের জানা নেই। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আফসানা মিমি। স্নিগ্ধ, শুভ্র শাড়ি পরণে। এক মাথা ছড়ানো চুল।  আমীরুল কি করছো তোমরা? বাইরে তাকিয়ে দেখ। একটু বাইরে যাও। বৃষ্টির গন্ধের গান শোনো।  আমরা করিডোরে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টির স্পর্শ আমাদের ছুঁয়ে গেল। মিমি পাশে পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। আন্তরিকভাবে। মিমি টিভি অভিনেত্রী। মিমি সাহিত্য পাঠক। মিমি মঞ্চশিল্পী। মিমি নাট্য নির্দেশক। মিমি সংগঠক। মিমি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। মিমিকে নাট্য আমুদে দর্শকেরা বড় ভালোবাসে। মিমি স্নিগ্ধতার প্রতীক। মিষ্টি লাবণ্যমাখা মুখখানি। সবসময় হাসিমুখ। কথা বলে খুব দৃঢ়স্বরে। নেতৃত্বদানকারী কণ্ঠস্বর। আর তার মাথায় ঘুরপাক খায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন নতুন পরিকল্পনা। কোন ধরনের কাজ করা যায়? সেমিনার সিম্পোজিয়াম, আড্ডা সবখানেই মিমির উপস্থিতি আলো ছড়ায়। নাটক ও সিনেমায় মিমি কিংবদন্তী অভিনেত্রী। সুবর্ণা মুস্তাফার পরেই মিমিদের অবস্থান। শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত, আফসানা মিমি সমোচ্চারিত নাম।  মিমি বড় কর্মবীর মানুষ। সারাক্ষণ কাজের প্রেরণায় ছুটতে থাকে। মিমিকে কখনো স্থিরভাবে বসে থাকতে দেখিনি। একটু সৌজন্য আড্ডা দিয়েই ছুটলো কোনো মিটিংয়ে। শিডিউল মেইনটেন করায় সে খুব দক্ষ। নইলে শত শত টেলিভিশন নাটকে কি করে সে অভিনয় করলো? ভালো ভালো চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। অনেক জনপ্রিয় ও সফল ধারাবাহিক নাটকের তিনি ছিলেন প্রধান অভিনেত্রী। 

সে ইতিহাসের বয়ান দিতে চাচ্ছি না। সেটা সবাই জানে। মিমি ভালো রান্না করতে পারে। দেশীয় লোকায়ত রান্নার প্রতি তার আগ্রহ। বড়ি, লতি, মাছের বড়া, চিংড়ির মালাইকারি, ভাপা মাছ, সরষে দিয়ে ঢেঁড়শ, পোস্ত দিয়ে সবজি এমন সব বিচিত্র রসনায় তার রন্ধনশিল্প সমৃদ্ধ। মিমি চ্যানেল আইতে বাটি ভরে খাবার এনেছে। আমরা একসঙ্গে খেয়েছি। রসনা বিলাস থাকে বলে আর কি! মিমি স্বল্পাহারী। তবে পছন্দের খাবার খেতে ভালোবাসে।  সুদূর উত্তরা থেকে সে প্রতিদিন শিল্পকলা একাডেমিতে আসে। কর্মসূত্রে সে শিল্পকলা একাডেমির নাট্য বিভাগের প্রধান। এই দীর্ঘ রাস্তা মিমি নানা পরিকল্পনায় ক্ষত বিক্ষত করে তোলেন নিজেকে। পরিকল্পনার যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। ঢাকা শহরে প্রবেশ করে মিমি যার সঙ্গে দেখা হয় তার সঙ্গেই পরিকল্পনা শেয়ার করতে থাকেন। টগবগ করে কথা বলতে থাকেন।  মিমি অসম্ভব রকমের বইপড়ুয়া ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্র ভক্ত। এই বিষয়ে এক আড্ডায় মিমি বলেছিলেন-তার বাবা-মা প্রচুর বই পড়তেন। তারা ছোটবেলায় মিমির শিয়রে রবীন্দ্রনাথের ছবি রেখে দিতেন। রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখেই শৈশবে বেড়ে উঠেছেন আফসানা মিমি।  রবীন্দ্রনাথের প্রচুর কবিতা মুখস্ত মিমির। ছোটদের কবিতাগুলো অনর্গল মুখস্থ বলতে পারেন। মিমি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসগুলো খুব ভালো মতো পড়েছেন। সুনীল-শীর্ষেন্দু-সুচিত্রা ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব গুহ, মতি নন্দি, সমরেশ মজুমদার, হুমায়ূন আহমেদ, শওকত ওসমান, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেন প্রমুখের লেখা তিনি নিয়মিত পড়ে থাকেন। ফিকশনের বাইরে নন ফিকশন পাঠেও আফসানা মিমির ব্যাপক আগ্রহ। স্মৃতিকথা, ভ্রমণ, ফিচার, অনুবাদ বিভিন্ন বিষয়ে মিমির ব্যাপক পাঠ অভিজ্ঞতা। মিমির হাতব্যাগে সবসময় তার অপঠিত কোনো বই থাকে।

 চলমান পথে মিমি সুযোগ পেলেই বই পড়তে থাকেন। নাট্যজগতের কোনো শিল্পীর মধ্যে খুব কমই দেখতে পেয়েছি। খায়রুল আলম সবুজ, আজিুজল হাকিম, পাভেল আজাদ প্রমুখকে নিয়মিত বই পড়তে দেখেছি। মিমি সেই একই পথের পথিক। পাঠ মানে কেবলই বিনোদন নয়। অলস দুপুরে গল্প জানার জন্য বই পড়া। মিমি সচেতন পাঠক। জগতের খুঁটিনাটি সকল তথ্য-উপাত্ত মিমির কাছে আছে। মিমি ক্ষমতার দম্ভ করে না। ক্ষমতা বলয়ের কাছাকাছি থেকেও সে ফিরে আসতে জানে। অনেক লোভ থেকে নিজেকে উপেক্ষা করতে পারে। শিল্পীসুলভ মানসিকতাই মিমিকে এমন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। মিডিয়া লাইন অনেক ভঙ্গুর। অনেক পিচ্ছিল। অনেক লোভ-লালসা। অনেক হাতছানি। এসবকে ম্যানেজ করে একজন শিল্পীকে প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে হয়। অনেক কঠিন ও দুর্গম পথ। মিমি সেই পথে সফল অভিযাত্রী।  মিমি সম্পর্ক আরেকটি তথ্য দেই। মিমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তারা নির্দিষ্ট কিছু ক্ল্যাসিক বই পড়তো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সেই বিষয়ে সপ্তাহে একদিন আলোচনা করতেন। প্রশ্ন উত্তর পাঠ চলতো। মিমি সেই পাঠ কর্মসূচি সম্পন্ন করেছিলেন। জীবনের বিকাশ পর্বে মিমির সেই শিক্ষালাভ মিমিকে অন্য মানুষের চেয়ে আলাদা মানুষে রূপান্তরিত করেছে। আর দশজনের চেয়ে মিমি অন্যরকম। মিমি শরতের নীল মেঘ দেখে কাতর হয়। বর্ষার ঘন বৃষ্টি তাকে পাগল করে তোলে। শীতের উষ্ণতায় জবুথবু মিমি। হেমন্তের পাকা ধানের মাঠে হেঁটে যায় মিমি। গ্রীস্মের দাবদাহে গাছতলায় বসে থাকে। মিমি গাছ চেনে। ফুল চেনে। প্রকৃতির প্রতি তার অনেক ভালোবাসা।  মিমি এই প্রকৃতিরই অংশ। মিমি প্রকৃতির সব আনন্দ ছড়িয়ে দেয় আমাদের মধ্যে।   

 

শবনম ফেরদৌসী 

তাকে নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। আবার হয়তো কিছুই লেখা যায় না। অম্লমধুর এক চরিত্র। যেকোনো বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বমুখর আলোচনায় তিনি পারঙ্গম। জীবনব্যাপী তিনি সাংবাদিক। অন্তর্জগতে তিনি পুরোদস্তুর চলচ্চিত্র নির্মাতা। প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণে তিনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তিনি আমাদের প্রিয় এক ব্যক্তিত্ব। তার নাম শবনম ফেরদৌসী। এক দৃঢ়চেতা নারী চরিত্র। অসাধারণ গুণবতী। কিছু বিশেষণ তার জন্য সুপ্রযোজ্য। যেমন তিনি কথার জাদুকর। যেকোনো বিষয়কে নানা আলোয় বিশ্লেষণ করতে পারেন। সাংবাদিক তার পেশাভিত্তিক পরিচয় হলেও তিনি মূলত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, ডকু চলচ্চিত্র নির্মাতা। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি চলমান ছবির জগতে ভ্রমণরত। অসাধারণ সব প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেছেন। শবনম দীর্ঘদিন টিভি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। চ্যানেল আইতে সংবাদ পাঠ করেছেন দীর্ঘদিন। এটিএন নিউজে ছিলেন প্রযোজক। এখন আছেন একাত্তর টেলিভিশনে। শবনমের জীবন শুরু হয়েছিল ভোরের কাগজে। সংবাদ ও ফিচারকর্মী হিসেবে। দারুণ উদ্দীপনাময় ব্যক্তি তিনি। প্রতিদিন নতুন কিছু করার জন্য ছটফট করেন। অসম্ভব প্রাণশক্তি বলে তিনি ভাবনার জগত থেকে সরে আসেন না। তার যেকোনো স্বপ্নযাত্রা একদিন বাস্তবে পরিণত হয়।  শবনম একদিন ফিল্ম নির্মাণ করবে। সেই লালিত স্বপ্ন নিয়ে তিনি ফিল্ম এপ্রিয়েশন কোর্স করেছেন।

 পৃথিবীর ভালো ভালো চলচ্চিত্র মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এসব নিষ্ঠাবান নারীবাদী নারী আমাদের চারপাশে সচরাচর দেখা যায় না। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত শেষবার ঢাকা এসেছেন করোনার আগে। উঠেছিলেন গুলশান ক্লাবে। সেখানেই প্রদর্শিত হয় ‘টোপ’ নামের অসাধারণ এক সিনেমা। একাত্তর টিভির পক্ষ থেকে শবনম তার সঙ্গে কথোপকথন শুটিং করেন। শবনমের ফিল্ম সেন্স দেখে বুদ্ধদেব দা মুগ্ধ হলেন। পরদিন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এলেন আমাদের বাসায় আড্ডা দিতে। সেদিন উপস্থিত ছিলেন সেই আড্ডায় চলচ্চিত্রকার আবু সাইয়ীদ, গোলাম রব্বানী বিপ্লব, রোকেয়া প্রাচী, শিরীন বকুল, আহমাদ মাযহার, সোহিনী দাশগুপ্ত। কিন্তু বুদ্ধদেব দা বারবার বলেছিলেন- শবনম কোথায়, শবনম কোথায়? শবনম সেদিন আসি আসি করেও অফিসের কাজে আটকা পড়েছিলেন। শবনমকে প্রচণ্ড পছন্দ করেন বিখ্যাত প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান। হাবিব ভাইয়ের সরলতা ও শিশুতোষ আচরণের আমরা খুব ভক্ত। শবনমকে হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে দেখেছি। মনপছন্দ আড্ডায় শবনমের কোনো জুড়ি নেই। খানিক সোমরস পানে শবনম হয়ে ওঠেন তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার তরবারির মতো। ইউরোপীয় মনস্ক হয়েও শবনম পুরোদস্তুর বাঙালি। টাঙ্গাইলের মতো সংস্কৃতিসেবী জেলায় তার জন্ম। বিকশিত হয়েছেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ তার অপরিসীম। শবনমের সঙ্গে একবার কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছিলাম। আমরা যখন রবীন্দ্র সদনে আড্ডায় ব্যস্ত শবনম তখন বিভিন্ন ভেন্যু ঘুরে ঘুরে ফিল্ম দেখছে। 

সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তার। উৎসব চলাকালীন প্রতিদিন চলচ্চিত্র কর্মীদের পার্টি হতো। শবনম ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায়। খানিকক্ষণ কথা বলেই শবনম স্ক্যান করে ফেলতো সেই ব্যক্তিকে। তার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হতো। যেকোনো বিষয়কে শবনম ক্রিটিক্যাল দেখতে পারে।  শবনমের পাঠ অভিজ্ঞতাও ব্যাপক। তিনি বাংলা ভাষার সেরা মণিমুক্তো বেশ মন দিয়ে পড়েছেন। মজার ব্যাপার হলো তিনি শিশুসাহিত্যও অনেক পাঠ করেছেন। তাই তার মননে শিশু বাস করে। যেকোনো সৃজনশীল মানুষের ভেতরেই মহাকালের শিশু খেলা করে। অনেক পুরস্কারের সম্মানে তিনি সম্মানিত। তার অনেক প্রামাণ্য চিত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। শবনমের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের নাম আজব কারখানা। এই ছবি নির্মাণের সময় শবনম অস্থির উন্মাদে পরিণত হয়। মাথায় তখন চলচ্চিত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এই উন্মাদনাই তাকে সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক অনেক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন। তার নির্মিত ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। শবনম খুব মর্যাদাবান ব্যক্তি। কোথাও কোনো অমর্যাদা হলে সেখানে তিনি এক মুহূর্ত থাকেন না। ইদানীং শবনমের হৃদযন্ত্রে ব্যাধি আক্রমণ করেছে। তাকে চিকিৎসকের নানারূপ বাধা নিষেধের দেয়াল তুলেছে। কিন্তু কে মানে সেসব কথা। শবনম ছুটে বেড়াচ্ছে চিরযৌবনের শক্তি। সমাজে এমনসব নারীশক্তি আছে বলেই আমরা হতাশ নই। শবনমের মতোই আলোচনা সমালোচনার মধ্যদিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সর্বক্ষেত্রে জয় হোক শবনমের।   

 

অণিমা রায় 

অণিমাকে নিয়ে আমার কিছু লেখা বেশ কঠিন। কোনো কোনো সম্পর্ক গভীর আন্তরিক ও ব্যাখ্যাতীত হয়ে যায় অণিমা আমার জীবনে তেমনই এক স্নেহপরায়ণ ভালোবাসার মানুষ। অণিমার সঙ্গে আমার স্নেহপূর্ণ সম্পর্কটাই প্রধান হয়ে ওঠে। আমার কখনো মনে থাকে না অণিমা রায় একজন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। দেশে বিদেশে ওর খ্যাতি তৈরি হয়েছে। লন্ডন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কলকাতা, সবখানেই ওর বাঙালি মহলে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। অণিমা পিএইচডি করেছে। ওর নামের আগে ড. ব্যবহার করা হয়। অণিমা রেডিও টেলিভিশন ও মঞ্চের একজন সফল শিল্পী। অণিমা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। অণিমা ‘সুরবিহার’ নামের সঙ্গীত স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকে স্মরণ করে বিরুলিয়ায় স্থাপন করেছে বাগানবাড়ি ‘পুনশ্চ‘। এক কর্মময় জীবনের অধিকারী সে। সারাদিন কাজ আর কাজ। অবাক হয়ে ভাবি এই ছিপছিপে শরীরে দিনরাত এত বিপুল পরিমাণ কাজ কি করে করে সে। এতকিছুর পরও অণিমা জনসংযোগ রক্ষা করছে। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাচ্ছে। খুব কাছ থেকে দেখলে অবাক হতে হয়। গান চর্চা করছে। দেশ-বিদেশে ছাত্র ছাত্রীদের গান শেখাচ্ছে। মুহূর্ত মাত্র ওকে অকারণ সময় ব্যয় করতে দেখি না।  ওর স্বামী বিখ্যাত বিনোদন সাংবাদিক তানভীর তারেক। নিজেও সঙ্গীত চর্চা করেন। সুর সৃষ্টি করেন। চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিবেশন করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। তার একমাত্র পুত্র সন্তান অমিয়। সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে সে বড় হচ্ছে।  অণিমার গানের আমরা খুব ভক্ত। রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও সে চার কবির গান খুব ভালো গায়। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মিতা হক, সাদী মহম্মদ তার প্রিয় শিক্ষক। হাতে কলমে তাদের কাছে গান শিখেছেন। তার আরেক প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী। 

স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার বলেই অণিমার সংস্কৃতি চর্চা আরও তীব্র, আরও বেগবান। প্রতিদিন ব্যস্ত বলেই হঠাৎ তারা জগৎ সংসার থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে যায় বিনোদন ভ্রমণে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কলকাতা, কাশ্মীর-এইসব বিনোদন কেন্দ্রে। অণিমা ভাগ্যবান নারী। জীবনের রূপ রস গন্ধ সে মনের আনন্দে উপভোগ করে যাচ্ছে। তার সঙ্গীত জীবনের প্রধান সহায়তাকারী তানভীর তারেক। তার সকল কাজে গাছের মতো ছায়া দিয়ে রাখেন তার প্রিয়তম স্বামী।  আমি সঠিকভাবে বলতেই পারি-আমি অণিমার বড় ভাইয়ের মতো। অণিমার অভিভাবকের মতো। আমি অণিমার যেকোনো সুখে-দুখে পাশে থাকি। মন খারাপ থাকলে মাসে ছয় মাসে একবার পুনশ্চতে যাই। সবুজ গাছের ভিড়ে মনটা সতেজ করে ফিরে আসি। চমৎকার নৈসর্গিক পরিবেশ। সবুজের মাঝে কিছুক্ষণ থাকলেও মনটা ভালো হয়ে যায়। অণিমার ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়িও খুব সুন্দর। ছিমছাম। সবুজের সমারোহ চারপাশে। গানের স্টুডিও আছে বাসায়। যদিও নিকেতনে তানভীরের আলাদা গানের স্টুডিও আছে।  অণিমার ছোট্ট সুখী গৃহকোণ। কোনো বাড়তি আড়ম্বর নেই। নিজেকে জাহির করার কোনো প্রবণতা নেই। সবার সঙ্গে অণিমা খুব বিনয়ের সঙ্গে মধুর ব্যবহার করে। কারও সঙ্গে কখনো রূঢ় ব্যবহার করতে দেখিনি। মধুর স্বরে কথা বলে। কখনো উচ্চকণ্ঠে তাকে কথা বলতে শুনিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত বিভাগে লেখাপড়া করেছেন। ফলাফল বরাবরই ভালো। রবীন্দ্রনাথকে তিনি অন্তরে ধারণ করেন। তার জীবন দেবতা সয়ং রবীন্দ্রনাথ। তার গানের ভেতর দিয়ে অণিমা দেখে জগতখানি। তার কর্মে-ভালোবাসায় চিন্তায় মননে বেঁচে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। অণিমার গানের গায়কী খুব সুন্দর। চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত তার কণ্ঠে আরও সুন্দর গভীর হয়ে ওঠে। তার গানের অত্যন্ত সচেতন শ্রোতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আসাদুজ্জামান নূর কিংবা ফরিদুর রেজা সাগর।

 সামনা সামনি দেখা হলেই তারা অণিমার গানের প্রশংসায় মেতে ওঠেন। সায়ীদ স্যার একবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নায় অণিমার গানের আসর বসিয়েছিলেন। সে এক স্বর্গীয় পরিবেশ। সুরের আগুন যেন কাঁপতে কাঁপতে চাঁদের দিকে যাচ্ছিল। সায়ীদ স্যার শেষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বললেন, চাঁদের থেকে জ্যোৎস্না ধার করে অণিমার কণ্ঠে মিশে গেছে। অণিমা অনেক ভালো গান গাইবে।  অনেক মঞ্চ অনুষ্ঠানে দেখেছি-অণিমা গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আসাদুজ্জামান নূরের উপস্থিতি। তিনি উদারচিত্তে প্রশংসা করেছেন অণিমার। এসব অনেক বড় প্রাপ্তি। ফরিদুর রেজা সাগরও অণিমার গান খুব পছন্দ করেন। সময় সুযোগ পেলেই বলেন-কাল অণিমার গান দিয়ে দাও। ফিলার হিসেবে অণিমার গান দাও। বিশেষ দিনেও অণিমার গান প্রচার করো। এভাবেই পেছন থেকে সাগর ভাই অণিমার গানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। অণিমার অনেক মঞ্চ অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকেছি। দর্শকদের আবেগ উচ্ছ্বাস টের পেয়েছি। তার গান শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন দর্শক- শ্রোতারা। অনুষ্ঠান শেষে দর্শকেরা ছুটে এসেছেন অণিমার কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। অটোগ্রাফ নিয়েছেন। অণিমার সঙ্গে আমার কখনোই নিয়মিত দেখা হয় না। কিন্তু যখনই দেখা হয় তখনই আন্তরিকতার ফুল ঝরে পড়তে থাকে। অনর্গল গল্প হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক হতে থাকে। অফুরন্ত খাইদাই হতে থাকে। উচ্ছ্বাসময় সময় কাটে।  অণিমা এলেই অনেকে মিলে আড্ডা জমে ওঠে। ফরিদুর রেজা সাগর, শহিদুল আলম সাচ্চু, শাহরিয়ার নাজিম জয়, আফসানা মিমি, আবদুর রহমান-আমরা আড্ডার নিয়মিত সঙ্গী। চ্যানেল আই আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। আজকাল আমার শরীর ভালো যায় না। নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আছি। যখনই হাসপাতালে ভর্তি হই প্রথমেই ছুটে আসে অণিমা। কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলে ওঠে তার। শিয়রে বসে থাকে। হাতটা হাতের ওপর রাখে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকে তানভীর তারেক। অণিমা কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট উচ্চারণে বলতে থাকে-আপনার এই অবস্থা হলে আমরা বাঁচবো কি করে। ছায়া পাবো কোথায়? যত্ন নেন আমীরুল ভাই। প্লিজ যত্ন নেন। আপনি হারিয়ে গেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।  অণিমার কান্না থামতেই চায় না। অণিমার কান্নার মূল্য কি আমি দিতে পেরেছি? 

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ থেকে আরও পড়ুন

   

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status