ঢাকা, ২৩ জুন ২০২৪, রবিবার, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

ঈদ সংখ্যা ২০২৪

কন্যাকুমারীর ত্রিবেণী সঙ্গমে

আবদুল্লাহ আল মোহন

(২ মাস আগে) ১৪ এপ্রিল ২০২৪, রবিবার, ৫:২৮ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৪ অপরাহ্ন

mzamin

নিজেকে চার দেয়ালের ঘরে আটকে রেখে সারাটি জীবন কাটাতে কেউ কী ভালোবাসে? নিশ্চয় নয়। অজানাকে জানা এবং অদেখাকে দেখার আগ্রহ মানুষের জন্মগত। এ একটি প্রবণতা। মানুষের কৌতুহলী মনই এই প্রবণতার উৎস। আর সেই বিবেচনায় অনুভব করা যায় অকৃত্রিম, বৈচিত্র্যময় ও বহুবিধ রূপের সমন্বয় এবং সমারোহ ঘটেছে এই পৃথিবীতে। পৃৃথিবীর আনাচে-কানাচে এত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তা হয়তো না দেখলে ধারণা করা অসম্ভব। যদিও জানি, সব জায়গায় সবার পায়ের ছাপ পড়বে না, তবে মানস ভ্রমণে ব্রতী হতে কারও কোনো বাধা নেই। নেই বলেই তো পৃথিবীর পথে হেঁটে বেড়াতে কার মন না উন্মুখ থাকে? তার ওপর যদি রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভবঘুরে শাস্ত্র’ শৈশবেই হয়ে ওঠে কারও প্রিয় বই? ‘পালামৌ’-এর প্রবল টানের কথা আর নাইবা বললাম। জগত জুড়ে ঘুরে বেড়াবার সখ কিংবা স্বপ্ন গড়ে ওঠে স্কুল জীবনেই। যমুনা পাড়ের নগরবাড়ী ঘাটের ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেও নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠায় এবং ‘আউট বই’ পড়ার অভ্যাসের কারণে মন ছুটে চলতে শুরু করে পথ থেকে পথে।

বিজ্ঞাপন
ছাত্রজীবনে শিক্ষকদের চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনার কারণে ভূগোলের প্রতিও সবিশেষ আগ্রহ জন্মে। স্যারদের কাছেই শুনি ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’র পাশাপাশি ভারতের  দু’প্রান্ত ‘কাশ্মির থেকে কন্যাকুমারী’র কথা। এতবার শুনেছি যে, সেই ভ্রামণিক মনে শৈশব থেকেই জীবনের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল স্থানগুলো পর্যটনের। জীবনের নানান চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে অবশেষে সেই কামনা-বাসনা পূরণ হলো একদিন। ২০১৯ সালের জুনে বিয়ের আমন্ত্রণে সপ্তাহব্যাপী কাশ্মির ভ্রমণের সুযোগ ঘটে। আর ২০২৩ সালের শুরুতে চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে মুম্বাই-কেরালা যাওয়ার ফলে কন্যাকুমারী’র বুড়ি ছুঁয়ে সাধ-আহ্লাদ মেটানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতেই হয় আমার প্রতিটি ভ্রমণের রথের রশি যার হাতে ছিল, তিনি আমার নিত্যপথসাথী শান্তা ম্যাডাম, যিনি ঢাকার গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সাইন্সের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাশনা রশীদ ম্যাডাম হিসেবে জনারণ্যে সুপরিচিতি। করোনাজনিত নানাবিধ শারীরিক সমস্যার কারণে চিকিৎসার জন্য যেতে হয় ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী শহর মুম্বই। সেখানে থাকতে থাকতেই কন্যাকুমারী ভ্রমণ বিশেষত স্বামী বিবেকানন্দ রক দর্শনের তীব্র ইচ্ছা মনে জেগে ওঠে। মুম্বাইয়ে আমাদের চিকিৎসার শেষের দিকে অনেক ঘাটের জল ঘোলা করে, নানাবিধ জটিলতা এড়িয়ে পরিকল্পনা মাফিক শান্তা ম্যাডামের আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার প্রয়োজনে কেরালা যাত্রা করি। 



কন্যাকুমারী দক্ষিণ ভারতের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পর্যটন কেন্দ্র। প্রাচীনকালেও কন্যাকুমারী ছিল তামিলাকাম বা প্রাচীন তামিল দেশের দক্ষিণতম সর্বশেষ অঞ্চল। হিন্দু দেবী কন্যাকুমারী নাম থেকেই কন্যাকুমারিকা হয়েছে। বৃটিশ যুগে কন্যাকুমারীর অপর নাম ছিল কেপ কমোরিন। ইংরেজি নামটা এখনো সেখানকার কোনো কোনো প্রাচীন রাস্তাঘাটে দেখা যায়। কন্যাকুমারীর সঙ্গে আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দের নাম। ভারতবর্ষের এই শেষবিন্দুতে এসে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন বীর সন্ন্যাসী। তার স্মৃতিতে এখানে নির্মিত হয়েছে স্মারকস্থল। সারা বছর আসেন বহু পর্যটক। ঘুরে দেখেন। কন্যাকুমারীতে আছে আরও অনেক দর্শনীয় স্থান। তিনটি কারণে কন্যাকুমারী দেখার তীব্র ইচ্ছা মনের মধ্যে। এক. এটি ভারতের শেষ বিন্দু বা মূল ভূখণ্ডের শেষ প্রান্ত। দুই. এখানে বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর আর ভারত মহাসাগরের মহামিলনে নীল জলরাশির এক রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ থাকে সব সময়। তিন. এখানে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম চিন্তাবিদ এবং গুরু স্বামী বিবেকানন্দের নামাঙ্কিত ‘বিবেকানন্দ রক’। সুবিশাল প্রস্তরখণ্ডের উপর ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তারই স্মৃতিতে ১৯৭০ সালে নির্মিত হয়েছে মন্দির।
 


২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি ভোরে আমরা কেরালার নয়নাভিরাম সমুদ্র শহর কোভালাম থেকে রওনা দেই কন্যাকুমারী। পথ ধরলাম অনেক দিনের লালিত স্বপ্নের সীমানা ছুঁতে- কন্যাকুমারীর শেষ বিন্দু, ভারতের শেষ ভূখণ্ড স্পর্শ করে, মহাসমুদ্রের উত্তাল জলরাশির মহামিলনে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে স্বপ্ন পূরণের শিহরণে পুলকিত হতে। কেরালার কোভালাম থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের পথ কন্যাকুমারী। উল্লেখ্য, ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই মহানগরী থেকে কন্যাকুমারীর দূরত্বপ্রায় ৮০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। চিকিৎসার জন্য আমরা একাধিকবার চেন্নাই গেলেও প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দূরত্বের কারণে ও সময়ের অভাবে কন্যাকুমারী যাওয়া হয়ে ওঠেনি আগে। আর তাই এবার কেরালা ভ্রমণের কোভালাম পর্বে পরিকল্পনায় রেখেছিলাম কন্যাকুমারী। এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে ভ্রমণের বিদেশি পর্যটকদের  জন্য নির্ধারিত ফি প্রদান করে চলে আমাদের ছুটে চলা। কেরালা থেকে তামিলনাড়ু রাজ্যের সর্বত্রই রাস্তার দু’ধারে পড়ে নারকেল গাছের বাগান। মাঝে মাঝে সমুদ্রের সঙ্গে বৃক্ষরাজির মিতালীর অপরূপ দৃশ্য বিমোহিত না করে পারে না। প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কখন কন্যাকুমারী পৌঁছে যাই, অনেকটা টেরই পাই না। হিন্দু-মুসলিম প্রধান কেরালায় চলতি পথে রাস্তায় প্রচুরসংখ্যক নান্দনিক নির্মাণ শৈলির চার্চ চোখে পড়েছে। প্রকৃতির বৈভবের একান্ত সান্নিধ্যে, ঝিরঝিরে বাতাসে, অচেনা কয়েকটি শহর-বন্দর-গ্রামের পথ পেরিয়ে, পথের মাঝে কয়েকবার বিরতি দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই ছোট্ট শহরে, দুই সাগর আর এক মহাসাগর- তিন বিশাল জলরাশির মহামিলনস্থল স্বপ্নের সেই কন্যাকুমারীতে। ভারতের একমাত্র সৈকত, যেখানে এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে পাওয়া যায়।
 


চলতি পথে মনের জানালায় উঁকি দিয়ে জানান দেয় তামিলনাড়ু ও কেরালা এ দুই রাজ্যের ইতিহাস ও ভূগোল একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ছড়িয়ে গিয়ে জড়িয়ে ছিল ভ্রমণকালে আমার মাঝেও! তাই অজানা সেসব জায়গার ডাকে মশগুল হয়ে পড়ায় বেরোনোর দিন গাড়ি ছাড়তেই মনকে উড়িয়ে দিলাম স্বপ্নের দুনিয়ায়। অজানার সেই ডাক, ভ্রমণ পিপাসু শরীর-মনের সবটুকু ক্লান্তি, প্রতিবন্ধকতা উধাও করে দিলো। আমাদের ইনোভা গাড়িটি যখন কন্যাকুমারীর পথে চলতে শুরু করেছিল তখন থেকেই সমুদ্র সমুদ্র একটা পুলক অনুভব করছিলাম চারপাশের প্রকৃতি দেখে। পথের দুধারে সারি সারি নারকেল গাছ, সামুদ্রিক বাতাসে যারা সারাক্ষণ নেচে বেড়াচ্ছে আপন মনে, মাতাল বাতাসে। উইন্ড মিলের বিশাল বিশাল পাখাগুলো জানিয়ে দিচ্ছিল কাছেই মহাসমুদ্রের মহামিলন। হু হু বাতাসের তোড়ে শেষ পথটুকু যেন উড়ে উড়ে চলছিল! অবশেষে পৌঁছলাম ‘কেপ কমোরিন’। এক সময় কন্যাকুমারী এ নামেই পরিচিত ছিল। দক্ষিণ ভারতে মূল ভূ-খণ্ডের সর্বশেষ বিন্দু কন্যাকুমারী ইতিহাসসমৃদ্ধ তো বটেই, পর্যটকদেরও চোখের মণি। 
 


কন্যাকুমারীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বিবেকানন্দ মেমোরিয়াল রক। সেই টানেই পথের ক্লান্তি ভুলে নানান মোহনীয় প্রকৃতির পরিবেশের সান্নিধ্যের পরশ পেয়ে হাজির হই কন্যাকুমারী। সেখানে নেমে প্রথমেই একটি ভালো মানের হোটেল খুঁজে দু’জনা নাস্তা করে নেই। খাবার ও পরিবেশ পছন্দ হওয়ায় ফেরার পথেও একই হোটেলে মধ্যাহ্ন ভোজনও সারি। প্রথম দর্শনীয় স্থান বিবেকানন্দ রকে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটতে হয়। এরপর প্রখর রোদে লাইন ধরে লাইফ জ্যাকেট পরে লঞ্চে উঠে সমুদ্রের হালকা দুলুনি খেতে খেতে পৌঁছে যাই বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত এই রকে। মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে সমুদ্রের উপর অবস্থিত। ফেরার পথেও একইভাবে ফেরিঘাটের দীর্ঘ অলিগলি ঘুরে শেষে লাইফ জ্যাকেট পরে লঞ্চে চেপে বসেছিলাম। চঞ্চল সমুদ্রের বুকে মোচার খোলার মতো দুলতে দুলতে আসা-যাওয়ার স্মৃতিপিঠ আকর্ষণ- বিবেকানন্দ রক। দেবী কন্যাকুমারীর পদস্পর্শ ধন্য এই পাথর পুরাণের কাল থেকেই পবিত্র স্থন হিসেবে সমাদৃত। সারা ভারত পরিক্রমার পর ১৮৯২ সালের ২৪, ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর এ জায়গাতেই স্বামী বিবেকানন্দ গভীর ধ্যান শেষে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বিবেকানন্দ স্মৃতিরক্ষা সমিতির উদ্যোগে এই শিলার উপর নির্মিত হয়েছে ‘বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির’ ও ‘শ্রীপদ মন্দির’। প্রতি বছর ১২ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনে আসেন বহু মানুষ। সমুদ্রের মাঝখানে পাথরে টিলার উপর তৈরি বিবেকানন্দ রকের নির্মাণে লেগেছে অজন্তা এবং ইলোরার গুহা মন্দিরের আদল। সেখানে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের বিশালাকার ব্রঞ্জের মূর্তি। শান্ত পরিবেশে মনের মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাবের উদয় হয়। অশান্ত সমুগ্রের মাঝে এক পরম প্রশান্তির স্পর্শ। ধ্যানগৃহের অন্ধকারে স্নিগ্ধ সবুজ আলোর বিচ্ছুুরণ ও গম্ভীর ধ্বনি এক ঝটকায় বাইরের জগত থেকে মনকে পৌঁছে দেয় আত্মার অন্তঃস্থলে
 


তামিলনাড়ু রাজ্যের কন্যাকুমারী জেলার অন্তর্গত সমুদ্রের বুকে দেবী কন্যাকুমারীর মন্দিরই ভারতের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণতম শেষ বিন্দু। যেখান থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের দিকে পিছন ফিরে উত্তর দিকে তাকালে মনের মধ্যে অনিন্দ্য-অনির্বচনীয়, স্বর্গীয় অনুভূতি জাগবেই। কারণ সেই মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে গোটা ভূ-ভারতের একদম পাদদেশে। এরপর কোনো ভ্রামণিক মন শ্রদ্ধা ও আবেগে না ভরে থাকতে পারে? আমাদের সামনেই তিন রঙের তিন সমুদ্র। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর আর আরব সাগর। দূরের আকাশ রেখায় সেই শিলা, যার উপরে বিবেকানন্দ ধ্যানে বসেছিলেন ভবিষ্যৎ ভারতের অন্তরাত্মার অনুসন্ধানে। বিবাদ নয়, বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ, সমন্বয় ও শান্তির বার্তা নিয়ে শিকাগো পাড়ি দিয়েছিলেন এখান থেকেই। আগেও বলেছি তিনটি কারণে কন্যাকুমারীর তাৎপর্য আলাদা। প্রথমত, এটাই ভারতের শেষ বিন্দু বা মূল ভূখণ্ডের শেষ প্রান্ত। দ্বিতীয়ত, তিন সাগরের মিলনস্থল হওয়ায় সর্বদা উত্তাল সমুদ্র। তৃতীয়ত, বিবেকানন্দ রক। এবং স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির ভবন। ফলে কন্যাকুমারী না ঘুরলে বাঙালির ভ্রমণই হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিন সাগরের রানি হলো কন্যাকুমারী। কন্যাকুমারী ভারতের একমাত্র সৈকত, যেখানে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়। দূরের সমুদ্রে জলবিভাজিকাও দেখা যায় কন্যাকুমারী ঘাট থেকে। সাগরপাড়ে দাঁড়ালেই সামনে শান্ত ঘন নীল ভারত মহাসাগর, একটু বাঁদিকে ফিকে ও ঘোলাটে নীল বঙ্গোপসাগর, ডান দিকে পান্না সবুজ আরব সাগর। দূরে হালকা জল বিভাজিকাও দেখা যায়  কন্যাকুমারীর ঘাট থেকে। বোল্ডারের আধিক্য থাকায় এখানে সমুদ্রস্নান সম্ভব নয়, বেশ বিপজ্জনক। 



বাঙালির চির গর্বের শহর কন্যাকুমারী। এখানেই স্বামী বিবেকানন্দ সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তিন সমুদ্রেদ্রর মাঝে যে শিলাখণ্ডের উপর বসে স্বামীজি ধ্যান করেছিলেন, সেই শিলা আজ বিবেকানন্দ রক নামে জগদ্বিখ্যাত! তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিবেকানন্দ স্মারক ভবন‌। রকে প্রবেশপথেই বিবেকানন্দ রক মিউজিয়ামের জনসংযোগ আধিকারিকের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তাকে আমার প্রকাশিত ‘দৃষ্টি ও অর্ন্তদৃষ্টির ভারত ভ্রমণ’সহ কয়েকটি বই উপহার দিলাম তাদের পাঠাগারের জন্য। তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানালেন এই উপহার পেয়ে, বললেন তাদের গ্রন্থাগারে বাংলা বইয়ের আলাদা তাকও আছে। স্বামীজীর জীবনীকর্ম নিয়ে আমার লেখা আছে এবং বই প্রকাশের আগ্রহ আছে জেনে খুশি হলেন। আমার সঙ্গে অনেকটা সময় নিয়ে আলোচনাও করলেন। বাঙালি স্বামীজীর একজন স্বজন হিসেবে অভিহিত করে বিশেষ সমাদরও করলেন। তাদের কিছু প্রকাশনাও উপহার দিলেন। গৌরব অনুভব করলাম। জানালেন, বিবেকানন্দ মেমোরিয়াল রক স্মৃতিসৌধটি স্থাপিত হয় ১৯৭০ সালে। এটি বিবেকানন্দ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত। বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণকালে লেখক হিসেবে বিশেষ সমাদর পেয়েছি, সম্মানিত হয়েছি। অনেক বাঙালিকেও পেলাম রকে। তারা সবাই পশ্চিমবঙ্গের। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষার্থীদের দেখে দারুণ ভালো লেগেছে। প্রচণ্ড গরমে ও উত্তাপের কারণে বিবেকানন্দ রকের বিভিন্ন স্থানে খালি পায়ে হেঁটে দেখার জন্য বিশেষ ধরনের শীতল পাথুরে পথের  ব্যবস্থা থাকায় পা পোড়েনি দিল্লির জামে মসজিদের ভ্রমণকালের মতো। বিষয়টি খুব ভালো লেগেছে। ফলে ভ্রমণবান্ধব পরিবেশ সকলের জন্য দারুণ সহায়ক ছিল কাঠফাটা রোদেও। প্রচুর দর্শনার্থী থাকলেও বিশৃঙ্খলা তেমন চোখে পড়েনি। প্রচণ্ড গরমেও ঠাণ্ডা বাতাসের আরামপ্রদ আবহাওয়া কষ্টকে লাঘব করেছে। একটা রকে যে এত রকমের কার্যক্রম থাকতে পারে, সেটা না দেখলে অনুমান করা কঠিন। আর ব্যবস্থাপনাও ভালো। বইয়ের দোকান, ধ্যান-ঘর বা মেডিটেশন কক্ষ, স্বামীজীর পূজা মন্দির, সেখানে মা সারদাদেবী, গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মূর্তিও দারুণ মনকাড়া। 



তিন সাগরের সঙ্গমস্থল হলো কন্যাকুমারিকা। আর সেই মিলনক্ষেত্রেই দেবী কন্যাকুমারীর মন্দির আছে। কুমারী মাতার মন্দিরটি সতীর অন্যতম পীঠস্থান। স্থানীয় নাম কুমারী আম্মান। পার্বতীরই আরেক রূপ দেবী কন্যাকুমারী। দেবী কন্যাকুমারী আম্মান মন্দিরে আরতিতে দক্ষিণী বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখরিত হয় চতুর্দিক। প্রায় ৩০০০ বছরের প্রাচীন। অধিষ্ঠিত দেবী কুমারীরূপী পার্বতীকে কেন্দ্র করে বেশ মজার উপাখ্যান প্রচলিত আছে। পার্বতী শিবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। শিবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে দেবী কুমারী থাকার প্রতিজ্ঞা করেন। এই মন্দিরের পাশে সাগর পাড়ে দাঁড়ালেই সামনে শান্ত ঘন নীল ভারত মহাসাগর। আছে প্রাচীন তামিল মহাকবি, দার্শনিক তিরুবল্লোবরো, ওরফে থিরুভাল্লুভারের ১৩৩ ফুটের বিশালাকায় মূর্তি। আছে গান্ধীমণ্ডপম। ভারত মহাসাগরের জলে মহাত্মা গান্ধীর চিতাভস্ম বিসর্জনের আগে এই জায়গায় রাখা হয়েছিল। আমরা মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়ালও ঘুরে দেখি, আর অহিংস চেতনার অনন্য ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।



সমুদ্রসৈকত থেকে বেশ খানিক উপরে কন্যাকুমারী মন্দির। কুমারী মহামায়ার আরাধনায় উৎসর্গীকৃত এই মন্দির তিন হাজার বছরের পুরনো। সেই মন্দির পরিদর্শন শেষে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম সমুদ্রের পাড়ে। উত্তাল সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস। ছোট মাছধরা ডিঙিগুলো ঢেউয়ের তালে অবিরাম তার ভিতর শুধু দুলছে। আর পাড়ে? দূর থেকে ছুটে আসা সাদা ঢেউয়ের মালা সশব্দে আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে। এলোপাথাড়িভাবে ভিজিয়ে দিচ্ছে হলুদ বালিয়াড়ি। সূর্যের তাপ একটু স্নিগ্ধ হতেই ভিড় জমতে শুরু করল সৈকতে। ঝড়ো বাতাসে উড়ে যেতে ইচ্ছে করাই তখন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি শেষ বিকেলের নরম আলো গায়ে মেখে। আমাদের ছুঁয়ে যায় প্রাগৈতিহাসিক নোনা বাতাস। আমি স্বামীজিকে খুঁজে ফিরি সেই বিস্ময় পাথরের ওপরে গড়ে তোলা বিবেকানন্দ মেমোরিয়ালের উপাসনালয়ে, লাইব্রেরিতে, ধর্মীয় আচারের নানা রকম আয়োজনে দর্শনে। ধীরলয়ে অস্তাচলে যায় দিনমণি। একসময় আমাদের ফিরতে হয় স্মৃতির আনন্দশক্তি নিয়ে। তার আগে একে একে ঘুরে দেখলাম বিবেকানন্দ প্রদর্শনী, সূচিন্দ্রম মন্দির, মোম সংগ্রহশালা ও পদ্মনাভ প্যালেস। 

১০
বিবেকানন্দ রকে ভ্রমণ শেষে কন্যাকুমারীর শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে দেখলাম বিকেল গড়িয়ে পড়ছে কন্যাকুমারীর নীল জলে। শেষ বিকেলের মায়াময় আলো গায়ে মেখে কন্যাকুমারীর শেষ বিন্দুতে, বিশাল বিশাল পাথরে ঘিরে রাখা প্রাচীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে বড় বিস্ময়কর অনুভূতি। এখানে, এই মহাসমুদ্রের উত্তাল জলরাশির মধ্যে অনন্তকাল ধরে দুটি দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর পাথরখণ্ডের একটিতে বসে একদিন ধ্যান করেছিলেন বিবেকানন্দ নামের এক বাঙালি! আমরা জানি, স্বামী বিবেকানন্দ (আসল নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত, জন্ম: ১২ই জানুয়ারি ১৮৬৩- প্রয়াণ: ৪ঠা জুলাই ১৯০২) একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি দার্শনিক। তবে তিনি ঠিক ঋষি অরবিন্দ ঘোষের (১৮৭২-১৯৫০) মতো আশ্রমবাসী সন্ন্যাসী অথবা আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের (১৮৬৪-১৯৩৮) মতো প্রাতিষ্ঠানিক দার্শনিক ছিলেন না। বিবেকানন্দ ছিলেন একাধারে বৈদান্তিক, গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী, ধর্মীয় নেতা ও মহান মানবতাবাদী সমাজসংস্কারক। আধুনিক ভারতের তিনি অন্যতম নির্মাতা। স্বামী বিবেকানন্দের জীবন আলোচনা করতে গেলে রামকৃষ্ণ পরম হংসদেবের (১৮৩৬-১৮৮৬) কথা বলতেই হয়। ভারতীয় ও পাশ্চাত্যদর্শন পড়ে নরেন্দ্রনাথ উপলব্ধি করতে পারেন যে, শুধু বুদ্ধি দিয়ে পরম সত্যকে জানা সম্ভব নয়। সত্যের সন্ধানে তিনি বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে যেতে থাকেন। এই আগ্রহ থেকেই তিনি ব্রাহ্মসমাজেরও অন্তর্ভুক্ত হন। একদিন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন, ‘আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন?’ এ প্রশ্নে সকলের মতোই মহর্ষিও নিরুত্তর থাকেন। নরেন্দ্র পরমহংসদেবকেও একই প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে পরমহংসদেব বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ আমি ঈশ্বরকে দেখেছি। তোমাকে যেমন দেখছি তার চেয়েও স্পষ্টভাবে তাকে আমি দেখেছি।’ কিন্তু এ জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেননি নরেন্দ্র। যাইহোক, দীর্ঘদিন পরমহংসদেবের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। এই যোগাযোগসূত্রেই ধীরে ধীরে তিনি তাকে তার গুরু আর পথপ্রদর্শক বন্ধু হিশেবে গ্রহণ করেন। পরে এমন একটা সময় আসে, যখন সংসারজীবনের সঙ্গে তার সবধরনের সম্পর্কের পুরোপুরি অবসান ঘটে। ১৮৯৩ সাল থেকে ইউরোপ আমেরিকা পরিভ্রমণ শেষে তিনি ১৮৯৭ সালের কয়েক মাস অমৃতসর, আম্বালা, শ্রীনগর, মারী, রাওয়ালপিণ্ডি, জম্মু, শিয়ালকোট, লাহোর, দেবাদুন, দিল্লি, জয়পুর, ক্ষেত্রী প্রভৃতি জায়গায় তার বাণী প্রচার করলেন। ঘুরলেন বাংলাদেশেরও নানা জায়গা। স্বদেশের নানা ধর্মের-বর্ণের মানুষের সঙ্গে তিনি মিশলেন। কঠোর পরিশ্রমে তার শরীর এই সময় প্রায় ভেঙে পড়বার দশা। ১৮৯৯ সাল নাগাদ তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিন্ত একটু সুস্থ হওয়া মাত্র দুর্বল শরীরেই তিনি ১৮৯৯ সালে আবারো যাত্রা করেন আমেরিকা। এবার তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী তুরীয়ানন্দ আর ভগিনী নিবেদিতা। ১৯০০ সালে আমেরিকা থেকে স্বদেশের পথে প্যারিসে পৌঁছোন তিনি। সেখানে যোগ দেন ‘ধর্মণ্ডইতিহাস-সম্মেলনে’। ওই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ ঘুরে তিনি বেলুড় মঠে ফিরে আসেন। আর এসেই ঘোষণা করেন: ‘অসীম শক্তির অধিকারই ধর্ম। শক্তিমত্তাই পুণ্য, দুর্বলতাই পাপ। দুর্বলতা-এই একটি শব্দের মধ্যেই সমূহ পাপ এবং মন্দ নিহিত আছে। সকল দুষ্কর্মের মূল হচ্ছে দুর্বলতা। সকল স্বার্থপরতার উৎস হচ্ছে দুর্বলতা। দুর্বলতাবশেই মানুষ অপরের ক্ষতি করে বসে।’ 


স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০২ সালের ৪ জুলাই বেলুড় মঠেই পরলোকগমণ করেন। পরদিন অপরাহ্নে মঠের কাছেই গঙ্গার তীরে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পুরো চল্লিশ বছরের জীবনও নয়, এর মধ্যেই তিনি দেশকে যা দান করেন, অপরিমেয় তার মূল্য। এই মহান ধার্মিক বললেন: ‘অন্য দেবতাদের ভুলে যাও। দেশই মাতা। তার উপাসনা করো।’ স্বামীজী লিখেছেন, ‘গীতায়ও বলা হয়েছে: ‘আমাদের কর্মে অধিকার আছে, কিন্তু ফলে কখনো অধিকার নাই।’ অর্থাৎ নিরাসক্ত চিত্তে কাজ করে যাওয়া জীবের ধর্ম হওয়া উচিত। গীতায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে: ‘নির্বোধেরা কর্মে আসক্ত হইয়া কাজ করে; জ্ঞানীরাও কাজ করেন, তবে সকল প্রকার আসক্তিকে অতিক্রম করিয়া, কেবল জগতের কল্যাণের জন্যেই করেন।’ ‘কর্মযোগ’-এর পঞ্চম অধ্যায়ে বিবেকানন্দ বলেছেন: ‘অনাসক্ত হইয়া কীভাবে কাজ করিতে হয়, তাহা সর্বপ্রথমে শিক্ষা করা প্রয়োজন, তাহা হইলে আর ধর্মান্ধতা থাকিবে না।... জগতে যদি ধর্মান্ধতা না থাকিতো, তবে জগত এখনকার অপেক্ষা অনেকখানি আগাইয়া যাইতে পারিত।... ধর্মান্ধতা [জগতকে] পিছনে টানিয়া রাখে।... তুমি যখন ধর্মান্ধতাকে এড়াইবে, কেবল তখনই তুমি ভালোভাবে কাজ করিতে পারিবে।’ বিবেকানন্দের রচনাবলির পরিমাণও প্রচুর। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে: চিকাগো বক্তৃতা, কবিতা, ভাববার কথা, পরিব্রাজক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত, কর্মযোগ, কর্মযোগ প্রসঙ্গ, জ্ঞানযোগ, জ্ঞানযোগ প্রসঙ্গে, ধর্মবিজ্ঞান, কর্মসমীক্ষা, ধর্মদর্শন ও সাধনা, ভক্তিযোগ, পরাভক্তি, ভক্তি রহস্য, রাজযোগ, রাজযোগ ষড়পাঠ, পাতঞ্জল যোগসূত্র, যোগ ও মনোযোগ, মহাপুরুষ প্রসঙ্গ, বিবিধ, ভক্তি প্রসঙ্গে, বৌদ্ধ ভারত, বেদান্ত দর্শন এবং ভারত প্রসঙ্গে। ভক্তি আর উদ্দীপনামূলক কিছু কবিতাও তিনি লিখেছেন, যেমন ‘সুপ্ত দেবদূত’, ‘প্রবুদ্ধ ভারতের প্রতি’, ধৈর্য ধরো সাহসী হৃদয়’, ‘সন্ন্যাসীর সংগীত’, ‘৪ঠা জুলাই’, ‘হয়েছে খেলার অবসান’, ‘নাচুক তাহাতে শ্যামা’ প্রভৃতি।  আশাবাদী এই দার্শনিক-ঋষি লিখেছেন: 
‘মেঘের আড়ালে সূর্য ক্ষণিক ঢাকলে/ আকাশে ঘনায় সহসা অন্ধকার,
সাহসী হৃদয়, হারায়ো না তবু ধৈর্য,/ সন্দেহ নাই, খুলবে জয়ের দ্বার।’


১১
ইতিহাসের পাতায় ঘোরাঘুরির পালা শেষ হতে চায় না আমার। ত্রিবেণী সঙ্গমের বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, আরব সাগর একে অপরের সঙ্গে মিশেছে প্রকৃতির নিয়মে আর আমার মনেও খেলা করছিল নিজেকে খুঁজে ফেরার, স্মৃতির আনন্দ ঢেউরাশি। প্রকৃতি আর মন যেখানে জলে জলে জলাকার। এমন মনোহর দৃশ্য জীবনের মতো গেঁথে গেল স্মৃতির মণিকোঠায়। উত্তাল নীল জলরাশি, মহাসমুদ্রের মহামিলন, কয়েক মানুষের চেয়েও উঁচু উঁচু ঢেউয়ের আছড়ে পড়া, সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিবেকানন্দ রক, নতুন গড়ে ওঠা বিশাল মূর্তি, মহাসাগরের মাঝে ঢেউয়ের দোলায় ভেসে চলা রঙিন বোট, মাছ ধরার ট্রলার, শত মানুষের ভিড়, ঝকঝকে আকাশে সাদা মেঘেদের উড়ে যাওয়া, চারপাশে সবুজের নাচন, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো মাতাল বাতাস- সবকিছুই উপভোগ করার স্মৃতি আজো অম্লান। 


১২
এবার কন্যাকুমারীর দর্শনীয় কয়েকটি স্থান নিয়ে যৎসামান্য বলা যাক। কন্যাকুমারী নামটি এসেছে হিন্দু দেবী কন্যাকুমারীর (kanyakumari) নামানুসারে। তামিলনাড়ুর সবচেয়ে নির্মল এবং সুন্দর শহরগুলির মধ্যে একটি। এখানে ঘটেছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব মিশ্রণ। পাশাপাশি লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। আধ্যাত্মিক মনোভাবাপন্ন মানুষের যেমন ভালো লাগে, তেমন ভালো লাগে নির্ভেজাল প্রকৃতিপ্রেমীর। স্বামী বিবেকানন্দের পদস্পর্শে ধন্য সমুদ্রতীরবর্তী শহরটি ছুটি কাটানোর জন্য একটি আদর্শ স্থান। কন্যাকুমারীর আশেপাশে আছে বেশ কয়েকটি বেড়ানোর জায়গা। কন্যাকুমারীতে দেখবার মতোন অনেককিছু থাকলেও সময়ের অভাবে ও অসুস্থতাজনিত কারণে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি আমাদের পক্ষে। তবে আগ্রহী পর্যটকদের জন্য এবার দর্শনীয় কয়েকটি স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরছি।

ভগবতী আম্মান মন্দির
প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো মন্দির। পাচীন স্থাপত্যের আশ্চর্য নিদর্শন। এটা দেবী কন্যাকুমারী (kanyakumari) মন্দির নামেও পরিচিত। ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে একটি। কন্যাকুমারীর সবচেয়ে ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম। মন্দিরে কন্যাকুমারী আম্মানের একটি মূর্তি রয়েছে। দেবীর হাতে একটি জপমালা এবং নাকে সোনার নথ। প্রতিদিন অগণিত ভক্ত সমাগম হয়। বহু মানুষ পুজো দেন।

তিরুভাল্লুভার মূর্তি
তিরুভাল্লুভার ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক এবং কবি। তামিল সাহিত্যে তার অবদান অসামান্য বলে আলোচিত। দক্ষিণ ভারতে তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। কন্যাকুমারীতে আছে তিরুভাল্লুভার বিশাল মূর্তি। বহুদূর থেকে দেখা যায়। পর্যটকরা কন্যাকুমারী বেড়াতে এলে এই মূর্তিটি ঘুরে দেখেন।

গান্ধী মণ্ডপ
জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর ভস্ম সম্বলিত ১২টি কলসের মধ্যে একটি রাখা হয়েছে। এখানে আছে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী। আছে লাইব্রেরিও। সেখানে সুরক্ষিত আছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অসংখ্য পত্রিকা, বই এবং অন্যান্য প্রকাশনা।

সাঙ্গুথুরাই সৈকত
কন্যাকুমারীর সাঙ্গুথুরাই সমুদ্র সৈকত শহরের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা। এই সৈকতে আছড়ে পড়ে ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ। বহু পর্যটক অপলক তাকিয়ে থাকেন সমুদ্রের দিকে। উপভোগ করেন অপার্থিব সৌন্দর্য।

আওয়ার লেডি অফ র‌্যানসম চার্চ
কন্যাকুমারীতে অবস্থিত একটি বিখ্যাত ক্যাথলিক চার্চ। মাতা মেরির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। জানা যায়, চার্চটি পঞ্চদশ শতকে তৈরি। এটা গথিক স্থাপত্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। নীল চার্চের পিছনে উত্তাল সমুদ্র। এই চার্চটি না দেখলে কন্যাকুমারী ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

সেন্ট জেভিয়ার চার্চ
নাগেরকোয়েলে অবস্থিত প্রায় ৪০০ বছর আগে তৈরি এই চার্চ কন্যাকুমারীর বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির মধ্যে একটি। সেন্ট জেভিয়ার চার্চটি দেখার জন্য বহু পর্যটক আসেন।

থিরপারপ্পু জলপ্রপাত
কন্যাকুমারীর জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে একটি। মানবসৃষ্ট এই জলপ্রপাতের নিচে একটি পুকুরে প্রায় ৫০ ফুট উপর থেকে জল ঝরে পড়ে। জলপ্রপাতের আশপাশে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটানো যায়। অনেকেই পুলে স্নান করেন। এখানে আছে পিকনিক স্পট। বহু মানুষ পরিবার বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন। জলপ্রপাতের প্রবেশদ্বারের কাছে আছে একটি ছোট শিব মন্দির। চাইলে পুজো দেয়া যায়।

থানুমালয়ন মন্দির
সুচিন্দ্রামের পবিত্র মন্দিরটি ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং দেবাদিদেব মহাদেবকে স্মরণ করার জন্য নির্মিত হয়েছিল। স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। এই মন্দির ত্রিমূর্তি নামেও পরিচিত।

ভাট্টকোট্টাই দুর্গ
ভাট্টকোট্টাই ফোর্ট মানে ‘বৃত্তাকার দুর্গ’। সমুদ্রতীরবর্তী এই দুর্গটি কন্যাকুমারীর কাছে অবস্থিত। অসাধারণ নির্মাণ শৈলির জন্য খ্যাত। দুর্গটি বর্তমানে ভারতীয় প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগের সুরক্ষার অধীনে রয়েছে। বহু মানুষ ঘুরে দেখেন।

পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ
তিরুবনন্তপুরম থেকে ৬৪ কি.মি দূরে অবস্থিত পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ। এই প্রাসাদ ত্রাভাঙ্কোরের শাসকদের তৈরি। এখানে আছে থুকালয় মন্দির। মন্দিরটি আদিবাসী কেরালা স্থাপত্যের একটি সুন্দর উদাহরণ। প্রাসাদটি সুপ্রাচীন। তবু এর ম্যুরাল, দুর্দান্ত খোদাই আজও অক্ষত থেকে গেছে। কন্যাকুমারীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

মায়াপুরী মোম মিউজিয়াম
এই মোম মিউজিয়ামটি লন্ডনের মাদাম তুসো মোম মিউজিয়ামের আদলে তৈরি। এখানে মহাত্মা গান্ধী, চার্লি চ্যাপলিন, মাদার তেরেসা, মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিখ্যাত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের মোমের মূর্তি রয়েছে। কন্যাকুমারী (kanyakumari) শহরের অন্যতম আকর্ষণ।

চিথারাল জৈন স্মৃতিস্তম্ভ
স্থাপত্যের অনুরাগী এবং জৈন তীর্থযাত্রীদের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য চিথারাল জৈন স্মৃতিস্তম্ভ। জায়গাটা ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চিথারাল একসময় দিগম্বর জৈন সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল ছিল। এখানে নবম শতকের বিভিন্ন দেবদেবীর খোদাই করা একটি গুহা মন্দির রয়েছে। জৈনদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষরাও এই স্মৃতিস্তম্ভ ঘুরে দেখেন।

সানসেট পয়েন্ট
সানসেট পয়েন্ট কন্যাকুমারীর অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। উত্তাল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুহূর্তে বহু মানুষ সূর্যাস্ত দেখেন। সেই সময় আশ্চর্য রকমের প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে পর্যটকদের মনে। মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন ফটোগ্রাফাররা।

সুনামি মনুমেন্ট
২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ভারত মহাসাগর জুড়ে ভূমিকম্প এবং সুনামিতে মারা যান হাজার হাজার মানুষ। শুধু ভারতেই নয়, সোমালিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়াতেও অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাদের স্মরণে তৈরি হয়েছে সুনামি মনুমেন্ট। এই স্মৃতিসৌধ কন্যাকুমারীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। সর্বস্তরের দর্শনার্থীরা এই স্মৃতিসৌধে যান। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মৃতদের প্রতি।


১৩
কন্যাকুমারী তামিলনাড়ু রাজ্যের নাগোড়কৈল জেলার একটি ছোট্ট শহর। মহাসমুদ্রের তীর ঘেঁষে এখানে রয়েছে অনেক হোটেল, মোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, বাসস্ট্যান্ড, ভীষণ নান্দনিক একটি রেলওয়ে স্টেশন। আর রয়েছে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসের সম্ভার পুরো কন্যাকুমারীর উপকূল ঘিরে। মাছ, ডাব, নানা রকম সামুদ্রিক খাবারসহ, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য সব রকমের খাবার আর বিনোদনের সব আয়োজন আছে এখানে। এখানে থাকাও যায়। ৫০০ থেকে ১৫ হাজার রুপিতে প্রতিদিন থাকতে পারবেন যে কেউ। বিবেকানন্দ রকে ইচ্ছা করলে ধ্যানকক্ষে বসে ধ্যানও করতে পারেন। ১৮৯৩ সালে এই পাথরখণ্ডের উপরেই ধ্যানে বসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দ রকের সামনেই আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর মিশেছে। বিশাল এই তিন সমুদ্রের জলের রং দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কন্যাকুমারীতে সূর্যাস্ত অবশ্যই দেখবেন। কন্যাকুমারীতে একরাত থাকলে ভোরে উঠে সূর্যোদয় দেখতে ভুলবেন না। কন্যাকুমারী যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে প্লেনে ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের সর্বশেষ বিমানবন্দর ত্রিভুন্নাপুরামে উড়ে যাওয়া। যেখান থেকে কন্যাকুমারী পথের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। এরপরের উপায় হলো কলকাতা থেকে কন্যাকুমারী ট্রেন। সাপ্তাহিক দুটি ট্রেন ছাড়ে কলকাতা থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত। সময় লাগে ৪২ থেকে ৪৫ ঘণ্টা। এ ছাড়া চেন্নাই হয়েও কম সময়ে ট্রেন আর বাসে করে যাওয়া যায় কন্যাকুমারী। 


১৪
আমাদের চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে, শারীরিক কারণে ভ্রমণের নানাবিধ ঝক্কি ঝামেলা এড়িয়ে দক্ষিণ ভারত ঘুরতে পর্যটন সংস্থার সঙ্গী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সপ্তাহব্যাপী কেরালা ভ্রমণকালে আমাদের চালক কাম গাইড যোশী ভাইয়ের আন্তরিক সহযোগিতার কথা ভুলবো না কোনোদিন। নেপাল ভ্রমণকালে গাড়ির ড্রাইভারদের আচরণ অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো ছিল না, পর্যটন বান্ধব ছিল না। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতায় ভারত ভ্রমণের প্রতিবারেই আমাদের গাড়ি এবং চালকদের পেয়েছি অনেক বেশি ভ্রমণসঙ্গী মানসিকতার, ইতিবাচক আচরণের। তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের কারণেও ভ্রমণ প্রত্যাশিত আনন্দ উপভোগ করা যায়। ভ্রমণপিপাসুদের একবার হলেও ঘুরে আসা উচিত ভারতের দক্ষিণের শেষ প্রান্ত কন্যাকুমারী থেকে। কন্যাকুমারীর ত্রিবেণীসঙ্গমের অসাধারণ নৈসর্গিক রূপের মোহন মায়ায় আজো প্রবলভাবে বিভোর আমার মন। তাইতো দেখি বার বার পিছু ফিরে সেই জীবনানন্দ ভ্রমণ স্মৃতি। 

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ থেকে আরও পড়ুন

   

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status