ঢাকা, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৭ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সময় অসময়

ভালোবাসি ভালোবাসি বললেই ভালোবাসা হয় না

রেজানুর রহমান
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার
mzamin

প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসাই শুধু ভালোবাসা নয়। বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা সেটাও ভালোবাসা। ভাই-বোনের মধ্যে মধুর সম্পর্ক সেটাও ভালোবাসা। অফিসের বস অফিসের সবাইকে গুরুত্ব দেয়, স্নেহ, মায়া দেখায় সেটাও ভালোবাসা। দেশের উন্নয়ন ভাবনায় কাতর হওয়া মানুষটিও ভালোবাসার মানুষ। দেশ না থাকলে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়ই থাকে না। কাজেই যারা দেশকে ভালোবাসে তারাই প্রকৃত প্রেমিক।  আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে সবার অঙ্গীকার হোক আসুন দেশের উন্নয়নে প্রতিদিন একটি হলেও ভালো কাজ করি। আপনি দিনে একবারও মিথ্যা বলেননি- এটা ভালো কাজ। অন্ধ মানুষকে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন- এটাও ভলো কাজ।

বিজ্ঞাপন
কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হননি এটাও ভালো কাজ। কিছু একটা কিনতে গেছেন। বেশ ভিড়। আপনাকে লাইনে দাঁড়াতে বলা হলো। আপনি নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ালেন। এটাও একটা ভালো কাজ। রাস্তা পারাপারের একটা নিয়ম আছে। দেওয়াল টপকে রাস্তা পার না হয়ে আপনি যদি নিয়ম মেনে ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হন তবে সেটাও ভালো কাজ

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, তুমি যদি কাউকে ভালোবাসো তবে তাকে ছেড়ে দাও। যদি সে তোমার কাছে ফিরে আসে তবে সে তোমারই ছিল। তবে যদি ফিরে না আসে তবে সে কখনই তোমার ছিল না। 

আসলে ভালোবাসা একটি বিশ্বাস। ভালোবাসা এক অর্থে শক্তিও বটে। প্রেমিকা প্রেমিকের হাত ধরে যখন বলে, যাও আগুনে ঝাঁপ দাও। আমি পাশে আছি। তোমার কিছুই হবে না। তখন প্রেমিকের বুকে সাহস জন্মায়। পৃথিবী জয় করার ক্ষমতা পেয়ে যায় সে। একই ভাবে প্রেমিক যখন প্রেমিকাকে বলে, তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন? আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। যাও এগিয়ে যাও... তখন প্রেমিকা যেন স্বর্গের সুখ খুঁজে পায়। মানসিক দৃঢ়তায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠে সে। হ্যাঁ আমিও পারবো। এমন মানসিক শক্তিটাই তখন প্রবল হয়। 

এই যে আমাদের এত বড় পৃথিবী টিকে আছে মূলত ভালোবাসার শক্তিতেই। জীবন সবার কাছে প্রিয়। জীবনের জন্য ভালোবাসার প্রয়োজন। ভালোবাসা না থাকলে জীবন অর্থহীন। পৃথিবীও অর্থহীন। ভালোবাসা আছে বলেই পৃথিবীতে পরিবারের সৃষ্টি হয়েছে। ভালোবাসা আছে বলেই মানুষ মানুষের জন্য কাঁদে। প্রেমে পড়ে। প্রেমের টানে সাতসমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দেয়। 

ভ্যালেন্টাইন ডে পালন শুরু হওয়ায় আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবস পালনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসাই শুধু ভালোবাসা নয়। বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা সেটাও ভালোবাসা। ভাই-বোনের মধ্যে মধুর সম্পর্ক সেটাও ভালোবাসা। অফিসের বস অফিসের সবাইকে গুরুত্ব দেয়, স্নেহ, মায়া দেখায় সেটাও ভালোবাসা। দেশের উন্নয়ন ভাবনায় কাতর হওয়া মানুষটিও ভালোবাসার মানুষ। দেশ না থাকলে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়ই থাকে না। কাজেই যারা দেশকে ভালোবাসে তারাই প্রকৃত প্রেমিক। 

আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে সবার অঙ্গীকার হোক আসুন দেশের উন্নয়নে প্রতিদিন একটি হলেও ভালো কাজ করি। আপনি দিনে একবারও মিথ্যা বলেননি- এটা ভালো কাজ। অন্ধ মানুষকে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন- এটাও ভলো কাজ। কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হননি এটাও ভালো কাজ। কিছু একটা কিনতে গেছেন। বেশ ভিড়। আপনাকে লাইনে দাঁড়াতে বলা হলো। আপনি নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ালেন। এটাও একটা ভালো কাজ। রাস্তা পারাপারের একটা নিয়ম আছে। দেওয়াল টপকে রাস্তা পার না হয়ে আপনি যদি নিয়ম মেনে ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হন তবে সেটাও ভালো কাজ। আপনি কাউকে ঠগাচ্ছেন না, দুধে পানি মিশাচ্ছেন না, চালে কাকর মিশিয়ে দিচ্ছেন না, প্রকৃত মূল্যে জিনিসপত্র বিক্রি করছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য অবৈধ ভাবে মজুত করছেন না, অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন- এসবই ভালো কাজ। অনেকে আছেন ট্যাক্স দিতে চান না। ঘুষ না দিলে জরুরি ফাইল আটকে রাখেন, অবৈধ ভাবে জমি, বাড়ি দখল করেন। নদী, খাল ভরাট করে বাড়ি, মার্কেট নির্মাণ করেন এসব কাজ ভালো কাজ নয়। ভালো কাজ হলো মানুষকে বিপদে না ফেলা। বরং কেউ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। 

আমি তোমাকে ভালোবাসি মুখে বললেই ভালোবাসা হয় না, ভালোবাসা টিকে না। আগেই বলেছি- ভালোবাসা টিকে থাকে বিশ্বাসে। কিন্তু আমরা কী বিশ্বাসের মর্যাদা দেই?  ভালোবাসার অপর নাম বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্বের শক্তিটাও কী আগের মতো আছে? আমরা ক’জন বন্ধুর খোঁজ রাখি? কিছুদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। পুরনো বন্ধুদের গেট টুগেদার। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ভেবেছিলাম বন্ধুত্বের ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে কথা হবে। স্মৃতিচারণ হবে। কিন্তু কিছুই হলো না। কারণ সবাই মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। দুই একজন কথা বলছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? একদণ্ড মোবাইল ফোন বন্ধ রাখলে বোধকরি জীবনের গতি থেমে যাবে। বাবার হাতে মোবাইল। মায়ের হাতে মোবাইল। ছেলে-মেয়ের হাতেও মোবাইল। পরিবারে যতজন সদস্য ততটি মোবাইল ফোন। কেউ গান শুনছিল, কেউ ফেসবুকে ঢুকেছিল, কেউ ভিডিও গেম খেলছিল। খাওয়া-দাওয়া শেষে যে যার মতো চলে গেল। এই দৃশ্য সমাজের সর্বস্তরের। বন্ধুত্ব যেন ফেরারি। এই আছি, এই নাই। অর্থ প্রতিপত্তিও ইদানীং বন্ধুত্বের গুরুত্ব নিরূপণ করছে। 

আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন শফিক রেহমান। ভ্যালেন্টাইন ডে’কে আমরা নাম দিয়েছি ভালোবাসা দিবস। উদ্যোগটি খারাপ না। বছরের একটি দিনে ভালোবাসার শক্তি যাচাই করার সুযোগ তো আসে। কিন্তু ভালোবাসাও যেন করপোরেট কালচারে ঢুকে গেছে।

ভালোবাসার চেয়ে বাণিজ্যই যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজ ঢাকা সহ সারা দেশে ভালোবাসা দিবস পালনের প্রতিযোগিতা হবে। দেখে মনে হবে ভালোবাসাকে আমরা কতো গুরুত্ব দেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ভালোবাসার শক্তি যেন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। অনেকে হয়তো অবাক হচ্ছেন। ভালোবাসার শক্তি কমে কী করে? বরং ভালোবাসার শক্তিই তো বাড়ার কথা। চারদিকে এত আয়োজন, এত হইচই। শক্তিটা কমলো কোথায়? একটু ভাবুন তাহলেই বুঝবেন ভালোবাসার শক্তি দিনে দিনে কীভাবে কমে যাচ্ছে। 

সহজ প্রশ্ন। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসাই কী প্রকৃত ভালোবাসা? ভালোবাসার অপর নাম প্রেম। আজকাল তো প্রেমও বেশি দিন টিকে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কৌতুক পড়ে নিজে অনেকক্ষণ ভেবেছি। কৌতুকটা বলি আপনাদের। এক তরুণী তার প্রেমিককে ফোন করে বলছে- ‘এই শোনো আমার বাসা একদম খালি। তুমি আসো।’ প্রেমিক অবাক হয়ে বললো, ‘কী বলো তুমি? একটু আগেই না আমি তোমার বাসা থেকে এলাম।’ প্রেমিকার জবাব ‘ও হ্যাঁ তুমি তো এইমাত্র আমার বাসা থেকে গেলে... স্যরি আমার ভুল হয়েছে’। 

প্রেম এখন এই পর্যায়েও চলে গেছে। প্রেমের বিয়ে আগের মতো টিকছে না। সামান্য মনোমালিন্য, থাকবো না তোমার সঙ্গে বলে অনেক মেয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। পরের মাসেই আবার অন্যজনের সঙ্গে তার প্রেম হচ্ছে। ছেলেদের বেলায়ও এমনটাই ঘটছে। ভালোবাসি বলেই যে সারাজীবন এক সঙ্গে থাকতে হবে এমন তো কথা নেই। একই মুখ, একই শরীর কতোদিন সহ্য হয়। অসহ্য। চল বদলে যাই। 
এই বদলটাই বড় আশঙ্কার। পজিটিভ অর্থে বদলে যাওয়া ভালো লক্ষণ। কিন্তু আমরা তো পজেটিভ অর্থে বদলাচ্ছি না। ভালোবাসার মধ্যেও খাদ ঢুকে গেছে। অথচ ভালোবাসা শব্দটি অনেক পবিত্র। অনেক ভরসার। আমরা বোধকরি সে কথা ভুলেই গেছি। তবুও ভালোবাসার জয় হোক। সবার জন্য অনেক শুভ কামনা।     

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status