ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

হা ল ফি ল বৃত্তান্ত

‘যুদ্ধ’ যখন ‘গণহত্যা’

ড. মাহফুজ পারভেজ
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার
mzamin

গাজায় ‘ইসরাইল-ফিলিস্তিন’ সংঘাতকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে। আসলে তা মোটেও ‘যুদ্ধ’ নয়, ‘গণহত্যা’। যুদ্ধে সৈন্য মারা যায়। সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গাজায় মরছে সাধারণ নাগরিক, নারী, শিশু, বৃদ্ধ আর পুড়ছে জনবসতি। মাত্র তিন মাসে ২৭ হাজার মানুষ মেরে ৮০ ভাগ ঘরবাড়ি ধ্বংস করা যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের ছদ্মাবরণে গণহত্যা। গত ৭৫ বছর ইসরাইল যুদ্ধের নামে গণহত্যা, নব্য-বর্ণবাদী আগ্রাসন, জাতিগত নিধন চালাচ্ছে ফিলিস্তিনে, যার সর্বসাম্প্রতিক হিংস্রতম পর্যায় চলছে গাজায়।

খ্রিস্টপূর্ব ৭২০ অব্দ থেকেই ইহুদিরা ফিলিস্তিন ও জেরুজালেমের দখল নিতে তৎপর, যেখান থেকে অপকর্মের জন্য তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। তারপর থেকে এক ভাসমান গোষ্ঠী বা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডায়াস্পোরা’ হিসাবে ইউরোপের নানা দেশে ইহুদিদের বসবাস। সেখানেও ইহুদিরা নির্যাতিত হয়।

বিজ্ঞাপন
অনুতপ্ত ইউরোপ ইহুদিদের ‘শরণার্থীদের মতো ভাসমান অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে’ এশিয়ার ফিলিস্তিনে চাপিয়ে দেয়। ইউরোপে লাঞ্ছিত ইহুদিদের আইনগত অধিকার ছিল ইউরোপের কোনো দেশে জায়গা পাওয়ার। সেটা করা হয়নি। তাদেরকে ঠেলে দেয়া হয় সুদূর ফিলিস্তিনে, যেখানে মূল-অধিবাসীদের হটিয়ে পশ্চিমাদের মদতে সৃষ্ট ইসরাইল রাষ্ট্র চালাচ্ছে গণহত্যা, জাতিগত হিংসা, দখলদারিত্ব।  
আদি বর্ণবাদী-ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় শক্তি কর্তৃক নব্য-বর্ণবাদী ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেয়া হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ, মিত্রবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক প্রপেলেন্ট তৈরির জন্য ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়নবিদ ওয়েজম্যানকে কৃত্রিম উপায়ে অ্যাসিটোন তৈরি করার জন্য অনুরোধ করেন। হর্স-চেস্টনাট থেকে যুদ্ধের জন্য ৩০,০০০ টন অ্যাসিটোন উৎপাদন এক জায়নবাদী আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রথম ধাপ হিসাবে বাস্তবে কাজ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ যুদ্ধ শেষে ওয়েজম্যানকে ডেকে পাঠালে, তিনি পুরস্কার হিসাবে চেয়েছিলেন, ‘আ ল্যান্ড ফর মাই পিপল’। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিয়া সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হওয়ার পর, আজকের প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিনকে খ্রিস্টান, ইসলাম এবং ইহুদি ধর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান বলে, একে ‘আন্তর্জাতিক অঞ্চল’ হিসাবে রাখা হয়। ‘লিগ অব নেশনস’-এর ম্যান্ডেট বা আদেশানুসারে, বৃটেন ছিল এই অঞ্চলের দায়িত্বে। ১৯১৭ সালে বৃটিশ বিদেশ সচিব লর্ড বালফুর প্যালেস্টাইনে আরবদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও ইহুদিদের তথাকথিত ‘হোমল্যান্ড’ হিসাবে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতকে সমর্থন করেন। এই ঘোষণার পর, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তথাকথিত ছিন্নমূল ইহুদিরা বিরাট সংখ্যায় জেরুজালেম সংলগ্ন অঞ্চলে আসতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে মার খেয়ে আরও ইহুদি আসতে থাকে। এদের সঙ্গে যোগ দেয় আরব অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মিজরাহি ও সেফার্ডিক ইহুদিরা, যাদেরকে সহানুভূতির সঙ্গে পুনর্বাসিত করে পশ্চিমা শক্তিসমূহ। 

কিন্তু ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে এসে বলপ্রয়োগ করায় সেখানকার প্রকৃত বাসিন্দারা বাস্তুচ্যুত হতে থাকে। অপ্রস্তত ফিলিস্তিনিদের অর্থ, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি ও পরিকল্পিত পদক্ষেপে দ্রুতই কোণঠাসা করে ইহুদিরা, যাদের সন্ত্রাস ও হিংসায় আরবদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের নব্য-বর্ণবাদের সূচনা করে। ফিলিস্তিনের বুকের উপর জোরপূর্বক ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পরপরই আমেরিকাসহ প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো স্বীকৃতি দেয়। এমনকি, শুধু প্যালেস্টাইনি বিতাড়ন নয়, আরব উদ্বাস্তুদের প্রতি ইসরাইলের জাতিগত হিংসা ও নব্য-বর্ণবাদী মনোভাব এবং ব্যাপক পরিমাণে প্যালেস্টাইনি শরণার্থী হওয়ার পিছনে যে আধিপত্যবাদী রাজনীতি, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর প্রশ্রয়েই তা বাড়তে থাকে।

ফলে একবিংশ শতকে এসেও ফিলিস্তিনিরা প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসকবলিত এবং প্রতিদিনই ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত’ রিফিউজি গোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। নিজের দেশেই তারা পরাধীন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে হাসপাতালগুলোতে আক্রমণ করতে বা চিকিৎসা প্রদানে বাধা দেয়া না গেলেও ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে সেটাও করছে। গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল-শিফার ভিতরের টানেলে জঙ্গিদের মূলকেন্দ্র মর্মে গুজব ছড়িয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হাসপাতালে ঢুকে পড়ে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। বহু রোগী পালাতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হতে বাধ্য হলেন। জীবন দায়ী ওষুধ এবং ভেন্টিলেশন কাজ না করার কারণেও মারা গেল হাজার হাজার শিশু। ইসরাইলে এইসব ন্যক্কারজনক কার্যক্রমকে ‘যুদ্ধ’ বলে প্রচার করা হলেও তা আসলে ‘গণহত্যা’।   

লক্ষ্য করার মতো বিষয়, আমেরিকান প্রশাসন, বৃটেন এবং অন্য পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকারের নামে অন্য সময়ে এত সরব হলেও তারা কেউ কিন্তু ইসরাইলের একবিন্দু সমালোচনা করেনি, বরং সমর্থন জানিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। ইসরাইলি আগ্রাসন ও বর্বরতার যারা সমালোচনা করেছেন, তাদের সন্ত্রাসের বন্ধু বা সমর্থক বলে দাগিয়ে দিয়েছে। দৈনিক ৪ ঘণ্টা মানবিক যুদ্ধবিরতির অনুমতিও ইসরাইল বা পশ্চিমা বিশ্ব লঙ্ঘন করছে। পশ্চিমাদের এই ভণ্ডামি অমার্জনীয়।

প্যালেস্টাইনিদের প্রধান বাস্তুচ্যুতি ঘটেছিল ১৯৪৮ সালে, আরবি ভাষায় যার নাম ‘নাকবা’ বা ‘বিপর্যয়’। গাজায় চলমান ইসরাইলের আক্রমণ ‘নাকবা’র বর্ধিত সংস্করণ। ইসরাইলের ভাষায়: প্যালেস্টাইনিদের ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত করার জন্যই এবার পরিকল্পনা করা হয়েছে ‘গাজা নাকবা-২০২৩’। ইউএন রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি (ইউএনআরডব্লিউএ)-র সর্বশেষ পরিসংখ্যানও বলছে, ইসরাইল যুদ্ধের নামে নিবন্ধিত প্যালেস্টাইনি শরণার্থী শিবিরে সরাসরি বোমাবর্ষণ করে সাধারণ মানুষ মারছে। ইসরাইল চাচ্ছে যুদ্ধ লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে হয় নিহত, নয় বাস্তুচ্যুত করতে। তারপর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুতদেরও আক্রমণ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা। অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের নাগরিক থেকে শরণার্থী, শরণার্থী থেকে উদ্বাস্তু এবং উদ্বাস্তু থেকে রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিণত করতে চায় ইসরাইল। যে কারণে হাসপাতাল. শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জা, এমনকি জাতিসংঘের স্থাপনাতেও হামলা করছে ইসরাইল। সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি মারছে আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মী, চিকিৎসক, সাংবাদিক। ইসরাইলের এই বর্বরতা নিছক যুদ্ধ নয়, স্পষ্টতই গণহত্যা, বর্ণবাদী হিংসা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ। 

ইসরাইল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ফিলিস্তিনের সমস্যার সমাধানে  যে ‘দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব’ দিয়েছে, তা অস্পষ্ট। আশি ভাগ ভূমি দখল করে এবং অধিকাংশ মানুষকে তাড়িয়ে দিয়ে এখন যে দুই রাষ্ট্র করার কথা বলা হচ্ছে, তাতে ফিলিস্তিন হবে ইসরাইলের উপনিবেশ। ১৯৪৮ সালের আগে মূল মানচিত্রে ফিলিস্তিনিদের আসল অবস্থানের ভিত্তিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন ছাড়া  ফিলিস্তিনে চিরস্থায়ী সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। যে ইসরাইল আশ্রয়দাতা ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র বানিয়েছে, তা কেন সহ্য করবে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিরা? শুধু জবরদখলই নয়, ইসরাইল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করে গণহত্যা ও জাতিগত হিংসার আগুনে পুড়িয়ে মারছে। জাতিগত হিংসা ও বর্ণবাদী মানসিকতাকে হাতিয়ার করে, অসংবেদনশীল মানসিকতা এবং অনড় রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান নিয়ে ইসরাইল চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী এক  ভয়াবহ গণহত্যা, পৃথিবী ইতিহাসে এমন নৃশংসতা বিরল। 
গাজায় চলমান গণহত্যায় ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অপহরণ, নির্যাতন এবং হত্যা করেছে। অসংখ্য বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে প্রমাণ ছাড়াই হামাস বা সন্ত্রাসী বলে খুন করছে। ইসরাইলের প্রচারিত এসব নিহত ফিলিস্তিনি পুরুষের  ছবি এবং ভিডিও থেকে প্রিয়জনরা তাদের বেসামরিক হিসেবে শনাক্ত করেছেন। নিহতদের কেউই যুদ্ধে যায়নি। তাদেরকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে।   

প্রায় ১০ বছর আগে, জাদালিয়ার একাডেমিক এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা মায়া মিকদাশি, ‘ফিলিস্তিনি পুরুষ কি ভিকটিম হতে পারে?’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন লিখেছিলেন। এতে মিকদাশি ব্যাখ্যা করেন, পশ্চিমাভিত্তিক গণমাধ্যমে যেসব বেসামরিক মৃত্যুর সংবাদ জোর দিয়ে প্রচারিত হয়েছে,  অনুপাতিকভাবে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে এমন প্রতিবেদনেরই পুনরাবৃত্তি হয় বারবার। তবে পশ্চিমা মিডিয়া হত্যার পুরো চিত্র কখনোই দেখায় না। অতীতে ইরাকে মার্কিন ও বৃটিশদের হামলায় নিহতের তথ্য পশ্চিমা গণমাধ্যম যেভাবে কাভার করেছে, সেটি এখনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। সাদ্দামের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে, এমন অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমারা ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায়। পরে অবশ্য সেই অস্ত্র মজুতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পশ্চিমা আক্রমণের ক্ষেত্রে ছিল না জাতিসংঘের অনুমতিও। একচেটিয়া যুক্তরাষ্ট্র একপ্রকার গায়ের জোরেই ইরাকে হামলা চালায়। পশ্চিমা গণমাধ্যমের নিরুঙ্কুশ সমর্থন এই হামলাকে এক মহান পদক্ষেপের মর্যাদা দেয়। একই মনোবৃত্তির পুনরাবৃত্তি গাজায় ইসরাইল-হামাস সংঘাতেও দৃশ্যমান। ইসরাইলি হামলায় বহু ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পরেও যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অনড় সমর্থন রয়েই গেছে। তারা বারবার ইসরায়েলের এ গণহত্যাকে ‘আত্মরক্ষার লড়াই’ বলে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। এমন প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে পশ্চিমা মিডিয়া। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ফিলিস্তিনবিরোধী প্রচারণা ইসরাইল বাহিনীর পরিচালিত গণহত্যাকে শুধু ন্যায্যতাই দেয় না, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনও ঘটাচ্ছে। 

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকেই ইসরাইল ও পশ্চিমা মিডিয়া হামাস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি নারীদের ধর্ষণের নানা বর্ণনা দিয়েছিল। কিন্তু সাময়িক যুদ্ধ বিরতি চলাকালীন সময়ে হামাস যেসব জিম্মিদের মুক্তি দেয় তাদের কাউকেই এমন অভিযোগ করতে শোনা যায় না। বরং জিম্মিদের নিরাপত্তায় হামাসের ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে। শুধুমাত্র গাজাবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত চলমান গণহত্যাকে একটি আইনি ন্যায্যতা দেয়াই ছিল এমন মিথ্যা প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য। 

বরং এমন তথ্যই অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে যে, ইসরাইলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনি নারীদের ধর্ষণ করছে। গাজায় পরিবারের মধ্য থেকে যুবতী নারীদের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলতে বাধ্য করার ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য পাওয়া গেছে। নারীদের লাঞ্ছিত করার প্রমাণ মিলেছে। এমনকি গর্ভবতী নারীরাও ইসরাইলি সেনাদের ধর্ষণের শিকার হয়। ইসরাইলি আগ্রাসনে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি নারীরাই যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন না, বরং ফিলিস্তিনি পুরুষদেরও শ্লীলতাহানি করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি রিটার্ন সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলি বাহিনী ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি পুরুষকে তাদের অন্তর্বাস খুলে, চোখ বেঁধে উত্তর গাজার একটি রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখে। ইসরাইলি বাহিনীর এমন কর্মকাণ্ডের ছবি এবং ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি পুরুষদের নির্যাতন ও অপব্যবহারের সম্মুখীন হওয়ার অনেক বিবরণও প্রকাশ পেয়েছে। ফিলিস্তিনি শিশুদের অধিকার সংস্থা ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে একটি ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি কিশোরীকে ধর্ষণের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক পরিচালক জোশ পলের কাছ থেকে একটি চমকপ্রদ প্রমাণ পাওয়া যায়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এ ধরনের মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিলে, মানবাধিকার সংগঠনটিকে আরও ৫টি সামাজিক গ্রুপের সঙ্গে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে বর্ণনা করা হয়। পাবলিক কমিটি পরিচালিত ইসরাইলের নির্যাতন-বিরোধী একটি গবেষণায় যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন সহিংসতার শিকার নির্যাতিত হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পুরুষদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়। রিপোর্টটিতে দেখা যায়, পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতা পরিচালনা করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।

সার্বিক পর্যালোচনা ও তথ্য-প্রমাণ বলছে, ফিলিস্তিনের মাটিতে ইসরাইল যুদ্ধ নয়, পরিকল্পিত গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করছে। সেখানে সৈনিকে সৈনিকে লড়াই হচ্ছে না, সাধারণ নাগরিক, নারী এবং শিশু তথা গোটা জাতিকে টার্গেট করে যুদ্ধ করছে ইসরাইল। আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে সকল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এবং প্রতিটি ফিলিস্তিনি সংস্থার বিরুদ্ধে। বসতবাড়ি, ধর্মস্থান, অর্থনীতি, সংস্কৃতি রক্ষা পাচ্ছে না। পশ্চিমা দেশ ও মিডিয়া পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রচারণা করে ইসরাইলের মানবাধিকারবিরোধী কার্যক্রমকে মদত দিচ্ছে। গাজায় একটি ‘মিথ্যা’ ও ‘সাজানো’ যুদ্ধের খবর প্রচার করে ‘আসল’ গণহত্যাকে আড়াল করা হচ্ছে। 

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।  

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status