ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৮ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

ইউটোপীয় স্বপ্নবিলাস থেকে আজকের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র

কাজল ঘোষ
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, শুক্রবারmzamin

হাজার বছরের পুঞ্জীভূত এই জ্ঞান আমাদের সামনে বন্ধ দরোজা খুলে দিয়েছে। যে দরোজা আমাকে আলোর পথ দেখায়। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা মুক্তির পথ বাতলে দেয়। যদিও তা নির্ভর করছে ব্যক্তির ধীশক্তির ওপর। কাজেই কেন্দ্রে স্যারের পরে কে সেটি বড় প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন আমরা আমাদের সময়টাকে কতোটা কাজে লাগাতে পেরেছি? প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা আমাদের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পেরেছি কিনা? প্রশ্ন হচ্ছে, নিজে আলোকিত মানুষ হয়েছি কিনা?

দিন গণনার ক্ষণ শেষ। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আয়োজনের ষোলকলা আজ পূর্ণ। আনন্দে মাতোয়ারা আলোকিত অঙ্গন। বলছিলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথা। নব্বইয়ের দশকে আমি নিজেও যুক্ত হয়েছিলাম উচ্চ-মূল্যবোধসম্পন্ন, আলোকিত, উদার, শক্তিমান ও কার্যকর মানুষ গড়ার কাজে নিয়োজিত এই প্রতিষ্ঠানে।

বিজ্ঞাপন
নটর ডেম কলেজের তখন নবাগত শিক্ষার্থী হিসেবে একটি হলুদ লিফলেটে ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানটি দেখে এক অপরিসীম মুগ্ধতায় ছুটি বাংলামোটরে। সবুজ লন ঘেরা আড়াইতলা ভবনের লাল ইটে তৈরি লাইব্রেরিতে। সময়টা ১৯৯৩ সাল। সপ্তাহ ঘুরে কবে কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত তার জন্য ক্ষণ গণনা করতাম। শুক্রবার বিকাল যেন আমাদের জন্য অতিশয় আনন্দের। যেখানে এ কালের সক্রেটিস ডাক দেন জ্ঞান চর্চার, জিজ্ঞাসা ছুড়ে দেন নানা জীবনদর্শনের হেতু ও কার্যকারণ নিয়ে। যেখানে তৈরি হয় নানান প্রশ্নের আর এর উত্তর খুঁজতে আমরা কর্ষণ করি বিশ্বসাহিত্যের পাতায় পাতায়। আর এই কাজটি আমার মতো করেছি শত শত, হাজার হাজার বা লাখো নয় কোটি কোটি মানুষ। আজকের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এতটা সহজ ছিল না। শুরুর দিনগুলো মধুময় ছিল এমনটা বলা যাবে না। তবে যত তিক্ততা আর কষ্টসহিষ্ণুই হোক না কেন তার পরতে পরতে ছিল একটি আদর্শের লড়াই। আর তা হচ্ছে আলোকিত মানুষ গড়ার। আর সেই লড়াইয়ে আলোর মশাল জ্বেলে সব বাধাকে জয় করে এগিয়ে গেছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে ৪৫ বছর আগে ১৯৭৮ সালের ১৭ই ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র একাধারে একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাধর্মী প্রতিষ্ঠান। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র পরিচালনার জন্য রয়েছে ১১ সদস্যের ট্রাস্টিবোর্ড। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎকর্ষমণ্ডিত মানুষদের সমন্বয়ে এ বোর্ড গঠিত। 

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আর্থিক সহযোগিতায় রয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, বিভিন্ন লোকহিতৈষী ব্যক্তি, দেশীয় ও অনিয়মিত কোনো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রয়েছে একটি নিজস্ব ৯তলা একাডেমিক ভবন। প্রতিবছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রায় ২৮ লাখ সদস্য অংশগ্রহণ করে থাকে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম দেশে-বিদেশে নানাভাবে সমাদৃত। শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য কৃতিত্ব এবং অবদানের জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ২০০৮ সালে ইউনেস্কোর সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার The San Amos Comenius Medal for the year লাভ করেছে। কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ২০০৪ সালে পেয়েছেন এশিয়ার নোবেল খ্যাত র‌্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড।

যেভাবে শুরু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র 
খ্যাতিমান সাংবাদিক আবেদ খান লিখেছেন, আটাত্তর সালের জুলাই কিংবা অগাস্ট মাসের কোনো এক সন্ধ্যায় আমার সেগুনবাগিচার বাসায় আড্ডা বসেছিল। কথায় কথায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলে উঠলেন, ‘এমন একটা কিছু করা উচিত যা তৈরি করবে পরিপূর্ণ মানুষ।’ আড্ডা সমস্বরে বললো: ‘উচিত তো বটে, কিন্তু করার পথটা কী?’ সায়ীদ স্যার বললেন, ‘আমাদের দেশে পড়াশোনার পাট প্রায় চুকে গেছে। ধরতে হবে ঐ জায়গাটাকে। মানুষকে সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞান এসবের দিকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, বিশ্বসাহিত্যের ভাণ্ডার তুলে ধরতে হবে সবার সামনে। টেনে নামিয়ে ফেলতে হবে অন্ধত্বের কালো পর্দা। তবে বুড়োদের দিয়ে এসব হবে না। অজ্ঞানতা ও মূর্খতা তাদের হাড়ে-মজ্জায় ঢুকে গিয়েছে। এজন্য চাই টগবগে তরুণ- যারা দ্বিধাহীন চিত্তে পুরনো আবর্জনা ঝেড়ে ফেলতে পারবে।’ 

আমরা বললাম, ‘তাহলে কী করতে হবে?’
‘একটা আন্দোলন তৈরি করতে হবে- আলোকিত এবং সম্পন্ন মানুষ তৈরির আন্দোলন। এই আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টির জন্য চাই একটি কেন্দ্র। এই কেন্দ্র থেকে সঞ্চারিত হবে অনুপ্রেরণা, সাহায্য, সহযোগিতা। এই কেন্দ্রে থাকবে বিশ্বসাহিত্যের যাবতীয় উপকরণ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, থাকবে মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, থাকবে ফিল্ম আর্কাইভ, সবরকম জ্ঞান ও শিল্পের শাখা। এই কেন্দ্রে গড়ে উঠবে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপর নানারকম পাঠচক্র-  নিয়মিত আলাপ-আলোচনা আর মানসিক লেনদেনে তা হয়ে থাকবে উন্মুখর। শুরুতে প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাধ্যমিক পর্যায়, তারপর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এই কার্যক্রম।’

আমাদের প্রশ্ন: ‘কিন্তু এজন্য তো অনেক অর্থ দরকার। কে দেবে তা? অসম্ভব স্বপ্ন দেখছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ইউটোপীয় স্বপ্নবিলাস। ‘দুম করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তিনি’, এ আমি করবোই। মানুষের মধ্যেও মানুষ থাকে। তাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ কেন্দ্র হবেই।’ 

একটি চ্যালেঞ্জ থেকে আজকের বিস্তার
৪৫ বছর পূর্তি নিয়ে নানা আয়োজনের মধ্যেই কথা হচ্ছিল কেন্দ্রের শুরু থেকে ভবিতব্য নিয়ে। স্যার বলছিলেন, আমি যা একবার ধরি তা করে ছাড়ি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রবেশ মুখে ছোট্ট লনে দাঁড়িয়ে যখন এই কথাগুলো বলছিলেন- তখন কেন্দ্রের বিস্তৃতি বহুদূর পৌঁছেছে। মোটা দাগে দশটি বড় কর্মসূচি নিয়ে ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল ছুটছে আলোকিত মানুষ গড়ার এই প্রতিষ্ঠান। একে একে বাস্তবায়ন করেছে দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম (বইপড়া ও সাংস্কৃতিক), দেশভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, আলোর ইশকুল (উচ্চতর উৎকর্ষধর্মী কার্যক্রম), শ্রবণ-দর্শন কার্যক্রম, প্রকাশনা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, অনলাইন বইপড়া কার্যক্রম, আলোর পাঠশালা ও বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ ও প্রকাশনা কার্যক্রম। আর সকল কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে ২৮ লক্ষ মানুষ ঋদ্ধ হচ্ছেন। 

মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর পর কে? 
সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি টকশোতে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়। বিষয় যদিও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বা কেন্দ্রের কর্মসূচি বিষয়ক ছিল না। সেখানে আমার সঙ্গে অংশ নেয়া অপর আলোচক আতেঁলেনিয়াম ব্যাচের রাকিব হাসান সেলিম। সেও কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচির সদস্য। অনুষ্ঠান রেকর্ডিংয়ের আগে স্মৃতিচারণ করছিলাম বিটিভিতে প্রথম আসার অভিজ্ঞতা। প্রায় তিন দশক আগে স্যারের উপস্থাপনায় চারুপাঠ অনুষ্ঠানে কুইজ পর্বে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। প্রথমদিন টেলিভিশন ছিল ভয়কাতুরে পরিস্থিতি। আলাপের ফাঁকে রাকিব জানতে চাইলো, স্যারের পর কেন্দ্রে কে? এই প্রশ্নটি কেবল রাকিবের নয়, কর্মসূত্রে বহু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়। কেন্দ্রের বিষয়ে কথা এলেই সকলেই কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, স্যারের পরে কেন্দ্রে কে? আসলে এটাই কেন্দ্রের ৪৫ বছরে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। স্যারকে নানা আড্ডায় এবং সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় আমার মতো হাজারো মানুষ একই প্রশ্ন করেছে। যদিও তিনদশক পরে আজ আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি না। হয়তো এটা পরিণত বয়সের ফসল। শুরুর দিকে এ নিয়ে স্যারের সঙ্গে নানারকম কথা হয়েছে। এখন আমার কাছে মনে হয় স্যার বুঝি গৌতম বুদ্ধের শেষদিনের কথা জানেন। জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে গৌতম বুদ্ধ শালতরু ছায়ায় অন্তিম শয্যা নেবেন।  শিষ্য শ্রমণদের কাছে তিনি জানতে চাইলেন, বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ, বিধি বা মার্গ নিয়ে কোনো সংশয় বা প্রশ্ন আছে কিনা? পরপর তিনবার তিনি সকল ভিক্ষুর কাছে একই বিষয় জানতে চাইলে খেয়াল করেন সকলেই নিরুত্তর। তিনি ধীরে ধীরে ধ্যানে প্রবেশ করবেন এমন সময় আনন্দকে অস্থির দেখে বললেন, নিজেই নিজের প্রদীপ হও। কেন্দ্রের লক্ষ্য ও আদর্শ, কেন্দ্রের নেতৃত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন বা বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে যে কাজটি স্যার নীরবে করে দিয়েছেন তা হচ্ছে পৃথিবীর সেরা বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় ও সখ্যতা। আর হাজার বছরের পুঞ্জীভূত এই জ্ঞান আমাদের সামনে বন্ধ দরোজা খুলে দিয়েছে। যে দরোজা আমাকে আলোর পথ দেখায়। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা মুক্তির পথ বাতলে দেয়। যদিও তা নির্ভর করছে ব্যক্তির ধীশক্তির ওপর। কাজেই কেন্দ্রে স্যারের পরে কে সেটি বড় প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন আমরা আমাদের সময়টাকে কতোটা কাজে লাগাতে পেরেছি? প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা আমাদের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পেরেছি কিনা? প্রশ্ন হচ্ছে, নিজে আলোকিত মানুষ হয়েছি কিনা? স্যার প্রায়ই শ্রীরামকৃষ্ণ পরমংশ দেবের একটি কথা বলে থাকেন। শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বলেছেন, এই যে আমরা পৃথিবীতে জন্মেছি তা সার্থক করতে অন্তত একটি দাগ হলেও যেন কেটে যাই। কাজেই একটিই জীবন। আমরা সকলেই যদি একটু একটু অবদান রেখে যেতে পারি তাহলে আমাদের এই পৃথিবীটা আরও সুন্দর হবে।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ/ তাসে কি তবে টোকা লেগেছে?

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status