ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১০ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

নির্বাচন ২০২৪ মডেল থেকে তরুণ সমাজ কী পাচ্ছে?

মো. অলিউল ইসলাম
৭ জানুয়ারি ২০২৪, রবিবার
mzamin

একটি দেশে যদি ধারাবাহিকভাবে একতরফা ভোট হতেই থাকে, তাও আবার জাতীয় নির্বাচনগুলোতে, যে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাহী দায়িত্বের পালাবদল হয়, সে দেশের তরুণ-তরুণীরা রাজনীতিবিমুখ হতে বাধ্য। জেনেশুনে ‘দুষ্ট রাজনীতির নষ্ট লাঠিয়াল’ কে হতে চাইবে? ইনিয়ে বিনিয়ে যদি ভোট ব্যবস্থাটাই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়, তখন রাজনীতি বিরাজনীতিকরণের খপ্পরে পড়তে বাধ্য। আমরা সেই বিরাজনীতিকরণের মধ্যেই আছি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া থেকে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত করা, ছাত্র রাজনীতির নামে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, শক্তি প্রদর্শনের মহড়া, টেন্ডারবাজি, ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব অছাত্রদের হাতে তুলে দেয়া এই বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ারই অংশ। বিরাজনীতিকরণের এ শৃঙ্খল ভাঙা ছাড়া কোনো অবস্থায় আগামীর সুসংহত বাংলাদেশ চিন্তা করা যায় না

একতরফা প্রেম প্রসঙ্গে বলিউড সিনেমা ‘এ দিল হ্যা মুশকিল’-এ চমৎকার একটি সংলাপ আছে। সিনেমার অতিথি চরিত্র শাহরুখ খানের বলা হিন্দি সে সংলাপটি বাংলায় তর্জমা করলে এমন শোনায়, ‘একতরফা প্রেমের শক্তি মাত্রাতিরিক্ত’। প্রেম বাস্তবায়নের তাড়নায় যেকোনো বাজি ধরতে পারে একতরফা প্রেমিক। ভুলে বসে আসমান-জমিনের ফারাক! সালিশ মানবে, কিন্তু তালগাছটি তার। একদম এবসলিউট, কনস্ট্যান্ট।

প্রকারান্তরে যা ফ্যাসিস্ট চিন্তারই নামান্তর। এভাবে নিজেরই অজান্তে এক সময় গন্তব্যহীন ট্রেনের উদ্দেশ্যহীন যাত্রী হয়ে যায় সে।

বিজ্ঞাপন
কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে বোধশক্তিহীন মোটা চামড়ার গণ্ডারে পরিণত হয়। নাজিম হেকমত থেকে ফুঁকো আওড়ানো ব্যক্তির বোধে তখন আর কাজ করে না নীল রং-এর সঙ্গে হলুদ রং মেশালে কীভাবে সবুজ হয়। অথবা পৃথিবী কীভাবে ভূমিহীনা। বস্তুত এক ধরনের ‘পাগলপ্রায়’ অবস্থা বিরাজ করে তার মধ্যে। নিজেকে নির্বোধ, পাগল মানতে অস্বীকৃতি জানানোর আগেই আশপাশের সবার এ নিয়ে নিরঙ্কুশ ঐকমত্যে আসার পাট চুকে যায়। পরিণতিস্বরূপ খুন হওয়া স্বপ্নের চোখ ঢাকতেই সে ব্যতিব্যস্ত থাকে।

সিনেমার মতো বাস্তব জীবনে একতরফা প্রেমের ক্ষতির ব্যাপ্তি ব্যক্তিগত পরিসরেই আবদ্ধ। সর্বোচ্চ প্রেমিকের পরিবার পর্যন্ত গড়ায়। সেটা শারীরিক, মানসিক কিংবা আর্থিকভাবে। কিন্তু বোধহীন, পাগলপ্রায় একতরফা প্রেম, প্রেমিক ও তার পরবর্তী প্রভাবের সঙ্গে যখন আমাদের ভোট, ভোটাধিকার ও ভোটের পরবর্তী চিত্র মিলে যায়, তার ক্ষয়ক্ষতি ব্যক্তি কিংবা পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। গোটা জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি পড়ে তরুণ-তরুণী বিশেষত প্রথম ভোটারদের মনে।
২০০৯ সালে যে ছেলে/মেয়েটি ভোটার হয়েছিল, তার বয়স এখন ৩১ পেরিয়ে ৩২-এর কোঠায়। মোটা দাগে এর মধ্যে দুটি জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে, দলীয় সরকারের অধীনে। দুর্ভাগ্যবশত, এ দুটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। ’১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্থাৎ ভোটাভুটি ছাড়াই ১৫৩ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৮ সালের নির্বাচনের অবস্থা আরও ভয়াবহ, আরও জালিয়াতির। নির্বাচন কমিশনের দেয়া কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক জানায়, ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ে। এ ছাড়াও ৯৯ শতাংশ ভোট পড়ে ১২৭টি কেন্দ্রে, ৯৮ শতাংশ ভোট পড়ে ২০৪টি কেন্দ্রে, ৯৭ শতাংশ ভোট পড়ে ৩৫৮ কেন্দ্রে এবং ৯৬ শতাংশ ভোট পড়ে ৫১৬ ভোটকেন্দ্রে। অর্থাৎ ৯৬ থেকে ১০০ শতাংশ ভোট পড়ে এক হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়ে ছয় হাজার ৪৮৪টি ভোটকেন্দ্রে।

কিন্তু ভোটের জন্য নির্ধারিত সময়ে শতভাগ ভোট পড়া কীভাবে সম্ভব? তালিকাভুক্ত ভোটারের মৃত্যুবরণ, দেশের বাইরে অবস্থান, জরুরি কাজে এলাকার বাইরে অবস্থান, অসুস্থতা ইত্যাদি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এমনকি সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টিও শতভাগ ভোট পায়নি। অথচ আমরা তাদেরকেও ছাড়িয়ে গেছি ২০১৮ সালের নির্বাচনে। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাও একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন যে, শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

তাই ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া যেকোনো যুক্তিতেই স্বাভাবিক নয়। এই নির্বাচনটিকে অনেকেই বলে থাকেন ‘রাতের ভোটের’ নির্বাচন। এমনকি আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালও সাম্প্রতিক সময়ে বলেছেন যে, শতভাগ নিশ্চিত করতে পারি, রাতে ভোট হবে না। সেই ’১৮ সালের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী বিভিন্ন ধরনের হেনস্তা, হয়রানির শিকার হয়। মুখোমুখি হতে হয় অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার। তারা জানতে পারে, ইতিমধ্যেই তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে!

’১৪ ও ’১৮ সালের ভোট দিতে না পারার দগদগে ঘা’য়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি আজ ৭ই জানুয়ারি আরেকটি একতরফা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলীয় সরকারের অধীনে। যে নির্বাচন বর্জন করেছে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারা বিশ্বাসযোগ্য প্রধান বিরোধী দলসহ তার সমমনা দলগুলো। আর নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকের বাইরে যারা আছেন, তারা সবাই দিনশেষে এক দলের, আদরের নাম ‘ডামি’। অথবা জোটভুক্ত। অথবা ক্ষমতাসীন দলের খেলার পুতুল। যারা মিডিয়ায় নিজেদের দল হিসেবে সাবালক হয়েছে দাবি করলেও তলে তলে আসন ভাগাভাগি করেন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে। এই যে আসন ভাগাভাগির ক্যারিক্যাচার, এটিকে কোনোভাবেই জাতীয় নির্বাচন বলা যাচ্ছে না। এক ধরনের পলিটিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বা রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা বলা যায় সর্বোচ্চ। ফলাফলস্বরূপ, তরুণ প্রজন্মকে আবারো গিলতে হচ্ছে একতরফা ভোটের ঢেঁকি।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১টি নির্বাচন হয়েছে। যার ৭টি দলীয় সরকারের অধীনে। ৪টি নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার অধীনে। দলীয় সরকার ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হওয়া ৭টি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত নির্বাচন এবং এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলই ক্ষমতায় এসেছে। আর এ জন্য অনেকেই ব্যঙ্গ করে নির্বাচনকালীন সময়ে দলীয় সরকার ব্যবস্থাকে বলে থাকেন ‘কাক্সিক্ষত ফলাফল নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা’। পক্ষান্তরে নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া ৪টি নির্বাচনই ছিল তুলনামূলক ভালো নির্বাচন এবং এ সবগুলো নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের বিদায় নিতে হয়। বস্তুত এ সমীকরণটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আমাদের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কাছে। তারা ২০১১ সালে একতরফাভাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। 

’৯১-পরবর্তী খুঁড়িয়ে চলা গণতন্ত্রও ঠিক এই জায়গা থেকে নতুন দিকে বাঁক নেয় এবং আস্তে আস্তে আমরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখানে গণতন্ত্র থাকবে, নির্বাচন থাকবে, কিন্তু চয়েস থাকবে না। বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প প্রার্থী থাকবে না। একটি নির্দিষ্ট পক্ষ থেকেই বেছে নিতে হবে। সেই একমনাদের নির্বাচনটি আয়োজন করতেই আবার হিমশিম খাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। জেলেনস্কির মতো রাজনৈতিক দলগুলোকে অটল থাকতে বলা এই কমিশনের জন্য সত্যিই মায়া হয়!

আমাদের নীতিনির্ধারক থেকে অনেক পোড়খাওয়া বুদ্ধিজীবী-ই মনে করেন এখনকার তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। নির্বাচন বুঝে না। সমাজ বুঝে না। সম্পর্ক বুঝে না। মানুষের প্রতি কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা নেই। এ কথা সত্য যে, আমাদের টালমাটাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা তরুণদের মনে অনীহা জাগিয়ে তুলছে রাজনীতি নিয়ে। একেবারে সর্বোচ্চ জায়গা থেকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হয় কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত। নেতা থেকে কর্মীদের ওইসব সিদ্ধান্ত বিনা বাক্যে মানতে ও বাস্তবায়ন করতে হয়। এসব দেখেশুনে তরুণদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তরুণদের নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা ও মাঠ পর্যায়ের তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে দেশ-সমাজ-রাজনীতি নিয়ে বিস্তর আলাপচারিতার অভিজ্ঞতার সুবাদে বলতে চাই, রাজনীতি নিয়ে অতৃপ্তি, বেদনা থাকলেও ৭ তারিখে নির্বাচনের নামে হতে যাওয়া এসব পলিটিক্যাল ম্যানেজমেন্ট খুব ভালো করেই বুঝে আজকের প্রজন্ম। ফলে আজকের তরুণদের কোনো ধরনের সুযোগ না দিয়ে শুধু গালাগাল করাটা ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ দেয়ার মতোই।

একটি দেশে যদি ধারাবাহিকভাবে একতরফা ভোট হতেই থাকে, তাও আবার জাতীয় নির্বাচনগুলোতে, যে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাহী দায়িত্বের পালাবদল হয়, সে দেশের তরুণ-তরুণীরা রাজনীতিবিমুখ হতে বাধ্য। জেনেশুনে ‘দুষ্ট রাজনীতির নষ্ট লাঠিয়াল’ কে হতে চাইবে? ইনিয়ে বিনিয়ে যদি ভোট ব্যবস্থাটাই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়, তখন রাজনীতি বিরাজনীতিকরণের খপ্পরে পড়তে বাধ্য। আমরা সেই বিরাজনীতিকরণের মধ্যেই আছি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া থেকে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত করা, ছাত্র রাজনীতির নামে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, শক্তি প্রদর্শনের মহড়া, টেন্ডারবাজি, ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব অছাত্রদের হাতে তুলে দেয়া এই বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ারই অংশ। বিরাজনীতিকরণের এ শৃঙ্খল ভাঙা ছাড়া কোনো অবস্থায় আগামীর সুসংহত বাংলাদেশ চিন্তা করা যায় না।
লেখক: যুগ্ম আহ্বায়ক, সুজন বন্ধু

পাঠকের মতামত

এবার ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল! কেউ ভোট কেন্দ্রে না গেলে কি-ই বা করার আছে! আর গনতন্ত্র? এই গুলো পশ্চিমাদের খবরদারির হাতিয়ার! আমরা স্বাধীন দেশ!!

Harun Rashid
১৪ জানুয়ারি ২০২৪, রবিবার, ২:৩৩ পূর্বাহ্ন

অসাধারণ লিখনি

আরমান মাহমুদ
৯ জানুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার, ১:১৩ পূর্বাহ্ন

জোর করে কিভাবে খমতায় থাকতে হয় নতুন প্রজন্ম সেটাই শিখছে

মো: ফারুক
৬ জানুয়ারি ২০২৪, শনিবার, ৯:২৬ অপরাহ্ন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status