ঢাকা, ৪ মার্চ ২০২৪, সোমবার, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২২ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বেহুদা প্যাঁচাল

ভোটের ময়নাতদন্ত

শামীমুল হক
৩১ ডিসেম্বর ২০২৩, রবিবার
mzamin

দলীয় সংকট সমাধান করে নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল বিএনপি যেন সংসদের বিরোধী দল হতে পারে, সে জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন দলটির এই নেতারা।  তারা দাবি করেছেন, দলের ১৩০ জন প্রার্থী এখন তাদের সঙ্গে আছেন। আশ্চর্য নির্বাচন। নির্বাচনের আগেই তারা সংসদে বিরোধী দল হওয়ার গ্যারান্টি চায়। শুধু তৃণমূল বিএনপি নয়, জাতীয় পার্টিও এটি চায়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এ দুটি দলের কেউই বিরোধী দলের তকমা লাগাতে ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন স্বতন্ত্র জোট। ২০২৪ সালের এ নির্বাচনের পোস্টমর্টেমে আরও অনেক কিছু ধরা পড়েছে। ভোটারদের সামনে সবকিছুই ধরা পড়ছে। তারপরও করার কিছু নেই।

বিজ্ঞাপন
বলার কিছু নেই। নির্বাচন যে হতেই হবে। আর নির্বাচনের পর বিরোধী দলও পেতে হবে


আর মাত্র এক সপ্তাহ। এরপরই দেশে সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু দেশের ১২তম এই নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে ঘটে গেছে নানা ঘটনা। তফসিল ঘোষণার পর থেকে একের পর এক ঘটনায় নির্বাচন নিয়ে হাজারো প্রশ্ন জনমনে। প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে শরিক ও মিত্রদের আলোচনা, আকুতি চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আসন বণ্টন হলেও মনোযাতনা নিয়ে মেনে নেয় তারা। এখানেই কি শেষ? না! আরও আছে। এখনো চলছে আসন নিয়ে নানা খেলা। কোন কোন আসনে আজ এই প্রার্থী তো কাল আরেক প্রার্থীকে বলা হচ্ছে সরকার সমর্থিত। এ নিয়ে ওইসব আসনে এখনো এক অনিশ্চয়তায় ভোটাররা। বিশেষ করে সরকারদলীয় লোকজন। কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। শেষ মুহূর্তে এসে প্রচারণায় ব্যস্ত থাকার কথা প্রার্থী ও সমর্থকদের। পাড়া-মহল্লায় হই- হুল্লোড়ে দিন পার করার কথা। মিটিং মিছিলে উত্তাল থাকার কথা নির্বাচনী আসনগুলো। কিন্তু ভোটের মাঠে কী দেখা যাচ্ছে- দিন দিন সহিংসতা বাড়ছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী আর আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থীদের মধ্যে এ সংঘাত সংঘর্ষই হচ্ছে বেশি। ইতিমধ্যে কয়েকটি লাশও পড়েছে। নিজেদের মধ্যে এ সংঘাত কি ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে? 

আর যেসব আসনে এখনো সরকারসমর্থিত প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে সেখানকার অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। এরমধ্যে একটি আসন হলো- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন। যে আসনে এখনো চূড়ান্ত হয়নি সরকারসমর্থিত প্রার্থী। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজুকে। কিন্তু জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়া আওয়ামী লীগের ২৬ আসনের এটি একটি। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দেয়া হয় রেজাউল করিমকে। যিনি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা। এর আগে এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল আবদুল হামিদ ভাসানীকে। কিন্তু কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ সদর আসনে জাপা’র মনোনয়ন পাওয়া রেজাউল করিম ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তিনি সদর আসনেরই বাসিন্দা। কিন্তু সদর ছেড়ে তিনি কেন অন্য আসনে দৃষ্টি দিলেন? এ আসনের সাবেক দুই বারের এমপি রওশনপন্থি জাতীয় পার্টির নেতা জিয়াউল হক মৃধা আবার রেজাউলের শ্বশুর। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন রেজাউল। শ্বশুর আর জামাইয়ের ঠেলাঠেলিতে দু’জনই হেরে যান। এবারো রেজাউল এখান থেকে নির্বাচন করতে জাতীয় পার্টির পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। ওদিকে আবদুল হামিদ ভাসানীও জাতীয় পার্টির সমর্থনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়ন জমা দেয়ার পর দেখা যায় জাতীয় পার্টির দু’জন প্রার্থী এখানে। অবশ্য রেজাউল কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তার প্রভাব দলে বেশি। শেষ পর্যন্ত তিনিই জাতীয় পার্টির প্রার্থিতা লাভ করেন। আবদুল হামিদ ভাসানী পিছু হটেন। এবার এখানে রওশনপন্থি জাপা’র জিয়াউল হক মৃধা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তিনি প্রতীক পান ঈগল। আর জিএম কাদেরপন্থি মৃধার মেয়ের জামাই রেজাউল লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাঠে। আর আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়া ২৬ আসনের একটি হওয়ায় এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া শাহজাহান আলম সাজু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। সে হিসাবে রেজাউল থাকার কথা সুবিধাজনক অবস্থানে। কিন্তু একদিকে তার শ্বশুর আর অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা মঈন উদ্দীন মঈন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। মঈনের প্রতীক কলারছড়ি। মঈনও এখানে শক্ত প্রার্থী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৭৬ হাজার ভোট পান তিনি। অল্প ভোটে হেরে যান বিএনপি’র উকিল আব্দুস সাত্তারের কাছে। এভাবেই চলছিল সবকিছু। হঠাৎ করে তিন/চারদিন আগে সরাইল আওয়ামী লীগ এক সভা করে জিয়াউল হক মৃধার প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। তাদের এ সিদ্ধান্তের কথা সকল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের জানিয়ে দেয়া হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্দেশনা পেয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগও দ্রুত সভা করে নেতাকর্মীদের জিয়াউল হক মৃধার পক্ষে কাজ করার কথা জানিয়ে দেন। ওদিকে আওয়ামী লীগ নেতা মঈন উদ্দীন মঈন জোর গলায় বলছেন কেন্দ্র থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি। এটি স্থানীয় আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত। আবার সরাইল আওয়ামী লীগের নেতা রাশেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এসে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি তাদের সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে ঘোষণা দেন। আর মাত্র ছয় দিন পরে ভোট। প্রচারণা চলবে ৫ই জানুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত। এই শেষ সময়ে এসেও হ-য-ব-র-ল অবস্থা সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে। 

এবার আসা যাক সরাইলকে কেন বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অন্যদৃষ্টিতে দেখে। এ আসনটি তারা শরিকদের জন্য বরাদ্দ রেখে দেয়। নিজ দলীয় যোগ্য প্রার্থী থাকার পরও কেন তারা আসনটির সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। বিশেষ করে জোটের রাজনীতি শুরু হওয়ার পর থেকে এ অবস্থা চলে আসছে। বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোট প্রথম এ আসনটি তুলে দেন ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ফজলুল হক আমিনীর হাতে। তাদের যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও এটি করেছিলেন জোটের স্বার্থের কথা বলে। অবশ্য সে সময় চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে তাদের প্রার্থী উকিল আব্দুস সাত্তারকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেয়া হয়। একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধাকে সমর্থন দেয় আওয়ামী লীগ। একই অবস্থা ২০১৪ ও ২০১৮ সালে হয়। ২০১৪ সালে জিয়াউল হক মৃধাকে সমর্থন দিলেও ২০১৮ সালে এসে জাতীয় পার্টি তাদের প্রার্থী দেয় রেজাউল করিমকে। সেই থেকে শুরু শ্বশুর ও জামাইয়ের দ্বন্দ্ব। এ সময় আওয়ামী লীগ আসনটিতে তাদের প্রার্থী না দিলেও অন্য কোনো প্রার্থীকে সমর্থনও করেনি। অন্যদিকে বিএনপি’র সঙ্গে ইসলামী ঐক্যজোটের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় ২০১৮ সালে উকিল আব্দুস সাত্তারকেই এখানে প্রার্থী করে। তিনি জয়ীও হন। এবার যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে কী হয় বলা মুশকিল। তবে এ আসনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র জোটকে ছাড় দেয়ার মানসিকতাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না জনগণ। তারা বলছেন, সরাইল ও আশুগঞ্জ হলো আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র সৎ সন্তান। তাই তারা এ আসনটিকে নিয়ে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। নিজ দলের প্রার্থীকে কোরবানি দিয়ে জোটের শরিক কিংবা মিত্রদের হাতে ছেড়ে দেয়। যে কারণে সারা দেশের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও সরাইল-আশুগঞ্জ রয়ে গেছে অবহেলিত। এ দুঃখ নিয়েই দিন কাটাচ্ছে এলাকাবাসী। 

ওদিকে সিলেট-৬ আসন নিয়েও চলছে ছলচাতুরি। এ আসনের এমপি নূরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি এবারো লড়ছেন নৌকা প্রতীকে। এখানে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থীও রয়েছে। আবার তৃণমূল বিএনপি’র চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীও লড়ছেন এ আসন থেকে। বৃহস্পতিবার হঠাৎ করে কেন্দ্রে ডাক পড়ে নাহিদের। এ ডাককে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন এলাকার মানুষ। 

এবার আসা যাক তৃণমূল বিএনপি’র দিকে। নির্বাচনের আগে তৃণমূল বিএনপি’র চেয়ারপারসন শমসের মুবিন চৌধুরী ও মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকারকে ‘জাতীয় বেঈমান’ আখ্যায়িত করেছেন দলটির বিভিন্ন আসনে প্রার্থী হওয়া নেতারা। দলের প্রার্থীদের মাঠে নামিয়ে দুই শীর্ষ নেতা এখন আর খোঁজ নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এসময় শমসের, তৈমূর ও তৃণমূল বিএনপি’র নির্বাহী চেয়ারপারসন অন্তরা হুদা দলের তহবিল থেকে টাকা তছরুপ করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। এই পরিস্থিতিতে দলীয় সংকট সমাধান করে নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল বিএনপি যেন সংসদের বিরোধী দল হতে পারে, সে জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন দলটির এই নেতারা।  তারা দাবি করেছেন, দলের ১৩০ জন প্রার্থী এখন তাদের সঙ্গে আছেন। 
আশ্চর্য নির্বাচন। নির্বাচনের আগেই তারা সংসদে বিরোধী দল হওয়ার গ্যারান্টি চায়। শুধু তৃণমূল বিএনপি নয়, জাতীয় পার্টিও এটি চায়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এ দুটি দলের কেউই বিরোধী দলের তকমা লাগাতে ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন স্বতন্ত্র জোট। 

২০২৪ সালের এ নির্বাচনের পোস্টমর্টেমে আরও অনেক কিছু ধরা পড়েছে। ভোটারদের সামনে সবকিছুই ধরা পড়ছে। তারপরও করার কিছু নেই। বলার কিছু নেই। নির্বাচন যে হতেই হবে। আর নির্বাচনের পর বিরোধী দলও পেতে হবে।

পাঠকের মতামত

স্বতন্ত্র জোট বলে কিছু নেই ও ভোটের ময়নাতদন্ত হবে ভোটের পর । বেহুদা প্যাঁচাল এর বেহুদা প্যাঁচাল।

mohd. Rahman ostrich
১ জানুয়ারি ২০২৪, সোমবার, ৪:১২ অপরাহ্ন

সঠিকই মনে হচ্ছে আপনার কথা। কােণ বিরুধী দলে যাওয়ার মতো অবস্হ বা অবস্থান কোনোটিই নেই জাপা ও ছাগল বি তৃণমূল বি এন পির,,কাজেই তারা দিবাস্বপ্নে বিভোর হয় কী ভাবে? আর কেবল সরাইল -আশুগঞ্জ নয়,বৈমাত্রিক খরা থেকে মুক্ত হোক প্রতিটা নিজ আসন।কারণ, প্রত্যেক এলাকার নেতাদের উদ্দেশ্য থাকবে পাশ করলে এলাকার উন্নয়ন না করলে পরবর্তীতে গুণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরবে।কাজেই ভবিষ্যতের কিছুটা চিন্তা হলেও মাথায় থাকবে।আর অতিথি পাখি সিজনে আসবে,নুজ এলাকায় আবার চলে যাবে। যেখান থেকে পাস করবে সে এলাকা অভিভাবক হীন, ছাঁদ ছাড়া ঘরের মতো থাকবে। কাজেই ওসব প্রার্থীদের পাত্তা না দেওার কাচার তৈরি করার বিকল্প নেই

হোসেন মাহবুব কামাল
৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, শনিবার, ১২:৫০ অপরাহ্ন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status