ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১০ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

জারদারি-বিলাওয়াল বাপ-ব্যাটার লড়াই

মোহাম্মদ আবুল হোসেন
২৭ নভেম্বর ২০২৩, সোমবার
mzamin

দলের কিছু সিনিয়র নেতা বিলাওয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং জানতে চান, তাদের রাজনীতি ছেড়ে দেয়া উচিত হবে কিনা। জবাবে বিলাওয়াল বলেন, তিনি এটা বুঝাতে চাননি। এ সময় বিলাওয়াল তার পিতাকে বলেন, তিনি বিমানে উঠেছেন প্রায়। এই সাক্ষাৎকার আর দেখতে পারবেন না। হামিদ মীর বলেন, যখন ফোনকল শেষ হলো, আমি আসিফ আলি জারদারির কাছে জানতে চাইলাম বিলাওয়াল কেন দুবাই যাচ্ছেন। জারদারি আমাকে বললেন, সে ফিরে আসবে। সে দুবাই যাচ্ছে, কারণ সনম ভুট্টো সেখানে যাবেন। পারিবারিকভাবে মিলিত হবে তারা। আমার মনে হলো আসিফ আলি জারদারিও দুবাই যাবেন। জারদারি ও বিলাওয়াল খুব শিগগিরই ফিরে আসবেন।

বিজ্ঞাপন
জারদারি চলে যাওয়ার পর অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয় ছেলের সঙ্গে মতবিরোধ কাটিয়ে ওঠার জন্যই জারদারি গেছেন

 

বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির লক্ষ্য সামনে প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি দেশ চালাবেন। কিন্তু তার পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি কী তার স্বপ্নে ছেদ ঘটালেন! দৃশ্যত তেমনই মনে হচ্ছে। তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন তাতে ক্ষুব্ধ ছেলে ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো। সম্প্রতি পাকিস্তানের সুপরিচিত সাংবাদিক হামিদ মীরের সঙ্গে জিও নিউজে একটি সাক্ষাৎকার দেন আসিফ আলি জারদারি। তাতে তিনি নিজের ছেলে ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, এখনো রাজনীতিতে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে বিলাওয়ালের। এখনো বিলাওয়াল পুরোপুরি প্রশিক্ষিত নন। তার এ মন্তব্যের পর বিলাওয়াল ভুট্টো পাড়ি দিয়েছেন দুবাই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এক্স হ্যান্ডেলে নিজের প্রোফাইল ছবি পাল্টে ফেলেছেন। সেখানে যোগ করেছেন নতুন ছবি। তাতে দেখা যায়, তার কাঁধের উপর হাত দিয়ে আছেন প্রয়াত মা বেনজির ভুট্টো। এর মধ্যদিয়ে বিলাওয়াল ভুট্টো তার পিতার সঙ্গে দূরত্ব কতোটা তা বোঝাতে চেয়েছেন।

 সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে মারাত্মক গুজব। চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। পাড়া-মহল্লা এমনকি মোড়ের  দোকানে মানুষের জমায়েতে আলোচনার বিষয় জারদারি ও বিলাওয়ালের সম্পর্কের ফাটল। বলাবলি হচ্ছে, পিতা-পুত্রের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে মতভেদ বিদায়ী সরকারের পতনের পর থেকেই স্পষ্ট হয়। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ আগামী ৮ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিলাওয়াল। তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে সাংবিধানিক নিয়মে নির্বাচনের পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে গিয়ে জারদারি প্রলম্বিত সময়ে নির্বাচনের পক্ষে রায় দেন। তাদের বিরোধ তখন থেকেই প্রকাশ পায়। তবে তা নিয়ে এতদিন তেমন কোনো কথা বলাবলি হয়নি। কিন্তু সামনে যখন নির্বাচন, প্রচারণায় দলের পুরোদমে প্রস্তুতি থাকার কথা, তখন ছেলেকে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ বলে মন্তব্য করে তাকে ছোট করেছেন আসিফ আলি জারদারি। এতে বিলাওয়াল মনঃক্ষুণ্ন হতেই পারেন। কারণ, বিগত সরকারে শেষ খণ্ডকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাতে তেমন কোনো অনভিজ্ঞতা প্রদর্শন করেননি তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী একজন নেতাকে যখন তারই পিতা অনভিজ্ঞ বলে প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, তখন তার সম্মান কোথায় থাকে! তাদের দল পিপিপি অবশ্য পিতা-পুত্রের মধ্যে মান অভিমানের কথা প্রত্যাখ্যান করেছে। 

২৩শে নভেম্বর জিও নিউজে ‘ক্যাপিটল টক’ অনুষ্ঠানে আসিফ আলি জারদারি নিজে আরেকদফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, তার দল সব রকম অপসনের জন্য উন্মুক্ত। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএলএন) প্রধান নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার কথা বলেন। ৮ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের জন্য যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন জারদারি এমন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জোটের নেতৃত্ব নওয়াজ শরীফের দেয়া উচিত এমনটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, আরও ব্যক্তিবর্গ আছেন। এর মধ্যে আছে পিপিপিও। তারাও জোটের নেতৃত্ব দিতে পারে। জারদারি পিএমএলএনের উদ্দেশ্যে বলেন, এর আগের দফায় তাদেরকে আমরা সুযোগ দিয়েছিলাম। এখন আমাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ দেয়ার পালা তাদের। এর মধ্যদিয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সরকারকে সমর্থন দেয়ার কথা বুঝিয়েছেন। এরই এক পর্যায়ে তিনি বিলাওয়াল প্রসঙ্গে বলেন, সে রাজনীতিতে পুরোপুরি প্রশিক্ষিত নয়। তার অভিজ্ঞতায় ঘাটতি আছে। এ জন্য অভিজ্ঞতা পূর্ণ হতে তার জন্য সময় প্রয়োজন। একইসঙ্গে জারদারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরিণতি এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের (পিটিআই) পরিণতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন। বলেন, পিটিআইকে নিষিদ্ধ করা হবে না। তারা নির্বাচনের অংশ হবে। তবে তাতে দলের প্রধান ইমরান খান মাইনাস থাকবেন। 

শীর্ষ গোয়েন্দা সূত্রগুলো মিডিয়াকে জানিয়েছেন, এই সাক্ষাৎকারে জারদারি স্পষ্টতই তার উচ্চাকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছেন। একটি সূত্র এর জবাবে বলেছেন, পাকিস্তানে কোন দল বা কোন ব্যক্তি প্রার্থী হবেন তা নির্ধারণ করে সেনাবাহিনী। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হতে চান জারদারি। একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদে নিজের ভাগ চান। অর্থাৎ নতুন সরকারে নিজে প্রেসিডেন্ট পদ চান। পাঞ্জাবে এবং অন্য এলাকায় পিএমএলএনকে আটকে রাখতে চান, যাতে তারা সিন্ধুর দিকে হাত না বাড়ায়। সাক্ষাৎকারে জারদারি বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে যে, তারা স্বচ্ছ নির্বাচন করবে এবং তাতে শীর্ষে আসবে পিপিপি। সব রকম পরিবেশে নির্বাচনে লড়াই করতে সক্ষম একমাত্র দল পিপিপি। করাচিতে বৃটিশ হাইকমিশনার জেন ম্যারিয়টের সঙ্গে বৈঠকের একদিন পরে তিনি এমন মন্তব্য করেন।  

ওদিকে পিতা-পুত্রের মধ্যে বিরোধের কথা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে পিপিপি। তারা বলেছে, শুক্রবার নয়, বৃহস্পতিবার দুবাই গেছেন বিলাওয়াল। পূর্ব নির্ধারিত ব্যক্তিগত সফরে তিনি এই সফরে গেছেন। বিলাওয়াল দুবাই চলে যাওয়ার পরই ইসলামাবাদ ছেড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে যান আসিফ আলি জারদারি। তিনি শুক্রবার সন্ধ্যায় এই যাত্রা শুরু করেন। ফলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি ছেলের মান ভাঙাতে এই সফরে গেছেন। গুজবে ভাসতে থাকে দেশ। বিশেষ করে পিপিপি’র চেয়ারম্যান বিলাওয়াল তার এক্স অ্যাকাউন্টে নিজের প্রোফাইল ছবি পাল্টে মায়ের সঙ্গে একটি ছবি দিয়েছেন। এতে বিলাওয়ালের কাঁধে মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হাত রাখা দেখা যায়। এ ছবি দেয়ার পর গুজব আরও জোরালো হয়। পাকিস্তানি মিডিয়া বলছে, খাইবার পখতুনখাওয়া প্রদেশ সফরের পর বিলাওয়াল দুবাই সফরে যান। খাইবার পখতুনখাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন তিনি। 

বিভিন্ন সূত্র বলেছে, বিলাওয়াল ভুট্টো দুবাই সফরে গেছেন বোন বখতাওয়ার ভুট্টো জারদারি ও তার সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। পিপিপি’র তথ্য বিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল করিম কুন্দি এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গুজব সরিয়ে রেখেছেন। বলেছেন, পূর্ব নির্ধারিত সফরে গেছেন বিলাওয়াল। তিনি বৃহস্পতিবার দুবাই সফরে দেশ ত্যাগ করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে গুজব সৃষ্টি হয়েছে, তাকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বিলাওয়াল দু’দিনের জন্য দুবাই গেছেন। সোমবার বা মঙ্গলবার তার দেশে ফেরার কথা। ৩০শে নভেম্বর কোয়েটায় পিপিপি’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে ভাষণ দেবেন। তিনি আরও জানান, পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল এখনো নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেননি। বলেন, যখন নির্বাচনী প্রচারণার শিডিউল ঘোষণা করা হবে, তখনই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করবেন বিলাওয়াল। পিতা-পুত্রের বিরোধের গুজব অস্বীকার করেছেন পিপিপি’র সিনেটর সেলিম মান্দভিওয়ালা। দলটির সিনেটর শেরি রেহমান এক্সে লিখেছেন, জানি না কেন কিছু চ্যানেলে এমন হতাশা সৃষ্টি করা হচ্ছে। 

কিন্তু জিও টিভির ‘আজ সাহজেব খানজাদাকে সাথ’ অনুষ্ঠানে ওই সাক্ষাৎকার নেয়ার পর সুপরিচিত সাংবাদিক হামিদ মীর বলেছেন, সাক্ষাৎকারটি রেকর্ডিং হওয়ার পর তা দেখতে আমরা অন্য একটি রুমে বসে ছিলাম। এ সময় বিলাওয়াল তার পিতা জারদারিকে ফোনকল করেন। এতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিলাওয়ালকে জারদারি বলেন, তার এটা করা উচিত হবে না। এ ছাড়া কঠিন কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জারদারি। হামিদ মীর বলেন, তাকে নিয়ে যা বলেছেন জারদারি সে বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বিলাওয়াল। জারদারি তার প্রায় ৭০ বছরের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিলাওয়ালকে নিয়ে এভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। জবাবে আসিফ আলি জারদারি বলেন, তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং ব্যাখ্যা দেবেন। হামিদ মীর বলেন, এরপর দলের কিছু সিনিয়র নেতা বিলাওয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং জানতে চান, তাদের রাজনীতি ছেড়ে দেয়া উচিত হবে কিনা। 

জবাবে বিলাওয়াল বলেন, তিনি এটা বুঝাতে চাননি। এ সময় বিলাওয়াল তার পিতাকে বলেন, তিনি বিমানে উঠেছেন প্রায়। এই সাক্ষাৎকার আর দেখতে পারবেন না। হামিদ মীর বলেন, যখন ফোনকল শেষ হলো, আমি আসিফ আলি জারদারির কাছে জানতে চাইলাম বিলাওয়াল কেন দুবাই যাচ্ছেন। জারদারি আমাকে বললেন, সে ফিরে আসবে। সে দুবাই যাচ্ছে, কারণ সনম ভুট্টো সেখানে যাবেন। পারিবারিকভাবে মিলিত হবে তারা। আমার মনে হলো আসিফ আলি জারদারিও দুবাই যাবেন। জারদারি ও বিলাওয়াল খুব শিগগিরই ফিরে আসবেন। জারদারি চলে যাওয়ার পর অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয় ছেলের সঙ্গে মতবিরোধ কাটিয়ে ওঠার জন্যই জারদারি গেছেন।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status