ঢাকা, ৪ মার্চ ২০২৪, সোমবার, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২২ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

স্বপ্নের স্বদেশের সন্ধানে

২০২৪ থেকে দেশ কি সুশাসনের দিকে যাত্রা করতে পারবে?

সুবাইল বিন আলম
৩১ অক্টোবর ২০২৩, মঙ্গলবার
mzamin

২০১৪’র পর থেকে দেশ সব গণতান্ত্রিক এবং সুশাসনের সব সূচকে শুধু পিছিয়েই যাচ্ছে। মানুষ ভোট দিতে পারছে না, সেখানে হাজার কোটি টাকা খরচ করে ভোটের কি দরকার বা যে সংসদে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় না- তার পেছনে বছরে শতকোটি টাকা খরচের কী দরকার? কোনো পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনো অনুন্নত থাকতে পারে না। এটা প্রমাণিত। স্বাধীনতার ৫২ বছর পর সব দল যেন এই একটা ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে পারে- তবেই সম্ভব সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আমরা এখনো ভোটের অধিকারের জন্য হা-হুতাশ করি।  যা সুশাসনের প্রথম শর্ত।


আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পার হয়ে যায়। সংগত কারণেই এই দেশে সরকারি ভাবে ওই দিবসটি উল্লেখযোগ্য ভাবে পালন হয় না। কিন্তু এর মাঝে বিভিন্ন জায়গার লেখাতে একটা জিনিস দেখে অবাক হলাম বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র বলতে শুধু ভোটের অধিকারই বুঝে। এই দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও শাসন ব্যবস্থার বিশালতা নিয়ে ধারণা কম। পত্রিকাগুলোতে ওই দিনের ফিচারে সবগুলো গণতান্ত্রিক কাজের আলাদা আলাদা করে র‌্যাংকিং দেখালেও মানুষের ফোকাস চলে সেই এক ভোটের দিকে।

বিজ্ঞাপন
আজকের লেখাটা আসলে আমাদের দেশ কি অবস্থাতে আছে তা নির্ণয় না করে বরং গণতন্ত্র বলতে বিশ্ব এখন কী চিন্তা করছে তা জানানো। 

উইকিপিডিয়া অনুসারে গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। মানুষ ভোট দিয়ে ঠিক করে সরকার- গণতান্ত্রিক সরকার (Democratic Government)। কিন্তু সরকারের চালাতে হয় একটা শাসন ব্যবস্থা। ছোটবেলা থেকেই আমাদের সবার জানা আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা- গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের অংশগ্রহণ, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য। এই সব সংজ্ঞা থেকে আমরা জানতে পারি, গণতন্ত্র একটা শাসন ব্যবস্থা যার পরিচালক ও গঠন করবে জনগণ আর সেই পরিচালক জনগণের জন্য দেশ পরিচালনা করবেন যা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা (Democratic Governance) বা সুশাসন।  জর্জ বার্নার্ড শ’ এই জন্যই গণতন্ত্রকে সরকার না বলে যন্ত্র বলেছেন। যেই যন্ত্রগুলো মানুষকে যথাসম্ভব ভালো রাখার চেষ্টা করবে। 

সরকার একা দেশ চালাতে পারে না। তার এই জন্য নির্ভর করতে হয় বিভিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর। সরকারের কাজ শুধু আইন প্রণয়ন করা সেই সব রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য যারা সেই আইন অনুসারে নিজ নিজ কাজ ঠিকমতো করে যাবে। এখানে সরকারের কাজ হবে মনিটরিংয়ের, নিয়ন্ত্রণমূলক নয়। থাকবে সহনশীলতা, সব মতের সম্মান। যেকোনো বিপদে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিবো বা আনন্দে সবাই এক সঙ্গে থাকবো।  উদাহরণ হিসেবে আমরা ইউএসএ’র গত নির্বাচনের কথা বলতে পারি। পৃথিবীর সব থেকে ক্ষমতাবান মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নির্বাচন কমিশন বা বিচার বিভাগের কাছে অসহায় ছিল। নিজের ক্ষমতার সময়েও দায়বদ্ধ ছিল সিনেট আর কংগ্রেসের কাছে। ইউএসএ’র সিনেট ইচ্ছা করলে মন্ত্রী নিয়োগও আটকে দিতে পারে। এত গেল ইউএসএ’র কথা। ইউকে-তে সরকার প্রধান ফুলটাইম চালাতেই পারছে না। কিন্তু কোনো নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা শোনা যায় না। জার্মানিতে তো দুই প্রধান দল এক সঙ্গে কোয়ালিশন করে। ভালো গণতন্ত্রের দেশ কখনো একা সিদ্ধান্তে যুদ্ধেও যেতে পারে না।  কিন্তু রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া বা মিয়ানমারের জন্য এই সবের বালাই নাই। এই প্রসঙ্গে একটা কৌতুক না বলে পারছি না। এক ইউএসএ নাগরিক আর এক রাশিয়ান নাগরিকের মধ্যে কথা হচ্ছে। ইউ এসএ’র নাগরিক: “তুমি জানো আমি হোয়াইট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, মি. প্রেসিডেন্ট, আমি আপনাকে অপছন্দ করি”। রাশিয়ান নাগরিক তার কথা শুনে বললেনঃ “এ আর এমন কি? আমিও পারি (হোয়াইট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে)”। 

আমাদের পাশের দেশ ভারত বা পাকিস্তানেও সরকার, স্বাধীন বিচার বিভাগের কাছে দায়বদ্ধ। বিচার বিভাগ সরকারের বিপক্ষেও সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশ (আফগানিস্তান আর বাংলাদেশ (!!) বাদে) সবার মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা আছে তার মানে তাদের সরকার অন্তত গণতান্ত্রিক। যদিও বাকি সব রাষ্ট্রযন্ত্র স্বাধীন কিনা, এই গুলো নিয়ে কথা হতেই পারে। আবার মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে যখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণমূলক শাসন ব্যবস্থা ছিল, তখনও রাষ্ট্রের অন্য যন্ত্রগুলো স্বাধীন থাকাতে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি। তাদের উন্নতি তো আমাদের চোখের সামনেই। এই দুই দেশের সেই সময়ের শাসকেরা কিন্তু চরম জনপ্রিয়, কারণ মানুষের উন্নতি আর চাওয়া কখনই বন্ধ হয় নাই। 

তাই এখনকার আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুধুমাত্র ৫ বছর মেয়াদি ভোটের অধিকারেই সীমাবদ্ধ নাই। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ সেই বৃটিশ আমল থেকে শুধু এক ক্ষমতা পেয়ে এসেছে, আর আমাদের কোনো রাজনৈতিক দল এই ভোটের বাইরে কোনো কথা বলে না। এদেশের সব আইন উপনিবেশবাদী বৃটিশ সরকারের তৈরি আইনের আধুনিক সংস্করণ যেখানে শাসক এবং তার সহযোগীদের জন্য আইনে সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা সুযোগের ফাঁক ফোকর থাকে। শাসক এবং তার সহযোগীরা কেন এই সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে সাধারণ জনগণের কাতারে আসতে চাইবে? আর সাধারণ জনগণ নিজেদের শাসক শ্রেণিতে উন্নীত করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তাদের স্বপ্ন সেই বিশেষ সুবিধা। ফলাফল দেশের সরকার, প্রশাসন যন্ত্র যারা সংবিধান অনুসারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, তারাই এখন শাসক হয়ে বসেছে। ফলাফল সমীক্ষা অনুসারে সব গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোতেই আমাদের পিছিয়ে পড়া। যেকোনো কাজ করতে গেলেই দেখা যায় কতোটা বাধা আসছে যদি আপনার কেউ পরিচিত না থাকে। কিছু কিছু ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি কথা বললেও আসল চাওয়াটা আসতে হবে ভোটের মূল স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলো থেকেই।  দেশের মানুষের স্বপ্ন হওয়া উচিত আমি অমুক দল করছি বা ভোট দিছি বলে এই সুবিধা পাবো না হয়ে, আমি নাগরিক- ভোট দেই বা না দেই নাগরিক হিসেবে নাগরিক সব সুবিধা পাওয়া আমার অধিকার। এই চাওয়াটাই আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে মরে গেছে। আসলে মানুষ ভাবতেই ভুলে গেছে। এই চাওয়াটা আমাদের দলগুলোর কাছে উঠাতে হবে। 

এখন আমাদের সিস্টেম বদল কি খুব কঠিন? কঠিনের থেকে সদিচ্ছা দরকার। বিশ্বে এখনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প আসে নাই। তাই আমাদের চাওয়া থাকবে  গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে দলগুলোর কাছে কীভাবে একটা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তার রূপরেখা ইশতেহারে যেন থাকে। আওয়ামী লীগের স্মার্ট বাংলাদেশ বা বিএনপি’র ২৬ দফা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে দেশে সুশাসন আসবেই।  আমাদের ভিশন দেখাতে হবে, ভিশন-২০৪১ বা ২০৩০ যেটাই হোক প্রথম চাওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, তাহলে উন্নয়ন অটোমেটিক হবেই। কিন্তু দুঃখের কথা অনেক ভালো ভালো কথা আমাদের নেতারা বললেও  ২০১৪’র পর থেকে দেশ সব গণতান্ত্রিক এবং সুশাসনের সব সূচকে শুধু পিছিয়েই যাচ্ছে। মানুষ ভোট দিতে পারছে না, সেখানে হাজার কোটি টাকা খরচ করে ভোটের কি দরকার বা যে সংসদে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় না- তার পেছনে বছরে শতকোটি টাকা খরচের কী দরকার? কোনো পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনো অনুন্নত থাকতে পারে না। এটা প্রমাণিত। স্বাধীনতার ৫২ বছর পর সব দল যেন এই একটা ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে পারে- তবেই সম্ভব সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আমরা এখনো ভোটের অধিকারের জন্য হা-হুতাশ করি।  যা সুশাসনের প্রথম শর্ত। আর তাই আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের জন্য পরিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন আমরা কখনোই দেখতে পাই না। দুই দল বিভিন্ন দিকে যাত্রার কথা বলছে, আমরা এই ২০২৪ থেকে সুশাসনের ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করতে পারি না? 

লেখক: টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক কলামিস্ট।
ই-মেইল: [email protected]

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status