ঢাকা, ২৬ জুন ২০২২, রবিবার, ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৫ জিলক্বদ ১৪৪৩ হিঃ

মত-মতান্তর

সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ঘোষণা এবং বাংলাদেশে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয়তা

কাজী রাকিব উদ্দীন আহমেদ

(১ সপ্তাহ আগে) ১৭ জুন ২০২২, শুক্রবার, ৪:০৫ অপরাহ্ন

সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ:

সৌদি আরবে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা খুবই উচ্চ পর্যায়ে থাকে। এই তাপমাত্রায় বাইরে শ্রমিকদের কাজ করা অস্বাস্থ্যকর এবং জীবনের নিরাপত্তা হুমকিস্বরূপ। তাই জুন ১৫ থেকে সেপ্টেম্বর ১৫ পর্যন্ত (দুপুর বারোটা থেকে তিনটা) শ্রমিকদের বাইরে কাজ করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।

এর সাথে শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারেও কিছু নীতিমালা/নির্দেশিকা ঘোষণা করা হয়েছে যেগুলো শ্রমিক বান্ধব।‌

এ ধরনের একটি নীতিমালার/নির্দেশিকার ‌ প্রয়োজন এবং প্রয়োগের ব্যাপারে সৌদি সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সাধুবাদ প্রাপ্তির যোগ্যতা রাখে।

আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়কে। বাংলাদেশের হাজারো শ্রমিক এই নির্দেশিকায় উপকৃত হবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

এখন বাংলাদেশ প্রেক্ষিত এবং কিছু আলোচনা।

আমাদের দেশে নিম্নতম মজুরি বা ওভারটাইম বা বোনাস ইত্যাদি সময়মতো পাওয়ার জন্য অনেক সময়ই শ্রমিকরা আন্দোলন করতে বাধ্য হন। ‌ নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষাতো বেহেশতী আলোচনা।

আক্ষরিক অর্থেই শুধু দুই হাত দিয়ে ড্রেন থেকে আমাদের শ্রমিকরা যে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করেন বা ১৫/২০ তলা বিল্ডিং এর পাশে বাঁশ দিয়ে কোন ধরনের সেফটি গিয়ার ছাড়াই বিল্ডিং কন্সট্রাকশন এর কাজ করেন, ২০২২ সালে তা কোনরকমেই মানানসই নয়। দেশের কয়টি কনস্ট্রাকশন/ডেভেলপার কোম্পানী গুরুত্ব দিয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তা-স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে যে আইনগুলো বইতে আছে তা প্রয়োগ করে?

যত অল্প খরচে, যত বেশি মুনাফা করা যায় সেটিই থাকে মালিকপক্ষের প্রধান লক্ষণ। একটির পর একটি দুর্ঘটনা আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয় শ্রমিক-কর্মীর সুস্বাস্থ্য বা জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা কতখানি উদাসীন।

বর্তমানে সরকারের ৩০টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বা এজেন্সি শিক্ষিত বেকারদের দক্ষতা বৃদ্ধি, চাকুরীর সুযোগ, প্রবাসী কল্যাণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখাশোনা করছে। এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা ও কর্মযজ্ঞ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

দেশে ৫৩ টি সরকারি এবং ১০৩ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ডিগ্রী শেষ হওয়ার‌ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাদের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘোষণা করে।

বিজ্ঞাপন
‌ এই আত্মতৃপ্তি বেকার সমস্যা প্রকটতর করে তুলছে, তরুণ এবং মেধাবীদের মেধাকে যথাযথভাবে লালন এবং ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় টিপস, কোমল ও কঠিন দক্ষতা ইত্যাদির ব্যাপারে অনেকটা নিস্প্রভ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।  হাতেগোনা দুই-একটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার বলে কিছু গড়ে ওঠেনি। ৩/৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কলাবরেশন বাস্তবতা নেই বললেই চলে।  

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, চাকরিপ্রার্থী, চাকরিদাতা, উদ্যোক্তা, শিল্পপতি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও‌ উন্নয়ন পেশাজীবী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, আইসিটি ডিভিশন, শ্রম মন্ত্রণালয়, ‌‌প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়‌ ইত্যাদির মধ্যে সমন্বয়ের‌ সাথে কাজ করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ 'সেতু' তৈরি নির্মাণ করা-সময়ের দাবি।

পদ্মা সেতুর মত এই 'সেতু'টি আমাদের সার্বিক উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এবং রপ্তানিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।‌‌ মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য জনশক্তি আমদানিকারক দেশসমূহ এখন নতুন প্রজন্মের আরো উন্নততর দক্ষ জনশক্তি খুঁজছে। ব্লু ইকোনমি, রিনিউয়েবল এনার্জি, ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ মানবসম্পদের প্রস্তুতির সময় এখনই।

কিন্তু কী ধরনের মানবসম্পদ প্রয়োজন, কোথায়, কখন কিভাবে পরিকল্পনামাফিক তা  গড়ে উঠবে বা পাওয়া যাবে, তার জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য তথ্য, পরিসংখ্যানের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের বিদেশি, আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহের উপর নির্ভর করতে হয়। কী লজ্জাজনক!

চাকরির বাজারের নির্দেশিকাগুলো কোনদিকে যাচ্ছে সে অনুযায়ী মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কারিকুলাম নতুনভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন যাতে সদা পরিবর্তনশীল নতুন প্রযুক্তি জ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যেতে পারেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি কোনদিকে পরিচালিত হচ্ছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে জড়িত বিষয়গুলো আমরা কত দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োগ করতে পারি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুযোগটিকে কত দ্রুত কাজে লাগানো যায়, ম্যাক্রো এবং মাইক্রো লেভেলে দেশি এবং বিদেশি সব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দক্ষতার সাথে এসব সমন্বয়ের কাজ করে যাবে এই সেতু এবং তার নাম হবে - মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়।

সংক্ষেপে, কলাবরেশন এবং ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এই মন্ত্রণালয় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ জনশক্তির সব তথ্য পরিসংখ্যান হালনাগাদ করত সমস্ত ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ফর অল কাইনডস ‌‌অফ হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভলপমেন্টস, এক্টিভিটিস, স্ট্যাটিসটিকস অ্যান্ড ইনফরমেশন। ‌Human Resources Ministry।

দক্ষ এবং টেকসই মানবসম্পদই ২০৪১ সালের‌ মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে শক্তভাবে প্রোথিত করার সক্ষমতা রাখে। পরিকল্পনামাফিক দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য -  মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়‌ই তার প্রধান দায়িত্বে থাকবেন।

আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার পদ্মা সেতুকে শতাব্দীর পর শতাব্দী টেকসই রাখতে আমাদের দেশের দক্ষ, টেকসই, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মানবসম্পদ থাকবে।

থাকবে দেশের প্রতিটি সেক্টরে  - দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী জনশক্তি‌, ইনশাআল্লাহ।

লাল-সবুজের পতাকা দেখে তখন বিশ্ববাসী বলবে Model of Miracle!

[লেখকঃ সিইও এন্ড ফাউন্ডার, আমেরিকান বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট এক্সিলেন্স (এবিসিডিই)। লেখাটি তার ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া]

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com