ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১০ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

চলতি পথে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী বিপজ্জনক পরিণতির দিকে এগুচ্ছে

শুভ কিবরিয়া
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, বুধবার
mzamin

তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি এই ভিসা নীতি কার্যকর ঘোষণার পর হাল ছেড়ে দেবেন। বিরোধীদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করবেন? সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন?-না, সে রকম ঘটনা ঘটার কোনো উপায় নেই? বরং উল্টোটা ঘটতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের কথা বলে আওয়ামী লীগ যেকোনো মূল্যে একটা নির্বাচনের দিকে এগুতে থাকবে। ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি সরকার নিয়ে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত। বিএনপি না এলে কাদের নিয়ে সরকার নির্বাচন করবে, তার নমুনা দেখা গেছে। শমসের মবিন-তৈমূর আলম খন্দকার প্রজেক্ট সামনে এসেছে। দলছুট বিএনপিদের নিয়ে নির্বাচনের চেষ্টা চলবে। সেটা সক্রিয়ভাবে সফল না হলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা দেখানোর চেষ্টা চলবে।

ভারতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সেলফি কাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেভাবে আশা ফিরে পেয়েছিলেন সে আশায় হঠাৎ এই রকম অন্ধকার নেমে যাবে তা বোঝা যায়নি। একদিনের বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর যখন জলমগ্ন, যখন প্রশ্ন উঠছে উন্নয়ন কি তাহলে বৃষ্টিতেই ভেসে গেল? ঠিক তখনই আমেরিকান বাজ পড়লো ‘ভিসা নীতি কার্যকর’ ঘোষণার আদলে।

বিজ্ঞাপন
বলা হলো আমেরিকান ভিসা নীতি কাজ করা শুরু করেছে। খোদ আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তর, বাংলাদেশে আমেরিকান দূতাবাস প্রায় যৌথভাবে এই ঘোষণা দিলে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আমেরিকায়, জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন, তখন আমেরিকান ভিসা নীতি কার্যকরের এই ঘোষণা ভীষণ রকম তাৎপর্যবাহী। অবাক হবার মতো বিষয়, আগেরবার আমেরিকান এই ঘোষণা আসার পর পর বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে হাজির হয়ে পুরো বিষয়টির ব্যখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু। এবারো তার ব্যত্যয় হয়নি। ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা অনলাইন চ্যানেলে এ বিষয়ে সবিস্তার ব্যাখ্যাসহ হাজির হয়েছেন ডোনাল্ড লু। ‘ভিসা নীতির প্রয়োগ নিয়ে ডেইলি স্টারকে যা বললেন ডোনাল্ড লু’ শিরোনামে শুক্রবার সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৩ অপরাহ্ণে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড লু বলেছেন, ‘এই নীতি ঘোষণা করার পর থেকে সার্বিক ঘটনা খুব কাছ থেকে আমরা দেখেছি। সাক্ষ্য-প্রমাণ ভালোভাবে পর্যালোচনা করার পর আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি। গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে ক্ষুণ্ন করছেন, এমন যেকোনো ব্যক্তির ওপর এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে এই নীতি অনুযায়ী। ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয় দেখানো, সংগঠনের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা থেকে বিরত রাখতে সহিংসতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বা মতামত প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমের ওপর পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণের মতো কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হতে পারে।

এই নীতির উদ্দেশ্য হলো, সহিংসতা কমানো এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের গঠনমূলক অংশীদার হওয়া।
এই নীতি অনুযায়ী যাদের ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্যরাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন।’

কারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছেন তাদের নাম ঘোষিত হয় নাই। প্রকাশ্যে আমেরিকানরা নামও ঘোষণা করবে না। ফলে এটা রাজনৈতিকভাবে আরও বিপজ্জনক হয়ে দেখা দেবে। গুজব বাড়বে। বহুজনের নাম নিয়ে জনপরিসরে, সোশ্যাল মিডিয়ায় জল্পনা ও কল্পনা চলতে থাকবে। যা চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এখন দেখার বিষয় এই মার্কিন ঘোষণার ফলে কি ঘটতে পারে।

এক. এই ঘোষণার পর সরকার দু’রকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। প্রথমত: একটা প্রাথমিক বিমর্ষতা তাদের ঘিরে ধরবে। যেটা এই ঘোষণার পর পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংবাদ প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে। এরপর সরকার একটা উল্টো ড্যামকেয়ার ভাবও দেখাতে পারে। তারা বলতে পারে কি হবে এই ভিসা নীতি কার্যকরে? গেলাম না আমেরিকায়!

দুই. এই ভিসা নীতি কার্যকর ঘোষণার ফলাফল পড়তে পারে বাজারে। দ্রব্যমূল্যের বাজার এখন সরকারের সম্পূর্ণ হাতছাড়া। ডিম কারবারিদের কাছে সরকার অসহায় আত্মসমর্পণ করে ডিম আমদানির মতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেটা এখনো বাজারের ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে নাই। আলুর বাজারে সরকার ব্যর্থ। প্রতিদিন টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক যে অপেশাদারি কায়দায় ছোট ব্যবসায়ীদের সামনে রেখে হুমকি-ধমকি-হৈ-চৈ করেন সেটাই প্রমাণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কোনোভাবেই আর কাজ করছে না। ফলে এই ভিসা নীতি কার্যকরের ঘোষণা বাজারকে আরও বিশৃঙ্খল ও বেপরোয়া করে তুলবে। বাজার সিন্ডিকেট ওপরে-নিচে-মাঝখানে সর্বত্র আরও শক্তিমান হয়ে উঠবে। দ্রব্যমূল্যের দাম আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।

তিন. এই ভিসানীতির আওতায় আমেরিকার ভিসা থেকে কারা বঞ্চিত হচ্ছে, কাদের উপার্জিত সম্পদ নিয়ে আমেরিকান সরকার টানাহেঁচড়া শুরু করেছে তা সরাসরি জানা না গেলেও সেসব নাম গোপন থাকবে না। কোনো না কোনোভাবে প্রকাশিত হবেই। এদেব মধ্যে সরকারঘনিষ্ঠ সামরিক-বেসামরিক-আধাসামরিক দু’একটা আমলার নাম প্রকাশ্যে আসলেই গোটা আমলাতন্ত্রের আসল চেহারা ভেসে উঠবে। আমলাতন্ত্রের নীরব শিথিলতা-সতর্কতা মাঠ পর্যায় পর্যন্ত সক্রিয় হবে। সেটা সরকারদলীয় রাজনৈতিক কর্মীদের একটা সতর্ক বার্তা দেবে।

চার. সরকারের একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল যেভাবে বিদ্রোহ করেছিলেন, সেই রকম বিদ্রোহের ঘটনা নানা সেক্টরে বাড়তে পারে। 

পাঁচ. সরকারের ক্ষমতাবর্ধী সম্প্রসারণকামী প্রজেক্টের আওতায় যেসব নেতাকর্মী-আমলা-ব্যাবসায়ী নীতিহীনভাবে সম্পদ বানিয়েছেন গত দুই দশকে, তারা তাদের সম্পদ সুরক্ষার জন্য সরকার বেকায়দায় পড়ে এ রকম কাজে প্রভাবিত হতে পারেন।

তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি এই ভিসা নীতি কার্যকর ঘোষণার পর হাল ছেড়ে দেবেন। বিরোধীদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করবেন? সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন?-না, সে রকম ঘটনা ঘটার কোনো উপায় নেই? বরং উল্টোটা ঘটতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের কথা বলে আওয়ামী লীগ যেকোনো মূল্যে একটা নির্বাচনের দিকে এগুতে থাকবে। ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি সরকার নিয়ে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত। বিএনপি না এলে কাদের নিয়ে সরকার নির্বাচন করবে, তার নমুনা দেখা গেছে। শমসের মবিন-তৈমুর আলম খন্দকার প্রজেক্ট সামনে এসেছে। দলছুট বিএনপিদের নিয়ে নির্বাচনের চেষ্টা চলবে। সেটা সক্রিয়ভাবে সফল না হলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাঁড় করিয়ে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা দেখানোর চেষ্টা চলবে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকার নিজস্ব স্টাইলে একটা নির্বাচন করার চেষ্টা করবে।

তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত কি?
বাংলাদেশ কি ইরান, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, এই পরিণতির দিকে যাচ্ছে?
সেটা নির্ভর করবে এখানকার রাজনীতিবিদরা তাদের শক্তি ও বুদ্ধিকে কতোটা দেশের স্বার্থে কাজে লাগান সেটার ওপর। এটা এখন পরিষ্কার, আমেরিকা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছে। সেটা তাদের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতিতে একমাত্র আমেরিকান স্বার্থই সুনির্দিষ্টভাবে সুচিহ্নিত করা আছে। সেটা সক্রিয়ভাবে সফল করতে তারা বদ্ধপরিকর। আমাদের রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার ভুল মিশনে যেভাবে ক্ষিপ্র বাঘের পিঠে চড়ে বসেছেন, সবকিছু আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। ফলে, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ, বাংলাদেশের সক্ষমতা উন্নয়নের শক্তি কোনোটাই আর বাংলাদেশের মানুষের হাতে নাও থাকতে পারে। বিপদ সেটাই!

পুনশ্চ: লেখাটা একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। 
একজন ঋষির খুব নামডাক। তিনি চিন্তা করে ভবিষ্যৎ বলতে পারেন নিখুঁতভাবে। ক্ষমতাশালী রাজা একথা শুনে ঋষিকে খবর পাঠালেন রাজপ্রাসাদে। রাজার দূত এসে জানালেন ঋষি রাজপ্রাসাদে আসতে নারাজ। কেননা ঋষির ভাষ্য, তিনি সত্য বলেন। রাজা সেটা সহ্য করতে নাও পারেন। রাজা সেনাপ্রধানকে পাঠিয়ে ঋষিকে ধরে আনলেন রাজপ্রাসাদে।

ঋষির কাছে নিজের ভবিষ্যৎ জানতে চাইলেন রাজা। রাজ্যের ভবিষ্যৎও ছিল তার জিজ্ঞাসাতে। ঋষি অনেকক্ষণ ধ্যানমগ্ন থেকে জানালেন রাজ্যের ভবিষ্যৎ সমুজ্জ্বল। রাজাও অনেক সুকৃতির অধিকারী হবেন। রাজা খুশি হলেন। ঋষিকে অনেক উপহার দেয়া হলো।

কিছুক্ষণ থেমে ঋষি এবার রাজার ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যের কথা বলতে লাগলেন। বললেন, যে বাঘের পিঠে চড়ে রাজ্য চালাচ্ছেন, সেই বাঘই আপনার হন্তারক হয়ে উঠতে পারে। বহু প্রিয়জন হারাবেন। কাছের লোকেরা আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। রাজ্য-রাজ্যপট হারিয়ে বনবাসী বড় দুর্দিন আপনার শেষ বয়সকে নিঃসঙ্গ ও যন্ত্রণাকাতর করে তুলবে। 

একথা শুনেই ক্রুদ্ধ রাজা কোমরে রাখা পিস্তল বের করে ঋষির দিকে তাক করে বললেন, ‘চিন্তা করে এবার বলো তোমার মৃত্যু কখন হবে?’
ঋষি কিছুক্ষণ হিসাব করে বললেন, ‘আমার হিসাব অনুসারে, আমার মৃত্যু হবে আপনার মৃত্যুর ঠিক দেড়ঘণ্টা আগে।’

রাজা থতমত খেয়ে, পিস্তল নামিয়ে, দ্রুত নিজের খাস কামরায় প্রবেশ করলেন।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status