ঢাকা, ১৩ জুন ২০২৪, বৃহস্পতিবার, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

আন্তর্জাতিক

ইমরান আউট স্বাগত নওয়াজ শরীফ

মোহাম্মদ আবুল হোসেন
৭ আগস্ট ২০২৩, সোমবার
mzamin

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের নাম জমা দেয়ার জন্য জোটের কিছু শরিক সময় চেয়েছে। তারা পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার সময় হিসেবে ৯ই আগস্টের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এ নিয়ে যে মিটিং হয়েছে তাতে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, জমিয়তে উলেমায়ে ইসলাম-ফজলুর (জেইউআইএফ) আমীর মাওলানা ফজলুর রেহমান, এমকিউএম-পি’র আহ্বায়ক খালিদ মকবুল সিদ্দিকী, বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির নেতা খালিদ মাগসি, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মোহসিন দাওয়ার ও আসলাম ভুটানি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম চূড়ান্ত করবেন নওয়াজ শরীফ

মঞ্চ প্রস্তুত। ‘আইনগতভাবে’ সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হলো কাপ্তান ইমরান খানকে। স্বাগত জানাচ্ছে পাঞ্জাবের লায়ন হিসেবে খ্যাত নওয়াজ শরীফকে। এ কারণেই বৃত্তের বাইরে ঠেলে দেয়া হলো ইমরান খানকে! ৫ই আগস্ট তোষাখানা দুর্নীতির মামলায় তাকে অভিযুক্ত করে ৩ বছরের জেল ও এক লাখ রুপি জরিমানা করেছে আদালত। সঙ্গে সঙ্গে ৫ বছরের জন্য তিনি সক্রিয় রাজনীতি করতে পারবেন না। এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটলো, যখন সামনেই জাতীয় নির্বাচন। ৯ই আগস্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন
এরপরই অক্টোবরে বা নভেম্বরে নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ইমরান খান বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ফলে তাকে বাইরে রাখলে তাদের ঝুঁকিটা বেশি থেকে যায়। এ জন্য দেখে দেখে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার চারদিন আগে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি চৌকসভাবে ঘটানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে আইন। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন এমন জেল-জুলুম বা কোনো অভিযোগের বিচার দ্রুততর হয়, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। ইমরান খানকে নির্বাচনের মাঠ থেকে দূরে রাখতে পারলে ক্ষমতাসীনদের জন্য সব পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে। হয়তো সে জন্যই তড়িঘড়ি করে এ রায়। দ্বিতীয়ত, রায় দেয়া হয়েছে ইমরান খান বা তার আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে। এশিয়ার রাজনীতি ক্রমশ কলুষিত হয়ে পড়ছে। এ ধারায় পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই অগ্রগামী। এক ইমরান খানকে নিয়ে শাসকগোষ্ঠী নতুন নতুন গেম খেলেছে। গত বছর এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর ইমরানের বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে প্রায় ১৭০টি মামলা। 

তিনি জেলে গিয়েছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার টুইটারে বলে গেছেন, ‘তোষাখানা মামলা নিয়ে জাতির কাছে আমার বার্তা হলো, অব্যাহতভাবে আমাকে সুষ্ঠু বিচারের সাংবিধানিক অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এমনকি আমার পক্ষের কোনো সাক্ষীকে উপস্থিত হতে দেয়া হয়নি। এখানে সামরিক স্টাইলের অপবিচার চলছে। বিচারের নামে এই অপবিচার বন্ধে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করতে হবে সুপিরিয়র কোর্টকে। 

দেশটিতে এখন মঞ্চ প্রস্তুত নির্বাচনের। পাঞ্জাব লায়ন নওয়াজ শরীফ স্বেচ্ছায় নির্বাসনে আছেন লন্ডনে। সেখান থেকে তিনি দেশে ফিরবেন। কানকথা শোনা যায় তিনি সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরবেন। তার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছেন ছোট ভাই, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। নওয়াজ শরীফকে সুপ্রিম কোর্ট যাবজ্জীবন সরকারি পদে অযোগ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু শেহবাজ শরীফ ও তার জোটসঙ্গীরা পার্লামেন্টে সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদ বিষয়ক আইন সংশোধন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ড. আরিফ আলভি পবিত্র হজে থাকার সময়ে তড়িঘড়ি করে সেই আইনে স্বাক্ষর করানো হয়েছে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টকে দিয়ে। ফলে বিলটি এখন আইন। এই আইনের অধীনে কোনো পার্লামেন্টারিয়ানকে ৫ বছরের বেশি অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না। সেই হিসাবে নওয়াজ শরীফের অযোগ্য ঘোষণার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তাই তিনি বৈধভাবে দেশে ফিরতে পারেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও তার দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) জানিয়ে দিয়েছেন, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন নওয়াজ শরীফ। এ জন্য ১২ই আগস্ট পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা ভেঙে দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। 

কিন্তু ইমরান খানকে যেভাবে পর্দার আড়ালে পাঠিয়ে দেয়া হলো, তাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন পাকিস্তানের সুপরিচিত সাংবাদিক হামিদ মির। তিনি আদালতের রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, রায় এমন হবে এটা আগেই প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কারণ, এই রায় আগেই লিখে রাখা ছিল। যেভাবেই রায় দেয়া হোক, ইমরান খানকে বাইরে রেখে তাহলে যদি নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন সৃষ্টি হবে। রউফ হাসান নামে ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের নতুন তথ্য বিষয়ক সেক্রেটারি জুনে একবার বলেছিলেন, ইমরান খান ও তার দল পিটিআইকে ছাড়া নির্বাচন হলে তা মোটেও নির্বাচন হবে না। এমন নির্বাচনকে পাকিস্তানিরা তো মেনে নেবে না। আর তো বাকি বিশ্ব! কারণ, ইমরান খানকে জেলে রেখে তার দল নির্বাচনে যাবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। 

শুধু ইমরান খান একা নন, তার দলও আছে তীব্র চাপের মুখে। এখনো তার সঙ্গে আছেন এমন সদস্যদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু কেন! ২০২২ সাল থেকে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। গত ৯ই মে ইমরান খানকে প্রথম দফা গ্রেপ্তার করা হয়। তখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তার দলীয় নেতাকর্মীদের যে অনিয়ন্ত্রিত আচরণ তা প্রকাশ পেয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেটকে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন ইমরান খান। সেই থেকে তিনি কিংবদন্তি। রাজনীতিতে প্রবেশ করে চমক দেখিয়েছেন। তার অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু তিনি এটা বুঝতে পারেননি যে, তার দেশের সেনাবাহিনী বিপুল ক্ষমতাধর। তাদের ইচ্ছায় সব হয়। তারা চাইলে যে কাউকে ক্ষমতায় রাখতে পারে। আবার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। অন্তত তাদের অতীত ইতিহাস তো একথাই বলে। এতসব যদি জেনেই থাকেন, তাহলে তাদের সঙ্গে কেন অসম শক্তির প্রতিযোগিতায় নামতে গেলেন তিনি! জনসমর্থন? হ্যাঁ, এখনো যে জনসমর্থন আছে তার তাতে তিনি নির্ভেজালভাবে জিতে আসতে পারবেন। তাকে সে সুযোগ দেয়া হবে না। এ জন্যই তার রায়কে হামিদ মীর ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। 
তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে তোড়জোড়

কম্বোডিয়ার নির্বাচনের কথা একবার কল্পনা করুন। সেখানে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে আদালত ব্যবহার করে। ফলে ওই নির্বাচন কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। এর চেয়ে নিকৃষ্ট ও লজ্জার বিষয় আর হতে পারে না। নির্লজ্জের মতো এমন একখানা নির্বাচন করে আবার দাঁত কেলিয়ে হাসেন হুন সেন। কিন্তু দিনের আলোকে অন্ধকার বলার মতো মিথ্যা তিনি বলে যাচ্ছেন অবলীলায়। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত দিক দিয়ে পাকিস্তান একটু সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তারা নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ক্ষমতা তুলে দেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু একে অন্যকে বিশ্বাস করে না, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, তা তারা মেনে নিয়েছেন। এ জন্য চালু হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। বর্তমান পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১২ই আগস্ট মধ্যরাতে। তাই নির্বাচনে একটু সময় বেশি পাওয়ার জন্য ৯ই আগস্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দেবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। কিন্তু যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক তৎপরতা। জোটের শরিকরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শোনা যাচ্ছে এ পদে পারস্পরিকভাবে দলগুলো একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। 
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের নাম জমা দেয়ার জন্য জোটের কিছু শরিক সময় চেয়েছে। তারা পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার সময় হিসেবে ৯ই আগস্টের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এ নিয়ে যে মিটিং হয়েছে তাতে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, জমিয়তে উলেমায়ে ইসলাম-ফজলুর (জেইউআইএফ) আমীর মাওলানা ফজলুর রেহমান, এমকিউএম-পি’র আহ্বায়ক খালিদ মকবুল সিদ্দিকী, বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির নেতা খালিদ মাগসি, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মোহসিন দাওয়ার ও আসলাম ভুটানি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম চূড়ান্ত করবেন নওয়াজ শরীফ। 

এখন পর্যন্ত যেসব নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে আছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী ইসহাক দার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসি, সাবেক অর্থমন্ত্রী ড. আবদুল হাফিজ শেখ, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ফাওয়াদ হাসান ফাওয়াদ, সাবেক প্রধান বিচারপতি তাসাদুক হোসেন জিলানি, জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল্লাহ হোসেন হারুন, পাগারোর পীর শিবঘাতুল্লাহ শাহ রশিদি এবং পাঞ্জাবের সাবেক গভর্নর, পিপিপি’র নেতা মাখদুম আহমেদ মেহমুদ।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ/ তাসে কি তবে টোকা লেগেছে?

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status