ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বেহুদা প্যাঁচাল

আসুন সবাই সাংবাদিক পেটাই!

শামীমুল হক
১৬ মার্চ ২০২৩, বৃহস্পতিবার
mzamin

সাংবাদিক সুরক্ষায় দেশে বিশেষ কোনো আইন নেই। সাংবাদিকতা দিন দিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাংবাদিকরাই যেন সবার শত্রু। সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেন। তাদের নেই কোনো দেহরক্ষী। নেই কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নেই কোনো ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নত দেশে সাংবাদিকদের ইন্স্যুরেন্স থাকে। যাদের ওপর হামলা হয়, অঙ্গ হানি হয় বা তার জীবন হুমকির মুখে পড়ে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। আর যারা ঘটনা ঘটায় তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিচার। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সাংবাদিকদের ওপর হামলাকে আরও উৎসাহিত করে। উস্কে দেয়। প্রত্যেকটি ঘটনার যথাযথ বিচার হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেকাংশেই কমে যেতো। তবে সবচেয়ে বড় কাজটি হবে মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। কারণ সাংবাদিকের ওপর সহিংস হয়ে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করা যায় না। কেউ ভালো কাজ করলে গণমাধ্যম তা ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে। আর খারাপ কাজ করে ইতিবাচক কাভারেজ প্রত্যাশা করা যায় না। এ বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। সংবাদপত্র সমাজের আয়না। একের পর এক সাংবাদিকের ওপর হামলা সাংবাদিকদের তাদের লক্ষ্য থেকে পিছু হটাতে পারবে না। কারণ সাংবাদিকরা তাদের কাজ করে যাবে সততার সঙ্গে। সাহসের সঙ্গে


আমি অনিয়ম করবো, তাতে কার কি? আমি দুর্নীতি করবো, কার বাপের কি? আমি জালিয়াতি করবো, কোন বেটা নাক গলাবে? আমি চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত, এতে অন্য কেউ নাক গলাবে কেন? আমি মাদক কারবারি, তাতে তোমার কি? আমি ঘুষখোর, খাবোই তো, ঘুষ দিয়েই তো চাকরি নিয়েছি। আমি সুদখোর, এটা আবার অন্যায় কি? বরং মানুষের উপকারই করি। মানুষের বিপদে সহযোগিতা করি। বিনিময়ে সুদ খাই। তাতে অন্যের এত জ্বালা কেন? বিশেষ করে দেশের সাংবাদিকরা সবদিকে নজর রাখে। ওদের যন্ত্রণায় টেকা দায়। একটু এদিক সেদিক হলেই লিখে দেয়। এখন আবার ভিডিও করে ছেড়ে দেয়। ওদের এত সাহস হয় কী করে? ওদের আর বাড়তে দেয়া যায় না। তাই আসুন, সবাই সাংবাদিক পেটাই। ওদের শায়েস্তা করি। ওদের কালো হাত ভেঙে দেই। হ্যাঁ, সাংবাদিকদের ওপর সমাজের অনেকেরই রাগ। ক্ষোভ। আর এ রাগ ঝাড়েন সাংবাদিক পিটিয়ে। কখনো কখনো সাংবাদিককে খুন করে। কারণ এদেশে সাংবাদিককে পেটালে কিছু হয় না। সাংবাদিকরা নিরীহ এক প্রাণী। ওদের মধ্যে ঐক্য নেই। ওদের পেটানো খুবই মজা। তাই কিছু হলেই সাংবাদিক পেটানো শুরু হয়। সাংবাদিক পিটালে কি হবে? সত্যিই তো সাংবাদিক  পিটালে দুই চার দিন নিরীহ এ প্রাণীগুলো প্রেস ক্লাবের সামনে গলা ফাটাবে। ব্যানার হাতে নিয়ে উঁচু গলায় কিছু কথা বলবে। দুই চার দিন পর সব শেষ। সবাই যার যার ঘরে গিয়ে ঘুমাবে। এই যে, এ দুই চার দিন গলা ফাটাবে এখানেও এক পক্ষের সাংবাদিক নেতারা আসবেন। অন্যপক্ষ কানে তালা লাগিয়ে বসে থাকবেন। কারণ সাংবাদিকরাও দ্বিধাবিভক্ত। আর এই দ্বিধাবিভক্তির খবর সবাই জানেন। আর জানেন বলেই সাংবাদিকের ওপর আক্রমণও হয় বেশি। আরেক সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার তদন্তই শেষ হয়নি এত বছরে। কই সাংবাদিকরা তো কিছুই করতে পারেনি। 

বছরে বছরে সাগর-রুনি হত্যা দিবসে রাজপথে সাংবাদিকরা মানববন্ধন করে। বক্তৃতা দেয়। এরপর আবার চুপ। ক’দিন পরপরই পত্রিকায় খবর আসে সাংবাদিক মারধরের। প্রহারের। পিটিয়ে জখম করার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। সাংবাদিকরা কি মার খেয়েই যাবে? গতকালের ঘটনাই দেখুন না। খোদ রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সাংবাদিকদের বেদম প্রহার করেছে পুলিশ। ভিডিওর মাধ্যমে মারধরের এ চিত্র দেখছে দেশবাসী। দেখছে বিশ্ববাসী। তাতে কার কী আসে যায়। ক’দিন ধরেই সুুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে বইছিল উত্তেজনা। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন করতে পাল্টাপাল্টি দুই প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করা হয়। এর আগে সোমবার রাতে হঠাৎ করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি মুনসুরুল হক চৌধুরী পদত্যাগ করেন। দেখা দেয় নতুন জটিলতা। মঙ্গলবার যথারীতি ভোট করতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ দু’পক্ষই নতুন দুই জনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করেন। আওয়ামী লীগপন্থিদের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামানকে এবং বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি এডভোকেট এ এস এম মোক্তার কবিরকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করা হয়। উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠতে থাকে। মঙ্গলবার রাতেই বারের এক জরুরি সভা ডেকে আওয়ামী লীগ-বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা তাদের পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও শূন্যপদে নতুন করে একজনকে যুক্ত করে পুনরায় নির্বাচন কমিশন গঠন করে। দু’পক্ষই বুধবার যথাসময়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দেয়। এই নির্বাচন নির্দলীয় হলেও কার্যত দলীয় ছদ্মাবরণেই ভোট হয়। আওয়ামী লীগপন্থিরা সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ (সাদা প্যানেল) নামে এবং বিএনপিপন্থিরা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্যপরিষদ (নীল প্যানেল) নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনকে দু’পক্ষই মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার লড়াই বলে বিবেচনা করে। গত বছরের নির্বাচনেও সরকারপন্থি ও বিএনপিপন্থিদের মধ্যে বেশ কয়েকবার হট্টগোল, হাতাহাতি, মারামারি, হাতুড়ি নিয়ে হামলা ও রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। এবারও এর বাইরে যেতে পারেননি সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবীরা। মঙ্গলবার রাত থেকেই উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠে। সাংবাদিকরা আঁচ করতে পারেন কিছু একটা হতে পারে। সকাল হতে না হতেই হলোও তাই। বিএনপিপন্থি আইনজীবী ও আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা মুখোমুখি অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মারধর করে বের করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। দুপুরে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের গঠন করা নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দু’পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও হট্টগোল হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোতায়েন করা হয় পুলিশ। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বাধার মুখে সকাল ১০টায় ভোটগ্রহণ শুরু করতে পারেনি। বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের পিটিয়ে বের করে দেয় পুলিশ। এসব দৃশ্য সাংবাদিকরা ধারণ করছিলেন তাদের ক্যামেরায়। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিলেন। রিপোর্টাররা তাদের প্রয়োজনে তথ্য সংগ্রহে সেখানে গেছেন। দুই পক্ষের এমন উত্তেজনার চিত্র দেশবাসীকে জানানো সাংবাদিকদের দায়িত্ব। অধিকার। এখানেই যত রাগ সাংবাদিকদের ওপর। পুলিশ সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়। বেদম মারধর করা হয় তাদের। এতে আজকের পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার এসএম নূর মোহাম্মদ, এটিএন নিউজের সাংবাদিক জাবেদ আক্তার, জাগো নিউজের ফজলুল হক মৃধা, মানবজমিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মারুফ হাসান, এটিএন বাংলার ক্যামেরাপারসন হুমায়ুন কবির, সময় টিভির ক্যামেরাপারসন সোলাইমান স্বপন, ডিবিসি’র ক্যামেরাপারসন মেহেদী হাসান মিম, বৈশাখী টিভির ক্যামেরাপারসন ইব্রাহিম আহত হন। পুলিশ সাংবাদিকদের কিল-ঘুষি মারে, ছিঁড়ে ফেলে জামা কাপড়। এ ছাড়া, মানবজমিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মারুফ হাসানের হাতের বুম কেড়ে নিয়ে যায়। 
সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে যান সেখানে। তারা দায়িত্ব ঠিকভাবে পালনও করছিলেন। তাহলে তাদের ওপর এই আক্রমণ কেন? তারা তো ভোট বন্ধ করা বা ভোটগ্রহণ করতে যাননি। তাহলে তাদের ওপর কিসের রাগ পুলিশের। কেন এভাবে তাদের ওপর আক্রমণ চালালো পুলিশ? পেশাগত কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই সন্ত্রাসীদের মারধরের শিকার হচ্ছে সাংবাদিকরা। অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। এ ছাড়া সাংবাদিক সুরক্ষায় দেশে বিশেষ কোনো আইন নেই। সাংবাদিকতা দিন দিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাংবাদিকরাই যেন সবার শত্রু। সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেন। তাদের নেই কোনো দেহরক্ষী। নেই কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নেই কোনো ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নত দেশে সাংবাদিকদের ইন্স্যুরেন্স থাকে। যাদের ওপর হামলা হয়, অঙ্গ হানি হয় বা তার জীবন হুমকির মুখে পড়ে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। আর যারা ঘটনা ঘটায় তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নেয়া হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিচার। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সাংবাদিকদের ওপর হামলাকে আরও উৎসাহিত করে। উস্কে দেয়। প্রত্যেকটি ঘটনার যথাযথ বিচার হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেকাংশেই কমে যেতো। তবে সবচেয়ে বড় কাজটি হবে মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। কারণ সাংবাদিকের ওপর সহিংস হয়ে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করা যায় না। কেউ ভালো কাজ করলে গণমাধ্যম তা ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে। আর খারাপ কাজ করে ইতিবাচক কাভারেজ প্রত্যাশা করা যায় না। এ বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। সংবাদপত্র সমাজের আয়না। একের পর এক সাংবাদিকের ওপর হামলা সাংবাদিকদের তাদের লক্ষ্য থেকে পিছু হটাতে পারবে না। কারণ সাংবাদিকরা তাদের কাজ করে যাবে সততার সঙ্গে। সাহসের সঙ্গে।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status