ঢাকা, ২৬ জুন ২০২২, রবিবার, ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৫ জিলক্বদ ১৪৪৩ হিঃ

মত-মতান্তর

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আমাদের করণীয়

হাসান আল বান্না

(১ মাস আগে) ২২ মে ২০২২, রবিবার, ৬:৩৬ অপরাহ্ন

কোভিড পরবর্তী সারা দুনিয়ার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে এটা পূর্ব থেকে অনুমেয়। বিশ্ব যে সময়টা টিকা কূটনীতিতে ব্যস্ত ছিল আসলে সেই সময়টি ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধের উপযুক্ত সময়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমেরিকা, চীন, কানাডা ছাড়া বাকি রাষ্ট্রগুলো ব্যস্ত ছিল টিকা নিয়ে। কোভিড পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতিতে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুধুমাত্র দুই দেশের যুদ্ধ নয় বরং এটা এশিয়া-পশ্চিমা বিশ্বের যুদ্ধ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দুই পরাশক্তি এশিয়া-পশ্চিমা যুদ্ধের সৃষ্টি হয়। ফলে বিশ্বে অর্থ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চপেটাঘাত হবে এটাও নির্মম বাস্তবতা।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, রাশিয়া হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম তেল-গ্যাস সরবরাহকারী রাষ্ট্র আর ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম খাদ্য শস্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারী রাষ্ট্র। এই যুদ্ধে বিশ্ব জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে বিশ্বে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি এখন লাগামহীন। জ্বালানি ও খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি হওয়াই অন্যান্য সকল পণ্যের মূল্যও লাগামহীন।

বিজ্ঞাপন
উপরন্তু কোভিট পরবর্তী কর্মসংস্থান সারা পৃথিবীতেই অর্ধেকে নেমে এসেছে।

উপরোক্ত বাস্তবতায় বিশ্বের জাতি রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশেও এর বাইরে কোন কিছু নয়। তবে বাংলাদেশে কোভিডকালীন সময়ে ও কোভিড পরবর্তী সময়েও কিছুটা ইতিবাচক পরিস্থিতিতে ছিল। বিশেষ করে জাপান-চীনের অর্থায়ন, কৃষি উৎপাদন, প্রবাসী আয় এবং পোশাক রপ্তানি আয়ের ফলে এদেশে অর্থনীতি মোটামুটি সচল ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোয় কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব থাকলেও বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি, দেশের উন্নয়নে অবকাঠামো নির্মাণকাজের সচল থাকা এবং অব্যাহত কৃষি উৎপাদনের ফলে অর্থনৈতিক কোন সংকট ও বিপর্যয় পরিলক্ষিত হয়নি। যার প্রমাণ এবারের রমজান ও ঈদে মানুষের মাঝে কেনাকাটার ধুম লেগেছিল। ঈদ উৎসব এমনভাবে পালিত হয়েছিল যেন বাংলাদেশে কোন কোভিট ছোঁয়া লাগেনি।

এতদসত্ত্বেও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা, প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি হারানো, পোশাক শিল্পে রপ্তানি হ্রাস ও দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের একটা আশঙ্কা ছিলই। কিন্তু সরকার বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি দেখে বিষয়টি কর্নপাত করেনি। যার ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে। কিছু বিষয়ে এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

দেশ ও জাতির সম্ভাব্য এই সংকটে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি: 

ক. প্রথমেই ডিজেল- বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করা এবং প্রয়োজনে সরকার কিছু ভর্তুকি দিয়ে হলেও ডিজেল-বিদ্যুতের মূল্য কিছুটা কমিয়ে আনতে হবে।

খ. জ্বালানি সংকট উত্তরণে আগামী এক বছর বাকিতে ঋণ পত্র (এলসি) খোলে রাশিয়া থেকে তেল এবং কাতার থেকে এলপিজি গ্যাস আমদানি করা। সেক্ষেত্রে রাশিয়া ও কাতারের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।

 গ. ব্রাজিল ও আমেরিকার সাথে বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে টিসিবির মাধ্যমে সয়াবিন তেল যতটা কম মূল্যে আমদানি করা যায় তা দিয়ে এক কোটি পরিবারকে সয়াবিন ১০০ টাকা লিটারে বিক্রির পদক্ষেপ নেওয়া। 

ঘ. সারাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সকল পতিত জমি চাষের আওতায় আনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ে সয়াবিন গাছ লাগিয়ে সয়াবিন উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সারাদেশে সরিষা চাষের জন্যেও সরকার বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। 

ঙ. কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সার ও কীটনাশক বিতরণ এবং সকল কৃষকদের বিনা সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষি লোন দিতে সকল সরকারি বেসরকারী ব্যাংক সমূহে নির্দেশ প্রদান করা দরকার। 

চ. সারাদেশের কৃষি পণ্য সংরক্ষণে প্রতিটি উপজেলায় হিমাগারা ( কোল্ড স্টোরেজ)  করতে হবে। 

ছ. দক্ষ শ্রমিক রপ্তানিতে সারাদেশের প্রতিটি জেলায় বিশেষ ইনস্টিটিউট তৈরি করতে হবে। 

জ. প্রবাসী শ্রমিক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইট চালু করে বিমান ভাড়া (ওয়ানওয়ে)  ফ্রি করে দিতে হবে। যা প্রবাসী শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধির সহায়ক হবে। 

ঝ. বিশ্ব বাজারে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিজিএমআই, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টিম গঠন করা যেতে পারে, এই টিম এক যোগে পশ্চিমা বিশ্বে তৎপরতা চালাবে।  

ঞ.চীনের অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্প সহ চীন ও জাপানের বিনিয়োগে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী  শিল্প গড়ে তুলতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। 

ট. বিদেশ থেকে আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক পণ্য, সিগারেট, কসমেটিক ও পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর চাপ কমাতে হবে। এবং প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, এজন্য বিশেষ কিছু সৌজন্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা এবং প্রবাসী বিনিয়োগ সুরক্ষিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিম ও সেল গঠন করা যেতে পারে। কারণ, এই প্রবাসী আয় এখন দেশের অর্থনীতির প্রাণ।

লেখক: সংবাদকর্মী (উপ-সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশসময়)।
 

পাঠকের মতামত

সময়োপযোগী দিক নির্দেশনামূলক লেখা। লেখককে সাধুবাদ জানাই।

প্রফেসর আর. কে. শাব
২২ মে ২০২২, রবিবার, ৪:৪২ অপরাহ্ন

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com