ঢাকা, ৬ জুন ২০২৩, মঙ্গলবার, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলক্বদ ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বেহুদা প্যাঁচাল

খোশমেজাজে সাত্তার, নির্বাচনী পুলসিরাত এত সহজ!

শামীমুল হক
২৪ জানুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবারmzamin

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বিএনপি’র ভোট মাইনাস হলেও প্লাস হবে আওয়ামী লীগের ভোট। সবদিক বিবেচনায় উকিল সাত্তারই এখন নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে। নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে না এটা যেমন বলা যায় তেমনি একতরফা হবে বলেই মনে হয়। প্রার্থিতার বিচারে এমনটাই বলবেন যে কেউ। ধানের শীষ ত্যাগ করে কলার ছড়ি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামা উকিল আবদুস সাত্তার এ অবস্থায় ফুরফুরে মেজাজেই থাকার কথা। তিনি আছেনও বেশ  খোশমেজাজেই। বড় কোনো অঘটন না হলে তিনিই হচ্ছেন আবারো এমপি। যে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন সেই সংসদেই ফের যাবেন উপনির্বাচনে লড়ে। তার শেষ ইচ্ছা অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করা

কলার ছড়ি নিয়ে উকিল আবদুস সাত্তার নির্বাচনী ফুলসিরাত পার হবেন তো? ধানের শীষ ত্যাগ করার পর এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আর জনমনে এ প্রশ্ন নেই।

বিজ্ঞাপন
নির্বাচনী মাঠ থেকে একে একে হেভিওয়েট প্রার্থীরা সরে দাঁড়ানোয় এখন একমাত্র হেভিওয়েট প্রার্থী উকিল আবদুস সাত্তার নিজেই। তার নামের পাশে রয়েছে একাধিক বারের এমপি। সাবেক মন্ত্রী। পোড় খাওয়া রাজনীতিক। দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ একটি দলের জেলার প্রধান। ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। গত ১১ই ডিসেম্বর বর্তমান সংসদ থেকে পদত্যাগ করার পর তিনি আলোচনায় আসেন। আসলে সংসদ থেকে নয়, বিএনপি থেকে যখন পদত্যাগ করেন তখনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি। তাকে নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি বাতাসে ছড়াতে থাকে। উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তিনি তার নিজ আসন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। গোটা দেশের দৃষ্টি পড়ে তার দিকে। এরপর সব খোলাসা হয় তিনি যখন মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়েও তিনি টিকে যান। এরপর মার্কা পান ডাব। কিন্তু পড়ে এটা বদল করে কলার ছড়ি মার্কা নেন। ধানের শীষ থেকে কলার ছড়ি। ওদিকে আওয়ামী লীগের তিন নেতা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টু, স্বাধীনতা শিক্ষক ফোরামের নেতা অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মঈন উদ্দিন মঈন একযোগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। মঈন ২০১৮ সালের নির্বাচনে উকিল আবদুস সাত্তারের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। স্বতন্ত্র লড়ে অল্প ভোটে তিনি হেরে যান উকিল আবদুস সাত্তারের কাছে। এই তিন জনের একযোগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর খবরে এলাকার ভোটাররা নড়েচড়ে বসেন। অবাকও হন। কারণ এরই মধ্যে এ তিন জনই তাদের নিজ নিজ অনুসারীদের নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছিলেন। ইউনিয়নে ইউনিয়নে সভা করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছিলেন। তারপরও মানুষজন মনে করেছিলেন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। কারণ এখন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক দুই বারের এমপি জিয়াউল হক মৃধা মাঠে রয়েছেন। আর নির্বাচনে সাত্তার আর মৃধার মধ্যেই লড়াই হবে। তবে হিসাবনিকাশ চলছিল এই দুই জনের মধ্যে কার অবস্থান কেমন তা নিয়ে। বেশির ভাগ মানুষ মৃধাকে এগিয়ে রেখেছিলেন। কারণ উকিল আবদুস সাত্তার বিএনপি থেকে ধানের শীষ মার্কা নিয়ে একাধিকবার এ আসনের এমপি হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীও বানিয়েছেন খালেদা জিয়ার সরকার। আর যে দল তাকে এত সম্মান দিয়েছে সেই দল ত্যাগ করায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই তার ওপর নাখোশ। এমনকি তারা সাত্তারের বিপক্ষে মাঠে নেমে কাজও শুরু করেছিলেন। মনে করা হচ্ছিল সাত্তারকে হারাতে তারা মৃধাকেই বেছে নেবেন। এমন হিসাবনিকাশের মধ্যেই জিয়াইল হক মৃধা নিজেই ঘোষণা দেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর। এ ঘোষণায় চুপসে যায় মৃধার অনুসারীরা। এমনিতেই মৃধা এখন রয়েছেন বেকায়দায়। তারই মেয়ের জামাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মাঠে নামেন।

 

 

সে সময় জামাই শ্বশুরের নির্বাচনী ক্যাচাল দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত সে নির্বাচনে মৃধা স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করেন। আর জামাতা রেজাউল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জাতীয় পার্টি থেকে। নির্বাচনে দু’জনই হেরে যান। এখনো জামাই-শ্বশুরের লড়াই অব্যাহত আছে। উপনির্বাচনেও জিয়াউল হক জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পাননি। সেই জামাতাই মনোনয়ন পান। কিন্তু পরে জামাতাকে বাদ দিয়ে জাপা নেতা আব্দুল হামিদ ভাসানীকে জাতীয় পার্টি মনোনয়ন দেয়। আব্দুল হামিদ উপনির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। তবে তিনি নতুন মুখ হিসাবে এলাকায় ততটা পরিচিত নন। আর উকিল আবদুস সাত্তারের কাছে তিনি এ মুহূর্তে রাজনীতিতে শিশুই বলা চলে। এ ছাড়া নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন জাকের পার্টির প্রার্থী জহিরুল ইসলাম। তিনিও নির্বাচনে কিছু করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন না এলাকাবাসী। এ ছাড়া আরেকজন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু আসিফ আহমেদ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো প্রার্থীরা যখন সরে দাঁড়িয়েছেন তখন উকিল সাত্তারের পথ এখন পরিষ্কার। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি যেমনই হোক।  আর ভোটার উপস্থিতির প্রসঙ্গ আনতে হয়, কারণ ইতিমধ্যে বিএনপি’র পক্ষ থেকে তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কেউ যেন ভোট দিতে না যান। এমনকি কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা করলেও দল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিএনপি তাদের তিন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারও করেছে। যতটুকু  বোঝা যায় বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন দু’টি ভাগে বিভক্ত। উকিল আবদুস সাত্তার দীর্ঘদিন এ আসনের এমপি থাকায় এবং দলের জেলা সভাপতি থাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার একটা সখ্য আছে। কিছু নেতাকর্মী আছেন যারা উকিল সাত্তারকে এ মুহূর্তে ছেড়ে যেতে পারবেন না। তারা দলের হুমকি সত্ত্বেও উকিল আব্দুস সাত্তারের পাশে থাকবেন। ওদিকে উকিল সাত্তারের নিজ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন সাত্তারের পক্ষে থাকার। তারা সাত্তারের নির্বাচনী মঞ্চে উঠে সাত্তারকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সাত্তারকে নিয়ে মিছিলও হয়েছে। ওই একদিনই উকিল আবদুস সাত্তার তার নিজ এলাকার সভায় হাজির হলেও এখন তিনি প্রচারণায় মাঠে নেই। তার পক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছেন তার পুত্র তুষার। আর মাঠে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বিএনপি’র একাংশও কাজ করছেন মাঠে। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ উপনির্বাচন নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো গতকাল এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, সরাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে শনিবার আবদুস সাত্তারের পক্ষে এক সভায় অংশ নেন সরাইলের আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান নেতা। প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ নেতাদের সূত্রে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উকিল আবদুস সাত্তারকে বিজয়ী করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনার প্রথম কাজ ছিল আওয়ামী লীগের তিন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আল মামুন সরকারের নেতৃত্বে তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী তা প্রত্যাহার করেছেন। আল মামুন সরকার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এই আসনে দলীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন। এ ছাড়া সাত্তারের পথ পরিষ্কার করতে জাতীয় পার্টির দুইবারের সংসদ সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধাকে নির্বাচন থেকে সরানো হয়েছে। আশুগঞ্জে সভা করে নির্বাচনের সময় পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি’র সংরক্ষিত আসনের পদত্যাগী সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজমুল হোসেন বলেছেন, উকিল আবদুস সাত্তার অন্য দলের হলেও সৎ, প্রবীণ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ। আমরা তার নির্বাচন করতেই পারি।

অপরদিকে এলাকায় আবদুস সাত্তারকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও সরাইল উপজেলা বিএনপি নির্বাচনী এলাকার কোথাও বিএনপি’র নেতাকর্মীদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। সরাইল উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব নুরুজ্জামান লস্কর তপু অবশ্য গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা ভোট বর্জনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে তাকে প্রতিহত করবো। বিএনপি’র কেউ কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবে না। 
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বিএনপি’র ভোট মাইনাস হলেও প্লাস হবে আওয়ামী লীগের ভোট। সবদিক বিবেচনায় উকিল সাত্তারই এখন নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে। নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে না এটা যেমন বলা যায় তেমনি একতরফা হবে বলেই মনে হয়। প্রার্থিতার বিচারে এমনটাই বলবেন যে কেউ। ধানের শীষ ত্যাগ করে কলার ছড়ি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামা উকিল আবদুস সাত্তার এ অবস্থায় ফুরফুরে মেজাজেই থাকার কথা। তিনি আছেনও বেশ  খোশমেজাজেই। বড় কোনো অঘটন না হলে তিনিই হচ্ছেন আবারো এমপি। যে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন সেই সংসদেই ফের যাবেন উপনির্বাচনে লড়ে। তার শেষ ইচ্ছা অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করা। এমনটাই বলেছেন, নির্বাচনী জনসভায়। আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারির উপনির্বাচন আরেকটি ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত। ইতিমধ্যে এর আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

বেহুদা প্যাঁচাল/ অর্থমন্ত্রীর এত বুদ্ধি!

বেহুদা প্যাঁচাল/ বিএনপিতে এত বিশ্বাসঘাতক!

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status