ঢাকা, ২২ জুন ২০২৪, শনিবার, ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

কাওরান বাজারের চিঠি

বিএনপি’র নয়া কৌশল, কক্ষপথে জাপা, কী করবে জামায়াত?

সাজেদুল হক
১৪ জানুয়ারি ২০২৩, শনিবারmzamin

২০২৩ সালের ক্যালেন্ডার এরইমধ্যে সচল হয়েছে। বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির নীতি-নির্ধারণী বছর। এ বছরের শেষদিকে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? কেমন হবে সে নির্বাচনের চরিত্র- মূলত তা নিয়েই রাজনীতির ময়দানে চলছে লড়াই। মরিয়া দুই পক্ষই। সরকার কোনো ছাড় দেবে এখন পর্যন্ত তেমন ইঙ্গিত নেই। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ

গেল এক দশকের রাজনীতিতে এটা নয়া শিক্ষা। দৃশ্যত ব্যর্থ হরতাল-অবরোধ। নয়া কৌশলের খোঁজে বিএনপি। নয়া রাজনীতির খোঁজেও নয় কি! অবশেষে দলটি কি তা খুঁজে পেলো? সে প্রশ্নের জবাব খোঁজার সময় এখনো আসেনি। এ লেখা যখন শুরু করছি তখন নয়াপল্টনে অবস্থান কর্মসূচি চলছে বিএনপি’র।

বিজ্ঞাপন
গত কিছুদিনের মতো দলটির এদিনের কর্মসূচিতেও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। একইদিনে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করেছে সমমনা আরও বেশকিছু দল। এটি ঢাকায় বিরোধী দলগুলোর এ ধরনের দ্বিতীয় কর্মসূচি। তবে প্রথমদিন জামায়াত মাঠে থাকলেও এদিন ছিল না। 
দুইযুগ আগে সরবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ৪ দলীয় ঐক্যজোটের। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে মঞ্চ আলোকিত করেছিলেন সেদিনের বিরোধী রাজনীতির শীর্ষ নেতারা। ক’দিন আগে অনেকটা নীরবেই সে জোট বিলুপ্ত হয়ে গেল। এটি অবশ্য এরইমধ্যে সবার জানা। এ জোটের তত্ত্বদাতা হিসেবে পরিচিত আনোয়ার জাহিদ কিংবা গোলাম আযমও বেঁচে নেই। কিন্তু যে থিওরির ওপর ভর করে আদিতে এই জোট গড়ে ওঠেছিল তা কি টিকে আছে? এ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল। কারণ ২০১৪ কিংবা ১৮ সালে ভোটের ময়দানে এ তত্ত্বের পরীক্ষা হয়নি। তবে ‘বিএনপি-জামায়াত’ ব্র্যাকেটবন্দি রাজনীতি বিএনপি’র জন্য বহুক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। দলটি চেয়েছিল এর থেকে বেরিয়ে আসতে। যদিও বিএনপি’র ভেতরে এ নিয়ে নানামত ছিল। আন্দোলন এবং ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন বিএনপিতে এমন নেতার সংখ্যা একেবারে কম নয়।

আন্দোলন কিংবা নির্বাচন বিগত ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা ভালো নয় বিএনপি’র। দলটি হোঁচট খেয়েছে বার বার। মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন লাখ লাখ নেতাকর্মী। গুম-খুনের ঘটনাও ঘটেছে। তবে আখেরে বিএনপি ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। সে অভিজ্ঞতা থেকেই কিনা এবার নতুন কৌশলে এগুনোর চেষ্টা করছে। বিএনপি’র এই কৌশল কেমন? দলটির সামনে চ্যালেঞ্জও বা কী? বিএনপি কি এসব চ্যালেঞ্জ উতরাতে পারবে। 

১. সাম্প্রতিক অতীতে বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের প্রতি কমিটমেন্টকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষত অতীতে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, হেভিওয়েট নন, কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকেছেন এমন ব্যক্তিদেরই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এটি করতে গিয়ে বেশকিছু হেভিওয়েট নেতা অবশ্য বাদ পড়েছেন। বিশেষত আগামী নির্বাচনে কেউ দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেন কিনা সে বিষয়টিও মাথায় রাখছে বিএনপি নেতৃত্ব। এরইমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উপনির্বাচনে প্রবীণ নেতা উকিল আব্দুস সাত্তার বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে অংশ নিচ্ছেন। এটিকে বিএনপি’র অনেকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন।  

 

 

২. রাজপথে এককভাবে কর্মসূচি পালন করে নিজেদের শক্তির জানান দেয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি। গত কয়েকমাসে বিএনপি তার সবক’টি সমাবেশ, মিছিল এককভাবেই করেছে। এসব সমাবেশ-মিছিলে বিপুল লোক সমাগম বিএনপি’র নেতৃত্বকে আশাবাদী করেছে।

৩. আদিতেও বিএনপি’র রাজনীতিতে নানা মত ও পথের সম্মিলন ছিল। এখন অবশ্য বিএনপি যে যুগপৎ আন্দোলনের রাজনীতির সূচনা করেছে তা কিছুটা আলাদা। একই ফর্মুলায় আগেও এদেশে আন্দোলন হয়েছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলনে এই যুগপৎ ধারা আমরা দেখেছি। এবার যেটা আলাদা সেটা হচ্ছে, বিএনপি ওয়াদা করেছে যদি তারা বিজয়ী হতে পারে তবে আন্দোলনকারী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। 

৪. বিএনপি’র এবারের যুগপৎ আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য বামপন্থি দল ও নেতারা যোগ দিয়েছেন। এটি আন্দোলনকে নতুনমাত্রা দিয়েছে। অবশ্য এটি অতি ডান-অতি বামের ঐক্য বলে কেউ কেউ সমালোচনাও করছেন।

৫. বিএনপি’র এই আন্দোলনের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মামলা এবং চাপের মুখে দলটির নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত রাজপথে থাকতে পারেন কিনা সেটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিএনপি’র দাবি অনুযায়ী, দেড় লাখ মামলায় দলটির প্রায় ৩৬ লাখ নেতাকর্মী আসামি। এসব মামলা মোকাবিলা করা দলটির জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া এরইমধ্যে এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে, বিএনপি’র কর্মসূচির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শাসকদলের নেতাকর্মীরাও মাঠে থাকবেন। সক্রিয় থাকবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। এসব চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ থাকবে বিএনপির সামনে।

৬. হরতাল-অবরোধের বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিএনপি সমাবেশ, মিছিল, অবস্থানের মতো কর্মসূচি পালন করছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের কর্মসূচি কতোটা কার্যকর হবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা স্পষ্ট বিএনপি যেকোনো মূল্যে সংঘাত-সহিংসতা এড়াতে চায়।

৭. অসীম সময় ধরে নিশ্চয় বিএনপি’র এ আন্দোলন চলবে না। আন্দোলনকে একটি গন্তব্যে পৌঁছানো বিএনপি’র নীতি নির্ধারকদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

কক্ষপথে জাতীয় পার্টি

‘‘এরশাদ সাহেবের সমস্ত রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে টান টান দড়ির ওপর দিয়ে চীনা এ্যাক্রোব্যাট মেয়েরা যেভাবে সাইকেল চালায় তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিস্থিতি যতই খারাপ এবং অনিশ্চিত হোক না কেন তিনি ঠিকই নিরাপদে তার কাজটি করে যাবেন।’’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে মনীষী লেখক আহমদ ছফার এই মন্তব্য প্রায়ই স্মরণ করি। দুইজনই ইতিমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। তবে এরশাদের রেখে যাওয়া দল জাতীয় পার্টি যথারীতি তার দেখানো কক্ষপথেই রয়েছে। তার মৃত্যুর পরই অবশ্য দলের কতৃত্ব নিয়ে স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জিএম কাদেরের মধ্যে এক দফা প্রতিযোগিতা হয়েছিল। একপর্যায়ে অবশ্য নেতৃত্ব চলে আসে জিএম কাদেরের হাতে। যদিও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন এরশাদই। জিএম কাদেরের হাতে কতৃত্ব আসার পর জাতীয় পার্টির বেশকিছু নেতা অনেকটা রুটিন মেনেই সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন। জাতীয় পার্টি সরকার বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয় কিনা এমন আলোচনাও তৈরি হয়। কানাঘুষা তৈরি হয় বিএনপি’র সঙ্গে জাতীয় পার্টির নেতাদের কারও কারও যোগাযোগ নিয়ে। তবে এরইমধ্যে আদালতের শরনাপন্ন হন জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক এমপি জিয়াউল হক মৃধা। আদালত দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয় জিএম কাদেরের ওপর। নানা হস্তক্ষেপে রওশন এরশাদ এবং জিএম কাদেরের দূরত্ব কমে আসে। জাতীয় পার্টির নেতাদের মুখ থেকেও সরকার বিরোধী বক্তব্য উধাও হয়ে যায়। রওশন এরশাদ সরব হন সরকারের প্রশংসায়। সব মিলিয়ে কক্ষপথেই ফিরেছে জাতীয় পার্টি।

নয়া চ্যালেঞ্জে জামায়াত 

৩০শে ডিসেম্বর, ২০২২। বহুদিন পর ঘোষণা দিয়ে ঢাকার রাজপথে নামে জামায়াত। তবে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়নি জামায়াতের মিছিল। কয়েকটি স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে পুলিশের। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারও করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জামায়াত মিছিলের জন্য অনুমতি নেয়নি। এ সংঘর্ষের পর একাধিক মামলা হয়েছে জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত ১১ই জানুয়ারি যুগপৎ অবস্থান কর্মসূচিতে অবশ্য জামায়াত যোগ দেয়নি। সেদিন দলটি একটি ঘরোয়া আলোচনা সভা করে। ওই সভায় অবশ্য জামায়াতের নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। এদিন যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াতের যোগ না দেয়া রাজনীতিতে এক ধরনের কৌতূহল তৈরি করেছে। তবে জামায়াতের সূত্রগুলো বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মুখে দলটির অবস্থান কর্মসূচি পালনের সুযোগ ছিল না। দ্বিতীয়ত, জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করার ঘটনায় জামায়াতের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
 

শেষ কথা: ২০২৩ সালের ক্যালেন্ডার এরইমধ্যে সচল হয়েছে। বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির নীতিনির্ধারণী বছর। এ বছরের শেষদিকে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? কেমন হবে সে নির্বাচনের চরিত্র-মূলত তা নিয়েই রাজনীতির ময়দানে চলছে লড়াই। মরিয়া দুই পক্ষই। সরকার কোনো ছাড় দেবে এখন পর্যন্ত তেমন ইঙ্গিত নেই। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ।
 

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, মানবজমিন।  

 

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ/ তাসে কি তবে টোকা লেগেছে?

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status