ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বেহুদা প্যাঁচাল

মেট্রোরেল এবং নতুন কথা

শামীমুল হক
৩০ ডিসেম্বর ২০২২, শুক্রবার
mzamin

পর পর দুটি নতুন কথা বলা হয়ে গেছে। তৃতীয় নতুন কী কথা নিয়ে হাজির হবেন তা নিয়ে চিন্তিত প্রজা। অনেক  ভেবেচিন্তে উপায় একটা বের করলেন। তৈরি করতে থাকলেন বিরাট আকারের একটি গোলা। বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি গোলা নিয়ে রওয়ানা দিলেন রাজ দরবারে। রাজা তার নবরত্নকে নিয়ে দরবারে উপস্থিত। এ সময় হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন প্রজা। বললেন, রাজা মশাই আমার বাবা ছিলেন বিরাট জমিদার। এক সময় আপনার বাবা আমাদের প্রয়াত রাজা খুব অভাবে পড়েছিলেন। রাজ্যজুড়ে অভাব ঘুচাতে তিনি দিশাহারা।

বিজ্ঞাপন
এ সময় তিনি দ্বারস্থ হয়েছিলেন আমার বাবার। আর এ সময় আমার বাবা ওই যে গোলা দেখছেন,  সেই গোলা ভর্তি করে টাকা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন আপনার বাবাকে


মেট্রোরেল চলছে। বিস্ময় চোখে দেখছে মানুষ। যাত্রীরা ছুটছেন মেট্রো স্টেশনে। বাংলাদেশে মেট্রোরেল! যা ছিল কল্পনা। এই কল্পনাই এখন বাস্তব হয়ে সামনে এসেছে। ঢাকাবাসী এখন যানজট এড়িয়ে চলতে পারবেন। আর যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না। উত্তরা দিয়াবাড়ি থেকে একেবারে আগারগাঁও পর্যন্ত ছুটে যাবে মানুষ। আগামী বছরের এ সময়ে রাজধানীর মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলবে। সত্যিই মেট্রোরেল স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে। আর এর মাধ্যমে মেট্রোরেল যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। সরকারের আন্তরিক চেষ্টায় এই মহাযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে। হচ্ছে। আর এর মাধ্যমে পদ্মা সেতুর পর বাঙালি জাতির আরও একটি অবিশ্বাস্য স্বপ্নপূরণ হলো। বুধবার যানজটের নগরী ঢাকায় বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের মেট্রোরেলের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে নতুন এক মাইলফলকে প্রবেশ করলো দেশ। তাই তো মেট্রোরেল উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, দেশের প্রথম মেট্রোরেল উদ্বোধনের মাধ্যমে বাঙালির গৌরব ও বাংলাদেশের উন্নয়ন মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত হয়েছে। মেট্রোরেল উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় জনগণের মাথার মুকুটে অহংকারের আরও একটি পালক যোগ হয়েছে। মেট্রোরেল চালু হওয়ার মধ্যদিয়ে দেশ বৈদ্যুতিক, দূর নিয়ন্ত্রিত এবং দ্রুততম যোগাযোগের যুগে প্রবেশ করেছে।

 মেট্রোরেলের উদ্বোধনের ফলে একই সঙ্গে প্রযুক্তিতে চারটি মাইলফলক ছুঁলো বাংলাদেশ। প্রথমত, মেট্রোরেল নিজেই একটি মাইলফলক। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে প্রথম বৈদ্যুতিক যানের যুগে প্রবেশ করলো। তৃতীয়ত, ডিজিটাল রিমোট কন্ট্রোল যান এটি, যেটি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি ধাপ। চতুর্থত, বাংলাদেশ দ্রুতগতিসম্পন্ন যানের যুগে প্রবেশ করলো। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলবে মেট্রোরেল।  দ্রুতগতির মেট্রোরেল সেবার মধ্যদিয়ে ঢাকার চেহারা বদলে যাবে। ওদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছেন বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদেই মেট্রোরেল আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাকি অংশ চালু হবে। কিন্তু আমি ডেট দেয়ার পক্ষে না। আগামী বছর এ সরকারের মেয়াদেই মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলে আসবে। মানুষ মতিঝিল পর্যন্ত আসবে উত্তরা থার্ড ফেস থেকে ৩৮ মিনিটে। আমাদের ঢাকা শহরের যে অবস্থা, ৩ ঘণ্টা ৮ মিনিট লাগে। ওদিকে মেট্রোরেলে চড়তে মানুষের দীর্ঘ লাইনের খবর বেরিয়েছে সংবাদ মাধ্যমে। 

 

 

ভোর থেকেই আগারগাঁও স্টেশনে দর্শনার্থী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এতে স্টেশনের নিচে ফুটপাথেও দীর্ঘলাইন তৈরি হয়। যাত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য মেট্রোরেল একটি নতুন মাইলফলক। তাই তারা প্রথম দিনেই এই মেট্রোরেলে চড়ে মাইলফলকের অংশ হতে চান। দুই শিক্ষার্থীর  বক্তব্য- ডিজিটাল বাংলাদেশ একটা প্রকল্প চালু করেছে। এটা বিদেশে দেখেছি। এখন বাংলাদেশে দেখছি। এটা আনন্দের বিষয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজনের কথা- ভালো লাগছে। বাংলাদেশে এমন একটা মেগা প্রজেক্টের বাস্তবায়ন দেখছি। আমরা খুব এক্সাইটেড। ওদিকে বিএনপি মেট্রোরেল উদ্বোধনের দিনই বলেছেন, দেশের প্রথম মেট্রোরেলের ভাড়া ঢাকায় চলাচল করা বাসের চেয়ে দ্বিগুণ ও কলকাতা মেট্রোরেলের তিনগুণ।

  মঙ্গলবার বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান একথা বলেন। ওই দিন তাদের স্থায়ী কমিটির সভায় মেট্রোরেল আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে ভাড়া সর্বনিম্ন ২০ টাকা এবং উত্তরা থেকে মতিঝিল ২০ কিলোমিটারের ভাড়া ১০০ টাকা নির্ধারণের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। নজরুল ইসলাম বলেন,  ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন নগরীর মেট্রোরেলের ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে পাঁচগুণ বেশি। ঢাকা মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন  ভাড়া দিল্লি, মুম্বই,  চেন্নাই ও লাহোরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। কলকাতার চেয়ে তিনগুণ। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ গণতান্ত্রিক সরকার হলে এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না।  নজরুল ইসলাম খান একবারের জন্যও মেট্রোরেল চালু হওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাননি। অথচ দেশের এ মাইলফলকে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি তাদের দাবি তুলে ধরতে পারতেন। মূল কথা-বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা যেন বাংলাদেশের ললাট লিখন হয়ে আছে। বিএনপি যদি ধন্যবাদ জানাতো তাহলে তাদের মনের উদারতাই প্রকাশ পেতো। যা তারা পারেনি। 

বিএনপি’র এ বক্তব্য শুনে আমার একটি গল্প মনে পড়েছে।  এক রাজা তার রাজ্যে ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি তাকে তিনটি নতুন কথা শোনাতে পারবে তাকে অর্ধেক রাজত্ব দান করবেন। এ ঘোষণায় রাজ্যজুড়ে তোলপাড়। প্রজারা অর্ধেক রাজত্বের আশায় নতুন কথা নিয়ে হাজির হচ্ছেন রাজ দরবারে। রাজাও তার নবরত্নকে নিয়ে গঠন করেছেন বোর্ড। এ বোর্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রজারা। কিন্তু কোনো প্রজাই নতুন কথা শোনাতে পারছে না। রাজাসহ নবরত্ন সদস্যরা হতাশ। শেষ মুহূর্তে রাজ দরবারে প্রবেশ করলেন এক প্রজা। বললেন, আমি শোনাবো নতুন কথা। সবাই এক বাক্যে বললেন কী তোমার নতুন কথা শুনি। আমি সপ্তাহে একটি করে নতুন কথা শোনাবো আপনাদের। রাজা ও নবরত্ন রাজি। প্রজা বলতে শুরু করলেন- আমার গ্রামে দেখে এসেছি একটি শকুন মারা গেছে। আর এ শকুনকে খাওয়ার জন্য গ্রামের সকল গরু দড়ি ছিঁড়ে দৌড়ে যাচ্ছে মরা শকুনের কাছে। নবরত্নের সদস্যরা কথা শুনে তাজ্জব। একজন বললেন, সারা জীবন শুনে এসেছি গরু মরলে শকুনের পাল গিয়ে মরা গরু খায়। 

আর এখন শুনি মরা শকুন খেতে ছুটছে গরু! হ্যাঁ- এটা নতুন কথা। চলে গেলেন প্রজা। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহ জুড়েই প্রচণ্ড বৃষ্টি। বৃষ্টিতে সকল কাজকর্ম বন্ধ। রাজ্যজুড়ে জলাবদ্ধতা। এ অবস্থায় নির্দিষ্ট দিনে প্রজা হাজির হলেন নবরত্নের সামনে। নবরত্নের এক সদস্য জিজ্ঞেস করলেন, এবার কী নতুন কথা নিয়ে এসেছো? বলো। প্রজা বললেন, সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টিতে  গোটা রাজ্যই এখন অচল। আমার বাবা মৃত্যুর আগে বেশক’টি রোদের গাঁট্টি সিন্দুকে ভরে রেখে গেছেন। বলে গেছেন কখনো এমন হলে সিন্দুক থেকে যেন ২/১ গাঁট্টি খুলে দেই। তাহলে বৃষ্টি চলে যাবে। রোদ হাসবে রাজ্যজুড়ে। নবরত্নের সদস্যরা হতবাক। সত্যিই তো এটি নতুন কথা। এমন কথা তো কখনো শুনিনি। পর পর দুটি নতুন কথা বলা হয়ে গেছে। তৃতীয় নতুন কী কথা নিয়ে হাজির হবেন তা নিয়ে চিন্তিত প্রজা। অনেক  ভেবেচিন্তে উপায় একটা বের করলেন। তৈরি করতে থাকলেন বিরাট আকারের একটি গোলা। বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি গোলা নিয়ে রওয়ানা দিলেন রাজ দরবারে। রাজা তার নবরত্নকে নিয়ে দরবারে উপস্থিত। 

এ সময় হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন প্রজা। বললেন, রাজা মশাই আমার বাবা ছিলেন বিরাট জমিদার। এক সময় আপনার বাবা আমাদের প্রয়াত রাজা খুব অভাবে পড়েছিলেন। রাজ্যজুড়ে অভাব ঘুচাতে তিনি দিশাহারা। এ সময় তিনি দ্বারস্থ হয়েছিলেন আমার বাবার। আর এ সময় আমার বাবা ওই যে গোলা দেখছেন,  সেই গোলা ভর্তি করে টাকা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন আপনার বাবাকে। কিন্তু সে টাকাটা আজও আমাকে দেয়া হয়নি। কথা শুনে নবরত্নসহ রাজা হতবাক। যদি বলে না এটা কখনো শুনিনি, একেবারেই নতুন কথা, তাহলে প্রজার জয় হবে। আর দিতে হবে অর্ধেক রাজত্ব। যদি বলে এটা নতুন নয়, শুনেছি। তাহলে গোলা ভর্তি টাকা দিয়ে বাবার ঋণ পরিশোধ করতে হবে রাজাকে। রাজার অর্ধেক সম্পত্তি বিক্রির টাকা দিয়েও এ গোলা ভরবে না। উভয় সংকটে পড়েছেন রাজা ও তার নবরত্ন।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status