ঢাকা, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, শনিবার, ৩০ চৈত্র ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ৩ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

চলতি পথে

ভয়ের চোখে নয় সমীহের চোখে

শুভ কিবরিয়া
২৭ ডিসেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার
mzamin

একটা দেশের অর্থনীতি গতিশীল হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশের মধ্যদিয়ে। রাষ্ট্র এই উদ্যোক্তা শ্রেণিকে নীতি দিয়ে, অর্থ দিয়ে, আইনি সুরক্ষা দিয়ে বড় করে তোলে। এই উদ্যোক্তা শ্রেণি যত নিয়মানুগ পন্থায় বিকশিত হয়, দেশের অর্থনীতি তত মজবুত ও কল্যাণধর্মী হওয়ার সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্য আমাদের, উল্টোটা ঘটেছে এখানে। রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে নানা ছলাকলায় লুটপাট করে, দখল করে, সেটা আরও ছলাকলা প্রয়োগ করে বিদেশে পাচারের এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এই দেশে। এই ব্যবস্থা মোটেই সুখপ্রদ ও স্বাস্থ্যপ্রদ নয়। নৈতিক তো নয়ই। অথচ আমাদের একটা সবল, সুস্থ, শক্তিমান, সৃজনশীল, নৈতিক উদ্যোক্তা শ্রেণি দরকার

সকাল সাতটা। শীতের সকালে আড়মোড়া ভেঙে শহরটা তখনো জাগেনি। আমরা যাবো পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিজ্ঞাপন
বরিশাল শহরের যে হোটেলে উঠেছি সেটা শহরের কেন্দ্রস্থলেই অবস্থিত। হালকা দুয়েকটা অটোরিকশা আর সবুজ রঙের সিএনজি স্কুটার চলছে। এই শহরের গণপরিবহন সত্যিকার অর্থে এখন বিদ্যুৎচালিত রিকশা আর অটো। মাহেন্দ্র নামের অটোরিকশাও এখানে বেশ পপুলার। 

এই সাতসকালে অবশ্য শহরের ট্রাফিক নিয়ম মানার খুব একটা বাধ্যবাধকতা নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা অটোরিকশা (অটো নামেই বহুল পরিচিত) পেলাম। চালক বয়সে বেশ তরুণ। পোশাক দেখেই বোঝা যায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। আমরা যাবো শহরের কেন্দ্রস্থল বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর সড়ক থেকে শহরের বাইরে রূপাতলী বাস স্ট্যান্ডে। সেখান থেকেই পটুয়াখালীর বাসে গেলে লেবুখালী ব্রিজ পার হয়ে পাগলাবাজার নামার পরেই আমাদের যেতে হবে দুমকীর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমবারের মতো যাচ্ছি বলে, সেখানে সময়মতো পৌঁছানোর একটা টেনশনও কাজ করছে। এদিকে আমার যারা সহযাত্রী তারা বয়সে তরুণ, কিন্তু সবকিছুতেই কিছুটা আয়েশি। সবকিছুতেই সময় লাগে তাদের। সেটাও আমার জন্য বাড়তি টেনশনের বিষয়। আমি চাই সবকিছুতেই সময়মতো হাজিরা দিতে। যেকোনো অনুষ্ঠানে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টাটা আমার বহু পুরনো। তাছাড়া রাস্তাঘাটের যানজট কিংবা অজানা বিপত্তির জন্য কিছুটা সময় হাতে রেখেই আমি বেরুতে চাই। আমার সহজ হিসাব হচ্ছে, যেকোনো অনুষ্ঠানে সময়ের আগে পৌঁছাতে পারলে, অকারণ টেনশনটা আর বহন করতে হয় না।

হোটেলের লবি থেকে বেরিয়ে নিচে অটোরিকশাচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দেন-দরবার করা লাগলো। প্রথমেই সে কিছুটা বেশি ভাড়া চাইলো বলেই আমার মনে হলো। গত কয়েকদিনে এই শহরে চলাচলের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হলো তরুণটি ইচ্ছা করেই বেশি ভাড়া চাইলো। দরদাম করার পরও হাতে কিছুটা সময় রইলো। সহযাত্রীরা তখনো হোটেলের রুম থেকে বেরুতে পারেনি। কথায় কথায় জানা গেল তরুণটি কোরআনে হাফেজ। পুরো তিরিশ পারা কোরআন শরীফ তার মুখস্থ। তারাবির নামাজ পড়ানোর কাজও করেছে। এখন সে মাদ্রাসায় উচ্চ শ্রেণিতে পড়ছে। তরুণটি বিনয়ী এবং কথাবার্তায় খুবই স্বতঃস্ফূর্ত। খুব কৌতূহল হলো। তার ক্যারিয়ার প্ল্যানিং জিজ্ঞাসা করলাম। দেখি মুচকি হাসে। বলে সবাই তো মাওলানা হয়। ভালো মাওলানা হলে অবশ্য আয় খারাপ না। তবে সেটা সিজনাল। আমি অবশ্য অন্য কিছু করবো। কি করবা? এবার তরুণটি কিছুটা সহজ হয়ে বলে আমি ব্যবসা করবো। আপনি যে হোটেলে উঠেছেন তার তিনতলায় একটা ব্যাংক আছে। সেখানে আমি একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছি। প্রতি সপ্তাহে টাকা জমাই। কীভাবে? বলে, এই যে অটো চালাই। আমার কৌতূহল আরও বাড়ে। এবার খুব পরিষ্কার করে জানায়, প্রতিদিন রাত সাড়ে তিনটার দিকে ঘুম ভাঙলে অটো নিয়ে ভাড়ার জন্য বের হই। এই ভোররাতে নাকি আয়ও ভালো হয়। ঢাকা বা অন্য জায়গা থেকে আসা লঞ্চ বা বাসযাত্রীরাই তখন মূল ভরসা। এই দেখেন না, বলেই তার টাকা রাখার জায়গাটি খুলে দেখায়। গুণেই দেখায়, ভোর থেকে এখন অবধি আয় ছয়শ’ টাকার উপরে। অটো যেহেতু তার নিজের না, সেজন্য অটোরিকশার মালিককে দিতে হয় জমা হিসেবে প্রতিদিন পাঁচশত টাকা। এই জমা দেয়ার পর যা থাকে সেটাই তার নিজের অংশ।

সকাল ন’টা পর্যন্ত অটো চালানোর পর মাদ্রাসার ক্লাসে যাবে। ক্লাস ও খাবার শেষ করে আবার বিকালের দিকে বেরুবে। রাতে ঘরে ফিরে যাবার আগ পর্যন্ত তার আয় ভালোই হয়। সেখান থেকে নিজের খরচ বাদ দিয়ে যে আয় হয় সেটা জমিয়ে সাতদিন পর পর ব্যাংকে জমা দেয়। এই টাকা দিয়েই সে ব্যবসা করতে চায়। কেননা, তার মন পড়ে থাকে ব্যবসার দিকে। বললাম, হুজুর মানুষ, এত টাকা দিয়ে কী করবে? হাসতে হাসতে বলে, আমার খুব ইচ্ছা, আমার টাকা হলে তা দিয়ে এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য কিছু একটা করবো। এমন একটা উপায় বের করবো, যাতে তারা টাকাটা ব্যবহার করে কিছু আয় করতে পারে। ওই টাকাটা কাজে লাগিয়ে তাদের কষ্টটা লাঘব করতে পারে।

তরুণটির দিকে তাকিয়ে আমার খুব মায়া লাগে। কী মিষ্টি চেহারা। কী সুন্দর প্রত্যয়। কী নিদারুণ পরিশ্রমী। কী অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে। জানতে চাইলাম দিনে-রাতে তো বেশি সময় ঘুমাবার সময় পাও না। ভালোভাবে খাওয়া-দাওয়া করো তো? জানালো প্রতিদিন চেষ্টা করি, দুধ-ডিম খেতে। কখনো কখনো খেজুর। বুঝলাম নিজের পুষ্টি নিয়েও একটা সচেতনতা আছে। পরিবারে কেও ব্যবসা করে কিনা জানতে চাইলে বললো, দুই-তিন জেনারেশনে তো কাউকে দেখি না। তাহলে তোমার মাথায় ব্যবসার চিন্তা এলো কেমনে? হাসতে হাসতে বললো, সেটা তো বলতে পারবো না। তবে, ব্যবসা আমি করবোই ইনশাআল্লাহ।

ততক্ষণে আমার সহযাত্রীরা এসে তাড়া লাগালো। গল্প শেষ করে দ্রুত রওয়ানা দিলাম। হাসান মাহমুদ নামের তরুণটি যথাসময়ে রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডে একেবারে পটুয়াখালীর বাসেই আমাদের উঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করলো। যাবার সময় বললো, আমার জন্য দোয়া করবেন।

পটুয়াখালীর এই তরুণের কথা মনে পড়লো বাংলাদেশের আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ আলম সারওয়ারের একটা ফেসবুকে পোস্ট পড়ার পর। উনি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এম. এ. হাসেম (১৯৪৩-২০২০) স্মরণে ২৪শে ডিসেম্বর ২০২২ তার প্রয়াণ দিবসে একটা পোস্ট দিয়েছেন। তাকে ট্রিবিউট করে ইংরেজিতে লিখেছেন, ‘Departure of an ICON. Mr Hashem is an ICON of maû aspects for which we take pride in as a nation. An ICON of Creativity, an ICON of entrepreneurship, an ICON of Courage, an ICON of Simplicity, an ICON who builds family and ICON who doesnÕt forget routes. Bangladesh was built on the ashes of ruins. There are few pioneers in this country who treaded on unknown but dreadful paths and put everything they had on the line to vanquish all adversity. And came out they victorious. It was not an easy journey. But he played his role as a pioneer to build the economic sector and left a legacy. ¸ salute to Mr Hashem. A person like Mr Hashem does come to a nation not every day. A Dream-Merchant who materialiæed the dream and taught others to dream on. In a society where success normally incur jealousy and obstacle- a person like Mr Hashem will remain unsung or under-celebrated. May Allah subhanahu Wa Taala admit him to Jannatul Ferdous. Ameen.’ এম.এ. হাসেমকে এদেশের একজন আইকন উদ্যোক্তা বলেছেন শাহ আলম সারওয়ার। স্বাধীন দেশে ছাইভস্ম  থেকে শূন্য হাতে বেড়ে ওঠা এই উদ্যোক্তাকে কী অসম্ভব কষ্ট করে বড় হতে হয়েছে, কী অসাধারণ সৃজনী ক্ষমতা দিয়ে প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, সে কথা স্মরণ করে তিনি প্রয়াত এম.এ. হাসেমকে ‘ ড্রিম-মার্চেন্ট’ বলেছেন। এই ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে বিশিষ্ট এনজিও ব্যক্তিত্ব খায়রুল ইসলাম লিখেছেন অরও কিছু প্রয়োজনীয় কথা। তিনি লিখেছেন, ‘ইনাদের প্রজন্মের কয়েকজন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও ব্যক্তিখাতে ব্যবসা ও কর্মসৃজনে যে অবদান রেখেছেন তা মনে রাখা দরকার। চেম্বারগুলোর উচিত ইনাদের অবদানের ইতিহাস সংরক্ষণ করা। শুধু স্মৃতিচারণ নয়, তথ্য উপাত্তনির্ভর অবদানের দলিল।’

লেখাটি শুরু করেছিলাম বরিশালের মাদ্রাসা পড়ুয়া অটোচালক এক তরুণের ব্যবসায়ী হওয়ার ইচ্ছা ও চেষ্টার কথা দিয়ে। লেখাটিতে ঘটনাপ্রবাহে এসে যায় দেশের সেরা উদ্যোক্তাদের একজন প্রয়াত ব্যবসায়ী এম. এ. হাসেমের কথা। একটা দেশের অর্থনীতি গতিশীল হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশের মধ্যদিয়ে। রাষ্ট্র এই উদ্যোক্তা শ্রেণিকে নীতি দিয়ে, অর্থ দিয়ে, আইনি সুরক্ষা দিয়ে বড় করে তোলে। এই উদ্যোক্তা শ্রেণি যত নিয়মানুগ পন্থায় বিকশিত হয়, দেশের অর্থনীতি তত মজবুত ও কল্যাণধর্মী হওয়ার সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্য আমাদের, উল্টোটা ঘটেছে এখানে। রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে নানা ছলাকলায় লুটপাট করে, দখল করে, সেটা আরও ছলাকলা প্রয়োগ করে বিদেশে পাচারের এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এই দেশে। এই ব্যবস্থা মোটেই সুখপ্রদ ও স্বাস্থ্যপ্রদ নয়। নৈতিক তো নয়ই। অথচ আমাদের একটা সবল, সুস্থ, শক্তিমান, সৃজনশীল, নৈতিক উদ্যোক্তা শ্রেণি দরকার। যারা শুধু দেশের অর্থনীতিতেই অবদান রাখবে না তারা বরং আগামী প্রজন্মের চোখে আইকনও হয়ে উঠবে। ভালো উদ্যোক্তার মডেল হয়ে উঠবে। সবাই তাদের দিকে তাকাবে সমীহের চোখে, সম্মানের চোখে। ভয়ের চোখে তো নয়ই, ঘৃণার চোখেও নয়।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, [email protected]
 

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status