ঢাকা, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, শনিবার, ৩০ চৈত্র ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ৩ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

বেহুদা প্যাঁচাল

বিএনপি’র সমাবেশ তাহলে হচ্ছে!

শামীমুল হক
৯ ডিসেম্বর ২০২২, শুক্রবার
mzamin

আজ বাদে কাল কি হবে? বিএনপি’র দাবি অনুযায়ী যে, নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না- এ ঘোষণা ইতিমধ্যে এসেছে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। আবার অনুমতি দেয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি সমাবেশ করবে না- এটা নিশ্চিত। তাহলে কী হবে? ১০ই ডিসেম্বর বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ কি তাহলে হচ্ছে না? এটাও তো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ বৃহস্পতিবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়েই বলেছেন সমাবেশ হবে। আর সেটা নয়াপল্টনেই হবে। ওদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রাস্তায় কোনো সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। অথচ এ সমাবেশ ঘিরেই গত ক’দিন ধরে বিএনপি’র নয়াপল্টনের অফিসের সামনে একদিকে পুলিশের কড়া পাহারা অন্যদিকে নেতাকর্মীদের ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসে হাজির হচ্ছিল দলীয় কার্যালয়ের সামনে। কেউ কেউ রাতযাপনও শুরু করেছিল। আবার কেউ রান্নাবান্নারও প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন
এ অবস্থায় ঘটে বিপত্তি। বুধবার পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে হয় সংঘর্ষ। গুলিতে নিহত হয় একজন। আহত হয় শতাধিক। গ্রেপ্তার করা হয় দলীয় প্রথম সারির নেতাসহ বহু কর্মীকে। বিএনপি অফিসে চলে পুলিশের অভিযান। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিএনপি অফিস থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়। 

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিএনপি অফিস থেকে তাদের লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। এতে তাদের ৩০ থেকে ৩৫ জন সদস্য মারাত্মক আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম পুলিশের এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পুলিশ নিজেই বোমা রেখে তা উদ্ধার নাটক সাজিয়েছে। মির্জা ফখরুল দলীয় অফিসে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের খেলায় এখন কোন খেলা সামনে এসেছে। এখন বিএনপি বনাম পুলিশের খেলা চলছে। এ খেলা কাল কোন রূপে সামনে আসে তা আল্লাহ মালুম। শেষ খবর হলো-রাজধানীর প্রবেশ পথগুলোতে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। রাজধানীতে প্রবেশে কড়াকড়ি চলছে। ১০ই ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতির মাঠ এখন উত্তপ্ত। বিএনপি অফিসের এ ঘটনায় বিরোধী অন্য দলগুলোও নড়েচড়ে বসেছে। তারাও প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

  লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশে এখন একাত্তরের মার্চ মাসের মতো অবস্থা বিরাজ করছে। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করুন। নয়তো সামাজিক পরিস্থিতি কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি হামলা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এক বিবৃতিতে ড. অলি আহমদ এ কথা বলেন। বিবৃতিতে ড. অলি বলেন, বিএনপি’র নেতাকর্মীরা দেশের সংবিধান অনুসারে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যাংক ডাকাতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়,  গণতন্ত্রের বিপর্যয় সর্বোপরি সামাজিক বিপর্যয় রোধ করার জন্য নিশিরাতের অবৈধ সরকারকে কিছু পরামর্শ দেয়ার জন্য একত্রিত হয়েছিল। তাদের উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কিন্তু হঠাৎ অযাচিতভাবে বিনা প্ররোচনায় পুলিশ এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগের গুণ্ডারা প্রকাশ্যে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে। অলি আহমদ বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে তাদের গুণ্ডা বাহিনী শত শত গাড়িতে আগুন লাগিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। তখন সুকৌশলে পুলিশের সাহায্যে সমস্ত দোষ বিএনপি’র ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়।

 এলডিপি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইতিমধ্যে হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা রুজু ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যায় ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়া বন্ধ করুন। রাজনীতির নামে আজকের এই খেলা খেলা ভাব কয়েকদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে। বিএনপি’র উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা সারা দেশে যে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছেন, পুরো বাংলাদেশে তা হয়তো বিশাল অগ্নিকাণ্ডে রূপ নিতে পারে। সরকারের উদ্দেশ্যে অলি আরও বলেন, ‘যদি সৎ সাহস থাকে পেটোয়া বাহিনী এবং পুলিশকে বাদ দিয়ে রাস্তায় নামেন। বিরোধী দলগুলোর শক্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হন। বিএনপি’র যে সব নেতাকর্মীকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে- তাদেরকে অবিলম্বে মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের পরামর্শ দিচ্ছি। সরকারকে বলবো, আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করুন। গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসুন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন।  এরপর নিরাপদে সরে পড়ুন।  

এদিকে ১০ই ডিসেম্বর বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ সফল করতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। বৃহস্পতিবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে মিছিল শুরু হয়ে শিক্ষা ভবন, কদম ফোয়ারা, জাতীয় ঈদগাহ মাঠ হয়ে বার কাউন্সিল গেটে এসে শেষ হয়। মিছিলে কয়েকশ’ আইনজীবী অংশ নেন।  মিছিল শেষে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিএনপি’র সমাবেশ নয়াপল্টনে হবে জানিয়ে বলেন, ১০ই ডিসেম্বরের সমাবেশ সফল করতে প্রচারণার অংশ হিসেবে আমাদের এই মিছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। সেখানে কোনো সমাবেশ হবে না। যেকোনো মূল্যে আমরা সমাবেশ সফল করবো। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে পথসভা বের করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। পথসভাটি ঢাকা জজ কোর্ট, সিএমএম আদালত প্রদক্ষিণ করে আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে আইনজীবী মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার বলেন, আপনারা জানেন সমগ্র বাংলাদেশের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে সেই আন্দোলনের সফল সমাপ্তির জন্য ১০ই ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকায় সমাবেশ করবে। 

 

 

বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে অংশ নেয়ায় সরকার ভীত। তাই অতীতের ন্যায় সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে সরকার মরিয়া হয়ে গেছে। অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। মামলায় হাজিরা দিতে আসার সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে অথবা পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে। আমরা এ অন্যায়কে মেনে নিতে পারি না।  আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি লাশ ফেলার দুরভিসন্ধি কার্যকর করেছে। বিএনপি দেশে আবারো আগুন সন্ত্রাস শুরু করেছে। ১০ই ডিসেম্বরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে তারা জঙ্গিদের মাঠে নামিয়েছে। লাশ ফেলার দুরভিসন্ধি বুধবার কার্যকর করেছে তারা। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা করেছে। পুলিশ রাস্তায় পড়ে ছিল, সেই ছবি মিডিয়া দেখায়নি। তারা বিআরটিসি বাস পুড়িয়েছে, সেই ছবি মিডিয়া দেখাবে না। এই দুর্ব্যবহার কেন করা হচ্ছে? গণমাধ্যমে প্রচার বিষয়ে তিনি বলেন, মিডিয়ার একটি অংশ কেন একটি পক্ষ নিচ্ছে? এটা আমার অভিযোগ। কক্সবাজারে এত বড় সমাবেশ, মিডিয়া ঠিকভাবে দেখায়নি। মিডিয়ার কাছে আমরা প্রত্যাশা করি তারা যা দেখবে, তা-ই দেখাবে। আমরা সত্যকে তুলে ধরার আহ্বান জানাই। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ আমরা করতে দেবো না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব বিভাগ, জেলা, উপজেলা, থানা, ওয়ার্ডে সতর্ক অবস্থায় থাকবে। আক্রমণ আমরা করবো না, তবে আক্রান্ত হলে সমুচিত জবাব দেয়া হবে। ষড়যন্ত্রের চোরাগলি দিয়ে বিএনপি সরকার হটানোর চেষ্টা করছে। সামপ্রদায়িক শক্তির হাতে আমরা দেশকে তুলে দিতে পারি না, এটা আমাদের শপথ। এই যখন অবস্থা তখন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১০ই ডিসেম্বর বিএনপি’র পূর্বঘোষিত সমাবেশ নয়াপল্টনেই হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।  অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে সরকার দায়ী থাকবে বলেও মন্তব্য করেন ফখরুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার বিকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। বিএনপি কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের বর্ণনা দেন ফখরুল ইসলাম।  বলেন, পুলিশ সমবেত নেতাকর্মীদের ওপর হঠাৎ করেই বিনা উস্কানিতে ক্রাকডাউন শুরু করে। তারা বর্বরোচিতভাবে নির্বিচারে মুহুর্মুহু গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ককটেল, লাঠিচার্জ করতে থাকে। এই কাপুরুষোচিত ও লোমহর্ষক ঘটনা স্বাধীন দেশে কল্পনাতীত। 

পুলিশের গুলিতে পল্লবী থানার স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মকবুল হোসেন নিহত হন এবং অসংখ্য নেতাকর্মী ও পথচারী গুলিবিদ্ধ হন। আমি খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হই এবং আপনারা দেখেছেন আমাকেও আমার অফিসে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এর মধ্যে পুলিশ সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অযাচিতভাবে প্রবেশ করে সিমেন্টের ব্যাগে করে হাত বোমা নিয়ে যায় এবং সেখানে রেখে আসে, যা বিভিন্ন মিডিয়ায় সরাসরি সমপ্রচারিত হয়েছে। এরপর দলীয় কার্যালয়ে তারা ন্যক্কারজনকভাবে অভিযান চালিয়ে নিচ তলা থেকে ৬ তলা পর্যন্ত বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে। আসবাবপত্র, ফাইল, গুরুত্বপূর্ণ নথি, তছনছ করে। তারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, হার্ডডিক্স এমনি কি দলীয় সদস্যদের প্রদেয় মাসিক চাঁদার টাকা, ব্যাংকের চেক বই, নির্বাচন কমিশন সংক্রান্তসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে যায়।

 পুলিশ বিএনপি’র কার্যালয়ে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে। এর পর পুলিশ নিজেদের রেখে আসা বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের নামে নাটক সাজায় ও মিথ্যাচার করে। আমার সামনেই পুলিশ সেখানে অসংখ্য বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সমগ্র ঢাকা শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ওয়ারী থানার যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল মাহবুব মিজুকে বাসায় না পেয়ে তার বৃদ্ধ পিতা মিল্লাত হোসেনকে বেদমভাবে প্রহার করে। ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ১০ই ডিসেম্বর কাল। সমাবেশ হবে? নাকি হবে না? এমন নানা প্রশ্ন জনমনে। বিএনপি’র সমাবেশ করার ঘোষণা আর আওয়ামী লীগের প্রতিহতের ঘোষণা পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে- এটাই এখন দেখার বিষয়।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status