ঢাকা, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, শুক্রবার, ২০ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১১ রজব ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

আমরা কি বর্বর অমানবিক যুগে বাস করছি?

কাজল ঘোষ
৬ ডিসেম্বর ২০২২, মঙ্গলবারmzamin

২০২১ সালে সারা  দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। ফি বছর প্রকাশিত এই হিসাব মিলালে দেখা যাবে মৃত্যু কমছে না, বাড়ছেই। কথা হচ্ছে দায়িত্বশীল পদে যারাই আছেন তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ কাম্য। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্না। সেখানে মৃত্যু বাড়ছে না বরং কমছে এমন কথার চেয়ে জরুরি হচ্ছে দুর্ঘটনায় যেন আর একজন মানুষেরও মৃত্যু না হয় সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া

একটি ফুটেজ ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। একটি গাড়ির নিচে একজন নারী। আর সেই গাড়িটি হায়েনার মতো ছুটছে। কী অমানবিক! নির্মম! মর্মান্তিক! হৃদয়বিদারক! যে ভাষাতেই এই নির্মমতাকে লিখি না কেন মনে হচ্ছে তার পূর্ণ প্রকাশ হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
কতোটা বর্বর হতে পারে মানুষ। একজন মানুষ গাড়ির নিচে পড়ে গেল আর তাকে রক্ষার চেয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করাই বুঝি অনেক বেশি জরুরি! আর এই গাড়িটির চালক একজন তথাকথিত শিক্ষায় (?) শিক্ষিত বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক। তথাকথিত বলছি এই জন্য যে, যিনি একজন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং যে ধরনের জ্ঞান থাকলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তাতে অন্তত মানবিক বোধ সম্পন্ন একজন মানুষ হওয়ার কথা। অথচ তিনি একজন আততায়ীর ভূমিকায়। সেদিন চালকের আসনে ব্যক্তির নাম আজহার জাফর শাহ্। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক। ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে নৈতিক স্থলনের অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।  

 

 

কতটা অমানবিক হলে চাকার নিচে একজন মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেছেন শাহবাগ থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত। তাও প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা। কি অপরাধ ছিল রুবিনা আক্তারের। ২রা ডিসেম্বর তিনি বোনের স্বামীর  মোটরসাইকেলে করে হাজারীবাগ যাচ্ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে আসামাত্র একটি প্রাইভেটকার তাদের  মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিলে ছিটকে ওই গাড়ির সামনে পড়ে যান রুবিনা। আর রাস্তার পাশে তার বোন জামাইও পড়ে যান। কিন্তু গাড়ির সামনে রুবিনা পড়লেও চালক গাড়ি না থামিয়ে চালাতে শুরু করেন। এতে করে রুবিনার ওড়না গাড়ির চাকার সঙ্গে  পেঁচিয়ে আটকা পড়ে যান। এভাবে ওই গাড়িচালক আটকে পড়া রুবিনাকে নিয়েই টিএসসি মোড় হয়ে নীলক্ষেতের দিকে  বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে  যেতে থাকেন। আর তার  পেছনে পেছনে প্রত্যক্ষদর্শীরা ছুটতে থাকেন। পরে নীলক্ষেতের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ  থেকে পলাশী অভিমুখী সড়কের মুখে চালককে আটকে রুবিনাকে উদ্ধার করেন পথচারীরা। আর ওই চালককে দেন গণপিটুনি। পরে পুলিশ এসে চালক ও রুবিনাকে উদ্ধার করে ঢাকা  মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। কিন্তু রুবিনাকে আর বাঁচানো যায়নি। রুবিনার স্বামী মারা  গেছেন এক বছর আগে। একমাত্র সন্তান এখন এতিম। অথচ একটু সাবধানতা, সতর্কতা, সচেতনতা এ রকম একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে পারতো। নিজের রিপোর্টিং ব্যস্ততায় যতবার এই দুর্ঘটনার কথা ভুলতে চাই ততই আরও বেশি করে মনে পড়ছে। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি চলছে। পাঠকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কয়েকজন পাঠকের প্রতিক্রিয়া এখানে প্রকাশ না করে পারছি না।  

 

 

মোহাম্মদ সোহেল হাসান লিখেছেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নেই বলেই জনগণ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে বাধ্য হয়। চালকও  বেশ ভালোভাবেই জানতো  যে, কোনোভাবে গন্তব্যে   পৌঁছাতে পারলেই আমি মুক্ত। জনগণ নগদ নগদ  যে বিচার করেছে সেটাই চূড়ান্ত বিচার মনে করছি।
আশরাফ চৌধুরী লিখেছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা একটা ট্রাফিক পুলিশ নাই  সেখানে? কী অদ্ভুত দেশ!  কোথায় মানবতা, কোথায় দয়া-মায়া, দায়িত্বপূর্র্ণ গাড়ি চাল না? এটার জন্য গাড়ির চালক, মালিক, প্রশাসন, সমাজ সকলে দায়ী। এটা ইচ্ছাকৃত ধাক্কা দিয়ে ফেলে  দেয়ার দায় থেকে বাঁচার জন্য পলায়নের চেষ্টা। এগুলোর বিচারের দীর্ঘসূত্রতা না করে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ সাজা দিতে হবে।
আরও অনেক প্রতিক্রিয়া এসেছে পাঠকমহল থেকে। যার বেশির ভাগই প্রকাশ সহনীয় নয়। সবাই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ। 

 

বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকের শিক্ষার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন। কথা হচ্ছে দুর্ঘটনা হলেই আমরা নড়েচড়ে বসি। টুকটাক প্রতিবাদ করি, মানববন্ধনে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে দাঁড়াই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদতো হয়েছে ছাত্রদের পক্ষ থেকে। তখন দাবি উঠেছে এই রাষ্ট্র মেরামতের। সরকার ভয় পেয়ে তখন অনেক কিছুই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সড়ক নিরাপত্তার আইন পাস করেছে। কিন্তু সবকিছু আটকে গেছে সেখানেই। সড়কে মৃত্যুর মহামারি কিন্তু বন্ধ নেই। চালকদের অরাজকতাও বন্ধ নেই। এ যেন শোনাউল্লা শুনে যা, বকাউল্লা বকে যা অবস্থা।  
এই লেখাটি যখন লিখছি ঠিক সে সময়ই একটি অনলাইন সংবাদে দেখছি সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিকদের নেতা শাজাহান খান চালকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে নানান কথা বলেছেন। রাজশাহী জেলা  মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক  ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, ‘একজন লোক আছেন, নিরাপদ সড়ক চান। ভালো, আমরাও তো চাই। তিনি একবার বললেন, বিএ পাস শ্রমিক লাগবে। বিএ পাস ছাড়া ড্রাইভার হতে পারবেন না। আবার কী বললেন? যদি  কেউ অ্যাকসিডেন্ট করেন, তাহলে প্রকাশ্যে পাঁচটা  বেত্রাঘাত করতে হবে। এটা কি বর্বর যুগে আছি নাকি আমরা?’

ইলিয়াস কাঞ্চনকে উদ্দেশ্য করে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শাজাহান খান আরও বলেন, ‘তার দাবি, ১৪ বছরের নিচে কোনো সাজা  দেয়া যাবে না। তিনি এই বঙ্গে আছেন কি না, আমি জানি না। বাংলাদেশের মানুষের মন-মানসিকতা, বাংলাদেশের আবহাওয়া, আমাদের অর্থনীতির অবস্থা, সামাজিক অবস্থা মনে হয় তিনি জানেন না। এই জন্য এই সমস্ত কথাবার্তা বলেন।’
সড়ক দুর্ঘটনা আগের চেয়ে কমেছে বলে দাবি করেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শাজাহান খান। তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেন, দুর্ঘটনা বেড়েছে। আমি বলি, দুর্ঘটনা বাড়েনি, কমেছে। ওনারা বাড়ার হিসাব দেন। কিন্তু ১০ বছর আগে যে গাড়ির সংখ্যা ছিল, আজকে কি সেটা আছে? তাহলে বিষয়টা কী? এখন যত রাস্তা, আগে কি ছিল? তাহলে ওই হিসাব যদি ধরেন, জনসংখ্যা  বেড়েছে, গাড়ি বেড়েছে, রাস্তা বেড়েছে। গাড়ি-জনসংখ্যা মিলে যদি ধরেন, হিসাব করলে দেখবেন, দুর্ঘটনা আগের চেয়ে কমেছে।’

সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে পুলিশের তদন্ত নিয়ে কথা বলেন শাজাহান খান। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা কথা বারবার বলি, বড় বড় স্পর্শকাতর কিছু অ্যাকসিডেন্ট আছে, সেই অ্যাকসিডেন্টগুলো আসলে শুধু পুলিশ দিয়ে তদন্ত করলে হবে না। পুলিশের তদন্তে সমস্ত দায়দায়িত্ব ড্রাইভারদের ওপর বর্তায়। কী বলে? বেপরোয়া গাড়ি চালাইছে, সেই কারণে। আরেকটা হলো হয় ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেয়, আর তা না হলে ড্রাইভারের ওপর চাপাইয়া দেয়। তাই শুধু পুলিশ দিয়ে এ সমস্ত দুর্ঘটনার তদন্ত হবে না।’

পুরো বক্তৃতাটি পড়লে সহজেই অনুমেয় শাজাহান খান ইলিয়াস কাঞ্চনকে খোঁচা দিয়ে কথা বললেও তিনি আসলে কাদের পক্ষে কথা বলেছেন। দুঃখজনক হচ্ছে হাজারে হাজারে মানুষ মরছে চালকদের কারণে আর তিনি বলছেন দুর্ঘটনা বাড়েনি, কমেছে। এই মানুষটিই সরকারের তরফে চালকদের বড় বন্ধু। রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তখন আসলে সাধারণের কিছুই করার থাকে না। বিএনপি জমানায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেনের একটি বক্তব্য তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। সে সময় রামপুরায় সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু নিহতের পর পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ্র মাল আল্লায় নিয়ে গেছে। 
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২১ সালে সারা  দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। ফি বছর প্রকাশিত এই হিসাব মিলালে দেখা যাবে মৃত্যু কমছে না, বাড়ছেই। কথা হচ্ছে দায়িত্বশীল পদে যারাই আছেন তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ কাম্য। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্না। সেখানে মৃত্যু বাড়ছে না বরং কমছে এমন কথার চেয়ে জরুরি হচ্ছে দুর্ঘটনায় যেন আর একজন মানুষেরও মৃত্যু না হয় সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status