ঢাকা, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, শনিবার, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

হেমন্তের অরণ্যে এক পোস্টম্যান

ড. মাহফুজ পারভেজ

(১ মাস আগে) ৮ নভেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ৫:২৬ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

mzamin

বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স ৯০ স্পর্শ করতো আর তিনি ঠিকই মাঝরাতে কবিতা আর নেশার ঘোরে নগর কলকাতা শাসন করে ঢুলুঢুলু পায়ে নিজের পাড়ায় এসে বলতেন: "অবনী বাড়ি আছো/দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া/কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া/অবনী বাড়ি আছো?" তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার বোহেমিয়ান রাজপুত্র শক্তি চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: নভেম্বর ২৫, ১৯৩৩ - মৃত্যু: মার্চ ২৩, ১৯৯৫)।

শক্তি নেতৃস্থানীয় আধুনিক ভারতীয়-বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, লেখক ও অনুবাদক, যিনি জীবনানন্দ-উত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান কবি হিসেবে বিবেচিত। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত এবং আলোচিত ছিলেন। ষাটের দশকে যে চারজন কবিকে হাংরি আন্দোলনের জনক মনে করা হয় তাদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্যতম।

কবি হিসেবে তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে নিত্য প্রাসঙ্গিক, আজও অনিবার্য। তাঁর কবিতার মধ্যে দিয়ে পাঠক খুঁজে পায় 'নিঃসঙ্গ নিজেকে'। তিনি সারা জীবন কবিতার নিরীক্ষায় কিছু একটা খুঁজতেন। উড়নচণ্ডীর মতো ছুটেছেন কবিতার পথে। কবিতার অন্বেষা তাঁকে ব্যক্তিগত জীবনে ও যাপনে স্থিতধী হতে দেয়নি, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে, কিন্তু তিনি নিজের মতো জীবনটাকে ধরতে চেয়েছেন। এখানেই শক্তি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাতন্ত্রিক। কাব্য-সমালোচকরা মনে করেন, জীবনভর চলিষ্ণু থেকে 'মানুষ শক্তি' ধরতে চাইছেন 'কবি শক্তিকে'। কোনও কোনও বোদ্ধার কাছে আবার উল্টোটাও সত্যি।

বিজ্ঞাপন
অনেকটা তাঁর ‘জ্বলন্ত রুমাল’ কবিতার মতো। 'কবি শক্তি' পেতে চাইছেন 'ব্যক্তি শক্তি'কে। দুজনের কেউই কারও নাগাল পাচ্ছে না, কিন্তু হালও ছাড়ছে না কেউ। 'হেমন্তের অরণ্যে এক পোস্টম্যান' হয়ে নিরন্তর ছুটে চলেছেন।

শক্তির সাথে কিছুটা মিল আছে আরেক বিশিষ্ট কবি বিনয় মজুমদারের। বা‌ংলা কবিতায় বিনয় মজুমদারই একমাত্র কবি, যাঁর কোনও লেখা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার আগেই বই হয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। বইয়ের নাম ‘নক্ষত্রের আলোয়’। ‘গ্রন্থজগৎ’ প্রকাশনার দেবকুমার বসু বিনয়ের পাণ্ডুলিপি পড়ে নিজ উদ্যোগে বইটি প্রকাশ করেন। বিনয়ের প্রথম দিককার বেশির ভাগ বইয়েরই প্রকাশক ইনি, ‘ফিরে এসো চাকা’-সহ। গ্রন্থজগৎ প্রকাশনা থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়েরও প্রথম বই 'হে প্রেম, হে নৈশব্দ' প্রকাশ পায়, যার শিরোনামই আধুনিক বাংলা কবিতার ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট।

অদ্ভুতভাবে বিনয়ের পুরনো বইয়ের সংগ্রহের মধ্যে প্রায়-অনাদরে কিন্তু সযত্নে কাপড়ে মোড়া ডায়েরির মতো একটা কিছু রাখা ছিল, যা কোনও কারণে আগে খুলে দেখা হয়নি। বহু পরে মোড়ক খুলে দেখা গেল, সেখানে আছে বিনয়ের ব্যক্তিগত ডায়েরি, যেখানে পাতার পর পাতা নানান গণিত বিশ্লেষণ— যার বেশির ভাগটাই উদ্দেশ্যহীন— তারই মাঝে মাঝে তারিখ দিয়ে কবিতার খসড়া করা। কোন কবিতা কোন পত্রিকায় পাঠিয়েছেন, সেটাও লেখা। আছে এমন কিছু কবিতা যা আগে প্রকাশ পায় নি। আর আছে বিভিন্ন জনের চিঠি। যার মধ্যে বিনয়ের বাবাও রয়েছেন, এবং রয়েছেন বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও, কোনও এক কবিতায় যিনি লিখেছিলেন, "তোমার কাছে এখনও পড়ে আছে, আমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি"। সত্যিই, আধুনিক কাব্যজগতের ঐশ্বর্যময় তোরঙ্গ আর সে ভাবে খোলা যায় না। চাবিটাই সম্ভবত হারিয়ে গিয়েছে শক্তির সঙ্গে।

১৯৩৪ সালের ২৫ নভেম্বর শক্তি চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা অঞ্চলের জয়নগর-মজিলপুরের দরিদ্র হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বামানাথ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার কাশিমবাজার স্কুলে পড়তেন তিনি। দারিদ্রের কারণে স্নাতক পাঠ অর্ধসমাপ্ত রেখে প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাড়েন এবং অসম সাহসে সাহিত্যকে জীবিকা করার উদ্দেশ্যে উপন্যাস লেখা আরম্ভ করেন।

যদিও কলেজ জীবনে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তথাপি কবিতা নয়, 'কুয়োতলা' নামে জীবনের প্রথমে একটি উপন্যাস রচনা করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। পরে কলেজকালীন বন্ধু সমীর রায় চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বনাঞ্চল-কুটির চাইবাসায় আড়াই বছর থাকার সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন সফল লিরিকাল কবিতে পরিণত হন। তারপর থেকে একই দিনে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখে ফেলার অভ্যাস গড়ে ফেলেন তিনি। শক্তি নিজের কবিতাকে বলতেন পদ্য। ভারবি প্রকাশনায় কাজ করার সূত্রে তার শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজ বের হয়।

পঞ্চাশের দশকে কবিদের মুখপত্র কৃত্তিবাস-এর অন্যতম কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'হে প্রেম, হে নৈশব্দ' ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। পেশাগত জীবনে তিনি ১৯৭০- ১৯৯৪ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করেছেন।

১৯৬১ সালের নভেম্বরে ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে যে চারজন কবিকে হাংরি আন্দোলনের জনক মনে করা হয় তাঁদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্যতম। সাহিত্যিক মতান্তরের জন্য ১৯৬৩ সালে তিনি হাংরি গোষ্ঠী ত্যাগ করে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে যোগ দেন। তিনি প্রায় ৫০টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করে ছিলেন।

পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম সাহিত্যিক মহলে একত্রে উচ্চারিত হতো এবং সুনীল-শক্তি বন্ধুত্ব ও কাব্য সাধনা আজীবন অটুট থাকে। তাঁরা দুইজন পরিণত হন কবিতার অনবদ্য জুটিতে।

আনন্দ ও ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কারে সন্মানিত  শক্তি চট্টোপাধ্যায় গদ্য ও কথাসাহিত্যে কিংবা সাংবাদিকতায় হাত লাগানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত কবিতাই ছিল তাঁর পরম আরাধ্য। জীবনভর অসংখ্য কবিতা রচনা করেন তিনি। প্রকাশ করেন বহু কাব্যগ্রন্থ: হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য (১৯৬১), ধর্মে আছো জিরাফেও আছো (১৯৬৭), সোণার মাছি খুন করেছি (১৯৬৮), অন্ধকার নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকার (১৯৬৮), হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান (১৯৬৯), চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৯৭০), পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি (১৯৭১), প্রভু নষ্ট হয়ে যাই (১৯৭২), সুখে আছি (১৯৭৪), ঈশ্বর থাকেন জলে (১৯৭৫), অস্ত্রের গৌরবহীন একা (১৯৭৫), জ্বলন্ত রুমাল (১৯৭৫), ছিন্নবিচ্ছিন্ন (১৯৭৫), সুন্দর এখানে একা নয় (১৯৭৬), কবিতায় তুলো ওড়ে (১৯৭৬), ভাত নেই পাথর রয়েছে (১৯৭৯), আঙ্গুরী তোর হিরণ্য জল (১৯৮০), প্রচ্ছন্ন স্বদেশ (১৯৮১), যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো (১৯৮৩), কক্সবাজারে সন্ধ্যা (১৯৮৫), ও চির-প্রণম্য অগ্নি (১৯৮৫), মিষ্টি কথায়, বিষ্টিতে নয় (১৯৮৫), সন্ধ্যার সে শান্ত উপহার (১৯৮৬), এই তো মর্মর মুর্তি (১৯৮৭), বিষের মধ্যে সমস্ত শোক (১৯৮৮), আমাকে জাগাও (১৯৮৯), ছবি আঁকে ছিঁড়ে ফ্যালে (১৯৯১), জঙ্গলে বিষাদ আছে (১৯৯৪), বড়োর ছড়া (১৯৯৪), সেরা ছড়া (১৯৯৪), টরে টক্কা (১৯৯৬), কিছু মায়া রয়ে গেল (১৯৯৭), সকলে প্রত্যেকে একা (১৯৯৯), পদ্যসমগ্র-১ম থেকে ৭ম খণ্ড ইত্যাদি।

অমিতাচার, বেখেয়ালি ও বেহিসাবি জীবনের দুঃসহ বেদনা নিয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ, ঠিক যেন তাঁর কবিতার উচ্চারণের মতো:
"আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী/ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি।"

ড. মাহফুজ পারভেজ, অধ্যাপক-বিশ্লেষক।

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: news@emanabzamin.com
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status