ঢাকা, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, বুধবার, ২৫ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৬ রজব ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

কি খেলা হবে ১০ই ডিসেম্বর?

তারিক চয়ন
৮ নভেম্বর ২০২২, মঙ্গলবারmzamin

চলতি বছরের বর্ষাকালে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত লক্ষ্য করা গেছে। খনার বচন আছে ‘উনো বর্ষায় দুনো শীত’। অর্থাৎ, যে বছর বৃষ্টিপাত কম হয়, সে বছর শীতের প্রকোপ বেশি হয়। খনার বচন অনুসারে এবার দেশে বেশ শীত অনুভূত হবে। গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশে আগের অনেক বছরের তুলনায় গড়ে অনেক কম তাপমাত্রা দেখা গেছে। গত বেশ কয়েকদিন ধরেই ঢাকায় কিছুটা শীত অনুভূত হচ্ছে। সবমিলিয়ে বলা চলে, আগামী ১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় বেশ শীত অনুভূত হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসও তাই বলছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একিউ ওয়েদার ওয়েবসাইট বলছে: ১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকতে পারে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকতে পারে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনটি হবে রৌদ্রোজ্জ্বল, বেশ উষ্ণ এবং মনোরম অনুভূতি হবে।

বিজ্ঞাপন
ওইদিন ঢাকায় বৃষ্টি বা তুষারপাতের সম্ভাবনা যেমন নেই, তেমনি বজ্রঝড়েরও কোনো সম্ভাবনা নেই। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকবে না। ১০ই ডিসেম্বরের আগের তিন দিনও ঢাকার আবহাওয়া একই রকম থাকবে। এককথায় বলা যায়, ১০ই ডিসেম্বর এবং তার আগের কিছুদিন ঢাকার আবহাওয়া চলাচলের জন্য একেবারে অনুকূল থাকবে। আর, ঠিক এরকম দিনই তো খেলার জন্য উপযুক্ত সময়।

সচেতন পাঠকের নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, এত তারিখ থাকতে ১০ই ডিসেম্বরের আবহাওয়া নিয়ে কেন এত গবেষণা! শুরুটা করেছিলেন বিএনপি’র ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান। গত

৮ই অক্টোবর পল্লবীর কালশীতে আয়োজিত জনসভায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘১০ই ডিসেম্বরের পর শেখ হাসিনার কথায় আর দেশ চলবে না, দেশ চলবে খালেদা জিয়ার কথায়। আপনারা নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে আল্লাহর নামে শহীদ হওয়ার প্রস্তুতি নিন, প্রয়োজনে শহীদ হবো, এই বাংলাদেশে হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়।’ আমানের কথায় রাজনৈতিক মহলে যেনো  কামানের গোলা ছোড়া হয়। বলা নেই, কওয়া নেই,  হঠাৎ করে ১০ তারিখ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে আমান ঠিক কী বুঝাতে চেয়েছেন তা নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-বিশ্লেষণ। সমালোচনাও চলতে থাকে। সাবেক ডাকসু ভিপি আমান এর আগে বহু জনসমাবেশে নেতাকর্মীদের হাত উঁচিয়ে সরকার পতনের অঙ্গীকার করালেও আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি; সুতরাং আমানের এ ধরনের বক্তব্য স্রেফ কথার কথা, নেতাকর্মীদের হাত তালি পাওয়াই তার উদ্দেশ্য- এ ধরনের কথা বলছিলেন খোদ বিএনপিরই অনেক নেতাকর্মী। অনেকে আবার সেটিকে ‘জলিলের ট্রাম্পকার্ড’ বলেও অভিহিত করেন। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০০৪ সালের মার্চে ওই বছরের ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে (ক্ষমতাসীন) বিএনপি সরকারের পতনের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন (বিরোধী দল) আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায় নি।

যাই হোক, ওই বক্তব্যের ঠিক দু’দিন পর (১০ই অক্টোবর) আমান অবশ্য নিজ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘১০ তারিখ নয়। যত দ্রুত গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।’ ওইদিনই সরকারকে দ্রুত নিরাপদে বিদায় নেয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বভাববিরুদ্ধ আক্রমণাত্মক ভাষায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমান উল্লাহ আমানের এই এক বক্তব্যে আপনারা সবাই ভয় পেয়ে গেছেন। ভয়ের কিছু নেই, আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। দ্রুত সেফ এক্সিট নিন, সংসদ ভেঙে দিন, নির্দলীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন। নয়তো পালাবার পথ পাবেন না। কারণ, মানুষ জেগে উঠেছে। কিছুদিন আগেও নিন্দুকরা বলতেন, বিএনপি নেই, বিএনপি’র কোনো চিহ্নই নেই, রাস্তায় বিএনপি নেই, মুরোদ নাই, হাঁটু ভাঙা। এখন কি বলছে? বাবা তোমরা ধমক দিও না।’

একইদিন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক ফের ১০ই ডিসেম্বর তারিখ উল্লেখ করে চমক দিয়ে বলেন, ‘১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ হবে ‘আটলান্টিক মহাসাগরের’ মতো। ওই সমাবেশে খালেদা জিয়া যাবেন। হয়তো পুলিশ বাসার গেটে বাধা দেবে। ম্যাডাম তো আর পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করবেন না। তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরাও প্রতিবাদ শুরু করবো সেখান থেকেই। মার্চ ফর ডেমোক্রেসির সময়ও তাই হয়েছিল।’ সেইদিনই লক্ষ্মীপুরে এক সমাবেশে দলের প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী আরও বড় চমক দিয়ে বলেন, ‘১০ই ডিসেম্বরের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। ১০ তারিখের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশ চলবে। আর কোনোভাবে ছাড় দেয়া হবে না। খুব শিগগিরই তারেক রহমান দেশে আসবেন।’ খেলা শুরু হয়ে গেছে উল্লেখ করে এ্যানী বলেন, ‘অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী শেখ হাসিনাকে আর ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না। বাধা দিলে প্রতিরোধ, হামলা হলে পাল্টা হামলা করা হবে। বাধা দিলেই যুদ্ধ হবে। খেলা শুরু হয়েছে। খেলা চলবে। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবো না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।’

এ্যানীর বক্তব্যকে বিএনপি বিরোধীরা স্বাভাবিক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ধরে নিলেও ফারুক নিজ বক্তব্যে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র প্রসঙ্গ টেনে আনায় অনেকেই তা নিয়ে হাসাহাসি করতে থাকেন। অবশ্য এর যুক্তিসংগত কারণও রয়েছে। কারণ, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর সারা দেশ থেকে মানুষকে রাজধানী অভিমুখে আসার আহ্বান জানালেও সেদিন ঢাকার রাজপথ ছিল কার্যত ফাঁকা। অনেক নেতাকর্মী ঢাকার বাইরে থেকে এলেও ঢাকার নেতারা ঘরে লুকিয়ে থাকায় ওই কর্মসূচি সফল হয় নি। সরকার খালেদা জিয়াকে তার বাসার সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে রাখলেও একমাত্র তার গৃহপরিচারিকা ফাতেমা ছাড়া কাউকেই পাশে দেখা যায় নি।

কেবল মার্চ ফর ডেমোক্রেসি নিয়ে টিপ্পনী কাটাই নয়, ‘১০ই ডিসেম্বর’কে নিয়ে বিএনপি নেতাদের দেয়া বক্তব্যকেও উড়িয়ে দিয়েছেন সরকারি দলের নেতারা। তারা বলছেন, ওইদিন রাজপথে নামাতো দূরের কথা, ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র মতো তারা সেদিন নিজেদের বাসা থেকেই বের হবেন না। ১৫ই অক্টোবর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘১০ই ডিসেম্বর সরকার চলবে বিএনপি’র কথায়, বিএনপি’র নেতারা এমন বক্তব্য দিয়ে বিজয়ের মাসকে কলঙ্কিত করতে চাইছেন। এ মাসকে টার্গেট করে তারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছেন। বিএনপি’র কোনো কথাই দেশের জনগণ বিশ্বাস করে না। ১০ই ডিসেম্বর রাজপথে নামাতো দূরের কথা, তারা বাসা থেকেই বের হবেন না।’ যদিও হানিফের বক্তব্যের দু’দিন পর (১৭ই অক্টোবর) বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনের কাছে দাবি করেছেন ‘১০ই ডিসেম্বর ঢাকার মহাসমাবেশে ব্যাপক জনসমাগম হবে। সরকারের কোনো বাধা-বিপত্তিই জনস্রোত ঠেকাতে পারবে না।’ তিনি অবশ্য ওইদিন নিয়ে কোনো আল্টিমেটাম না দিয়ে জানিয়েছেন, ১০ই ডিসেম্বর ঢাকার সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি আসতে পারে।

গত ২০শে অক্টোবর নয়াপল্টনে আরেকটি সমাবেশে আমান ফের ১০ই ডিসেম্বর নিয়ে কথা বলেন। তিনি এবার আরও আক্রমণাত্মক ভাষায় সরকারকে আক্রমণ করে বলেন, ‘আগামী ১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি’র চলমান বিভাগীয় কর্মসূচি শেষ হবে। ওই দিন ঢাকা সমাবেশের শহরে পরিণত হবে। যেখানেই বাধা সেখানেই সমাবেশ। ১০ই ডিসেম্বর ঢাকা হবে সমাবেশের শহর। শেখ হাসিনা কতো বাধা দিবেন? হাসিনার দিন শেষ। আর এক মুহূর্তও এই সরকারকে কেউ দেখতে চাই না। আমাদের দাবি এখন একটাই, সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ।’ পুলিশ ও প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে আমান বলেন, ‘আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন কারণ হাসিনা আর নেই। শেখ হাসিনার অধীনে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না এবং হতে দেয়া হবে না।’ ওই সমাবেশের প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বেশ আক্রমণাত্মক ভাষায় সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘অবিলম্বে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। ভালোয় ভালোয় সরে পড়ুন। নইলে দেশের জনগণ জানে কীভাবে সরাতে হয়।’

১০ই ডিসেম্বর নিয়ে বিএনপি শীর্ষ নেতাদের এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়ে শুরুতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা কিছুটা চুপ ছিলেন। কিন্তু, একে একে তারা মুখ খুলতে শুরু করেন। জবাব আসতে শুরু করে সরকারের উচ্চ মহল থেকে। স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মুখ খুলেন। ২৫শে অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেটে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের একটা খায়েশ রয়েছে, তারা নাকি আগামী ১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় এসে আমাদের তাড়িয়ে দেবে। আমরা ঢাকা ছেড়ে দেবো, আর তারা দখল করে বসে পড়বে। আবার সেই নৈরাজ্য, হাজার হাজার মানুষকে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, জঙ্গির উত্থান- এই সমস্ত ঘটনা আবার ঘটবে।’

২৯শে অক্টোবর রংপুরে বিএনপি’র গণসমাবেশ ছিল। ওই সমাবেশে মানুষের যোগ দেয়া ঠেকাতে সরকার ধর্মঘট ডেকেছে দাবি করে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ ফের ১০ই ডিসেম্বরের প্রসঙ্গ টেনে ১০ দিন আগে থেকে ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হবে উল্লেখ করে বলেন, ‘ধর্মঘট দিয়ে মানুষের আসা বন্ধ করতে পারেন নি। সমাগম দেখে আপনাদের মনে কম্পন তৈরি হয়েছে। ১০ তারিখের ১০ দিন আগে ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিবো। বাধা উপেক্ষা করে সমবেত হয়েছেন সবাই। ওবায়দুল কাদের বলছেন, খেলা হবে। ১০ই ডিসেম্বরের পরে খেলা দেখাবেন। মানুষ ১৫ বছর ধরে আপনাদের খেলা দেখছে। সম্পদ লুট করে পাচার করছেন, ভোট চুরি করে ক্ষমতায় আছেন। গণতন্ত্রের মাকে বন্দি করে রেখেছেন। তারেককে মিথ্যা মামলা দিয়ে দেশের বাইরে রেখেছেন। নাটক বন্ধ করেন। কাদের, নাটক বন্ধ করেন। ছোটবেলায় সার্কাস দেখতাম। সেখানে জোকার থাকতো। রং-বেরংয়ের পোশাক পরতো। জোকারি বাদ দেন, ধানাই পানাই বাদ দেন। ১০ তারিখে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আসবো।’

আবারো মুখ খুলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওইদিনই, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সপ্তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘কিছুদিন ধরে শুনছি ১০ই ডিসেম্বর তারা ঢাকা দখল করবে, আমাদের তাড়িয়ে দেবে। আমরা শুনছি, তারা ডিক্লিয়ার করে নাই। আমরা শুনছি, তারা মন্ত্রিপরিষদও গঠন করে ফেলেছে।’

দু’দিন পর (৩১শে অক্টোবর) মুখ খুলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। সেদিন শহীদ মিনারে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) আয়োজিত সমাবেশে অংশ নিয়ে বিএনপিকে কটাক্ষ করে কাদের বলেন, ‘এখন নাকি বিএনপি আন্দোলন করবে। ১০ই ডিসেম্বর সরকার পতন করে ক্ষমতায় যাবেন, এই স্বপ্ন খোয়াবে পরিণত হবে, কর্পূরের মতো উবে যাবে। দুর্নীতির বরপুত্র হাওয়া ভবনের যুবরাজকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিএনপি’র ক্ষমতায় বসার স্বাদ খোয়াবে পরিণত হবে।’ বিএনপিকে জাতীয়তাবাদী চামচা দল আখ্যা দিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দেখার মতো একটা মিছিলও করতে পারেনি।

একইদিন রাজধানীতে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মহাসমাবেশের প্রস্তুতি সভায় সংগঠনের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, ‘জামায়াত-শিবির ছাড়া বিএনপি আন্দোলন করতে পারে না। এখন তাদের নিয়ে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে। তারা নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। এবার সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামলে গণধোলাই খাবে। আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না, আমরা ভেসে আসিনি। বিএনপিকে মোকাবিলায় এবার প্রয়োজন হলে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো আমরা। যেখানে তাদের দেখা যাবে, সেখানেই তাদের মোকাবিলা করবে যুবলীগ। ১০ই ডিসেম্বর শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করতে চান, আমরা রাজপথে থাকবো।’ এর পাশাপাশি পরশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন যা অনেকের কান বা চোখ এড়িয়ে গেছে। যুব মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন- এ তথ্য জানিয়ে পরশ বলেছেন,  ‘নেত্রী কেন এই যুব সমাবেশ করতে বলেছেন, সেটি সময় হলে বুঝতে পারবেন। আমাদের রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে।’ উল্লেখ্য, আগামী ১১ই নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উক্ত যুব মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। 

ইদানীং ওবায়দুল কাদের প্রায়ই তার বক্তব্যে ‘খেলা হবে’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার করছেন। সেদিকে ইঙ্গিত দিয়ে (২রা নভেম্বর) জাতীয় সংসদে হারুনুর রশীদ বলেন, ‘যোগাযোগমন্ত্রী প্রায়ই বলছেন ‘খেলা’ হবে। আগামী ১০ই ডিসেম্বর ‘খেলা’ হবে। আমরা এমন খেলা দেখতে চাচ্ছি না যে মানুষ জনদুর্ভোগে পড়েন। এ দেশে দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ- এগুলো নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে সভা-সমাবেশ করছি। আপনি কেন পরিবহন বন্ধ করছেন?’ কিন্তু, ওবায়দুল কাদের থামেন নি। ১০ই ডিসেম্বর ঘিরে বিএনপি’র স্বপ্নপূরণ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে (৩রা নভেম্বর) বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভার সূচনা বক্তব্যে কাদের বলেছেন, ‘ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের মাস, বিজয়ের মাস। এই মাস আওয়ামী লীগের। আমরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিজয়ী হয়েছি, ইনশাআল্লাহ এই ডিসেম্বরেও আমাদেরই বিজয় হবে। ডিসেম্বরে বিএনপি’র রঙিন খোয়াব কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।’

১০ই ডিসেম্বর ‘খেলা’ হোক বা না হোক, স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন জাগে, ওইদিন নিয়ে কেন এত আলোচনা? কী হতে পারে সেদিন? ‘সারা দেশে আন্দোলনে সফল, কিন্তু রাজধানীতে ব্যর্থ’ বিএনপি কি সেদিন ঢাকার রাজপথ দখলে নিয়ে নেবে? বিএনপি রাজধানী দখলে নিয়ে নেবে আর দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কি ঘরে বসে থাকবে? বিশেষ বিবেচনায় মুক্ত বেগম খালেদা জিয়া কি সত্যিই সেদিন ‘গৃহবন্দি’ অবস্থা থেকে বেরিয়ে জনসম্মুখে আসবেন? বিএনপি’র আরেক শীর্ষ নেতা তারেক রহমান কি তার আগেই দেশে ফিরে আসতে পারেন? নাকি বিএনপি ওইদিনের সমাবেশ থেকে সরকার পতনের কঠোর কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করবে কিংবা এমন কোনো চমক দেবে যার জন্য কেউই প্রস্তুত নয়?

১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের আগে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন বলে কানাঘুষা আছে। আন্দোলনের মাত্রা তীব্র করতে কিংবা সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না সেটি বোঝাতেই তারা পদত্যাগ করবেন এমনটি শোনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই একাধিক সংসদ সদস্য জানিয়েছেন যে, দল চাইলে যেকোনো মুহূর্তে তারা পদত্যাগে প্রস্তুত। ১০ই ডিসেম্বরের আগেই সরকারবিরোধী সব দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করে সেদিন বড় ধরনের ঘোষণা আসতে পারে বলেও ধারণা করছেন কেউ কেউ। যদিও ১০ই ডিসেম্বর নিয়ে বিএনপি’র অনেক নেতা প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখলেও ওইদিন আসলে কী হবে তা নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন তারা।

অনেকেই জানেন, ১০ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। গত বছরের এই তারিখে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে র?্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দপ্তর। ওই নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মী যেমন আন্দোলন-সংগ্রামে উজ্জীবিত হয়েছেন, তেমনি তাদের অনেকেই এ নিয়ে প্রকাশ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই তাই বলছেন, আগামী ১০ই ডিসেম্বর নিয়েও বিএনপি নেতাকর্মীরা খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘আশাবাদী’ হয়ে থাকতে পারেন।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status