ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৯ সফর ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

খোলা চোখে

আমাদের একজন মাহবুব তালুকদার ছিলেন!

রুমিন ফারহানা
২৬ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার

একদিন হঠাৎ একটা ফোন পাই আমি। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় নির্বাচন কমিশনার জনাব মাহবুব তালুকদার আমার সঙ্গে কথা বলবেন। সংসদে যাবার ৩ মাসও তখন পূরণ হয়নি আমার। স্বাভাবিক কারণেই খুব বিস্মিত হই। কিছুটা ভয়ও পাই। আমার মতো নবীন সদস্যের সঙ্গে ওনার মতো বড় মানুষ কী বলবেন, ভেবে পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। কিন্তু কণ্ঠ শুনেই আশ্বস্ত হই আমি। গভীর স্নেহভরা কণ্ঠ। কতো বড় মানুষ কিন্তু কি ভীষণ বিনয়ী। আমার পার্লামেন্টে বলা কথাগুলো চাইছিলেন আমার কাছে।

বিজ্ঞাপন
 সেই শুরু। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই ফোন করতেন আমাকে। জানতে চাইতেন কেমন আছি, আমি একা চলি জানতেন বলেই হয়তো কথা হলেই বলতেন ‘তোমার জন্য খুব ভয় হয় আমার’। বলতেন সাবধানে চলার জন্য। বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন পরিস্থিতি, বিচারব্যবস্থা এই সবকিছু নিয়ে একটা বই লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। কথা ছিল তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হবে বইটা। আমাকে পড়তেও দিয়েছিলেন সেটা। জানতে চাইছিলেন আমার মতামত। কয়েকটা চ্যাপ্টার দেখার পর পুরোটা আর শেষ করে উঠতে পারিনি আমি। বেশ কয়েকবার বলার পর হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন নানা কারণে আমার অপারগতা। তাই আর জোর করেননি কখনো। কিন্তু ফোনে আমার খবর রাখতেন নিয়মিত। প্রতিবার কথা শেষে মাহবুব তালুকদার সাহেবের দোয়া চাইতাম আমি, প্রতিবারই বলতেন তার সকল প্রার্থনাতেই আমি আছি।

 শেষ কথা হয় মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন আগেই। জানালেন বেশ লম্বা সময় হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। দুর্বল, ক্লান্ত কণ্ঠ বলছিল ভালো নেই স্যার। নানা কারণেই বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। আমার কাছে রাজনীতি, নির্বাচনের বহু ঊর্ধ্বে উঠে তিনি ছিলেন পিতৃতুল্য শ্রদ্ধার মানুষ। কিন্তু আমার আজকের এই লেখা স্যারের স্নেহধন্য কন্যাসম আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়; বরং একজন নবীন রাজনৈতিক কর্মীর দৃষ্টিতে বিপুল বৈরী স্রোতের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানো এক নির্ভীক যোদ্ধার কথা।  ভবিষ্যৎ ঠিক কেমন আছে জানি না, কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাসীন থাকার সময়টা, বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে এই দেশের পরিস্থিতির তুলনা চলে একমাত্র স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগ সরকারটির সঙ্গেই। তৎকালীন সরকার রীতিমতো সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চরিত্র ধ্বংস করে একদলীয় রাষ্ট্র কায়েম করেছিল। আর বর্তমান সরকার সেই সরকারটির তুলনায় অনেক বেশি ধূর্ত, অনেক বেশি পরিপক্ব, তাই এবার আর বাকশাল নয়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মোড়কে বাংলাদেশকে একটি ডি-ফ্যাক্টো একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে।  এই বীভৎস সময়টা বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোটিকে ভেঙে ফেলেছে। আইন বিভাগ তো ছিলই, দেশের বিচার ব্যবস্থাকেও পুরোপুরি এক ব্যক্তির করায়ত্ত হয়েছে। এই দেশকে পরিণত করা হয়েছে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন আর লুটপাটের এক স্বর্গরাজ্য গোষ্ঠীতন্ত্রে (অলিগার্কি)। ভবিষ্যতের কোন সময় কোন গবেষক কিংবা ইতিহাসের কোন মনোযোগী ছাত্র অথবা শুধু একজন সাধারণ সচেতন নাগরিক এমন একটি চিত্রই দেখবে বাংলাদেশের। 

 একটা জাতির জীবনে পচনের সময়গুলো স্খলনের সময়গুলো নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু এই সময়গুলোর আরেকটা দিক আছে- এটা প্রকাশ্যে নিয়ে আসে জাতির সাহসী সূর্যসন্তানদের। ভবিষ্যতের আগ্রহী কেউ অবাক বিস্ময়ে দেখবে বাংলাদেশের বর্তমান সময়টিতে হাতেগোনা যে ক’জন সূর্যসন্তান আলো দিয়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তাদের বিস্ময়ের সীমা আকাশ ছোঁবে যখন তারা জানবে এই নির্বাচন কমিশনে কাজ করার পুরো সময়টা এই মানুষটার শরীরে বয়ে চলছিল ছড়িয়ে পড়া মরণব্যাধি ক্যান্সার। শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়া এই মরণব্যাধি এতটুকু কাবু করতে পারেনি তাকে। সত্যের নিজস্ব তেজ থাকে, থাকে শক্তি। সেই জোরেই হয়তো ভেতর-বাইরের সকল বাধা একা ডিঙ্গানোর সাহস পেয়েছিলেন তিনি। কেউ প্রশ্ন করতেই পারে, এই যে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেল, তাতে কি জনাব মাহবুব তালুকদার গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন? তিনি পারেননি। কেন পারেননি সেটার ব্যাখ্যাও নিজেই দিয়েছিলেন তিনি- “নির্বাচনে অনিয়ম ঠেকাতে আমি সর্বদাই সচেষ্ট ছিলাম। কিন্তু পাঁচজনের কমিশনে একজন কমিশনার এককভাবে কিছুই করতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের কাছে আমি হেরে গেছি। অনেক সময় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির কারণে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারিনি। 

 

 

সংখ্যাগরিষ্ঠরা আমার হ্যাঁ বা না-এর বিপরীতে অবস্থান নিয়ে জয়যুক্ত হয়েছেন”। নির্বাচন কমিশনে থাকার সময়কার পাঁচটি বছর একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ একা লড়াই করে গিয়েছিলেন চরমতম বৈরী পরিবেশে। তার কথা সরকারকে নানাভাবে বিব্রত করে যাচ্ছিল কিন্তু তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনতার মুখপাত্র। মানুষ যা বলতে চায় কিন্তু নানা চাপে বলতে পারে না সে কথাগুলোই উঠে আসছিল তার বক্তব্যে। এক পর্যায়ে সরকারি দলের লোকজন এবং নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকা কিছু ‘সুশীল’ তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিল। তারা ভীষণ ভাবে চাইছিলেন তিনি পদত্যাগ করুন। সেটা তার ওপরে হয়তো চাপও তৈরি করেছিল। কিন্তু আমাদের দেশের //টিপিক্যাল মধ্যবিত্তদের মতো আচরণ করেননি তিনি- পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধের মাঠ থেকে পালিয়ে যাননি। কেন যাননি সে প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন-      “একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে আমি আসন্ন নির্বাচনের বেহাল অবস্থা অনুধাবন করে পদত্যাগের চিন্তা করেছিলাম। বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে ভেবে দেখেছি আমার একক পদত্যাগ সমস্যার কোনো সমাধান নয়। আমার পদত্যাগে দেশ ও জাতির কোনো উপকার হবে বলে মনে হলে আমি তাই করতাম। বরং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে না গিয়ে এককভাবে যুদ্ধ করাই সমীচীন মনে হয়েছে।আমি পদত্যাগ করলে ভিন্নমত প্রকাশ সম্ভব হতো না এবং জনগণ তা জানতে পারতেন না। তাতে অনেকে স্বস্তিবোধ করতেন, কিন্তু যারা স্বস্তিবোধ করতেন না, সেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে অবশেষে পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছি”। 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে একজন সাংবিধানিক পদধারীর পদ যেহেতু খুব সিকিওরড, তাই তিনি লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। কিন্তু তার পদত্যাগ না করে এভাবে ‘মাটি কামড়ে পড়ে থেকে’ তার লড়াই করে যাবার তাৎপর্য বোঝা যাবে এই সরকারের আমলের এক অতি আলোচিত ঘটনায়। সাংবিধানিক পদধারী তো বটেই রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ, বিচার বিভাগের মাথা, প্রধান বিচারপতি জনাব সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ঘটনা আমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। সরকারের বিরাগভাজন হবার কারণে সিটিং প্রধান বিচারপতিকে গায়ের জোরে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। নূরুল হুদা কমিশন গঠিত হবার কিছুদিন আগেই এমন উদাহরণ সামনে থাকার পরও যে মানুষটা লড়াই চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন, সে মানুষটার সাহস নিশ্চয়ই বহু যুগ অনুপ্রেরণা যোগাবে যারা দেশ-দশের স্বার্থে কাজ করতে চাইবে তাদের জন্য।  জনাব মাহবুব তালুকদার কমিশনে থাকা অবস্থায় প্রতিটি নির্বাচন শেষেই নিঃসংকোচে, সাহসের সঙ্গে সত্য উচ্চারণ করে গেছেন। হোক তা জাতীয় নির্বাচন কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) পর্যবেক্ষণ শেষে মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন, ভোটযুদ্ধে যুদ্ধ আছে, ভোট নেই। সেই যুদ্ধ সরকারি দলের নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধ যে কতো ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটি প্রত্যক্ষ করেছে মানুষ। ভোটারদের ভয় দেখানো, কেন্দ্র বিমুখ করা, স্বতন্ত্র বা ভিন্ন দলের প্রার্থী ভোটারদের শাসানো, অস্ত্র থেকে শুরু করে এলাকা ছাড়া করার ভয় দেখানো সবই বলা হয়েছিল স্থানীয় পর্যায়ের সেই নির্বাচনগুলোতে। 

 নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সমালোচনা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনার মিথ্যাচার করেন। কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে জন্য ইসি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা বলেন।’ ইতিহাসই নির্ধারণ করবে কে সত্য আর কে মিথ্যার সঙ্গে ছিল, কার ভূমিকা কেমন ছিল। তবে সিইসি’র এই কথার উত্তর দিয়েছিলেন মাহবুব তালুকদার। বলেছিলেন ‘সিইসি ঠিকই বলেছেন, আমি এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেছি। তবে এজেন্ডাটি আমার নিজস্ব নয়, জনগণের তথা দেশবাসীর। এই এজেন্ডা হচ্ছে সব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, আইনানুগ ও শান্তিপূর্ণ করা। কোথাও সহিংসতা হলে তার দায় এড়াবো না। সর্বশক্তি দিয়ে এর পুনরাবৃত্তি রোধ করবো। আমার এজেন্ডা হচ্ছে- ভোটাধিকারের মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আমার এজেন্ডা হচ্ছে-গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা, যা সংবিধানের মূল পথনির্দেশ। ‘গণতন্ত্রহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়?’ বাংলাদেশে নির্বাচনী যে গভীর সংকট সেটি একজন কমিশনার হয়েও অকপটে বলেছিলেন তিনি। সরকার, ক্ষমতাসীন দল, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে তা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন ‘প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন এখন আইসিইউতে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গণতন্ত্র এখন লাইফ সাপোর্টে’।

 তার মতো জায়গায় থেকে এই কঠোর কঠিন সত্য উচ্চারণ নিশ্চিত ভাবেই সহজ ছিল না। এই রূপকের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু মনোভাব গণতন্ত্রকে অন্তিম অবস্থায় নিয়ে গেছে। খেলায় যেমন পক্ষ-বিপক্ষের প্রয়োজন হয়, তেমনি একপক্ষীয় কোনো গণতন্ত্র হয় না।’ জাতীয় থেকে স্থানীয় সকল নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা, পক্ষপাতমূলক আচরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার, প্রশাসনের বৈরিতা, সহকর্মীদের প্রতি মুহূর্তের অসহযোগিতা নিশ্চিতভাবেই বিপর্যস্ত করেছিল তাকে। কিন্তু কোনোদিন ভেঙে পড়েছেন বলে মনে হয়নি। দেশ, দেশের পরিস্থিতি, রাজনীতির দৈন্যদশা পীড়িত করতো তাকে কিন্তু হতাশ হতে দেখিনি কখনো। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৬৫ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ আর রাউজানে ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানসহ ১২৬ জন পুরুষ ও ৪২ জন সংরক্ষিত আসনের সদস্যের সবারই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বাংলাদেশের নির্বাচনে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে। এসব নির্বাচনে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী বা প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় নির্বাচন ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ।  আর তাই হয়তো মাহবুব তালুকদার প্রকাশ্যে বলেছিলেন সারা দেশে যদি সন্ত্রাসমুক্ত এ ধরনের নির্বাচন করা যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের বদলে একজন সচিবের অধীনে একটি সচিবালয় থাকলেই যথেষ্ট! বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক কলংকিত নির্বাচন ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

 দেশে বিদেশে এটি মধ্য রাতের নির্বাচন নামেই পরিচিতি পায়। আর এই নির্বাচনের সময় একজন কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন জনাব মাহবুব তালুকদার। তাই সেই নির্বাচনের কিছুটা দায় হয়তো তার ওপরও এসে পড়ে। কিন্তু আর সব কমিশনারের সঙ্গে তার পার্থক্যের জায়গাটা হলো নিজের দায় এড়ানোর জন্য কলংকিত এক নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলার তামাশা মানুষের সঙ্গে তিনি করেন নাই। দায়িত্ব নিয়েছেন, দায়ও স্বীকার করেছেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের ব্যর্থতার গ্লানি ছাড়া আর কিছু দিতে পারেনি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, এতেই বোঝা যায় নির্বাচন কেমন হয়েছে? এভাবে না অবাধ, না সুষ্ঠু, না নিরপেক্ষ, না আইনানুগ, না গ্রহণযোগ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য কিছু পাওয়ার আশায় কিংবা হারানোর ভয়ে যাদের জাতির বিবেকের ভূমিকায় থাকার কথা ছিল তারা হয় নিশ্চুপ না হলে উল্টো কথা বলছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের কলংকিত ইতিহাসকে সামনে রেখে আরও একটি জাতীয় নির্বাচন দরজায় করা নাড়ছে আমাদের। কেমন হবে সেই নির্বাচন সে আলোচনা সর্বোত। সবাই অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচনের কথা বললেও আসল কথাটি কেউ বলছেন না। 

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া কেউ বলছেন না ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইতিহাসের পর কারও আর বুঝতে বাকি নেই যে, এই সরকারের অধীনে ন্যূনতম কোনো সুষ্ঠু ভোট অসম্ভব। কিন্তু নিজের ৫ বছরের কমিশনের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন ‘বিগত দুটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না।’ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। একদিন এই দেশের অন্ধকারময় এই সময়ের কথাও লিখবেন কোনো ইতিহাসবিদ, লেখক কিংবা গবেষক। নির্মোহ ভাবে তুলে আনবেন কুয়াশাচ্ছন্ন ভীতিকর এই সময়ের কথা। নির্ভয়ে লেখা হবে বাংলাদেশকে আজকের এই অবস্থায় নিয়ে আসার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের নাম। তখন নিশ্চিতভাবেই লেখা হবে অন্ধকার এই সময়ে নক্ষত্রের আলোর মতো একা কিন্তু নির্ভয়ে জ্বলতে থাকা আলো ছড়ানো কিছু মানুষের কথাও। জনাব মাহবুব তালুকদারের নাম তাতে নিশ্চিত ভাবেই থাকবে। অনাগত প্রজন্ম জানবে- আমাদের একজন মাহবুব তালুকদার ছিলেন।

পাঠকের মতামত

আমাদের একজন মাহবুব তালুকদার ছিলেন

masud
২৮ আগস্ট ২০২২, রবিবার, ১:১৭ পূর্বাহ্ন

সময়ের সাহসী সন্তান ছিলেন। ইতিহাস তাকে স্মরণ করবে। নির্ভীক, দৃপ্তভাষী, দক্ষ, সত্য বলতে বজ্রকণ্ঠ। আমরা আশা করি তার মতো ব্যাক্তি সময়ের প্রয়োজনে ফিরে আসবে, আসতে হবে। আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্ব্বোচ স্থান দান করুন।

মো. সবুজ মিয়া
২৬ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১২:৪৭ অপরাহ্ন

হঠাৎ স্যারের মৃত্যুর খবর শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি মনে করি, এদেশের সাধারণ মানুষ তাদের হয়ে কথা বলার একজন মুখপাত্র হারালো। আল্লাহ যেনো আপনার সহায়ক হয়।

মোঃ আল-আমিন
২৬ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ৪:৫১ পূর্বাহ্ন

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। একদিন এই দেশের অন্ধকারময় এই সময়ের কথাও লিখবেন কোনো ইতিহাসবিদ, লেখক কিংবা গবেষক। নির্মোহ ভাবে তুলে আনবেন কুয়াশাচ্ছন্ন ভীতিকর এই সময়ের কথা। নির্ভয়ে লেখা হবে বাংলাদেশকে আজকের এই অবস্থায় নিয়ে আসার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের নাম। মহান আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা করেন।

Abdur Razzak
২৬ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১:০০ পূর্বাহ্ন

ইনশাআল্লাহ দেশে একদিন গনতন্ত্র ফিরে আসবে কিন্তু যাদের শ্রমে ফিরে আসবে তারা দেখতে পারবেনা কারন আল্লাহ মানুষকে সল্প সময়ের জন্য এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন

মোহাম্মদ হাসান
২৬ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। একদিন এই দেশের অন্ধকারময় এই সময়ের কথাও লিখবেন কোনো ইতিহাসবিদ, লেখক কিংবা গবেষক। নির্মোহ ভাবে তুলে আনবেন কুয়াশাচ্ছন্ন ভীতিকর এই সময়ের কথা। নির্ভয়ে লেখা হবে বাংলাদেশকে আজকের এই অবস্থায় নিয়ে আসার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের নাম। তখন নিশ্চিতভাবেই লেখা হবে অন্ধকার এই সময়ে নক্ষত্রের আলোর মতো একা কিন্তু নির্ভয়ে জ্বলতে থাকা আলো ছড়ানো কিছু মানুষের কথাও। জনাব মাহবুব তালুকদারের নাম তাতে নিশ্চিত ভাবেই থাকবে। অনাগত প্রজন্ম জানবে- আমাদের একজন মাহবুব তালুকদার ছিলেন।

Anwar Hossain
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:৪১ অপরাহ্ন

ওনার মৃত্যুর আগে ওনার সম্পর্কে না জেনেই মনে করতাম তিনি আওয়ামীলীগ বিরোধী। মৃত্যুর পর তার সম্পর্কে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর আমলেই তিমি বঙ্গবন্ধুর সহচর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁকেও ওএসডি করা হয়েছিল। যা তিন তার কিখনিতে বলেগেছেন। সেটা পড়ে মনে হল আরে ওনিই তো আসল আওয়ামিলীগ। আওয়ামী লীগ তো ওনার মতই হওয়া দরকার।অথচ আওয়ামী লীগ আজ পথ ভ্রষ্ট।

--এ দেশের জনগণ
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:০৭ অপরাহ্ন

একজন মাহবুব তালুকদার ও হাবিবুল -------------------------------------------------------------------- আউয়ালের ইভিএম সমাচার -------------------------------------------------------------------- নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। মাহবুব তালুকদার নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান শুধু নন, একটি প্রদীপ। রকিব কমিশন থেকেই বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অমানিশা নামে। সেই অমানিশার নিকষকৃষ্ণের ভেতরে আলোর মশাল হাতে ছুটোছুটি করেছেন আলোকিত মাহবুব তালুকদার। আমাদের সবার প্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ রাতের জ্যোৎস্নায় এতোটাই মুগ্ধ ছিলেন, চাঁদের আলোময় জ্যোৎস্নায় গা ভাসিয়ে দিয়ে তিনি তাঁর মৃত্যু কামনা করেছেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো ভালোবাসেনা এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবেনা। কিন্তু মানুষের মধ্যে অদ্ভুত একধরনের লোক খুঁজে পাওয়া যায় যারা রাতের জ্যোৎস্নার আলোর চেয়ে অমাবশ্যার অন্ধকার বেশি ভালোবাসে। অন্ধকার প্রিয় কেএম নূরুল হুদা কমিশন দিনের ভোট রাতের আঁধারে করার কৃতিত্বের দাবিদার। অদৃশ্য সুতোর টানে যেমন নাচিয়েছে তেমন নেচে-গেয়ে নির্বাচনকে খেলতামাশায় পরিণত করে গিয়েছেন কেএম নূরুল হুদা কমিশন। ব্যতিক্রম শুধু একটি বিবেক, একটি প্রতিষ্ঠান, জনগণের ভোটের আমানত রক্ষার একটি অঙ্গীকার। ভোটের আমানত রক্ষায় প্রাণান্তকর লড়াই করে দেশের মানুষের কাছে তিনি নন্দিত নায়ক। কিন্তু তাঁর দুঃখ, তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণকে উপহার দিতে পারেননি। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচনের কাজটা পুরো কমিশনের টিম ওয়ার্কের মধ্য দিয়ে করতে হয়। কমিশনের সামান্য ক্ষমতাই ছিলো মাহবুব তালুকদারের হাতে। তাঁর সহকর্মী যাঁরা ছিলেন কেএম নূরুল হুদা সহ সকলে সাংবিধানিক শপথ রক্ষা করেননি। ইতিহাস মাহবুব তালুকদারকে মনে রাখবে নির্বাচন কমিশনের নন্দিত নায়ক হিসেবে। আর অন্যদের মূল্যায়ন নিন্দাবাদের মধ্যদিয়ে ইতিমধ্যেই বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। একজন সত্যবাদী নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক মাহবুব তালুকদার ক্ষোভ নিয়েই বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে না পারার দুঃখ নিয়েই ফিরছি সাধারণের কাতারে। নির্বাচনের অনিয়ম ঠেকাতে এবং নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করতে মাহবুব তালুকদারের কোনো পরামর্শই গ্রাহ্য করেনি বশংবদ কেএম নূরুল হুদা সহ অন্যরা। পদে পদে তাঁকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বিবেকের দংশনে তিনি চটপট করেছেন। অনিয়মের প্রতিবাদ করেছেন। সমালোচনা করেছেন। শোধরাবার চেষ্টা করেছেন। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করা হলে গনতন্ত্র ভেঙে পড়ে তা তো জানা কথা। ক্রমাগত জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে যখন ছিনিমিনি খেলা হলো, পরিণামে গনতন্ত্র মৃত্যুমুখে দাঁড়ালো তখন মাহবুব তালুকদার ক্ষোভ নিয়েই বলেছেন নির্বাচন এখন আইসিইউতে আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গণতন্ত্র এখন লাইফ সাপোর্টে। তিনি জনগণের মনের কথা বলেছেন। যতোদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতোদিন বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে ততোদিন বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে একজন সৎ, দেশপ্রেমিক ও শপথের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হিসেবে কমিশনার মাহবুব তালুকদারের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। স্বভাবতই অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের পরে মানুষ সুনাম সুখ্যাতি অর্জন করতে চায়। কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো বাংলাদেশের গত কয়েকটি নির্বাচন কমিশন বদনাম ও কলঙ্কিত হওয়ার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছেন। পক্ষান্তরে নির্লোভ, নিরহংকার ও সততার প্রশ্নে উতরে যাওয়া মাহবুব তালুকদার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সাংবিধানিক শপথ রক্ষার। তাই অন্যদের বদনামের জায়গায় তিনি সুনাম পেয়েছেন। চাঁদে বরং কলঙ্ক থাকতে পারে, তার ছিটেফোঁটাও মাহবুব তালুকদারের গায়ে লাগেনি। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তায়ালা এ দুনিয়ায় যেমন তাঁকে সম্মানিত করেছেন তেমনিভাবে সম্মানিত করুন এবং শান্তিতে রাখুন। লুটপাট, দুর্নীতি, বিদেশি ব্যাংকে টাকা পাচার ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, হাভাতে গরিবের রোনাজারি, গনতন্ত্রের অধিকার, ভয়মুক্ত চলাচলের অধিকার, সাম্য, ন্যায় ও সুবিচারের অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার, সভাসমাবেশ ও মিছিলের অধিকার কেড়ে নেয়া এবং গুম, অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, লাখ লাখ মানুষের নামে হয়রানির মামলা, জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে জোরজবরদস্তি কর্তৃত্ববাদী শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া এবং পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া, সুশাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার হারানোর মতো জগদ্দল পাথরের ভারে নুয়ে পড়া জনগণ ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে, তবুও বাঁচার জন্য নড়াচড়া করছেনা মূলতঃ আঘাতের পর আঘাতে হাড়ভাজা হয়ে কঠিন কষাঘাতে দুমড়ে মুচড়ে পড়েছে, হাড্ডসার হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। কর্তৃত্ববাদীরা এমনিতেই শক্তির দাপটের ওপর ভর করে থাকে। পক্ষান্তরে, শক্তিহীনরা দুর্বল। শক্তিশালীরা চায় দুর্বলরা নিঃশেষ হয়ে যাক। শক্তিশালীদের এই চাওয়াটা চিরকাল একইরকম। এটাকে প্রতিঘাত বলা যায়না। কারণ দুর্বলের আঘাতের প্রশ্ন নেই, তাই প্রতিঘাতের কথা আসেনা। দুর্বলেরা হিংসাও করেনা, তাই প্রতিহিংসাও নয়। তাহলে দুর্বলের ওপর এতো নিপীড়নের হেতু কী? আদিকাল থেকেই দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার ঘিরে চলছে নগ্ন উল্লাস। মানব সভ্যতার কলঙ্ক- ক্ষমতা, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অসমতা। মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষে মানুষে সকল ভেদাভেদ মুছে দিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মানবসভ্যতাকে সকল প্রকার বৈষম্যের কলঙ্কমুক্ত করেছেন। আজকের দিনেও দুর্বলের সুযোগ্য প্রতিনিধি আছে, কাণ্ডারি আছে- পা-হাত বাঁধা। অকূল পাথারে সাঁতরে কিনারা খুঁজে মরিমরি অবস্থা। শক্তিমান কর্তৃত্ববাদীদের তাণ্ডবে এ দশা! যেনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে। সোনা জ্বলে পুড়ে খাঁটি হয়; দুর্বলরাও অত্যাচার নিপীড়ন সইতে সইতে শক্তিশালী হয়। হয় কি- বহুবার হয়েছে। সুদীর্ঘ তেইশ বছর নিপীড়ন সইতে সইতে ঊনসত্তর সালে দুর্বলরা হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেয়েছে, জেগে ওঠেছে, গণআন্দোলন গড়ে তুলেছে, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক, ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায় করে নিয়েছে। দুর্বলের এদিকটা ষোলআনা আচমকা প্রকৃতির নিয়মে ঘটেনা। প্রতিকূল তরঙ্গাঘাত অতিক্রম করে সাঁতরায়ে কিনারে এসে পৌঁছাতে পারলেও পাড়ে উঠার শেষ শক্তিটুকু নিঃশেষ হয়ে পড়ে যখন এবং প্রকৃতির সাহায্যের উপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে প্রকৃতি তখন হাত ধরে টেনে পাড়ে তুলে নেয়। প্রকৃতি প্রথমে দেখতে চায় উদ্দেশ্য সাধনে লক্ষ্যের প্রতি তার আকর্ষণ কতোটা তীব্র, লক্ষ্যে পৌঁছাতে জানমাল বিসর্জন দিতে সে কতোটা প্রস্তুত। প্রকৃতি যখন দেখে, বাঁধার পাহাড় ডিঙিয়ে তার লক্ষ্য অর্জনের পথে কাঁটা বিচানো দেখেও সে যখন পিছপা হয়না, বরং অমিত সাহসে এগিয়ে যায় এবং গুলিবারুদের সামনেও সে অবিচল থাকে, অর্থাৎ লক্ষ্যের প্রতি তাঁর নিয়ত কতোটা নির্ভেজাল বা খাঁটি এই বিষয়টি প্রকৃতি বুঝতে চায়। হাজরো বিপদমুসিবত বরণ করে উদ্দেশ্য সাধনে লক্ষ্যের দিকে অবিচল থাকতে পারলে প্রকৃতি তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শৃঙ্খলা বিধান করা প্রকৃতির দায়িত্ব। মানুষের ওপর স্রষ্টার অর্পণ করা দায়িত্ব পালনে মানুষ অবহেলা করলেও প্রকৃতি কখনো সে ভুল করেনা। দুর্বলদের অধিকাংশ মানুষ যখন শিশাঢালা প্রাচীরের অটুট বন্ধন গড়ে তুলতে পারবে, কোনো আঘাত তাঁদের লৌহ প্রাচীর ভাঙতে পারবেনা। তখন থেকেই বিজয়ের শুরু। আশির দশকে হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে শ্রীলঙ্কা আছে চোখের সামনে। অতীতে এরকম হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো হবে আরো দেশে। কারণ, শক্তিমান কর্তৃত্ববাদীদের কূটবুদ্ধি আছে, শিক্ষা নেই। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা শিক্ষা গ্রহণ করেনা। কালে কালে কতো কর্তৃত্ববাদী জনরোষে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তার হিসেব নেই। তবুও মানব সমাজে গজিয়ে ওঠে নতুন নতুন কর্তৃত্ববাদী। করল্লার রস বেজায় তেতো। অনেকের খাদ্য তালিকায় নিয়মিত থাকে করল্লা। ডায়াবেটিস রোগীর সুগার নিয়ন্ত্রণে করল্লার রস চাক্ষুষ ধন্বন্তরি। তাই খালিপেটে করল্লার তেতো রস নাকমুখ বুঁজে অনেকে পান করেন। সাধারণত পরিবারের বয়স্কদের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। তাঁরা তেতো জেনেও করল্লার রস খান। কিন্তু, পরিবারের যাদের ডায়াবেটিস নেই তাঁদের যদি জোর করে করল্লার রস খেতে বলা হয় বা বাধ্য করা হয় তাহলে সেই চর্চা কি অনধিকার নাকি অগণতান্ত্রিক নাকি অনৈতিক? এটাকি পরিবারের কর্তার কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা? ওই পরিবারে কর্তা পর্যায়ে যদি অন্য কেউ থাকেন তাহলে একজন মাহবুব তালুকদারের মতো গর্জে ওঠতে পারেন। কেউ যদি সুবিবেচক থাকেন তিনি নিশ্চয়ই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন- তবে বিজয়ী হতে পারবেন কিনা বলা যায়না, কারণ শক্তির জোর কম থাকলে করল্লা যতো তেতোই হোক অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেতে হবে বাধ্য করা হয়। অন্যায় অনিয়মের প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন মাহবুব তালুকদার। ফলাফল যেটাই হোক অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য নৈতিক শক্তির দরকার পড়ে, যার ষোলআনাই ছিলো মাহবুব তালুকদারের। হাবিবুল আউয়াল কমিশন দুর্বল ভোটারদের 'ইভিএম' নামের তেতো করল্লার রস খাওয়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। সরকারি বড়ো দল কমিশনের মতে সমর্থন দিয়েছে। রাজনীতিতে যাদের ডায়াবেটিস করল্লার তেতো রসের মতো ইভিএম ছাড়া তাঁদের ভোটের ডায়াবেটিস সারবেনা, তাঁরা এটা বুঝে যাওয়া পরে নির্বাচনের বৈতরণি পার হওয়ার এটাই একমাত্র ভরষা। দুর্বল ভোটারেরা প্রকৃতির সাহায্য পাওয়ার শর্ত এখনো পূরণ করতে পারেনি। সুতরাং, ইভিএমের তেতো রস তাঁদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পান করতে হবে। যাঁরা জনগণের ভোট ছাড়া সরকার গঠনে বেশি আগ্রহী এবং সেজন্যে ছলাকলা ও কূটকৌশলের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য প্রয়োগ এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনে অতীতের রেকর্ড অতিক্রম করেছে কারসাজির ইভিএম যখন তাঁদের পছন্দের তালিকায় তখনই সবাই বুঝে গিয়েছে আসল রহস্য। গতবার দিনের কাজ রাতে করে নিন্দার তুফানে জর্জরিত। সেই কলঙ্কের দাগ মুছতে হলে এবার দিনের কাজ দিনে করা চাই। আবার জিততেও হবে। ব্যালট পেপার সাথে সিল হাতে নেয়া, সিলে কালি মাখানো, এরপর সিল মারা কাজটা বেশ সময়ের। ঝটপট ইভিএমের বাটনে চাপ দেয়া কতো সহজ তা-ই না! সময়ও একদম সেকেন্ডের বেশি না। একটা ক্যালকুলেটরে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ হিসেবের পরে আবার পুনরায় হিসেবটা মিলিয়ে নেয়া যায়, কারণ হিসেবের রেকর্ড ক্যালকুলেটরে থাকে। ইভিএমে দরকার হলে পুনরায় ভোট গণনা করা অসম্ভব। কারণ, বর্তমান হাবিবুল আউয়াল কমিশনের অনুমোদিত ইভিএম- এর সঙ্গে ভোটার- ভেরিফায়েড পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি যন্ত্র ব্যবহার বা সংযুক্ত করা হয়নি। তা করলে কোনো প্রার্থী ভোটের ফলাফল নিয়ে আপত্তি করলে আবার পুনরায় ভোট গণনা করা সম্ভব ছিলো। ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণ করা হলে ভোটের রেকর্ড থাকে। প্রয়োজনে পুনরায় গণনা করা যায়। ইভিএমে ভোট গ্রহণ করার আসল রহস্য উন্মোচন হয়ে যায় যখন দেখা যায় ইভিএমে পুনরায় ভোট গণনা করার ব্যবস্থা নেই। কিন্তু ব্যালট পেপার একটি হার্ড কপি। যতোবার দরকার ততোবার ভোট আবার গণনা করা সম্ভব। সবচেয়ে বড়ো কথা ইভিএম একটা যন্ত্র মাত্র। তার নিজের চলার ক্ষমতা নেই। নিজের ইচ্ছায় সে কিছুই এবং কিছুই করতে পারেনা। একটি গাড়ি যেমন নিজের ইচ্ছায় চলতে পারেনা। চালাতে চালক দরকার হয়।ইভিএম মেশিন চালাতেও চালকের দরকার হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর নির্মাতা কারা? এর প্রোগ্রাম সেট করেছে কারা? কারা ভোটের সময় ইভিএম পরিচালনা করবে? এসব কাজ সরকারের লোকজনের তত্বাবধানে হবে। সুতরাং সরকারের লোকেরা নির্বাচনে সরকারকে না জিতিয়ে অন্যদের জেতানোর জন্যই কি ইভিএমে প্রোগ্রাম সেট করবেন? একথা একজন অবুঝ শিশুও বোঝে। এজন্যই রীতিমতো আইন পাশ করে কোনো কোনো দেশ নিষিদ্ধ করেছে ইভিএম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে নির্বাচনের প্রধান ও অধিকাংশ অংশীদারগণ শত উপকারী হওয়া স্বত্বেও করল্লার তেতো রসের মতো যদি ইভিএম গলাধঃকরণ করতে অপারগ হয় তাহলে জোরজবরদস্তি করে তাঁদেরকে ইভিএম গেলানো কি সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক অধিকার হরণ করা হবেনা? আমার ডায়াবেটিস নেই আমাকে জোর করে করল্লার তেতো রস খাওয়াতে চান কেনো? অনুরূপ, আমার নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় নেই আমাকে জোর করে ইভিএমে ঢুকতে বাধ্য করতে চাওয়া মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ নয়কি? হাবিবুল আউয়াল কমিশন রাজনৈতিক ডায়াবেটিস রোগীর ওষুধের দোকান খুলে বসেছেন। ডায়াবেটিস মার্কা নির্বাচনে জেতার জন্য ইভিএমের সুযোগ হাবিবুল আউয়াল কমিশনের বিশেষ অবদান। যাদেরকে নির্বাচনের ডায়াবেটিসে ধরেছে, অর্থাৎ পরাজয়ের ভয় আছে তাঁরা জনাব হাবিবুল আউয়াল কমিশনের মোক্ষম দাওয়াই 'ইভিএম' গ্রহণ করুন। কিন্তু, আমাদের এতোসব অনুরোধ, প্রচার-প্রচারণা যদি মাঠে মারা যায়, যদি প্রধান বিরোধী দল সহ সমমনারা ইভিএমের নির্বাচন বর্জন করে তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবেনা। তার দায় সম্পূর্ণভাবে কমিশনকে বহন করতে হবে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, রকিব ও নূরুল হুদা কমিশনের অপবিত্র কলঙ্কের পোশাক হাবিবুল আউয়াল কমিশন ছুঁড়ে ফেলে দেয়, নাকি গায়ে জড়িয়ে নেয়। আরো দেখার বিষয় হচ্ছে, হাবিবুল আউয়াল কমিশন সংবিধানের শপথের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একজন নির্ভীক নন্দিত মাহবুব তালুকদারের পদাংক অনুসরণ করেন, নাকি মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করার জন্য যাদের ওপর মানুষ অভিশাপ বর্ষণ করেছে সেই রকিব ও নূরুল হুদা কমিশনের পথে হাঁটেন। জনগণের দোয়ায় সিক্ত মাহবুব তালুকদারকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।

আবুল কাসেম
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১০:২২ অপরাহ্ন

সবই ঠিক আছে,সত্যিই মাহাবুব তালুকদার আমাদের মানুষ ছিলেন।অর্থাৎ মাহাবুব তালুকদারএদেশের সাধারন মানুষের মনের কথাই প্রকাশ করতেন।লেখকের কাছে প্রশ্ন ৭৫এর ১৫,২১আগষ্ট তথা কেক কাটা এসবের বিষয়ে কিছু লিখলে ভাল লাগতো।আমি কোন লীগ বা দল করিনা।এসবের ফয়সালা যত দ্রুত হবে দেশের মানুষ তত তাড়াতাড়ি শান্তিতে থাকবে।প্রতিহিংসার রাজনিতি থেকে বের হতে চাইলে এসবের ফয়সালা জরুরী।

Amirswapan
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১০:১৭ অপরাহ্ন

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। একদিন এই দেশের অন্ধকারময় এই সময়ের কথাও লিখবেন কোনো ইতিহাসবিদ, লেখক কিংবা গবেষক। নির্মোহ ভাবে তুলে আনবেন কুয়াশাচ্ছন্ন ভীতিকর এই সময়ের কথা। নির্ভয়ে লেখা হবে বাংলাদেশকে আজকের এই অবস্থায় নিয়ে আসার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের নাম। তখন নিশ্চিতভাবেই লেখা হবে অন্ধকার এই সময়ে নক্ষত্রের আলোর মতো একা কিন্তু নির্ভয়ে জ্বলতে থাকা আলো ছড়ানো কিছু মানুষের কথাও। জনাব মাহবুব তালুকদারের নাম তাতে নিশ্চিত ভাবেই থাকবে। অনাগত প্রজন্ম জানবে- আমাদের একজন মাহবুব তালুকদার ছিলেন।

এ দেশের নাগরিক
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৬:৩৭ অপরাহ্ন

আমাদের একজন মাহবুব তালুকদার ছিলেন

Alomgir Chowdhury
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৪:৪১ অপরাহ্ন

মহান আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা করেন।

এম কামাল উদ্দিন
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ২:১৭ অপরাহ্ন

Mr Mahbub Talukder was a man of principle. He will be remembered for his outspoken behaviour.

Mohammed Bazlur Rahm
২৫ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম থেকে সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট / আমরা এখানে কীভাবে এলাম?

বেহুদা প্যাঁচাল: মমতাজের ফেরি করে বিদ্যুৎ বিক্রি, রাব্বানীর দৃষ্টিতে সেরা কৌতুক / কি হয়েছে সিইসি কাজী হাবিবের?

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status