ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৫, বৃহস্পতিবার, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৩ শাওয়াল ১৪৪৬ হিঃ

মত-মতান্তর

আসুন সেনাবাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখি

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

(১ সপ্তাহ আগে) ২৬ মার্চ ২০২৫, বুধবার, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

mzamin

সুশৃঙ্খল সশস্ত্র বাহিনীর অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী কঠিন ও শক্ত কমান্ড স্ট্রাকচারে চলে। অনেকটা সাধারণ গ্রামের ভাষায় বলা যায়- তারা “হুকুমের গোলাম”। যথাযথ কমান্ড পেলে নীচের দিকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও আত্মহুতি দিতে হবে - এমন প্রশিক্ষণ দিয়েই তাদের তৈরি করা হয়। বিশ্বের বড় বড় যুদ্ধে স্ট্রিক্ট কমান্ডের আলোকে শত্রুদের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী হামলা ও আক্রমণ এবং আত্মহুতি অপারেশনের (martyrdom operation) ইতিহাস অজানা নয়। কমান্ড মানতে বা অনুসরণ করতে পরামর্শ, মেজরিটির মতামত, ইফ/বাট, মানবাধিকার, একটু দেখি, পরে করবো - এগুলো চলে না। কমান্ডই সার কথা - টিলার উপর থেকে পানি পড়ে। একটু ব্যত্যয় ঘটলে কঠিন শাস্তির বিধান আছে খোদ সেনা আইনে।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীর। এজন্য যেকোনো সুস্থ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক দেশে সেনাবাহিনীকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। তারা হোন সেখানে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্বে রাজনীতি নিয়ে রাজনীতিবিদরা বাদানুবাদ ও কেটস অ্যান্ড মাউস তর্ক-বিতর্ক করলেও তাদের সেনাবাহিনীর  ব্যাপারে তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ। সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে, নষ্ট হয় জাতীয় ঐক্য। ইদানীং বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থে, নিছক দলীয় বিবেচনায়, এমনকি ইউটিউবে ভিউ ও সাবস্ক্রিপশন বাড়াতে সেনাবাহিনীকে টার্গেট করে মারাত্মক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এটা জাতির জন্য এক অশনি সংকেত।

এটা ঠিক সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমুলক না হয়ে বরং দুর্নীতিগ্রস্ত ও একনায়ক/ফ্যাসিবাদী হয় তার প্রভাব ও রেশ সেনাবাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচারে পড়ে, পড়তে বাধ্য। কেননা সেনাবাহিনীর আসল বা ফাইনাল কমান্ড তো আসে সরকারের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে, তারাই ঠিক করেন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কমান্ডে কারা কারা আসবেন। সেনাবাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচারে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির স্খলন বা  ব্যর্থতার জন্য  পুরো সেনাবাহিনীকে কোনোভাবেই দায়ি করা যাবে না। বরং দায়ি হলেন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও এক বা একাধিক ব্যক্তি যারা সেনাবাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচারের শীর্ষে থাকেন।

যে কোনো মূল্যে আমাদের সেনাবাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিষয়ে নাক গলানো, হস্তক্ষেপ করা ও মেনুভ‍্যারিং করা, নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি করা কোনোভাবেই সেনাবাহিনীর কাজ নয়, কখনো হতে পারে না। এগুলো করতে গিয়েই অতীতে আমাদের গৌরবের সেনাবাহিনীর কিছু অংশ ও উয়িং বিতর্কিত হয়েছে। এজন্য সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট র‍্যাংক এন্ড ফাইলে স্তি্যকার সোলসার্চিং করা দরকার। ‍বৃটেন ও আমেরিকায় তাদের সেনাবাহিনী এই কাজগুলো করতে পারে? পারবে? মোটেই না। উন্নত ঐ দেশদ্বয়ের কথা বাদই দিলাম, আমাদের মতো পাশের দেশ ভারতে তাদের সেনাবাহিনী তাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে? নাক গলায়? গলাতে পারে?

সেনাবাহিনী হচ্ছে সুশৃঙ্খল ও প্রশিক্ষিত বাহিনী। তাদের হাতে আছে জীবনবিনাশী অস্ত্র। এই অস্ত্রগুলো তাদের কাছে থাকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য। সাধারণ মানুষের ধারণা যাদের হাতে অস্ত্র আছে তারাই ক্ষমতাবান, ফলে ক্ষমতাবানরা রাজনীতিসহ যে কোনো বিষয়ে নাক গলাতে চান বা চাইবে। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। ইতিহাস সাক্ষী সেনাবাহিনী না চাইলেও রাজনীতিবিদদের হঠকারিতা ও চরম ব্যর্থতার কারণেই সেনাবাহিনীর রাজনীতিতে নাক গলানো বা হস্তক্ষেপ করা অপরিহার্য হয়ে উঠে।

তবে সব ধরনের অস্ত্রের মধ্যে তো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে পারমাণবিক বোমা। যেসব দেশের সেনাবাহিনীর হাতে পারমাণবিক বোমা আছে তারা তো বহুগুণে শক্তিশালী এবং ক্ষমতাবান। অস্ত্র ও ক্ষমতা থাকলেই যদি তাদের দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে হতো তাহলে আমেরিকান সেনাবাহিনী ও বৃটিশ সেনাবাহিনী তাদের স্ব স্ব দেশে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতো! তারা তো তা করে না। এভাবে হস্তক্ষেপ করার রীতি, নরমস, প্র‍্যকাটিস বা পরিবেশ সেসব দেশে গড়ে ওঠেনি। বৃটেনে সচেতন নাগরিক হিসেবে বসবাস করছি সাড়ে তিন যুগের উপর। মিডিয়ায় সব বিষয়ে খবরাখবর রাখলেও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের নাম জানি না, জানার কখনও প্রয়োজন হয়নি। যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়া গণমাধ্যমে সেনাপ্রধানের নাম সচরাচর আসে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে হয়তো গুগল করে বের করতে হবে!

বস্তুত: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে (Internal affairs) সেনাবাহিনীর কোনো ভূমিকা থাকে না। কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও দূর্ঘটনার কারণে কোনো সিভিলিয়ান লাইফে সেনাবাহিনীকে নামালে সেটাও করা হয় সাধারণ প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে যেটাকে বলা হয় “in aid to civil power”। জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত সার্ভিস জাতির প্রয়োজনে কাজে লাগানোর জন্য একই ধরনের প্রভিশন বৃটেনে ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে আছে। যেমন Civil Contingencies Act 2004 এবং  the Emergency Powers Act 1964 এর অধীনে Military Aid to the Civil Authorities (MACA) হিসেবে সিভিলিয়ান লাইফে ক্ষেত্রবিশেষ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তবে এ ধরণের মোতায়েন হয় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য।

 

তিতা নিম গাছ থেকে সুস্বাদু আম আশা করা যায় না। ঠিক তেমনি অযোগ্য (Incompetent), দুর্নীতিবাজ (corrupt), একনায়ক (autocratic) ও জবাবদিহিহীন (accountability-less) রাজনৈতিক সরকার থেকে ফেরেশতার মতো armed force-এর উর্ধ্বতন কমান্ড স্ট্রাকচার আশা করতে পারেন না। গোঁড়ায় হাত দেন - এমন মৌলিক সংস্কার করেন যাতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বকারী ও জবাবদিহিতামুলক সরকার নির্বাচিত হয়। এমনটি হলে সেনাবাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচারে গুনগত পরিবর্তন আসবে, আসতে বাধ্য।

 

লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

 

Email: [email protected]

(লেখকের নিজস্ব মতামত)

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status