মত-মতান্তর
রাখাইন রাজ্যকে ‘মুক্ত’ করার অঙ্গীকার আরাকান বাহিনীর
মাইকেল এফ. মার্টিন
(১ মাস আগে) ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, শনিবার, ১২:১৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

রাজধানী সিত্তে ও বন্দর শহর কিয়াউকপিউ বাদে আরাকান সম্প্রদায়ের জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় পুরো রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের গোড়ার দিকের একটি প্রেস রিপোর্টে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, রাখাইন রাজ্যের ১৭টি শহরের মধ্যে ১৩টি (বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সমস্ত শহরসহ) এবং পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের পালেতোয়া শহরতলি নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি।
২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর আরাকান আর্মি দাবি করে যে, তারা রাখাইনের অ্যান টাউনশিপে অবস্থিত পশ্চিম সামরিক কমান্ডের সদর দপ্তর দখল করেছে। ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আরাকান আর্মি জানিয়েছে, অ্যান টাউনশিপের পাশাপাশি আইয়ারওয়াদি, বাগো ও ম্যাগওয়ে অঞ্চলে সামরিক জান্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
চলতি ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে আরাকান আর্মি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যা সম্ভাব্যভাবে সিত্তে শহরকে কেন্দ্র করে ছিল। রাজধানীর উপকণ্ঠে আরাকান আর্মি ও সামরিক জান্তার মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে বলে জানা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে সিত্তে আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে আরাকান আর্মি জান্তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নির্ণয় করার চেষ্টা করছে। রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি আরাকান আর্মি সম্প্রতি ম্যাগওয়ে অঞ্চলে জান্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। রাখাইন রাজ্যের অবশিষ্ট জান্তা বাহিনী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তারা সৈন্য, অস্ত্র এবং অন্যান্য সরবরাহের জন্য বিমানে পাঠানো সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে জান্তা অফিসার এবং সৈন্যদের পক্ষত্যাগ করলে বা আত্মসমর্পণ করলে সেই ব্যক্তিদের দায়মুক্তি প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে আরাকান আর্মি।
আরাকান আর্মির কাছে আত্মসমর্পণকারী একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এক ভিডিওতে বলেছেন, ‘সামরিক বাহিনী কেবল আরাকান আর্মির কাছেই হারবে না, বরং সমস্ত যুদ্ধে সর্বত্র পরাজিত হতে থাকবে।’
যদি সাম্প্রতিক এই প্রবণতা চলতি বছরের বাকি মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকে, তাহলে আরাকান আর্মি অবশেষে রাখাইন রাজ্যের পাশাপাশি চিন রাজ্যের পালেতওয়া টাউনশিপের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। এই ধরনের ঘটনাপ্রবাহ মিয়ানমারের ভবিষ্যতের জন্য বেশ গুরুতর প্রভাব ফেলবে। আরাকান আর্মি ইতিমধ্যেই তাদের নিয়ন্ত্রিত রাখাইন শহরতলীতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করছে। এই স্থানীয় সরকারগুলোর প্রকৃতি কেমন সে সম্পর্কে খুব কমই রিপোর্ট করা হয়েছে। আরাকান ব্যতীত অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক প্রতিনিধি এবং অন্তর্ভুক্তির স্তর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। মিয়ানমারের যেসব এলাকাকে তারা আরাকান মাতৃভূমির অংশ বলে মনে করে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ অর্জনের পর আরাকান সেনাবাহিনী জান্তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে কিনা তাও দেখার বিষয়।
চিন রাজ্যের পালেতোয়া দখলের অভিযোগ, আরাকান আর্মির দাবির ওপর ভিত্তি করে যে শহরটি ঐতিহাসিকভাবে রাখাইন রাজ্যের অংশ ছিল। ম্যাগওয়ে অঞ্চলে আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক আক্রমণগুলো ইঙ্গিত করে যে, ঐ অঞ্চলগুলো একটি নতুন আরাকান রাজ্যের অংশ হতে পারে। অন্যদিকে, ম্যাগওয়ে অঞ্চলে আরাকান আর্মির সামরিক অভিযান ছাড়াও ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি দ্বারা পরিচালিত আয়ারওয়াদি এবং সাগাইং অঞ্চলে অন্যান্য আক্রমণ-সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের বিপ্লবে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
মিয়ানমারে একটি সম্ভাব্য পুনর্গঠিত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে যোগদানের বিষয়ে আরাকান আর্মির মনোভাব আরেকটি সমস্যার বিষয়। ২০১৮ সালের সংবিধানের অধীনে শান রাজ্যে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির সাথে জান্তা যে আচরণ করেছিল, অনুরূপভাবে আরাকান আর্মি পূর্বে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। যদি ধরে নেয়া হয় যে, আরাকান আর্মি পুরো রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তাহলেও এই ধরনের ব্যবস্থা আর গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। পরিবর্তে, আরকান আর্মি সামরিক জান্তার পরাজয়ের পর জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দ্বারা গঠিত যেকোনো নতুন প্রজাতন্ত্রে একটি পৃথক রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চাইতে পারে। এছাড়া, আরাকান আর্মি একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি চাইতে পারে।
রাখাইন রাজ্যের পর আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে। রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির সৈন্যরা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। আরাকান আর্মি জানিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাগত জানাবে কিন্তু কীভাবে এই প্রত্যাবাসন ঘটবে বা আরাকান আর্মি শাসনের অধীনে প্রত্যাবর্তনকারী রোহিঙ্গারা কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে সে সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এটা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে যে অনেক রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় রাখাইন রাজ্যে ফিরে গিয়ে আরাকান আর্মি পরিচালিত সরকারের অধীনে বসবাস করবে।
নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ফলে রাখাইন রাজ্যের ভবিষ্যৎ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএডি) কর্তৃক প্রদত্ত মানবিক সহায়তা স্থগিত করার ফলে বাংলাদেশ, ভারত ও থাইল্যান্ডে লাখ লাখ বার্মিজ শরণার্থীর মৌলিক খাদ্য এবং চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে অপুষ্টি ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছে। মিয়ানমারে প্রতিরোধ আন্দোলন নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সমর্থনও বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। একইভাবে, বার্মিজ শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি স্থগিতকরণ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বার্মিজ শরণার্থীদের অনিশ্চিত অভিবাসন অবস্থা শত শত মানুষকে বিপদের মধ্যে ফেলছে।
আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ( International Emergency Economic Powers Act বা IEEPA)-এর অধীনে বার্মায় আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা পুনর্নবীকরণ ট্রাম্প প্রশাসনের মিয়ানমার নীতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এই পুনর্নবীকরণ সামরিক জান্তা এবং তার সমর্থকদের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করতে অথবা বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলো অপসারণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করে মিয়ানমারের পূর্ববর্তী সামরিক জান্তাদের ওপর বিদ্যমান বেশিরভাগ নিষেধাজ্ঞা অপসারণ করেছিলেন।
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, ২০২৫ সালটি রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী এবং নির্বাসিত আনুমানিক দশ লাখ রোহিঙ্গার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে পারে। কারো কারো জন্য এটি উদযাপন এবং মুক্তির বছর হতে পারে। অন্যদের ক্ষেত্রে, এটি তাদের নিজ গ্রাম ও শহরে নিরাপদ এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। অথবা এটি যুদ্ধ, সহিংসতা ও মৃত্যুর আরও একটি বছর হতে পারে যেখানে শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ।
লেখক: ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রোগ্রামের একজন ফেলো।
সূত্র: সিএসআইএস