ঢাকা, ১৪ জুলাই ২০২৪, রবিবার, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৭ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

আন্তর্জাতিক

কনজারভেটিভ পার্টির পরাজয়ের নেপথ্যে

মোহাম্মদ আবুল হোসেন
৭ জুলাই ২০২৪, রবিবারmzamin

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলউইন হ্যাটফিল্ডে ১৯ বছর ধরে এমপি। তিনিও টোরিদের সমালোচনা করেছেন প্রকাশ্যে। বলেছেন, নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য সমাধানে অক্ষম ছিলেন তারা। তিনি একে সীমাহীন এক ‘সোপ অপেরা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও বলেন, আমার কাছে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার একটা জিনিস। তাহলো লেবাররা এত আসনে জিততো না, যদি কনজারভেটিভরা পরাজিত না হতেন। আমাদের মতবিরোধ মিটিয়ে ফেলতে অক্ষমতার কারণে ভোটাররা হতাশ হয়েছেন। তারা জানিয়ে দিয়েছেন, যদি আপনারা একে অন্যের সঙ্গে একমত হতে না পারেন, তাহলে আপনাদেরকে ভোট দিতে আমরাও একমত নই।


স্টারমার সুনামিতে ভেসে গেছে কনজারভেটিভ পার্টি। এমনটা যে হতে পারে তা আগে থেকেই ঠাহর করা যাচ্ছিল। কারণ, দলটি ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকার সময়ে ব্রেক্সিট থেকে শুরু করে নানাবিধ ইস্যুতে ব্যাপক বিতর্কে জড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন
এমনকি করোনা মহামারির সময়ে লকডাউনের সময় তখনকার প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের মতো ব্যক্তি আইন লঙ্ঘন করে পার্টি করেছেন গোপনে। তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত যেমন বাইরের কোনো কিছুর সহায়তা ছাড়াই উদ্‌গীরণ ঘটে, ঠিক তেমনি তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। একে অভিহিত করা হয়েছে পার্টিগেট কেলেঙ্কারি হিসেবে। এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতা হারান বরিস জনসন। দলটি শুধু এই ইস্যু নয় আরও অনেক ইস্যুতে বিতর্কিত হয়ে পড়ে। দলের ভেতরেই বিভক্তি দেখা দেয়। এক নেতা অন্য নেতার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তো সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। বলা হয়, তার সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যানকে বরখাস্ত করতে। 

১০ ডাউনিং স্ট্রিটের অনুমতি না নিয়ে তিনি একটি বিতর্কিত ইস্যুতে লিখেছিলেন। ওই লেখায় তিনি মেট্রোপলিটন পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন। এর ফলে বিরোধী ৫টি দল একজোট হয়ে তাকে বরখাস্ত করতে ঋষি সুনাকের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। ওই লেখায় ব্রেভারম্যান অভিযোগ করেন- ডাউনিং স্ট্রিটকে এড়িয়ে পুলিশ ফিলিস্তিনপন্থি প্রতিবাদ বিক্ষোভের বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে। দ্য টাইমসে তিনি লেখেন- আমি মনে করি না এইসব বিক্ষোভকারী গাজায় সহায়তার জন্য বিক্ষোভ করছে না। গাজার সমর্থনে বিক্ষোভকে তিনি ঘৃণাপ্রসূত বিক্ষোভ বলে অভিহিত করেন। ঋষি সুনাক মন্ত্রিপরিষদ ঢেলে সাজানোর মুহূর্তে ডানপন্থি কিছু এমপি তাকে সতর্ক করেন যে, দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারেন ব্রেভারম্যান। পার্লামেন্টে ব্রেভারম্যানের মিত্ররা তাকে সমর্থন দিয়েছে। তারা বুঝাতে চাইছে ব্রেভারম্যানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলে তারা একসঙ্গে তা প্রতিরোধ করবে। উপরন্তু ঋষি সুনাককে কিছু এমপি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের পর তার নেতৃত্বের বিষয়ে ব্রেভারম্যানের অবদান কী। বিতর্কের মধ্যেই ব্রেভারম্যানের প্রতি ডাউনিং স্ট্রিট সমর্থন প্রকাশ করে। এরই মধ্যে ব্রেভারম্যান কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের জন্য লড়াই করতে পারেন বলেও দলের ভেতর গুঞ্জন ওঠে। ফলে দলের ভেতর দলীয় সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। এ খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। দেশের অর্থনীতি, দলীয় দ্বন্দ্ব সবকিছু মিলে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক আকস্মিক আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেন। বিরোধী লেবার দল সেই দুর্বলতাকে লুফে নেয়। এ অবস্থায় কনজারভেটিভ পার্টি যে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং বরিস জনসনের পার্টিগেট কেলেঙ্কারিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ভোটাররা। তারই প্রতিদান দিয়েছেন তারা ৪ঠা জুলাইয়ের জাতীয় নির্বাচনে। 

নির্বাচনের পর দলটির ভেতরকার বিরোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ৫ই জুলাই প্রকাশিত এক রিপোর্টে সেদিকে জোর দেয়া হয়। সেই রিপোর্টের শিরোনাম- ‘টোরি ইনফাইটিং বিগিনস অ্যাজ ঋষি সুনাক লিডস পার্টি টু রেকর্ড ব্রেকিং ডিফিট’। অর্থাৎ রেকর্ড ভাঙা পরাজয়ে ঋষি সুনাক যখন দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন টোরি দলের ভেতরেই লড়াই শুরু হয়ে গেছে। দলটির ভেতরকার ডান ও বামপন্থিরা তাদের দলের ভবিষ্যৎ গতিবিধি নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ইতিহাসে তারা লেবার দলের কাছে পরাজয়ের সবচেয়ে বড় রেকর্ড গড়েছে। আবারো দলের ভেতর ডানপন্থি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান প্রকাশ্যে আসেন। তিনি ভোটারদের থেকে কনজারভেটিভ পার্টি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে দু’বার ক্ষমা চান। তিনি বলেন, দেশের নির্বাচনের ফল নিয়ে সংক্ষেপে কথা বলতে চাই। একটিই কথা বলতে পারি আমি। তাহলো- সরি, আই অ্যাম সরি। আমি এ জন্য দুঃখিত যে, আমার দল আপনাদের কথা শোনেনি। আপনাদেরকে পাত্তা দেয়নি কনজারভেটিভ পার্টি। 

১৪ বছর ধরে বৃটেনের মহান ভোটাররা আমাদেরকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু আমরা প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি। আমরা এমন আচরণ করেছি যে, আমরা দেখাতে চেয়েছি আপনাদের ভোটের তোয়াক্কা করি না। আমরা কি করতে পারিনি, তারও তোয়াক্কা করিনি। কিন্তু বার বার আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, এটা ওটা সব করবো। এখন আমাদেরকে শিক্ষা নিতে হবে। কারণ, আমরা শিক্ষা নিইনি। এই নির্বাচনের চেয়েও খারাপ সময় সামনে আসছে দলের জন্য। দেশ এর চেয়ে ভালো কিছু প্রত্যাশা করে। আমাদেরকে ভালো কিছু করতে হবে। আস্থা পুনর্গঠনের জন্য আমার ক্ষমতার সবটাই করবো। আপনাদের কথা আমাদেরকে শুনতে হবে। আপনারা খুব পরিষ্কারভাবে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলউইন হ্যাটফিল্ডে ১৯ বছর ধরে এমপি। তিনিও টোরিদের সমালোচনা করেছেন প্রকাশ্যে। বলেছেন, নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য সমাধানে অক্ষম ছিলেন তারা। তিনি একে সীমাহীন এক ‘সোপ অপেরা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও বলেন, আমার কাছে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার একটা জিনিস। তাহলো লেবাররা এত আসনে জিততো না, যদি কনজারভেটিভরা পরাজিত না হতেন। আমাদের মতবিরোধ মিটিয়ে ফেলতে অক্ষমতার কারণে ভোটাররা হতাশ হয়েছেন। তারা জানিয়ে দিয়েছেন, যদি আপনারা একে অন্যের সঙ্গে একমত হতে না পারেন, তাহলে আপনাদেরকে ভোট দিতে আমরাও একমত নই। আমরা রাজনীতির মৌলিক নিয়মগুলো ভুলে গিয়েছি। সেটা হলো একটি বিভক্ত দলকে জনগণ ভোট দেয় না।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ/ তাসে কি তবে টোকা লেগেছে?

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status