ঢাকা, ১২ জুলাই ২০২৪, শুক্রবার, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

শেষের পাতা

রাতের বর্ষণে তলিয়ে গেল সিলেট নগর

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
৪ জুন ২০২৪, মঙ্গলবারmzamin

পানিবন্দি সিলেটে ভোগান্তি -ছবি মাহমুদ হোসেন

শঙ্কা ছিল বৃষ্টির। এক রাতে সিলেটে হলো অতিবৃষ্টি। ২৪ ঘণ্টায় ২৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি। এতেই তলিয়ে গেল নগরের অর্ধেক এলাকা। ভোরের আলো ফুটতেই অন্য দৃশ্য পড়লো চোখে। অনেক জায়গায়ই পানি। বাসা-বাড়িতে আটকা মানুষ। সড়কে সড়কে হাঁটু পানি। রাস্তাঘাট ফাঁকা। তখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিলো।

বিজ্ঞাপন
চললো দুপুর পর্যন্ত। নগরের উপশহর, সুবহানীঘাট, যতরপুর, মাছিমপুর, ছড়ারপাড় এলাকায় গত ৫ দিন ধরে ছিল পানি। নগরের নিম্নাঞ্চল উজানের ঢলে আগেই প্লাবিত। ফলে নগর জুড়ে রাতে হওয়া অতিবৃষ্টির পানি জমে যায়। এতে উপশহরসহ অনেক এলাকার মূল সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। গলিপথে কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর পারিমাণ পানি। দুপুরে নগরের উপশহরের রোজভিউ পয়েন্ট পাড়ি দিতে চোখে পড়লো পানির সমুদ্র। মূল সড়ক জুড়ে পানি আর পানি। ডানে বামে এ, বি, সি, ডি, ই ব্লকের সব গলি, উপ-গলিপথ পানিতে টইটুম্বুর। সুনসান নীরব এলাকা। মানুষজন বাসায় বাসায় বন্দি। পানির কারণে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। ডি ব্লকের নিজের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাউন্সিলর ফজলে রাব্বি চৌধুরী মাসুম। তিনি জানালেন; উপশহরের বাসিন্দারা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। মধ্যরাত থেকে সুরমা উপচে হু-হু করে পানি ঢুকতে থাকে। একই সঙ্গে হচ্ছিলো তুমুল বর্ষণ। বের হওয়ার সুযোগ ছিল না কারও। এই অবস্থায়ই উপশহরের ৯০ ভাগ এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। পানি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় বিদ্যুৎও। ভুতুড়ে পরিবেশ। এই অবস্থায় তিনিসহ সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা বিভিন্ন ড্রেনের ময়লা অপসারণের কাজ করছিলেন। বি ব্লকের মসজিদের পেছনের অংশে ছিল কোমর পানি। অনেক মানুষ বাসায় বন্দি। বেসরকারি চাকুরে নুরুজ্জামান জানালেন; নিচতলায় তিনি ছিলেন। শেষ রাতে তার বাসায় পানি ঢুকে পড়ে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি খাটের উপর ছিলেন। সকালে খাটের উপরও পানি চলে আসে। ঘরের সব আসবাবপত্র ভিজে গেছে। উপশহরের মতো নগরের অন্তত ২০টি স্থানে পানি ঢুকে। বেলা তখন ১১টা। নগরের তালতলা এলাকা ছিল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। সপ্তদীপা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সিলেট নগর আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক রজতকান্তি গুপ্ত। দাঁড়িয়ে ছিলেন গলির মুখে। জানালেন;  রাতে বাসায় পানি উঠেছিল। নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন তিনি। সকালের দিকে ঘর থেকে পানি নামলেও উঠানে রাস্তায় পানি ছিল। এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দুপুরে নগরের বন্যার্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। 

এ সময় সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মখলিসুর রহমান কামরান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- নগরে যেসব আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোতে খাবার দেয়া হচ্ছে। নতুন খোলা আশ্রয়কেন্দ্রে রাত থেকে রান্না করা খাবার দেয়া হবে। প্রয়োজন হলে আরও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে বলে জানান তিনি। এক রাতের বর্ষণে নগর পানিতে ডুবে গেলেও সিলেট জেলার পরিস্থিতি ভালো ছিল। উজানের পানি নামছে। অতি বর্ষণের কারণে নগরের প্রায় সব ওয়ার্ডের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছিল। ভোররাতে নগরের বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এতে করে বহু মানুষের বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। তবে সকালের দিকে নগরের উজান এলাকার পানি নেমে যায়। নতুন করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। সকালে সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কয়েকশ’ শ্রমিক ড্রেন ও ছড়ার ময়লা অপসারণে কাজ শুরু করা হয়। বিকালের মধ্যে বেশির ভাগ এলাকার ময়লা সরানো হয়। ময়লা অপসারণের কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জানিয়েছেন- নগরের ড্রেন ও বাসাবাড়ির পলিথিনসহ ময়লা এসে ছড়া ও খালের কালভার্টের মুখে জমা হয়েছিল। এতে পানি নিষ্কাশনে বাধার সৃষ্টি হয়। কয়েকশ’ কর্মী একসঙ্গে নগরের বিভিন্ন এলাকায় কাজ শুরু করেন। বিকালের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যায়। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- জেলার মধ্যে সিলেট নগরেই বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অতি বর্ষণের কারণে নগরে পানি উঠেছে। তবে জেলার অন্যান্য এলাকা থেকে পানি কমেছে। বিশেষ করে কানাইঘাটে সুরমা ও জকিগঞ্জে অমলসীদের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে- গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার ২৭৮ জন বানবাসী মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়েছেন। তবে এখনো জেলার ৫৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৩৮৪ জন বানবাসী মানুষ রয়েছেন। জেলার ৭টি উপজেলার ৮৭টি ইউনিয়নের ৭৬১টি গ্রামের ৬ লাখ মানুষ এবারের বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। 

সতর্ক সিসিক: গত রোববার রাত থেকে টানা বর্ষণে প্রায় ২৮টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন। নগরীর প্লাবিত এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন নগর ভবন কর্তৃপক্ষের। প্রায় ১০ হাজার পরিবার বন্যায় প্লাবিত হয়েছেন। গতকাল সকাল থেকে স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে বন্যায় আক্রান্তদের মাঝে শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সকাল ১১টা পর্যন্ত আগের দুটি আশ্রয় কেন্দ্রের সঙ্গে ২৬নং ওয়ার্ডে আরও ১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এদিকে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. মখলিছুর রহমান কামরান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাগণ গতকাল দুপুর ২টায় নগরীর মিরাবাজার, তেররতন, উপশহর হয়ে সিটি করপোরেশনের অন্তর্গত দক্ষিণ সুরমার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন তারা। এ সময় তারা আশ্রয়কেন্দ্রসহ পানিবন্দিদের খোঁজখবর নেন। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত রোস্টার ডিউটি পালন করবেন সিসিকের কর্মকর্তাগণ। জরুরি সেবায় কন্ট্রোলরুম যোগাযোগের ফোন নম্বর (০১৯৫৮-২৮৪৮০০) ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে। সিলেট সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর জানিয়েছেন- রোববার মধ্যরাত থেকে টানাবর্ষণ হচ্ছে। সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন করে আরও কয়েকটি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। নগরীর ২৬নং ওয়ার্ডে এরও ১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সকাল থেকে নগরীর প্লাবিত এলাকাগুলোতে কাউন্সিলরদের মাধ্যমে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। আজ রাতে ওইসব এলাকায় রান্না করা খাবার দেয়া হবে। নগরীর সকল ওয়ার্ডের স্থানীয় কাউন্সিলরদের সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে নগর ভবন। তিনি আরও জানান, সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে নগরীর ছড়া-খাল পানি ভরে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চল ওয়ার্ডসমূহে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নির্দেশে সব ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সিসিক। আশ্রয়কেন্দ্রসহ ত্রাণ সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে সিসিক কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে ৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। ১৫নং ওয়ার্ডে কিশোরী মোহন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, রামকৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয়, বসন্ত মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, মওদুদ আহমের বাসায় আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। ১৩নং ওয়ার্ড মির্জা জাঙ্গাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ২৪নং ওয়ার্ড তেররতন স্কুল, ওমর শাহ স্কুল ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ঘাসিটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউসেফ ঘাসিটুলা স্কুল, জালালাবাদ মডেল স্কুল, মঈনুদ্দিন মহিলা কলেজ, কানিশাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন কাউন্সিলর তাদের নিজ বাসভবনে পানিবন্দি মানুষকে আশ্রয় প্রদান করছেন। ইতিমধ্যে মহানগরীতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। 
 

পাঠকের মতামত

খবরটি বিশ্লেষণ করলে বলতে হয় বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের খাল গুলি দখল করে ফেলেছেন আমাদের মহামান্য বুজুর্গরা । তাদের ভিটা বড় করার জ্ঞান থাকলে এর কুফল সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান নাই।

Kazi
৪ জুন ২০২৪, মঙ্গলবার, ৭:৩৫ পূর্বাহ্ন

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status