ঢাকা, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ৩ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

হালফিল বৃত্তান্ত

খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে আমরাও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি

ড. মাহফুজ পারভেজ
১২ মার্চ ২০২৪, মঙ্গলবার
mzamin

মানবিক বিপর্যয়ের এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও খাদ্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধিতে চরম মানবিক বিপর্যয়ের আদিঅন্তহীন নগ্ন পদধ্বনির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এই আশঙ্কা যেন সত্যে পরিণত না হয়, সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের পক্ষে। মনে রাখা দরকার, ‘অধরা ও অদেখা বাজার সিন্ডিকেট’ নানা কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কয়েকটি বড় কোম্পানিই বিদেশ থেকে খাদ্যপণ্য আমদানি করে থাকে এবং তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। যখন এসব বড় ব্যবসায়ী মনে করেন সরকার তাদের ওপর নির্ভরশীল, তখন তারা ক্রেতাসাধারণের স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের স্বার্থ বড় করে দেখেন এদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
বিশেষত, কোনো পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা অমার্জনীয় অপরাধ।

মানবিক বিপর্যয় কেন হয়? কখন হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই যুদ্ধকে দায়ী করবেন। কেউ কেউ বলবেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা। কিন্তু খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে যে চরম মানবিক বিপর্যয় হতে পারে, তা অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় তাৎক্ষণিক সামনে চলে আসে। আর খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় সুপ্ত আকারে ও ধীর লয়ে হতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষ বিপদাপন্ন হয়। দরিদ্র হয়ে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

বিজ্ঞাপন
সমাজে নেমে আসে মানবিক বিপর্যয়। আর এই বিপর্যয় কোনোক্রমেই যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়।
তাদের গবেষণা অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, যখন কোনো দেশে খাদ্যের দাম রেকর্ড উচ্চতায় থাকে, তখন সেখানে শুধু আর্থিক বিপর্যয়ই হয় না, চরম মানবিক বিপর্যয়ও শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে খাদ্যের দাম নানা কারণে ১০-১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। আর তা নানাভাবে সরকারি উদ্যোগে, বিশেষ করে, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে ও মজুরি বাড়িয়ে সামাল দেয়াও সম্ভব হয়। 

কিন্তু যদি দাম বাড়তে থাকে লাগামছাড়া আর সেই সঙ্গে চলে মুদ্রাস্ফীতি, তাহলে পরিস্থিতি অসহনীয় রূপ ধারণ করে। ‘মানবজমিন’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে শুরু হচ্ছে মাহে রমজান। রোজায় প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ক্রেতারা এখন ব্যস্ত। কিন্তু বাজারে প্রায় সবকিছুর দামই চড়া। প্রতি বছর দাম বাড়বে এটা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে খেজুর, চিনি, শরবতের জন্য লেবু, সব ধরনের মাছসহ মুরগির দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। গরুর মাংস কেজিতেই বেড়ে গেছে অন্তত ১০০ টাকা। ছোলার দামও বেড়েছে। এ ছাড়া সবজির দাম কিছুটা কমলেও ইফতারি তৈরিতে ব্যবহৃত এমন সবজির দাম এখন বাড়তির দিকে। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও কোনো পণ্যের দাম কমার লক্ষণ নেই। উল্টো কিছু পণ্যের দাম বেড়েই চলছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। কয়েক মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের আশপাশেই আছে। এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে চাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কোনো বাজারই সরকারের নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে না। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর থেকেই সাধারণ মানুষ পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অতিমূল্যের রোষানলে। এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। বৃদ্ধির এই হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির অসহনীয় কষ্টের নাভিশ্বাস থেকে বাঁচার উপায় কী? সাধারণ মানুষ জানে না, জীবন চালাতে এই বাড়তি অর্থ কোথায় পাবে তারা?

বাংলাদেশকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে এজন্য যে, বিগত ২০২৩ সালে রেকর্ডসংখ্যক মানবিক বিপর্যয় দেখেছে বিশ্ব। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে যত মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে তত সংখ্যক বিপর্যয় বা দুর্যোগ গত এক দশকের মধ্যে ঘটেনি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সদ্য বিদায় নেয়া বছরটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অন্তত ২৯টি দেশ প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে ৪৩ বার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের বড় এবং উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের একটি তালিকাও করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা। তালিকায় স্থান পেয়েছে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্প, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সুদানের সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক আরএসএফ’র সংঘাত, মে মাসে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মোচা, গাজায় হামাস-ইসরাইল যুদ্ধসহ বিভিন্ন ঘটনা।
ইউএনএইচসিআর’র এক্সটার্নাল রিলেশন্স বিভাগের পরিচালক ডমিনিক হাইড, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈরী আবহাওয়ার পাশাপাশি সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কোটি কোটি পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করার পাশাপাশি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার জন্য হাত পাততে বাধ্য করেছে। বস্তুত ২০২৩ সালে দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বের অজস্র মানুষকে যে ভয়াবহ ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে- তা এক কথায় অবর্ণনীয়।’

প্রতিবেদনে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের মোট বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থী লোকজনের সঙ্গে যোগ হয়েছে মোট ১১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। এর আগে বিশ্বে এক বছরে এতসংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। আশঙ্কার বিষয় হলো, চলতি বছর এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইউএনএইচসিআর’র হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও ১৩ কোটি মানুষ।

এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। একই বছর লিবিয়ার ৫ প্রদেশে প্রবল বর্ষণ এবং বানের জলে বাড়িঘর ও সহায় সম্পদ হারিয়েছেন ৯ লাখ মনুষ। ঘুর্ণিঝড় মোচার জেরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ১ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে সুদানে। সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর সংঘাতে উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৭০ লাখ মানুষ।

এ ছাড়া অক্টোবরে হেরাত প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্পের জেরে বাড়িঘর হারিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন ১ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিক। আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সংঘাতের কারণে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন আজারবাইজানের নাগোরনো-কারাবাখ এলাকার ১ লাখেরও বেশি মানুষ। মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডি আর) কঙ্গোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ।

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত বছরজুড়ে এসব দুর্যোগের ক্ষেত্রে সংস্থার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়া এবং সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশে ইউএইএইসিআর পরিচালিত শরণার্থী শিবিরগুলোতে বর্তমানে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ আশ্রিত অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

মানবিক বিপর্যয়ের এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও খাদ্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধিতে চরম মানবিক বিপর্যয়ের আদিঅন্তহীন নগ্ন পদধ্বনির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এই আশঙ্কা যেন সত্যে পরিণত না হয়, সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের পক্ষে। মনে রাখা দরকার, ‘অধরা ও অদেখা বাজার সিন্ডিকেট’ নানা কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কয়েকটি বড় কোম্পানিই বিদেশ থেকে খাদ্যপণ্য আমদানি করে থাকে এবং তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। যখন এসব বড় ব্যবসায়ী মনে করেন সরকার তাদের ওপর নির্ভরশীল, তখন তারা ক্রেতাসাধারণের স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের স্বার্থ বড় করে দেখেন। এদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

বিশেষত, কোনো পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা অমার্জনীয় অপরাধ।  সেটি কারা করেছে, খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। এ বিষয়ে সরকারের টেকসই কোনো পদক্ষেপের কথা জানা নেই। যখনই বাজারে কোনো পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, বিক্ষিপ্তভাবে অভিযান চালাতে দেখা যায়। দু’চারজন চুনোপুঁটিকে জরিমানা করা হলেও রাঘব বোয়ালেরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই মুনাফা করবেন, কিন্তু সেই মুনাফা লাগামছাড়া হতে পারে না। কিছু নিয়মকানুনের মধ্যেই তাদের ব্যবসা করতে হবে। যেসব দেশে সরকারের নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার রয়েছে, সেসব দেশে ব্যবসায়ীরা কারসাজি করতে পারেন না। আমাদের দেশে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। যার সুযোগ নেয় অসৎ ব্যবসায়ী মহল। কিন্তু তাদের বাড়-বাড়ন্ত মানবিক বিপর্যয়ের কারণ সৃষ্টি করলে তা সহ্য করা মোটেও সমীচীন হবে না।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status