ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০২৪, সোমবার, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

শেষের পাতা

উপজেলা নির্বাচন

সর্বনিম্ন ভোটে জয়ের রেকর্ড

মো. আল-আমিন
১৫ জুন ২০২৪, শনিবারmzamin

সদ্য অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের হার আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। পাঁচ ধাপের এই নির্বাচনে গড় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি। যা আগের ৫টি উপজেলা নির্বাচনের মধ্যে সর্বনিম্ন। ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় এবার বেশির ভাগ চেয়ারম্যানরাই কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে পাওয়া ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ চেয়ারম্যানই ৩০ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে ২০ শতাংশের কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ৫৭ শতাংশ চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ১০ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়েও অনেকে চেয়ারম্যান হয়েছেন। তাদেরই একজন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মো. মোস্তফা মহসিন। তিনি তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের মাত্র ৬ দশমিক ৮০ শতাংশের ভোট পেয়েছেন। ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সবচেয়ে কম জনসমর্থন পেয়েছেন তিনিই।

বিজ্ঞাপন
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন। কম ভোট পেয়ে যদি চেয়ারম্যানরা স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পান, তাতে আইনগত বাধা না থাকলেও নৈতিকভাবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

প্রথম ধাপে ৩০ শতাংশ জনসমর্থন পায়নি ৯১ শতাংশ জয়ী চেয়ারম্যান: প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ৩০ শতাংশের কম জনসমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন অন্তত ১২৬ জন। এরমধ্যে ২০ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়েছে ৮১ জন এবং ১৫ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়েছে ৪৫ জন জয়ী চেয়ারম্যান। প্রথম ধাপে মোট ১৩৯ উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেই হিসেবে এই ধাপে ৯১ শতাংশ জয়ী চেয়ারম্যান ৩০ শতাংশ জনসমর্থন পাননি। এদিকে প্রথম ধাপে যারা ১০ শতাংশের কম সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন, তাদের একজন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার মোহাম্মদ সোহেল আহম্মদ চৌধুরী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই উপজেলায় মোট ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭ জন। এরমধ্যে ভোট দিয়েছেন ৬০ হাজার ৪১৯ জন। মোহাম্মদ সোহেল আহম্মদ চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছেন ১৩ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে। অর্থাৎ তিনি তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের মাত্র ৭ দশমিক ০৮ শতাংশের ভোট পেয়েছেন। ফরিদপুর সদর উপজেলায় মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৮ হাজার ৬৮০ জন। এরমধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ২০৪ জন। এই উপজেলার শামসুল আলম চৌধুরী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ৩২ হাজার ৩১৮ ভোট পেয়ে। অর্থাৎ তিনি তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশের ভোট পেয়েছেন। এ ছাড়া যশোরের কেশবপুর উপজেলা মো. মফিজুর রহমান ৮.৩৫ শতাংশ, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মোহাম্মদ এনায়েত হোসেনসহ ৭ জন ১০ শতাংশের নিচে ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে ১৩৯ চেয়ারম্যানের মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র  ১৩ জন। 

দ্বিতীয় ধাপে ২০ শতাংশের কম জনসমর্থন নিয়ে ৮৮ জন উপজেলা চেয়ারম্যান: দ্বিতীয় ধাপের ২০ শতাংশের কম জনসমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন অন্তত ৮৮ জন এবং ৩০ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়েছে ১৫৬ জন। এরমধ্যে ১৫ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়েছে ৪০ জন। এই ধাপে ১৫৬টি উপজেলায় ভোট হয়। এই ধাপে যারা ২০ শতাংশের কম সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের একজন গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর এ কে এম মোকছেদ চৌধুরী। ইসি’র তথ্য অনুযায়ী, এই উপজেলায় মোট ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ২০৯ জন। এরমধ্যে ভোট দিয়েছেন ৬৭ হাজার ২৯৩ জন। মোকছেদ চৌধুরী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ১৯ হাজার ৫৯৫ ভোট পেয়ে। অর্থাৎ তিনি তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের মাত্র ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশের ভোট পেয়েছেন। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ২৬ হাজার ৫৮৮ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তার উপজেলায় মোট ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯০ জন। সে হিসাবে তিনি পেয়েছেন মোট ভোটারের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশের ভোট। অন্যদিকে এই ধাপে সবচেয়ে বেশি ৪৪.৩৪ শতাংশ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চন্দ্র দেব চাকমা। 

তৃতীয় ধাপে ২০ শতাংশের কম ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান ৪৮ জন: তৃতীয় ধাপে মোট ভোটারের ২০ শতাংশের কম জনসমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন অন্তত ৪৮ জন। তাদের মধ্যে ৭ জন জয়ী হয়েছেন ১০ শতাংশের কম জনসমর্থন পেয়ে। এ ছাড়া ১৫ শতাংশের কম ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান হয়েছে ৩৬ জন এবং ৩০ শতাংশের বেশি জনসমর্থন পেয়েছেন মাত্র ৫ জন। এদিকে তৃতীয় ধাপে যারা ১০ শতাংশের কম সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের একজন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মো. মোস্তফা মহসিন। ইসি’র তথ্য অনুযায়ী, এই উপজেলায় মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭৯ জন। এরমধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৫৫৭ জন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তফা মহসিন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ২৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে। অর্থাৎ তিনি তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের মাত্র ৬ দশমিক ৮০ শতাংশের ভোট পেয়েছেন। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের উপজেলা নির্বাচনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ১১১। এরমধ্যে ৩৬ হাজার ৬৭৭ জনের ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন শাহেদ শাহরিয়ার। তিনি পেয়েছেন তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশের ভোট। সাতক্ষীরা সদরে ভোট পড়েছে ২৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। এখানে ৩১ হাজার ১৯৬ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মশিউর রহমান। তার উপজেলায় মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৬ হাজার ১৬৩ জন। সে হিসাবে তিনি পেয়েছেন মোট ভোটারের ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশের ভোট। এ ছাড়া বগুড়া সদরের শুভাশিস পোদ্দার, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ, সিলেটের বিয়ানীবাজারের আবুল কাশেম ও টাঙ্গাইল সদরের তোফাজ্জল হোসেন ১০ শতাংশের কম জনসমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে তৃতীয় ধাপে ফেনী সদর, সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলায় বেশি ভোট পড়েছে। ফেনী সদর উপজেলায় ৫১ দশমিক ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন শুসেন চন্দ্র শীল। 

চতুর্থ ধাপে ১৫ শতাংশও জনসমর্থন পায়নি ২৫ শতাংশ চেয়ারম্যান: চতুর্থ ধাপে ১৫ শতাংশের কম ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ১৫ জন। এ ছাড়া ২০ শতাংশের কম ভোট পেয়ে ৩৭ জন এবং ৩০ শতাংশের কম ভোট পেয়ে ৫৫ জন চেয়ারম্যান বিজয়ী হয়েছেন। এই ধাপে ৬০টি উপজেলায় ভোট হয়। অর্থাৎ ৬০ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন চেয়ারম্যান ৩০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। চতুর্থ ধাপে নওগাঁর মান্দা উপজেলায় মাত্র ৭.৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মো. তোফাজ্জল হোসেন। 

পঞ্চম ধাপে কেউ ৩০ শতাংশ জনসমর্থন পাননি: এদিকে পঞ্চম ধাপে অনুষ্ঠিত হওয়া ১৯টি উপজেলায় কোনো বিজয়ী প্রার্থীই ৩০ শতাংশ জনসমর্থন পাননি। এই ধাপে ২০ শতাংশের কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন চেয়ারম্যান। এরমধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন ভোলার লালমোহন উপজেলার মো. আকতারুজ্জামান। তিনি ভোট পেয়েছেন মাত্র ৯.৬৭ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন: এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচন হলো জনগণের সম্মতির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন। অতি অল্প ভোট পেয়ে যদি চেয়ারম্যানরা স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পান, তাতে আইনগত বাধা না থাকলেও নৈতিকভাবে এটি কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অধিকাংশ জনগণের সমর্থন তো দূরের কথা, অধিকাংশ জনগণ ভোট দিতেই যাচ্ছেন না। একদিকে দলগুলোর নির্বাচন বর্জন, অন্যদিকে ভোটার খরা। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status