ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা নেতানিয়াহুর

মোহাম্মদ আবুল হোসেন
৩ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার
mzamin

নেতানিয়াহু জাতিসংঘকে পর্যন্ত অভিযুক্ত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা হামাসকে সহায়তা করছে। তাদের হয়ে কাজ করছে। এ অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘ তদন্ত করছে। তিনি হত্যা করেছেন বিপুল সংখ্যক সাংবাদিককে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বার বার সতর্ক করা হয়েছে গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। মানুষ খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। পশুর খাদ্য পর্যন্ত খাচ্ছেন তারা। পবিত্র এই রমজানেও তাদেরকে এক ঢোক পানি পান করে রোজা রাখতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
এরপরও নিস্তার নেই। তাদের ওপর হায়েনার মতো হামলে পড়ছে নেতানিয়াহুর সেনারা। তারা নির্বিচারে হত্যা করছে। বোনেদের, মায়েদের অন্তর্বাস নিয়ে পশুর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়ে উল্লাস করেছে। এর কোনোটির জন্যই ইসরাইলকে দুঃখিত হতে দেখা যায়নি। তবে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের স্টাফ হত্যার পর যখন সারা দুনিয়া থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে, তখন মিত্র দেশগুলোর কাছে ‘আন্তরিক দুঃখ’ প্রকাশ করেছে ইসরাইল। সামরিক মুখপাত্র ডানিয়েল হাগারি বলেছেন, তিনি ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তার কাছে ইসরাইলের শোক জানিয়েছেন। হামলার এই ঘটনা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তিনি সরাসরি এই হামলার দায় নেননি। বলেছেন, তারা তদন্ত করবেন। তারপর কথা বলবেন।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সত্যি রক্তের নেশায়, হত্যার নেশায় পেয়ে বসেছে। আর একটু বাড়িয়ে বললে বলা যায়, তিনি চাইছেন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে। এর কারণ আছে। তার এখন পিছু হটার উপায় নেই। দেশে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভ। ক্ষমতার মেয়াদ আরও দুই বছর বাকি থাকতেই বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ আগাম নির্বাচন দাবি করে বসেছেন। তেলআবিব, জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন, করছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বনেতারা তাকে সতর্ক করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাকে সতর্ক করেছেন। 

বলেছেন, তিনি গাজায় যেভাবে নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছেন, তাতে বিশ্বদরবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে ইসরাইল। হচ্ছেও তাই। বিভিন্ন দেশ থেকে নেতানিয়াহু সরকারের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করা হচ্ছে। তার মধ্যে সোমবার তার বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ত্রাণ বিষয়ক গ্রুপ ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) স্টাফদের টার্গেট করে কমপক্ষে সাতজন স্টাফকে হত্যা করেছেন। এর মধ্যে আছেন অস্ট্রেলিয়ান সহ বিভিন্ন দেশের স্টাফ। এর বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানেজ, বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাদজা লাহবিব, সাইপ্রাস, মিশর, ইউরোপিয়ান কমিশন, ইরান, জর্ডান, জাতিসংঘের ইমার্জেন্সি ত্রাণ বিষয়ক প্রধান মার্টিন গ্রিফিথস, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, ওপেন আর্মস স্প্যানিশ অর্গানাইজেশন, পোল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেডরোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান সিন্ডি ম্যাককেইন। গাজায় ত্রাণ বিতরণ কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের কর্মীদের ওপর আকাশ থেকে বোমা নিক্ষেপ করে ইসরাইল। এতে নিহতদের মধ্যে আছেন ফিলিস্তিনি, অস্ট্রেলিয়ান, পোল্যান্ড, বৃটেন এবং একজন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার নাগরিক। উপরন্তু চারদিকে যখন বিপদ দেখছেন, তখন এই যুদ্ধে ইরানকে জড়ানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করছেন নেতানিয়াহু। তিনি সোমবার সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত ইরানের কন্স্যুলেটে হামলা চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। এতে রেভ্যুলুশনারি গার্ডের দু’জন শীর্ষ স্থানীয় কমান্ডার সহ নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭ জন। এর পাল্টা জবাব দেয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান। অন্যদিকে লেবাননে যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলার নামে সেখানেও নিরীহ মানুষকে হত্যা করছেন নেতানিয়াহু। মোদ্দাকথা তিনি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। হামাসকে নির্মূলের নামে গাজার পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। তাদেরকে বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। হাসপাতাল, স্কুল, জাতিসংঘ পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্র- কোনো কিছুকেই বাদ দেননি। ২৪ ঘণ্টায় তারা গাজায় হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে কমপক্ষে ৭১ জনকে। আহত হয়েছেন ১০২ জন। এই নিয়ে ৭ই অক্টোবর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩২,৯১৬। অসংখ্য মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। তাদের হদিসও মেলেনি। ফলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কতো, তা কেউ সঠিক করে বলতে পারেন না। ওদিকে প্যালেস্টাইনিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বলেছে, ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের নিহত ৭ কর্মীর মৃতদেহ রাফা সীমান্ত দিয়ে মিশরে পাঠানো হবে। প্রথমে তাদের মৃত্যুর পর মৃতদেহ নেয়া হয় গাজার দিয়ের আল বালাহ শহরে অবস্থিত আল আকসা মার্টিরস হাসপাতাল এবং রাফায় আবু ইউসেফ আল নাজ্জার হাসপাতালে। 

ইসরাইলের এই যে নৃশংসতা, রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়া- এখন তাকে জায়েজ করার জন্য এই লড়াইয়ে তার তীব্র প্রতিপক্ষ ইরানকে টেনে আনার চেষ্টা করছে। এ জন্যই দামেস্কে ইরানের কন্স্যুলেটে হামলা করেছে, যাতে ইরান ক্ষিপ্ত হয়ে লড়তে আসে ইসরাইলের সঙ্গে। এমনি করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। আর এই ফাঁকে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে দিয়ে তিনি মজা লুটবেন। এখনো এসব বিষয়ে চারপাশে থাকা মুসলিম দেশগুলোর ঘুম ভাঙছে না। তারা জোরালো কোনো বার্তা দিচ্ছে না ইসরাইলকে। তবে কি ধরে নেয়া হবে যে, তারা ইসরাইলকে মদত দিচ্ছে! হয়তো না। কিন্তু তাদের চোখের সামনে এভাবে ভাইবোন, মুখে আধো আধো বুলি ফোটা শিশুদের হত্যা করে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে বুক, তা তারা কীভাবে সহ্য করছে! এখানে সবিশেষ একজন মানুষের নাম খুব মনে আসছে। তিনি মাহমুদ আব্বাস। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট। তার দেশের মানুষকে কচু কাটার মতো হত্যা করছে ইসরাইল। অথচ তিনি নিজে নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমান কি করে! কেউ কি দেখেছেন তাকে আন্তর্জাতিক কোনো ফোরামে গিয়ে তার দেশবাসীর পক্ষে জোরালো কোনো বক্তব্য দিতে, যুদ্ধ বন্ধে কোনো উদ্যোগ নিতে! তিনি আছেন রাজপ্রাসাদে বহাল তবিয়তে। তার মুখ থেকে একটি বাণীও বের হচ্ছে না। কেন? গাজার মানুষগুলো কি তার নিয়ন্ত্রণাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ নয়? গাজা নিয়ন্ত্রণ করে আলাদা যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস এবং এই হামাসের কারণেই এই যুদ্ধ। মেনে নিতে কোনো অসুবিধা নেই। এই অজুহাতে হামাসের নাম করে পুরো গাজাকে গোরস্থান বানিয়ে ফেলার লাইসেন্স কি তিনি দিয়ে দিতে পারেন ইসরাইলকে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানরা যখন ইসরাইলি গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার, তীব্র প্রতিবাদ, ধিক্কার জানাচ্ছেন, তখন মাহমুদ আব্বাস নির্বিকার। তাকে টেলিভিশনেও দেখা যায় না। অথচ একবার স্মরণ করুন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারবিজয়ী প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাতের কথা। তিনি ফিলিস্তিনে শান্তি আনতে কি না করেছেন! কার কাছে যাননি। 

নেতানিয়াহু জাতিসংঘকে পর্যন্ত অভিযুক্ত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা হামাসকে সহায়তা করছে। তাদের হয়ে কাজ করছে। এ অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘ তদন্ত করছে। তিনি হত্যা করেছেন বিপুল সংখ্যক সাংবাদিককে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বার বার সতর্ক করা হয়েছে গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। মানুষ খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। পশুর খাদ্য পর্যন্ত খাচ্ছেন তারা। পবিত্র এই রমজানেও তাদেরকে এক ঢোক পানি পান করে রোজা রাখতে হচ্ছে। এরপরও নিস্তার নেই। তাদের ওপর হায়েনার মতো হামলে পড়ছে নেতানিয়াহুর সেনারা। তারা নির্বিচারে হত্যা করছে। বোনেদের, মায়েদের অন্তর্বাস নিয়ে পশুর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়ে উল্লাস করেছে। এর কোনোটির জন্যই ইসরাইলকে দুঃখিত হতে দেখা যায়নি। তবে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের স্টাফ হত্যার পর যখন সারা দুনিয়া থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে, তখন মিত্র দেশগুলোর কাছে ‘আন্তরিক দুঃখ’ প্রকাশ করেছে ইসরাইল। সামরিক মুখপাত্র ডানিয়েল হাগারি বলেছেন, তিনি ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তার কাছে ইসরাইলের শোক জানিয়েছেন। হামলার এই ঘটনা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তিনি সরাসরি এই হামলার দায় নেননি। বলেছেন, তারা তদন্ত করবেন। তারপর কথা বলবেন। 

ওদিকে বার্তা সংস্থা ওয়াফা বলছে, গাজা উপত্যকা জুড়ে ইসরাইলি হামলায় বিপুল পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছেন ২৪ ঘণ্টায়। বোমা হামলা হয়েছে রাফায় একটি বাড়িতে। এতে একই পরিবারের ৬ জন নিহত হয়েছেন। দিয়ের আল বালাহ’তে একটি মসজিদে বিমান থেকে হামলা করা হয়েছে। তাতে বেশ কিছু নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শিশুরাও আছে। খান ইউনুসের কেন্দ্রস্থল ও পূর্বাঞ্চলে বাড়িঘরে গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ মানুষ মারা গেছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নেতানিয়াহু কখন তার যুদ্ধ থামাবেন? তিনি কি পুরো গাজাকে ‘নির্জন দ্বীপে’ পরিণত করবেন? যদি সেটাই তার লক্ষ্য হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য এবং মুসলিমরা চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকুক!

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status