ঢাকা, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ৩ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

মত-মতান্তর

হালফিল বৃত্তান্ত

বলপ্রয়োগের দায়, প্রতিবাদের দাম

ড. মাহফুজ পারভেজ

(১ মাস আগে) ৩ মার্চ ২০২৪, রবিবার, ১:৩২ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

mzamin

সবার দৃষ্টি এখন বেইলি রোডের আগুনে। পুরান ঢাকার নিমতলী থেকে নতুন ঢাকার নাটকপাড়া বেইলি রোড়ের আগুনে স্পষ্ট হলো নগরের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। নাগরিক ও সামাজিক বিপদের অক্টোপাস দশদিক থেকে ঘিরে ধরেছে সবাইকে। এরই মাঝে নিশ্চলা রাজনীতিও উতপ্ত হয় মাঝে মাঝে, যাতে দৃশ্যমান হয় বলপ্রয়োগ ও প্রতিবাদ।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, 'গণতন্ত্র মঞ্চ'কে সামনে আনা যেতে পারে। যাদের নামসর্বস্ব রাজনৈতিক জোট না বললেও ঢাকা-ভিত্তিক সংগঠন বলাই যায়। মঞ্চের ওজন ও শক্তি গণমাধ্যমের শীর্ষ শিরোনামে আসার মতো নয়। তবুও তারা বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) অনেকটা সময় ধরে খবরের শিরোনামে থেকেছে। বলা ভালো, তাদেরকে শিরোনামে নিয়ে এসেছে একটি বলপ্রয়োগের ঘটনা, যা সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে।

কেবল বাধাই নয়, দলটির নেতাকর্মীদের ওপর নির্বিচার লাঠিচার্জ করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে কয়েকজনকে। হামলায় আহত হয়েছেন অনেকেই।

বিজ্ঞাপন
বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাকর্মীরা সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করতে গেলে তারা পুলিশ কর্তৃক আক্রান্ত হয়।

এই ঘটনার ফলে প্রথমত, গণতন্ত্র মঞ্চ সংবাদ শিরোনামের শীর্ষে জায়গা করে নিতে পেরেছে; দ্বিতীয়ত, তাদের দাবিগুলোকে অধিক সংখ্যক মানুষের নজরে আনতে সমর্থ হয়েছে; তৃতীয়ত, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে মর্মে অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ লাভ করেছে।

বলপ্রয়োগ না করে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের সুযোগ দেওয়া হলে গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষে চট করে লাইমলাইটে চলে আসা ও ব্যাপক প্রচার পাওয়া আদৌ সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ। তদুপরি, তাদের তথা বিরোধী দলগুলোর পক্ষে সরকারের সমালোচনা করার আশু ও তরতাজা কারণ খুঁজে পাওয়াও খুব সহজ হতো বলে মনে হয় না।

যেকোনো প্রতিবাদ ও বিরোধিতার ক্ষেত্রে পূর্বাপর বিবেচনা না করে বলপ্রয়োগ ও আক্রমণ করা হলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে বহুবার এমন হয়েছে। কোনো সাধারণ ইস্যু বা ছোটখাটো ঘটনাকে সরকার ও তার নানা সংস্থা মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে সেই ইস্যু বা ঘটনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে দিয়েছে। ছোট বিষয়টিই তখন বড় হয়ে পাহাড়ের মতো চেপে ধরেছে।

গ্রাম্য ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদে 'ছোট ঘটনার বড় প্রতিফল বা মাশুল' দেওয়াকে বলা হয় 'পচা শামুকেই পা কেটেছে'। সচেতন না হলে কখন যে কার পা কাটে, বলা মুস্কিল। বিশেষত, বলপ্রয়োগ আর প্রতিবাদ মুখোমুখি হলে একটি নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন যে কারোই পা কেটে যেতে পারে।

এ কারণেই গণতন্ত্রে প্রতিবাদকে অত্যন্ত সাবধানে সামলাতে হয়। উন্নত গণতন্ত্রে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের অপরিসীম দাম ও গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল তৈরি হয়ে বিপদ না ঘটে।

উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকের অক্ষমতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যদি ক্রমাগত প্রবল ভাবে ধ্বনিত এবং প্রতিধ্বনিত না হয়, গণতন্ত্র কমজোরি হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করা হয়। আবার, ঠিক সেই কারণেই, প্রতিবাদী স্বরকে শাসকরা কতটা মনোযোগ সহকারে শুনছেন, প্রতিবাদের সারবত্তা বুঝতে চেষ্ট করছেন এবং সেই অনুসারে আত্মসংশোধনের চেষ্টা করছেন, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র তার উপর অনেকখানি নির্ভর করে। ফলে বিরোধী মতের প্রতি কেবল সহিষ্ণুতা নয়, মর্যাদাবোধ যথার্থ গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। জনসমর্থন বা নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনওই এই শর্তের বিকল্প হতে পারে না।

প্রতিবাদহীন গণতন্ত্রের বহিরঙ্গ আবরণের আড়ালে স্বৈরশাসন কী ভাবে তার আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, ইতিহাসে তার বিস্তর প্রমাণ আছে, প্রমাণ আছে সমকালীন দুনিয়াতেও। যে সরকার কোনো বিরোধিতাই সহ্য করতে পারে না, যে প্রতিবাদ করে তাকেই দমন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে গণতান্ত্রিক বলা হয় না। প্রতিবাদীদের হেনস্থার নামে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসন যদি সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে তৎপর হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিকে বলা হয় ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু’র সূচক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যত হিংসা এবং বলপ্রয়োগ বেড়েছে, ততই গণতন্ত্রের ধস নেমেছে। এমতাবস্থা আসলে 'প্রকৃত গণতন্ত্র' নয়। মানুষ প্রকৃত গণতন্ত্র চায়। আর প্রকৃত গণতন্ত্র হল সকলের জন্য গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্র মানুষের হাতে অধিক ক্ষমতা আনে। অঞ্চলসমূহের সুষম বিকাশ আনে। নারীর মর্যাদা দেয়। শিশুকল্যাণ, শিক্ষা, মানবাধিকার ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি সূচিত করে। মজুরিবৃদ্ধি করে। শ্রমিকের জীবিকার নিরাপত্তা আনে। কৃষকের জীবনমানের উন্নতি নিশ্চিত করে। নাগরিক সুরক্ষা দেয়।

বাস্তবে তা হচ্ছে না। বিশেষত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধিতার পরিসর কমছে আর এর ফলে গণতন্ত্রের শরীরে কর্তৃত্ববাদের কলঙ্ক লাগছে। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের প্রচারণা চালানোর জন্য গঠিত একটি বৈশ্বিক সংগঠনের মতে, সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের অবক্ষয় হচ্ছে। এর পেছনে সাধারণ মানুষের নির্বাচনের বৈধতায় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার মতো অসংখ্য সমস্যাকে দায়ী করেছে সংগঠনটি।

৩৪টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইন্টারন্যশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমক্র্যাসি এন্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিসটেন্স বা ইন্টারন্যশনাল আইডিয়া একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসনের অবক্ষয়ের পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ফলাফলকে অবমাননা করার প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক দল ও তাদের চলমান বাস্তবতার সঙ্গে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন নেতৃবৃন্দদের বিষয়ে যুব-সমাজের ভ্রান্ত ধারণা এবং একই সঙ্গে উগ্রপন্থী-কর্তৃত্ববাদী চিন্তাধারার উত্থান, যা রাজনীতির মেরুকরণ করেছে।

স্টকহোম ভিত্তিক সংগঠনটি বৈশ্বিক গণতন্ত্র পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে আরো জানিয়েছে, গণতন্ত্রের দিকে ধাবমান দেশের তুলনায় কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা অবলম্বনের পথে রয়েছে এরকম দেশের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়াও, সারা বিশ্বের ক্ষমতাসীন কর্তৃত্ববাদী শাসকরা তাদের শোষণের মাত্রা আরো বাড়িয়েছে, এবং এ বিষয়ে কোভিড-পরবর্তী বছরগুলোর রেকর্ড সবচেয়ে খারাপ।

৬৪ পাতার এই প্রতিবেদনে ১৭৩টি দেশের গণতন্ত্রের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়েছে। প্রতিবেদন মতে, গত ৫ বছরে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে উন্নয়নের ধারা স্থিমিত হয়ে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গণতন্ত্র দুর্বল হচ্ছে এবং কর্তৃত্ববাদ আরো শক্তিশালী হচ্ছে। এই অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও ৮৫ শতাংশ মানুষ এমন দেশে বসবাস করেন, যেখানে গণতন্ত্র দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। সেসব দেশে গণতন্ত্রের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে।

সংগঠনটি আরো জানায়, “বিশ্ব এখন একটি ক্রান্তিলগ্নে রয়েছে”। তাই “উপযুক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা” মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক সংগঠনের সংস্কার ও দেশের নাগরিক ও সরকারের মধ্যে “সামাজিক চুক্তির” বিষয়গুলো নিয়ে নতুন ভাবে চিন্তা করা, যাতে এই দুই পক্ষ নতুন ও বিবর্তনশীল চাহিদা ও দাবির বিপরীতে সঠিক, ইতিবাচক, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিযোগ্য প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর গণতন্ত্রের সূচক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৫টি বিষয় বিবেচনা করা হয়৷ সেগুলো হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক স্বাধীনতা৷ পৃথিবীজুড়ে যেসব দেশে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটেছে বা ঘটছে সে দেশগুলোতে এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ক্ষমতাসীনদের আধিপত্য বিস্তার করতে দেখা যায়৷ বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন শতাব্দীতে অনেক দেশেই নামমাত্র গণতন্ত্র রয়েছে৷ সরাসরি সামরিক সরকার না থাকলেও পর্দার আড়ালে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারগুলো সামরিক একনায়কের মতই আচরণ করে৷ যাদেরকে ‘সিভিলিয়ান অটোক্র্যাট‘ বা ‘বেসামরিক স্বৈরশাসক‘ বলা হচ্ছে৷

মোটামুটিভাবে একটি সাধারণ ধারণা হলো, জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্ব, দায়বদ্ধতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে কোনো শাসনব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলা যায় না৷ বৃহত্তর পরিসরে এই চারটি সূচকের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের সহজ ও সাবলীল প্রক্রিয়া বজায় থাকা৷ কিন্তু নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলেও ক্রমপ্রসারমান কর্তৃত্ববাদী শাসকরা নির্বাচনকেই নিজেদের ক্ষমতাগ্রহণের বৈধতা দেয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে৷ তারপর ক্ষমতায় এসে বলপ্রয়োগের পন্থা অবলম্বন করছে। বিরোধী দলের প্রতিবাদকে ভূলুণ্ঠিত করছে। ফলস্বরূপ, গণতন্ত্রের ধস এবং বেসামরিক স্বৈরশাসনের বিপদ বাড়ছে।

 

লেখক

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

   

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবদলই সরকার সমর্থিত / ভোটের মাঠে নেই সরকারি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বিরোধীদল

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status