ঢাকা, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ৩ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

মত-মতান্তর

ক্রসসোর্ড এর উপর ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান

আবুল ফজল মোঃ সানাউল্লাহ

(১ মাস আগে) ১ মার্চ ২০২৪, শুক্রবার, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

mzamin

গত ০৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ১৬তম জাতীয় পরিষদ এবং ৪টি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিতর্কে জর্জরিত এই নির্বাচনে কেন্দ্রে এককভাবে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একক দল হিসেবে বেশিসংখ্যক আসনে জয়লাভ করলেও সরকার গঠন করতে পারেনি। পক্ষান্তরে, আসন সংখ্যার দিক থেকে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) (পি এম এল এন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ছোট কয়েকটি দলকে সাথে নিয়ে জোট  সরকার গঠন করছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা আসবে - এমনটা বলা যাচ্ছে না; বরং সার্বিক প্রেক্ষাপটে এমন কিছু উপাদান বিদ্যমান যা অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেমনটি হলে অভ্যন্তরীণ গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশটির বাইরেও বহুবিধ প্রভাব পড়তে পারে। 
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতাই সবচেয়ে 'স্থিতিশীল' বাস্তবতা। দেশটির ৭৬ বছরের ইতিহাসে কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। অপরদিকে স্বাধীনতার লগ্ন থেকেই আঞ্চলিক সামরিক বিরোধ আর অভ্যন্তরীণ বিগ্রহকে পুঁজি করে দেশটির সামরিক বাহিনী,  বিশেষ করে সেনাবাহিনী একচ্ছত্র নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রাচার, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য  এবং, শাসন-অনুশাসন সহ সম্যক সকল বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রভাব কালচারাল রূপ পরিগ্রহ করেছে। এজন্যই অনেকে তির্যকভাবে বলে থাকেন যে, সকল দেশের সেনাবাহিনী থাকে আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দেশ আছে।

বিজ্ঞাপন
 পাকিস্তানের রাজনৈতিক অচলায়তন বুঝতে এই বাস্তবতাটি বিবেচনায় রাখতেই হবে। 

অর্থনীতি, ভু-রাজনীতি, গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদসহ বিভিন্ন বিবেচনায় পাকিস্তান এই মুহূর্তে একটি সময়ের ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে আছে।  এখান থেকে আগামীর যাত্রা গতানুগতিক ধারা রক্ষা করেই হবে নাকি মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৪ এর নির্বাচন পরবর্তী পাকিস্তানের সম্ভাব্য গতিপথ অনুধাবন করতে হলে কিছুটা পিছন ফিরে ঘটনা প্রবাহ পর্যালোচনা করতে হবে। এর বেশিটাই ইমরান খান কেন্দ্রিক; কারণ সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাচক্র হলো ডানপন্থী ফায়ার ব্র্যান্ড নেতা ইমরান খানের উত্থান-পতন- এবং সমূহ পুনঃজীবন। 

রাজনীতিতে তিন দশক পার করলেও ইমরান খানের জ্যামিতিক উত্থানের শুরু ২০১৩ সালে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। ঐ সময় 'দুর্নীতি দমন' এবং 'পরিবার তন্ত্র ভাঙা'র অঙ্গীকার দিয়ে ইমরান খান ক্ষমতায় আসেন বলেই সমধিক প্রচলিত। তবে, ঐ নির্বাচনে ইমরান খান কথিত 'এস্টাবলিশমেন্ট', বিশেষ করে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া'র সহায়তা পেয়েছিলেন, এটা মোটামুটি সর্বজনবিদিত। স্বভাবসিদ্ধভাবে স্বাধীনচেতা হলেও সেনাবাহিনীর সাথে ইমরানের প্রাথমিক হানিমুনে তেমন ব্যাঘাত ঘটেনি। কৃতজ্ঞ ইমরান ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মাথায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সেনাবাহিনী প্রধানের নিয়োগ আরো একটি পূর্ণাঙ্গ মেয়াদ - তথা তিন বছরের জন্য বাড়িয়ে দেন।  সর্বোচ্চ আদালত এই নিয়োগ বৃদ্ধি রদ করে রায় দিলেও সংসদে আইন পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ইমরান তাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। তখন কে জানত যে ইমরান তাঁর রাজনীতির  সমুহ বধকারীকে গোকুলে বাড়ার সুযোগ করে দিলেন! 

ঘটনা পরিক্রমায় এর কিছুদিন পর থেকেই ইমরানের সাথে জেনারেল বজওয়ার সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। এই সুযোগে ২০২০-এর শেষ নাগাদ ১১টি বিরোধী দল ইমরান বিরোধী জোট-পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) গঠন করে এবং সংসদের ভিতরে-বাইরে আন্দোলন শুরু করে। সংসদে সংখ্যাধিক্য না থাকায় প্রাথমিক অবস্থায় পিডিএম ইমরানের বিরুদ্ধে তেমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। কিন্তু নিয়ামক শক্তি গোপনে এবং প্রকাশ্যে পিটিআই-কে ভাঙ্গতে এবং পিডিএম-কে শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হয়। সাথে যোগ হয় আলোচিত বিদশী হস্তক্ষেপ। বহু নাটকীয়তার পর ১০ এপ্রিল ২০২২ তারিখে ইমরান খান আস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান। 

‘আহত বাঘ আরো হিংস্র হবে’ ঘোষণা দিয়ে ইমরান ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর জনসমর্থন ইর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছে।  ঐ সময় একজন অশিতিপর পাকিস্তানি অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা অফিসার এই লেখকের সাথে আলাপচারিতায় ইমরানের জনপ্রিয়তাকে ৭০-৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তার সাথে তুলনা করেন। ইমরান একাধারে সংসদ বর্জন এবং উপনির্বাচনে অংশ নিতে থাকেন। তার ভাষায় এসব নির্বাচন ছিল তার জন্য গণভোট যার অধিকাংশে তিনি ও তার দল জয়ী হন। অদম্য ইমরানকে ঠেকাতে ২০২২ সালের নভেম্বরে তাঁর ওপর হামলা হয় এবং তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ইমরান খান এই হত্যাচেষ্টার জন্য তাঁর ভাষায় 'ডার্টি হ্যারি' খ্যাত আই এস আই এর ডিজি (সি) মেজর জেনারেল ফয়সাল নাসির'কে  সরাসরি দায়ী করেন।  এদিকে ইমরানের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে দু'শতাধিক মামলা করা হয় এবং ৯ মে ২০২৩ তারিখে তাঁকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেফতার করা হয়। জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসলে ইমরানকে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয়। একাধিক মামলায় শাস্তি পাওয়ায় নির্বাচন এবং দলীয় চেয়ারম্যান পদের জন্য তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তাঁর দল পিটিআই'র জন্য জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মার্কা ‘ক্রিকেট ব্যাট’ বাতিল করা হয়। নির্বাচনের আগে পরে এ পর্যন্ত তিনটি মামলায় ইমরান খান'কে যথাক্রমে ১০, ১৪ এবং ৬ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তদুপরি সকল বাধা মোকাবেলা করে ইমরান খান এখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে টিকে আছেন। সংক্ষেপে বললে-পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী,  নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের একটি স্তর এবং বিরোধী জোটের সমন্বিত শক্তির বিপক্ষে এখন পর্যন্ত ইমরানের টিকে থাকা এক সমসময়িক বিস্ময়। এই বিস্ময়ের ব্যবচ্ছেদ করতে বিশদ আলোচনা দরকার, যা এই লেখনির আওতার বাইরে। তবে সংক্ষেপে গত ৩/৪ বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলে সমসাময়িক বাস্তবতা এবং সমূহ ভবিষ্যৎ অনুমান করা যাবে।
প্রথমেই ইমরানের রাজনীতি ও নেতৃত্বের স্বরূপ এবং অবধারিত দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোকপাত করা যাক। এই লেখনিতে মোট চারটি কারণ বা ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। 

দ্বন্দ্বের প্রথম কারণটি রাজনৈতিক। পাকিস্তানের রাজনীতিতে কয়েকটি অমোঘ নির্ঘণ্ট  বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম হলো –সেনা নিয়ন্ত্রণ, বৃহত্তর প্রদেশের আধিপত্য, সামন্তবাদী ও গোত্রীয় ভাবধারা, আঞ্চলিকতা ও আভিজাত্য, ধর্মীয় প্রভাব ও ভারত বিরোধীতা। ঐতিহ্যগতভাবে পুরনো বড় রাজনৈতিক দলসমূহ স্ব স্ব অঞ্চলভিত্তিক অবস্থান মেনে নিয়ে যুগেযুগে একধরণের স্থিতাবস্থা রক্ষা করে এসেছে। বিশেষ করে আয়তন এবং জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহৎ এবং ক্ষমতার নিক্তিবৎ পাঞ্জাব এবং সিন্ধ প্রদেশে যথাক্রমে অভিজাত ব্যবসায়ী শরীফ পরিবারের নেতৃত্বে পি এম এল (এন) এবং সামন্তবাদী ভুট্টো পরিবারের নেতৃত্বে পিপিপি রাজ করে আসছে। এছাড়া তালেবানপন্থী ইসলামিক নেতা মাওলানা ফজলুর রহমানের জামিয়ত-উলেমা-ই-ইসলাম খাইবার পাখতুনখোয়ায় এবং কিছু আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী দল বেলুচিস্তানে অবস্থান সংহত করতে সচেষ্ট। ইমরান খান প্রথমবারের মত গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সার্বজনীন ও জাতীয়  একটি প্লাটফর্ম দাঁড় করান আর এতে ঐতিহ্যবাহী দলসমূহ নিজ নিজ প্রদেশে প্রভাব হারাতে থাকে। ইমরানের জনবান্ধব ও সার্বজনীন আপিল-এর পাশাপাশি পুরনো দলগুলির প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের বিমুখতা পিটিআইকে প্রত্যাশা ছাড়িয়ে সাফল্য এনে দেয়। ফলে দ্রুতই ইমরান সবার কমন শত্রুতে পরিণত হন। পরস্পরবিরোধী পুরনো দলগুলো স্ব স্ব প্রভাববলয় রক্ষার্থে হাত মেলায় এবং ইমরান বিরোধী জোট পিডিএম গঠন করে।

ইমরান খানের দ্বন্দ্বের দ্বিতীয় ক্ষেত্র তৈরি হয় সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট এর সাথে। স্বভাবজাতভাবে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করলে ইমরান 'ডীপ স্টেট' এর বিরোধীতার সম্মুখীন হন, যা তিনি ক্ষমতা হারানোর পর প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেন। পাশাপাশি সে সময়ের বেশ কিছু ঘটনা এক জটিল সমীকরণ দাঁড় করায় এবং তিনি সেনাবাহিনী প্রধানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এরমধ্যে অন্যতম হলো কাবুলে তালেবান এর প্রত্যাবর্তন এবং এর সাফল্য নিয়ে পাকিস্তান এস্টাবলিশমেন্টে আভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। ১৫ই আগস্ট ২০২১ তালেবান কাবুল দখল করে। প্রকাশ্যে না বললেও তালেবান এর বিজয়ে পাকিস্তান তথা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কৃতিত্ব দাবি করে। তালেবান এর প্রত্যাবর্তনের  অব্যবহিত পরেই তৎকালীন আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ এর কাবুল সফরকে কেউ কেউ 'ভিক্টরি ল্যাপ' হিসেবে বর্ণনা করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ ছিলেন ইমরানের আস্থাভাজন। প্রচলিত আছে যে ডিজি আইএসআই হওয়ার পূর্বে আই এস আই এর ডিজি (সি) থাকাকালীন সময়ে ফয়েজ হামিদ ২০১৮ সালে ইমরান খান’কে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছিলেন। এদিকে কাবুল সাফল্যকে পুঁজি করে বাজোয়ার পর ফয়েজ হামিদ সেনাপ্রধান হবেন - এমন কথা তখন চাউর হয়েছিল; যদিও বা তিনি জ্যেষ্ঠতম ছিলেন না। ইমরান খান এবং ফয়েজ হামিদ আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পাশাপাশি জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক ই তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি'কে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, তালেবান এর প্রতি সংবেদনশীলতার কারণে অনেক আগে থেকেই ইমরান খান কে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ‘তালেবান খান’ বলে আখ্যা দেয়। ধারণা করা হয় টিপির দাবি অনুযায়ী ওই সময় বেশ কিছু জঙ্গিকে মুক্তি দেয়া হয় যার সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। জেনারেল বাজওয়া ইমরানের সাথে লেঃ জেনাঃ ফয়েজ হামিদের সখ্যতা  এবং ফয়েজ হামিদের সমূহ উচ্চাভিলাস মেনে নিচ্ছিলেন না – ঐ সময় এমন একাধিক আলামত দৃশ্যমান ছিল। তাছাড়া তার নিজস্ব এজেন্ডার পাশাপাশি পছন্দের কাউকে পরবর্তী সেনাপ্রধান করার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী ছিলেন - পিছু ফিরে দেখলে তা সত্য বলেই প্রতীয়মান হয় । এহেন প্রেক্ষাপটে অক্টোবর ২০২১  হঠাৎ করেই সেনাপ্রধান আইএসআই এর ডিজি লেঃ জেনাঃ ফয়েজ  হামিদের বদলি প্রস্তাব করলে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ইমরান খান ঐ প্রস্তাবে এক মাসের অধিক সময় স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন; এবং শেষমেষ মেনে নিতে বাধ্য হন। এদিকে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার ইমরানের দলে যোগদানের বিষয়টি জেনারেল বাজওয়া'র বিরক্তি  বাড়াচ্ছিল, বলাই যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা জরুরি যে,  কিং-মেকার সেনাবাহিনী সাধারণভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ থেকে অভ্যস্ত। ইমরান খান কি এই স্থিতাবস্থা চ্যালেঞ্জ করছিলেন বা এখনো করছেন? কে জানে? 

সেনাবাহিনীর সাথে বাড়তে থাকা বিরোধ এবং হস্তক্ষেপের মুখে ইমরান খান ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে এনে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। বিশেষ করে বেলুচিস্তানের সাথে সমান্তরাল টেনে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নৃশংসতা এবং এর পরিণতির জন্য তিনি সম্যক স্পষ্টভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী করেন। সেনা কর্তৃপক্ষের  কাছে ইমরানের মন্তব্য ছিল 'কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা'র মতো। সেনাপ্রধান এর জবাবে সরাসরি কিছু না বললেও অবসর পূর্ব এক বক্তৃতায় ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য তদানীন্তন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করে সেনাবাহিনীর দায় এড়িয়ে যান। 
২৯ নভেম্বর ২০২২ জেনারেল বাজওয়া বর্ধিত তিন বছর সহ মোট ছয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান। অবসরের অব্যবহিত পূর্বে তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন যে সেনা নেতৃত্বের সমন্বিত সিদ্ধান্ত হচ্ছে রাজনীতিতে  হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকা। বেশিদিন সেনাবাহিনী এই প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারেনি। নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আসীম মুনির এর জ্যেষ্ঠতা এবং মেধা প্রশ্নাতীত হলেও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা দ্রুতই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এতে যোগ হয় তাঁর সাথে ইমরান খানের পূর্বাপর মিথস্ক্রিয়া। ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে জেনারেল অসীম মুনির ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা  আইএসআই এর ২৩ তম এবং সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদী মহাপরিচালক। প্রচলিত আছে যে ইমরান খানের পরিবার ঘনিষ্ঠ কোনো একটি তদন্ত বিষয়ে দূরত্ব তৈরি হলে মাত্র ৮ মাসের মাথায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁরই অধিনস্ত মেজর জেনারেল ফয়েজ হামিদকে পদোন্নতি দিয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। আসীম মুনির  সেনাপ্রধান হয়ে তিক্ততা ভুলে গেছেন, কার্যক্রমে এমনটা মনে হয়নি। আর ওদিকে তিনি সেনাপ্রধান হওয়ায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ সহ একাধিক লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেন।

ইমরানের দ্বন্দ্বের তৃতীয় ক্ষেত্রটি ছিল আন্তর্জাতিক যা ক্রমে জটিল রুপ পরিগ্রহ করে। পাকিস্তানের পরীক্ষিত ২/১ টি বন্ধু রাষ্ট্র ইমরান খানের কোন কোন মুভ সন্দেহের চোখে দেখার প্রয়াস পায়। যেমন, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার উদ্যোগে ইন্দোনেশিয়া, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং কাতারের উপস্থিতিতে সামিট মিটিংয়ের পরিকল্পনা করলে তা ‘ও আই সি'র বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সমালোচিত হয়। সমালোচনার মুখে ইমরান খান বা তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' এবং পাকিস্তানের পরিবর্তিত অবস্থান নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব - বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইমরান সরকারের টানাপোড়েন দেখা দেয়। ২০২১ সালের বাজেট অধিবেশনে ইমরান খান তার সরকারের পরিবর্তিত নীতিমালা উল্লেখ করে বলেন যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের হয়ে ২০ বছরের যুদ্ধে ৭০ হাজার পাকিস্তানি জীবন হারিয়েছে এবং তাঁর দেশের ১৫০ বিলিয়ন ডলারের ঊর্ধ্বে ক্ষতি হয়েছে। অথচ, এজন্য স্বীকৃতি তো দূরে থাক পাকিস্তান সমালোচিত হয়েছে বেশি আর দেশের ভিতরে সীমাহীন বিভক্তি তৈরি হয়েছে এবং সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ভবিষ্যতে পাকিস্তান আর যুদ্ধের পার্টনার নয় বরং শান্তির পার্টনার  হবে। ইমরান খান যখন এই ঘোষণা দেন তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের সময় প্রায় সমাগত। আফগানিস্তান ছাড়ার পর আমেরিকার জন্য নজরদারি এবং অপারেশন অব্যাহত রাখতে পাকিস্তানের ভূমি ও এয়ারস্পেস জরুরি ছিল। ধারণা করা যায় পাকিস্তানের উপর এজন্য প্রচণ্ড চাপও ছিল। পর্দার আড়ালের আবহ জানা না গেলেও ওই সময় একটি ইন্টারভিউয়ে পাকিস্তানে বিদেশি বেইজ এর প্রস্তাবকে মেনে নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে  ইমরান খান 'এবসলিউটলি নট' বলে নাকচ করে দেন। পরে 'এবসলিউটলি নট' তাঁর দলের একটি স্লোগান হয়ে দাঁড়ায়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের এই পরিবর্তিত নীতিগত সিদ্ধান্ত সমন্বিতভাবে নেয়া হয়েছিল বলে মনে করাই যৌক্তিক।  অনেকের ধারণা চাপের মুখে 'এস্টাবলিশমেন্ট' অবস্থান পরিবর্তন করলেও ইমরান তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এমতাবস্থায় সদ্য গৃহীত নীতিগত অবস্থানে ইমরান একা হ’য়ে পড়েন। 

চতুর্থ যে সমস্যাটি ইমরান খানকে বেসামাল করে তা ছিল অর্থনৈতিক। গাদা গাদা অঙ্গীকার রক্ষা করতে অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ টিম নিয়েই ইমরান যাত্রা শুরু করেন। এর মধ্যে দেখা দেয় কোভিড ১৯। মূদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ আশংকাজনকহারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি অসহনীয় ভর্তুকির কারণে ২০২০ সালের পর থেকেই পাকিস্তানের অর্থনীতি পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে নামতে থাকে। ক্ষমতার রশি টানাটানির কারণে অর্থনীতির দূরাবস্থা কিছুটা হলেও আড়ালে পড়ে যায়। চূড়ান্ত কষাঘাত সহ্য করার আগেই ইমরান ক্ষমতাচ্যুত হন। অনেকের মতে, ইমরানের রেখে যাওয়া ভংগুর অর্থনীতি পরবর্তী সরকারকে টানতে হয়েছে।

পাঠকের মতামত

দারুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখা! লেখককে ধন্যবাদ!

হিমেল
১ মার্চ ২০২৪, শুক্রবার, ৬:৫৪ পূর্বাহ্ন

সব সময়ে পাকিস্তানের ব‍্যাপারে আমাদের সাংবাদিক,কলাম লেখকদের নেতিবাচক লেখা সাথে সেনাবাহিনীকে জড়ানো। তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশের সরকার সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া চলতে পারে আমার জানা নাই।

মো হেদায়েত উল্লাহ
১ মার্চ ২০২৪, শুক্রবার, ১:১০ পূর্বাহ্ন

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

   

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবদলই সরকার সমর্থিত / ভোটের মাঠে নেই সরকারি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বিরোধীদল

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status