ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

মত-মতান্তর

রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যে নোবেল নেই কেন?

রেজাউল করিম রনি
২৩ মার্চ ২০২৪, শনিবার
mzamin

বাংলা সাহিত্যে সর্বশেষ এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সাহিত্যে নোবেল পান ১৯১৩ সালে। এরপরে একশ’ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুই বাংলা মিলে আর কেউ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন নাই। নোবেল পুরস্কারের বিষয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও পুরস্কারটির বিশ্বব্যাপী মর্যাদা ও খ্যাতি সুবিদিত। অনেক অনালোচিত লেখকও এই পুরস্কার পাওয়ার পর খ্যাতি ও মিডিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। নোবেল পুরস্কার নিয়ে এদেশে বিপুল আগ্রহ থাকলেও বাংলাদেশে নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার বিভিন্ন কারণ নিয়ে অনুসন্ধানী কাজ খুব একটা চোখে পড়ে না। নোবেল কর্তৃপক্ষ তাদের যেসব নীতি অনুসরণ করেন তার আলোকে এই বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করা যেতে পারে। পুরস্কারের নমিনেশন পাওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়াগুলোর কথা নোবেল কমিটি জানিয়েছে সেগুলো হলো-

প্রস্তাবনা পাঠানোর যোগ্যতা
সুইডিশ একাডেমির সদস্য বা অন্য একডেমির সদস্য বা এই ধরনের প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যাদের এই বিষয়ে (সাহিত্যে) কাজের আগ্রাধিকার ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সাহিত্য ও ভাষা বিজ্ঞানের শিক্ষক। আগে যারা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
বিভিন্ন দেশের লেখক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি যারা তাদের নিজ নিজ দেশের সাহিত্যের সৃজন প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন।
সুইডিশ একাডেমিই কোন বিষয়ে কে পুরস্কার পাবেন তা নির্ধারণ করে।

বিজ্ঞাপন
এজন্য তারাই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং এই দায়িত্ব পালনের জন্য ১৮ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। সাহিত্যে নোবেল প্রদানের জন্য একটি ওয়ার্কিং বডি আছে। তারাই সকল ক্যান্ডিডেট বা প্রার্থীর কাজ ও যোগ্যতা পর্যালোচনা করেন। সেখান থেকে বাছাই করে ৪/৫ জনের নামকে সুইডিশ একাডেমিতে পাঠান।

এর পরের ধাপে কে পুরস্কার পাবেন তা নির্ধারণ করা হয়। নোবেল কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের কাছে চিঠি বা ফরম পাঠানো হয়। অর্থাৎ কাকে তারা নোবেল পুরস্কার দেয়ার যোগ্য মনে করছেন তা জানতে সুইডিশ একাডেমি নির্ধারিত ব্যক্তিদের কাছে চিঠি পাঠায়। কিন্তু এখানে যারা নমিনেশন পাঠানোর যোগ্য (উপরে বলা হয়েছে) তারা সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে ইনভাইটেশন না পেলেও তারা যাদের যোগ্য মনে করেন তাদের নাম পাঠাতে পারেন। তবে শর্ত হলো- কেউ নিজের নাম পাঠাতে পারবেন না। 

সেপ্টেম্বর: কাকে নোবেল দেয়া যায় তার নাম প্রস্তাবের জন্য নির্ধারিত ব্যক্তিদের কাছে ইনভাইটেশন বা আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়। সাহিত্যে সম্ভাব্য নোবেল প্রাপকের নাম জানতে চেয়ে নোবেল কমিটি শতাধিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে নমিনেশন ফরম পাঠান। 
ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে নমিনেশন জমা দিতে বলা হয়। চলতি বছরের ৩১শে জানুয়ারির আগেই ফরমগুলো নোবেল কমিটির কাছে পৌঁছাতে হয়। তারপরে সাহিত্যে পুরস্কারের জন্য নিয়োজিত ওয়ার্কিং কমিটি সেইসব নমিনেশন পর্যালোচনা করেন এবং একাডেমির অনুমোদনের জন্য সেখান থেকে একটা লিস্ট তাদের কাছে প্রেরণ করেন। 

এপ্রিল: প্রাথমিক প্রার্থী এই পর্বে বাছাই হয়ে যায়। এরপরে আরও  পড়াশোনা করে, ঘাঁটা-ঘাঁটি করে কমিটি এবার ১৫-২০ জনের একটা প্রার্থী তালিকার চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বিবেচনার জন্য একাডেমিতে প্রেরণ করেন। 

মে: এই মাসেই চূড়ান্ত প্রার্থীকে নির্বাচন করার প্রক্রিয়া একটা পরিণতি পেয়ে যায়। কমিটি এই পর্যায়ে লিস্টটি ৫ জনের মধ্যে নামিয়ে আনেন। এবং একাডেমিতে ৫ জনের নাম পাঠিয়ে দেন। 

জুন-আগস্ট: এই সময়ের মধ্যে নির্বাচিত সংক্ষিপ্ত তালিকাতে চলে আসা লেখক, কবি বা সাহিত্যিকদের কাজগুলো পড়া হয়। এবং একাডেমির সদস্যরা গ্রীষ্মের সময় তাদের কাজগুলো ব্যাপকভাবে পড়েন এবং মূল্যায়ন করতে শুরু করেন। এবং নোবেল কমিটি প্রত্যেকের উপর স্বতন্ত্র প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। 

সেপ্টেম্বর: চূড়ান্ত প্রার্থীদের বিষয়ে প্রাপ্ত প্রতিবেদন এবং কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ার পরে, সুইডিশ একাডেমির সদস্যরা প্রত্যেকের কাজের গুরুত্ব ও অবদান নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন।

অক্টোবর: এই মাসেই নোবেল পুরস্কার কে পাবেন তা ঠিক হয়ে যায়। অক্টোবরের প্রথম দিকেই কে পাচ্ছেন সাহিত্যের জন্য এবারের নোবেল তা ঠিক করা হয়ে যায়। একজন প্রার্থী যদি মোট ভোটের অর্ধেক পান তখনই তার নাম সেই বারের চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে সুইডিশ একাডেমি। অর্থাৎ যে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হলো তারপরে ভোট হয়। ভোটে যিনি অর্ধেক ভোট পান তিনি বিজয়ী হন। 

ডিসেম্বর: এই মাসে পুরস্কার দেয়া হয়। যিনি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি ১০ই ডিসেম্বর স্টকহোমে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করবেন, পাবেন একটি মেডেল, মানপত্র এবং যে অর্থ তিনি পুরস্কারের সঙ্গে সঙ্গে পাবেন সেটার বাবদ দরকারি ডকুমেন্ট তিনি রিসিভ করবেন। 
নমিনেশন বা নমিনেটর অথবা পুরস্কার বিষয়ে কোনো তথ্য পাবলিক অথবা প্রাইভেট পরিসরে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। ৫০ বছর এই নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই ৫০ বছরের মধ্যে নমিনেশন, নমিনি বা কমিটির পুরস্কার দেয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। 

এখন এই প্রক্রিয়ার আলোকে যদি আমরা বিচার করি গত একশ’ বছরে বাংলা সাহিত্যের কেউ কেন নোবেল পুরস্কার পেলেন না তা হলে অনেক প্রশ্নই আলোচনার দাবি রাখে। খুব বেশি লেখক না হলেও নোবেল পাওয়ার যোগ্য লেখক আমাদের গত একশ’ বছরে ছিলেন না- তা বলার সুযোগ নাই। কিন্তু প্রস্তাব পাঠানোর যোগ্যতার যে ৪টি ক্যাটাগরি নোবেল কমিটি বলে দিয়েছে, সেই ক্যাটাগরির আলোকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে প্রস্তাব পাঠাবার সুযোগ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি?  

বাংলা সাহিত্যে কী ধরনের কাজ হচ্ছে তা কি দুনিয়ার সাহিত্য পরিমণ্ডল জানেন? জানানোর সুযোগ কি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে? প্রচুর মানসম্পন্ন অনুবাদ কি হয়? আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল যদি না জানেন- তা হলে সুইডিশ একাডেমি কীভাবে জানবে? 

তারপরে আসে- বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল শিক্ষক নমিনেশন পাঠানোর যোগ্যতা রাখেন এবং যাদের কাছে নোবেল কমিটি নামের প্রস্তাব চেয়ে ফরম পাঠান তেমন যোগ্য সাহিত্যের বা ভাষা বিজ্ঞানের অধ্যাপক কি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছেন? গবেষণা ও জ্ঞান চর্চার যোগ্যতার চেয়ে দলীয় বিবেচনাতে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের কাছে নোবেল কমিটি পুরস্কার দেয়ার নমিনেশন ফরম পাঠাবে না- এটাই তো স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি এডিট করেছেন উলিয়াম ইয়েটস। যিনি নিজে বিখ্যাত কবি ও নোবেল বিজয়ী। আগে যারা নোবেল পেয়েছেন তাদের রিকমেন্ডেশন পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুনিয়াতে জীবিত বিভিন্ন ভাষার ও দেশের নোবেন বিজয়ী লেখকরা কি বাংলা সাহিত্যের কোনো লেখার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান? কোনো লেখককে কি চেনেন? সর্বশেষ যে বিষয়টি সুইডিশ একাডেমি এই বিষয়ে উল্লেখ করেছে তা হলো, বিভিন্ন দেশের সাহিত্য সমাজের প্রতিনিধি। যারা নিজ নিজ দেশের সাহিত্য-সৃজন প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন। এমন সম্মানিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি আমাদের আছেন। আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতি সংগঠনগুলো লেখকের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্ত বিকাশের বিরুদ্ধে বরং সক্রিয়। রাষ্ট্রীয় সব সুবিধা দলীয় লেখক-কবিদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়। বাংলা একাডেমি রাজনৈতিকভাবে কম-বেশি ক্ষমতান্ধ ভূমিকা পালন করে প্রতিটি দলের শাসন আমলেই। আন্তর্জাতিক দুনিয়াতে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চাইতে এইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দেশের মধ্যে সুবিধা ও ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে বিবাদে বেশি আগ্রহী। গোষ্ঠীবাদীই তাদের প্রধান আগ্রহের বিষয়। চিন্তা ও ধারণার দিক থেকে অভিনব ও বিস্ময়কর সাহিত্য সৃষ্টির সাধনায় নিয়োজিত লেখক থাকতে হবে- এটা প্রথম শর্ত। প্রতিভার বিষয়ে কোনো ছাড় নাই। পশ্চিমের চিন্তার নকল করে সাহিত্য হলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না- এটাই স্বাভাবিক। সৃজনশীল আবিষ্কার থাকতে হবে। এবং তাদের কাজ বিশ্ব দরবারে হাজির থাকতে হবে। 

সুইডিশ একাডেমির ওয়েব সাইটে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নির্বাচনের প্রক্রিয়াগুলো সংক্ষেপে বলে দেয়া আছে। 
 

পাঠকের মতামত

এদেশে বাংলা একাডেমি, শিশুএকাডেমি, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক ইত্যাদির জন্য কাদের নির্বাচিত করছেন দেখলেই তো এসব প্রতিষ্ঠানের মুরোদ বোঝা যায়। এরা নোবেল সুপারিশের যোগ্য?

তপন চক্রবর্তী
১ এপ্রিল ২০২৪, সোমবার, ৯:৫২ পূর্বাহ্ন

Well written

Shoera Sarwar
২৫ মার্চ ২০২৪, সোমবার, ২:০৬ পূর্বাহ্ন

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

   

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবদলই সরকার সমর্থিত / ভোটের মাঠে নেই সরকারি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বিরোধীদল

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status