ঢাকা, ৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৪ শাওয়াল ১৪৪৬ হিঃ

অনলাইন

মরুভূমির মাঝে তাঁবুতে একরাত

পরিতোষ পাল

(২ দিন আগে) ১ এপ্রিল ২০২৫, মঙ্গলবার, ৭:১৪ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

mzamin

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম, মরুভূমির মাঝে একরাত তাঁবুতে কাটালে কেমন হয়? কেমন রোমাঞ্চ হবে সেই রাত কাটানোয়? অভিজ্ঞতার সেই মায়াময় দিনগুলো কি কোনোদিন ভোলা যাবে? ভাবতে ভাবতেই ঠিক করে ফেললাম। ভারতের একমাত্র মরুভূমি হলো থর মরুভূমি। সেখানকার জয়সলমিরে ডেজার্ট ক্যাম্পের তাঁবুতে একরাত কাটাবো। সঙ্গে বালিয়াড়িতে জিপের দুরন্ত গতিতে ছুটে যাওয়া এবং মন্থর গতিতে চলা উট সফারির দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবো।  


বিশ্বের সবচেয়ে জনসংখ্যাবহুল মরুভূমি হচ্ছে থর মরুভূমি। প্রতি কিলোমিটারে ৮৩ জন মানুষের বসবাস। হিন্দু, জৈন, শিখ ও মুসলিমরাই এখানকার বাসিন্দাদের অন্যতম। রাজস্থানের ৪০ শতাংশ জনসংখ্যার বাস মরুভূমিতেই।  থর মরুভূমি ভারত ও পাকিস্তানে বিস্তৃত হলেও ভারতেই এই মরুভূমির ৮০ শতাংশের অবস্থান। আর এই মরুভূমির ৬০ শতাংশই রয়েছে রাজস্থানে। পাশাপাশি পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কিছু অংশ এবং গুজরাটের কচ্ছের উপকূল বরাবর অঞ্চলে বিস্তৃত এই মরুভূমি।
সময়টা ছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। আমি, আমার সহধর্মিণী ও আমার ৮২ বছরের উৎসাহী শ্যালিকাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজস্থান সফরের উদ্দেশ্যে। সকলের মধ্যেই চরম উত্তেজনা। বিশেষ করে মরুভূমিতে আমাদের দিন-রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা কেমন হবে তাই নিয়েই যত আলোচনা। 


অসাধারণ স্থাপত্য সমৃদ্ধ প্রাসাদ, হাভেলি আর দুর্গের রাজ্য হলো রাজস্থান। রয়েছে অনেক মনোরম হ্রদ। শৌর্য আর বীর্যের ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। মীরাবাঈয়ের ভজন যেমন এর আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়, তেমনি রাণাদের অস্ত্রের ঝনঝনানি এর ইতিহাসকে করেছে রক্তাক্ত। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জহরব্রতের ইতিহাস। বহু হানাহানি আর রক্তপাতের সাক্ষী এই রাজস্থান।
রাজপুতানাদের বাসস্থান থেকেই নাম হয়েছে রাজস্থান। কথিত রয়েছে রাজপুতরা আবু পাহাড়ে দেবতাদের হোমাগ্নি থেকে জাত। আবার এমনও বলা হয় ভারতে আসা হূণদের উত্তরপুরুষ এরা। কারও মতে, আরয বংশীয়  তথা সূরয ও চন্দ্রের বংশোদ্ভূত এরা।  স্বাধীনতার পর রাজপুতানা নামে পরিচিত রাজপুত শাসিত দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতে যোগ দেয়। এই রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে ১৯৪৯ সালের ৩০শে মার্চ রাজস্থান রাজ্যটি গঠিত হয়। আরাবল্লী পর্বতমালা ও মরুভূমির যুগলবন্দি রাজস্থানকে করেছে অনবদ্য। আর জয়সলমির ব্যারিকেড গড়েছে গ্রেট গ্লোবাল ডেজার্ট বেল্টের বিস্তীর্ণ মরুভূমিকে। 


রাজস্থান সফরের মাঝপথেই হাজির হয়েছিলাম জয়সলমিরে। এই জয়সলমিরেই রয়েছে সোনার কেল্লা। বিশ্বের জীবন্ত কেল্লাগুলোর অন্যতম এই হলুদ বেলেপাথরে তৈরি কেল্লা। এই কেল্লাতে রয়েছে তিন চার হাজার মানুষের বাস। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লা ছবি করেছিলেন এই কেল্লাকে ঘিরে। তারপর থেকেই এই কেল্লার নাম মুখে মুখে ছড়িয়েছে সোনার কেল্লা হিসেবে। স্থানীয় গাইড হরিপ্রসাদ বলছিলেন, আগে এই কেল্লায় খুব বেশি পর্যটকের সমাগম হতো না। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা ছবির বদৌলতে এখন এই কেল্লায় পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে।  


অতীতের ভাটি রাজপুতদের রাজধানী ছিল এই জয়সলমির। একসময় দেয়াল ঘেরা ছিল এই শহর। এখন আর সেই দেয়ালের চিহ্ন নেই। জয়সলমিরের সব মন্দির, প্রাসাদ, দুর্গ সবই মধুরঙা হলুদ বেলেপাথরে তৈরি। জয়সলমিরের চারপাশে রয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ বালুকারাশি। সূর্যের আলোতে তা সোনালী রূপ ধারণ করে। সূর্যাস্তে সোনারঙ আর সূর্যাস্তের ঠিক আগে হলুদ রঙা বালিয়াড়ি গোলাপি রূপে মায়াময় হয়ে ওঠে।


জয়সলমির থেকে পশ্চিমে প্রায় ৪০ কিলোমিটার গেলেই সাম স্যান্ড ডিউনস। ৩ কিলোমিটার ব্যাপ্ত টিলা টিলা আকারে দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি। সেই বালিয়াড়ির একপাশে তৈরি হয়েছে অনেক ডেজার্ট ক্যাম্প। এমনই একটি ক্যাম্পে আমরা উঠেছিলাম।
সুন্দর এক আপ্যায়ন পেলাম। ক্যাম্পের প্রবেশপথে। কুমকুম, আবীর আর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে হাতে কিছু ফুলের পাপড়ি দিয়ে আমাদের প্রদীপের আলোয় লিটারারি বরণ করে নেয়া হলো। এর সঙ্গেই দেয়া হলো শরবত। এই আন্তরিক আহ্বানে আমরা আপ্লুত, ধূ-ধূ মরুভূমিতে এটা আমাদের প্রত্যাশার মধ্যেও ছিল না। আধুনিক পর্যটন যে কোথায় পৌঁছে গিয়েছে এসবই তার নমুনা। ক্যাম্পের মধ্যে তিনদিক ঘিরে রয়েছে একাধিক তাঁবু। অবশ্য পাথরের তৈরি উঁচু ভিতের উপর তৈরি এই সব তাঁবু। আধুনিক সব রকম ব্যবস্থাই রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো তাঁবুতে রয়েছে শীতাতপ যন্ত্রেরও ব্যবস্থা। পরিপাটি করে সাজানো খাটের উপর সুসজ্জিত বিছানা। তাঁবুর ভেতরে অন্দরসজ্জায় রয়েছে রাজস্থানি সংস্কৃতির ছাপ।  আমরা এমনি একটি তাঁবুতে মালপত্র রেখে জিপে করে মরুভূমির আরও কিছুটা ভেতরে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলাম। বেলা দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে। সামনেই অপেক্ষা করছে হুড খোলা জিপ। আমরা তিনজন ছাড়াও আরেকটি পরিবারের দুজন আমাদের সঙ্গী হলেন। বালিয়াড়ি দিয়ে জিপ দুরন্তগতিতে ছুটে চলেছে। আমরা রীতিমতো রোমাঞ্চিত। ঢেউয়ের পর ঢেউ পেরিয়ে আমরা চলেছি বালিয়াড়ি দিয়ে। জিপের মধ্যে আমাদের টালমাটাল অবস্থা। মনে হচ্ছে আমরা চলেছি কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। এইভাবে প্রায় ৯-১০ কিলোমিটার যাবার পর জিপ থামলো এক জায়গায়। সেখানে রয়েছে মরুবাহন উটের দল। সুন্দরভাবে সাজানো অনেক উট। পর্যটকদের জন্যই তাদের অপেক্ষা। এই মরুবাহনের পিঠের উপরে বসে এবার আমাদের উট সফারি শুরু হবে। প্রতিটি উটের পিঠে দুইজনের বসার জায়গা। উটগুলোকে নিয়ে যাবার জন্য রয়েছে উটের মালিক কিংবা তাদের পরিবারের লোকজন। বেশ কিছু নাবালকও রয়েছে তাদের মধ্যে। তারাই দড়ি ধরে পর্যটক সহ উটগুলোকে নিয়ে চলেছে বালিয়াড়ির এদিক সেদিক। আমরা এবার উঠবো একটি বেশ বড় মাপের উটের পিঠে। কিন্তু এখানে উটের পিঠে ওঠার জন্য কোনো মইয়ের ব্যবস্থা নেই। উটগুলো মালিক বা পরিচালকের নির্দেশ পেয়ে নিচে হামাগুড়ির মতো বসে পড়ে। আমরা গিয়ে উঠে বসি। সামনে যে বসছে তার ধরার জন্য কুজের কাছে ছোট্ট একটি লোহার দণ্ড আড়াআড়িভাবে দেয়া। আর পেছনের জনের ভরসা সামনের সঙ্গী। কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো উটের ঝাঁকুনি দিয়ে সামনের পায়ে ভর দিয়ে খাঁড়া হয়ে দাঁড়ানো। সেই সময় শক্ত করে ধরে বসে থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। যাক কোনো অঘটন না ঘটিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে উটের পিঠে অভিনব সফারিতে বেরোলাম। আমাদের পেছন  পেছন চলছিল লাইন ধরে আরও অনেক উট। সকলেরই পিঠে পর্যটক। তবে মজার ঘটনা হলো, আমাদের পেছনের উটের সঙ্গে কোনো পরিচালনা করার মতো লোক ছিল না। আমাদের উটের পরিচালক সেই উঠটির দড়িটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, আপনি ধরে বসে থাকুন। কিচ্ছু হবে না। এবার আমিই হলাম পেছনের উটের পরিচালক। চরাই উতরাই পেরিয়ে  দুলতে দুলতে চলেছি। প্রায় এক কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর আমরা ফিরে আসি। সত্যিই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে এই উট সফারিতে। তাও খোদ মরুভূমির বুকে। চারদিকে  শুধুই ধু ধু বালিরাশি। কোনো ওয়েসিসের দেখা পাইনি ঠিকই তবে ঢেউয়ের মতো চরাই-উতরাই ডিঙিয়েছি ছন্দে ছন্দে। 


আমরা উট সফারি শেষ করে নির্ধারিত জায়গায় ফিরে এলেও দেখি আমাদের সঙ্গী ৮২ বছরের বৃদ্ধার কোনো খোঁজ নেই। মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেল নাকি? দূরের উটের সারির দিকে তাকিয়ে দেখি একটি ছোটখাটো উটের পিঠে বসে তিনি, একাই। দুলকি চালে হাত নাড়তে নাড়তে ফিরে এলেন। আমাদেরও ধড়ে প্রাণ এলো। 


ততক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় নামতে চলেছে। পশ্চিম দিকে কাঁটাগাছের ঝোপের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্তের সে এক মোহনীয় দৃশ্য। চারদিকে রঙ বদল হচ্ছে। সোনালি হলুদ বালুকারাশি গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে। অনেক উট বাড়ির পথ ধরেছে। একজন উটের মালিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তার নাম ইসমাইল। জানালেন তার রয়েছে প্রায় পঞ্চাশটির বেশি উট। পর্যটনই তার প্রধান ব্যবসা। 
এদিকে আকাশে নীড়ে ফেরা বিহঙ্গদের সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি ড্রোন। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, পাকিস্তান সীমান্ত খুব কাছেই। তাই বিএসএফের নজরদারি চলছে এই সব ড্রোনের মাধ্যমে। 


এবার আবার সেই বিপজ্জনকভাবে টালমাটাল খেতে খেতে বালিয়াড়ির  ঢেউয়ের  পর ঢেউ ডিঙিয়ে জিপে করে ফিরে এলাম ক্যাম্পে। সামান্য ফ্রেশ হয়ে চলে আসি ক্যাম্পের প্রবেশ পথের কাছে বিরাট উঠোনে। সেখানে সাজানো বর্ণময় মঞ্চে অপেক্ষায় লোকসংস্কৃতির আসরের কুশিলবরা। চারদিকে গ্যালারির মতো চেয়ারে বসার জায়গা। সন্ধ্যা নেমে এলেও অন্ধকার নেমে আসেনি। আসলে কয়েকদিন পরেই ছিল পূর্ণিমা। তাই আকাশ পরিষ্কার। ঠান্ডা বাতাসের আমেজ। বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কারে জেগে উঠলো বর্ণময় নর্তকির দল। শুরু হলো রাজস্থানী লোকসংগীতের সঙ্গে নানা মুদ্রায় নৃত্য। শুরুতেই প্রত্যক্ষ করলাম, বলা ভালো অনুভব করলাম, এক অসাধারণ শৈলি। কি নেই তাতে। নাচ, অভিনয়, জিমন্যাস্টিক্সের এমন সম্মিলন আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিল। দু’চোখ ভরে দেখেছি রূপকথার মায়াজাল। এক কথায় আমরা খোলা আকাশের নিচে এক মনোরম পরিবেশে বসে রাজস্থানী সংস্কৃতির রূপ-রস-গন্ধ আমাদের মাতিয়ে রেখেছিল  কয়েক ঘণ্টা। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল আগুনের খেলা দিয়ে। অসাধারণ স্কিলের নৈপুণ্য ভোলার নয়। অনুষ্ঠানের  মাঝে আসছিল পকোড়া ও চা-কফি। এই দুইয়ের আমেজে আমরাও ততক্ষণে মাতোয়ারা। চারদিকের নিস্তব্ধতার মাঝে বানজারা ধুন মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। 


এরপর রাতের খাবার খেয়ে পুলকিত মনে শুতে গিয়েছিলাম। আমরা শহুরে মানুষ এমন নিস্তব্ধতায় অভ্যস্ত নই। এক অদ্ভুত নৈঃশব্দের মাঝে তাঁবুতে আমরা তিন জন। তবে খানিকটা সময় যেতেই সব আবেগ, তন্ময়তা একেবারে উধাও। আতঙ্কে নয়, মরুভূমির কনকনে ঠান্ডায় আমাদের তখন কাহিল অবস্থা। সমস্ত কাঁথা-কম্বল জড়ো করেও শীতকে আড়াল করা যাচ্ছে না। একরকম ঠকঠক করে কাঁপুনির মধ্যদিয়ে রাত কাটালাম।
মরুভূমির ঠান্ডা গায়ে মেখে গিয়ে হাজির হলাম রাজস্থানের একমাত্র শৈল শহর আবু পাহাড়ে। আরাবল্লী পর্বতমালার দক্ষিণে ১২১৯ মিটার উচ্চতায় এই আবু পাহাড়। গ্রানাইট পাথর আর সবুজ বনানী হাত ধরাধরি করে হাজির। মধ্যযুগীয় মন্দির ভাস্কর্য এই আবুর অন্যতম আকর্ষণ। আবু পৌঁছেই গেলাম এখানকার বিস্ময় ভাস্কর্যের রূপ দর্শনে। দিলওয়ারা জৈন মন্দির এবং একলিংজি মন্দিরের মতো আকর্ষণীয়  জৈন ও হিন্দু মন্দির রয়েছে এই আবুতে। গাছে ছাওয়া দিলওয়ারা মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে আদিনাথ, নেমিনাথ, মহাবীর, ঋষভদেব ও পারশ্বনাথের মন্দির। প্রথম জৈন তীরথঙ্কর আদিনাথের মন্দির বিমল বাসাহি তৈরি হয়েছিল ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে। গুজরাটের প্রথম সোলাঙ্কি রাজা ভীম দেবের মন্ত্রী বিমল শাহ এটি তৈরি করেছিলেন। ১৫০০ শিল্পী আর ১২০০ শ্রমিকের মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে  ১৪ বছরে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির। খরচ হয়েছিল ১৮ কোটি  ৫৩ লাখ টাকা। সোলাঙ্কি স্থাপত্য  শৈলিতে  সম্পূর্ণ শ্বেত পাথরে তৈরি এই মন্দিরে প্রবেশ করেই থমকে গিয়েছিলাম। কি অপূর্র সৃষ্টি। যেদিকে তাকাই সেদিকেই বিস্ময়কর কারুকাজের উপস্থিতি। শিল্পীদের দক্ষতা আর নিপুণ খোদাই করে গড়ে তোলা প্রতিটি ভাস্কর্য দেখতে দেখতে বারে বারে স্যালুট জানিয়েছি মনে মনে। ৪৮টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভের উপর অষ্টভূজাকার গম্বুজ। যূথবদ্ধ হাতির দল। অনন্য কারভিংয়ের কাজ।  রয়েছে ৫২টি দেব কুঠরি। প্রতিটিতেই অলঙ্করণ ও ভাস্কর্য চুম্বকের মতো আকর্ষণে দাঁড় করিয়েছে বারে বারে। অলিন্দের ভাস্কর্য বা সিলিংয়ের কারুকার্য মোহিত করে রেখেছিল। এ এক মর্মরের কাব্য কথা। বারে বারে একটি কথাই ভাবছিলাম, ভাস্কর্যের এই মর্মর রূপ দান কি সম্ভব মানুষের পক্ষে। কিন্তু হাজার বছর আগের শিল্পীরা সেই দক্ষতার নজির রেখে গিয়েছেন সারা বিশ্বের কাছে। আর তাই ভারত সহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন এই মর্মর মন্দির স্থাপত্যকে দেখার পাশাপাশি অনুধাবন করতে।
দিলওয়ারা ছাড়াও আরাবল্লীর সর্বোচ্চ শিখরে ১৭৭২ মিটার উচ্চতায় রয়েছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মন্দির। আবুতে ছড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক মন্দির। 


এবার আমাদের গন্তব্য নক্কি লেক। শহরের প্রাণকেন্দ্রে চারপাশ পাহাড় ঘেরা এই কৃত্রিম লেক। নক্কি লেক থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। পাহাড়ের গাছের ফাঁক দিয়ে লাল সূর্য আস্তে আস্তে দিগন্ত রেখায় বিলীন হচ্ছে। জলে তার প্রতিফলন অন্য এক রূপ নিয়েছে। প্রবাদ আছে রাক্ষসদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা ব্রহ্মার পরামর্শে দেবলোক ছেড়ে আবু পাহাড়ে আসেন যজ্ঞ করতে। আর যজ্ঞের জলের জন্য দেবতারা নখ দিয়ে খনন করেছিলেন এই লেক। সেই থেকেই এর নাম নক্কি লেক। লেক দেখে এসে আমাদের তাড়াতাড়িই আশ্রয়স্থলে ঢুকে পড়তে হয়েছিল। তাপমাত্রা ততক্ষণে নেমে এসেছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হাড় হিম করা কাঁপুনি দিয়ে ঠাণ্ডা যাকে বলে। সেই ঠাণ্ডায় কোনোরকমে রাত কাটিয়ে পরের দিন চলছিলাম রাজস্থানের অন্য শহরগুলোর উদ্দেশ্যে।
রাজস্থানের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম যোধপুর, বিকানীর, জয়পুর, চিতোর, জয়সলমির, উদয়পুর ও আজমীর। রাজস্থানীদের পোশাকের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্য। ছেলেরা পরেন ধুতির সঙ্গে বোতামহীন ফতুয়ার মতো ফুলহাতা জামা আর মাথায় থাকে ১৬ মিটার কাপড়ের তৈরি পাগড়ি। মেয়েরা পরেন ঘাঘরা, কাঁচুলি আর ওড়না। চোখে সুরমা, গায়ে মেহেন্দি, নাকে নোলক, কানে ঝুমকো, গলায় হাঁসুলি ও পায়ে মল। 
রাজস্থানের তিনটি শহরকে রঙিন শহর বলা হয়। একটি হলো সোনালী শহর জয়সলমির, দ্বিতীয়টি রাজধানী জয়পুর, গোলাপি শহর নামেই পরিচিত। অন্যটি নীল শহর বলে পরিচিত যোধপুর। এই শহরের পুরনো অংশের সব বাড়িঘর নীল রঙে রঙিন। শহরের ব্রাহ্মণরা নিজেদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করতে তাদের বাড়িঘরে নীল রঙ করিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে। মার্বেল স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নির্দশন রয়েছে এই শহরে। 
জয়পুরের সমস্ত প্রাসাদ ও বাড়িঘর গোলাপি রঙে রাঙানো। ১৮৭৬ সালের রানী ভিক্টোরিয়ার সফর উপলক্ষে মহারাজা রাম সিং আতিথেয়তার রঙ হিসেবে গোটা শহরের সব প্রাসাদ ও বাড়িঘর পোলাপি রঙে রাঙিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই একই পরম্পরায় সব বাড়িঘর গোলাপি। গোটা শহরটি ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র মেনে তৈরি করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় জয় সিংহ। জয়পুরে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত হাওয়া মহল, আমের দুর্গ, চোখি ধানি, সিটি প্যালেস, অ্যালবার্ট হল মিউজিয়াম, মশলা চক এবং আরও অনেক কিছু।
উদয়পুরকে বলা হয় দ্য সিটি অব সানরাইজ। অনেকে বলেন, এটি প্রাচ্যের ভেনিস বা হ্রদের শহর। মনোরম হ্রদ, মর্মর প্রাসাদ, কারুকার্যময় হাভেলি ও মন্দির নিয়ে এই উদয়পুর। এটি মেবার রাজ্যের রাজধানী ছিল। তাই এটিকে মেবারের রত্নও বলা হয়।       
রাজস্থানের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দর্শনীয়  দুর্গগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চিত্তোরগড়, মেহরানগড়, জয়সলমির, জয়গড় এবং জুনাগড় দুর্গ। এর মধ্যে যোধপুরের মেহরানগড় দুর্গটি ৫ কিলোমিটার  বিস্তৃত এবং প্রায় ১২৫ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে। চিত্তোরগড় দুর্গটি এশিয়ার বৃহত্তম দুর্গ। এটি ৭০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১৩ কিলোমিটার। চমৎকার স্থাপত্যের ছাপ সর্বত্র।
রাজস্থানের প্রতিটি শহরে এখনো রয়েছে রাজকীয় ঐশ্বর্যের নানা নিদর্শন। প্রাসাদ আর হাভেলির অসাধারণ স্থাপত্যের পাশাপাশি রাজস্থানী শিল্প ও সংস্কৃতির নানা ঐতিহ্য।


আমাদের সফরে অন্তর্ভুক্ত ছিল আজমিরও। আজমিরের খাজা মইনুদ্দিন চিশতির দরগাহ হল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সুফিবাদের মিলনস্থল। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি হিন্দু দর্শনাথীও আজমিরের এই দরগাহে হাজির হন মনস্কামনা পূরণের জন্য। নারীদের প্রবেশ যেহেতু অবাধ তাই আমার সঙ্গীরা চাদর চড়াতে গিয়েছিলেন। আমাদের মতো বহু মানুষ এসেছিলেন দরগাহে। তাদের মধ্যে একটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা কয়েক বছর পরপর দরগাহে আসেন।
এবার রাজস্থান সফর শেষ করি এক অভিনব মন্দিরের সন্ধানে। বিকানির থেকে প্রায় ৩১ কিলোমিটার দূরে দেশনোকে রয়েছে এই কার্নি মাতা মন্দির। এটি ইঁদুরের মন্দির নামে পরিচিত। কয়েক হাজার ইঁদুরের বাস এই মন্দিরে। কাবা নামে পরিচিত এই ইঁদুরদের পবিত্র বলে মনে করা হয়। আমরা যখন মন্দিরে পৌঁছেছিলাম তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতে চলেছে। মন্দিরে প্রবেশ করেই অজস্র ইঁদুরের ছুটোছুটি দেখে চমকে গিয়েছিলাম। মন্দিরের সর্বত্র এদের দৗড়াদৌড়ি। পায়ের উপর দিয়ে কখনো গায়েও উঠে পড়ছে। পূণ্যার্থীরা কেউই আপত্তি করছেন না। 
মন্দিরের মেঝেতে রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। তার মধ্যদিয়ে এরা যাতায়াত করছে। এমনকি বিগ্রহের গর্ভগৃহেও এদের অবাধ প্রবেশ। মন্দিরের কর্মীদের কাছ থেকে জানা গেল, প্রায় ২০ হাজার কাবা বাস করে মন্দির চত্বরে। মন্দিরের কর্মীরাই এদের দেখাশোনা করেন। খাওয়া দাওয়াও দেয়া হয় মন্দির থেকেই। এক বিচিত্র দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম যখন দেখলাম ইঁদুরগুলো দর্শনার্থীদের থালা থেকে বা রান্নাঘরে চরণ কর্মীদের একই থালা থেকে তারা খুটে খুটে খাবার খাচ্ছে। শুনলাম, ভক্তরা নাকি কাবা দ্বারা খাওয়া দাওয়াকে সম্মান হিসেবে মনে করেন। আধুনিক যুগেও এমন বিশ্বাস নিয়ে কিছু মানুষ বেঁচে রযেছেন। 

পাঠকের মতামত

অন্য কোনো দেশের মরুভূমিতে তাঁবুতে রাত কাটাতে কেমন লাগে, তা ও একটু জানাবেন পরিতোষ বাবু।আপনাকে ধন্যবাদ।

হাবিবুর রহমান
২ এপ্রিল ২০২৫, বুধবার, ১২:১৯ অপরাহ্ন

Excellent article. Thanks.

Md.Nazrul Islam
২ এপ্রিল ২০২৫, বুধবার, ৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

হিন্দু ধর্ম কুসংস্কারে ভর্তি। ইঁদুর, বানর তাদের কাছে দেবতার মত

Kazi
১ এপ্রিল ২০২৫, মঙ্গলবার, ৯:৪৯ অপরাহ্ন

অনলাইন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

অনলাইন সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: news@emanabzamin.com
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status