ঢাকা, ২৪ জুন ২০২৪, সোমবার, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৭ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সময় অসময়

বইমেলা: এক মাসের প্রেম, এগার মাসের বিরহ

রেজানুর রহমান
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবারmzamin

একুশে বইমেলা এবার আরও বেশি সুন্দর হয়েছে। সুশৃঙ্খল ভাবে সেজেছে এবারের একুশে বইমেলা। স্টল, প্যাভিলিয়নের সাজসজ্জা অন্যান্যবারের চেয়ে এবার অনেক আলাদা, অন্যরকম। ছবির মতো দেখতে। রাতের ঝলমলে আলোতে দূর থেকে বইমেলাকে দেখলে অপরূপ লাগে। গর্ব হয়। হ্যাঁ, গর্ব করার মতোই আমাদের একুশে বইমেলা। পৃথিবীতে আর কোথাও এমন মাসব্যাপী বইমেলার নজির নেই। শুধুমাত্র মাতৃভাষায় লেখা এমন চিরসবুজ বইয়ের মেলা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় না।

বছরের বাকি ১১টা মাস এই আবেগ কোথায় হারিয়ে যায় সেটাই বড় প্রশ্ন। একুশে বইমেলায় প্রায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ঢল দেখে বাইরের দেশের যেকোনো মানুষের মনে হতে পারে, আহা! বাংলাদেশের মানুষ বই কত্তো ভালোবাসে।

বিজ্ঞাপন
বইয়ের মেলায় কতো যে মানুষ। ছুটির দিনে এত বড় বইমেলায় তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। সবাই যে বই কিনতে আসে তা কিন্তু নয়। আসে বেড়াতে। ঘুরতে আসে। বছরের এটি একটি বড় উৎসবও বটে। অভ্যাস হয়ে গেছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা না হলে প্রতিবাদে ফেটে পড়বে মানুষ। চারদিকে হইচই পড়ে যাবে। প্রচার মাধ্যমে কঠোর সমালোচনা হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি গেল, গেল বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠবে। বইমেলার ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হবে। মাঠের ধুলা নিয়ে জোর বিতর্ক হবে। চুন থেকে পান খসলেই কতো যে কথা হবে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু বইয়ের মেলায় প্রকৃত অর্থে বইয়ের প্রতি ভালোবাসার চিত্রটা বোঝা যায় না। অনেকে মনে করেন একুশে বইমেলায় প্রতিদিন যে পরিমাণে মানুষ আসে তারা যদি প্রত্যেকে একটা করেও বই কিনতেন তাহলে বইমেলা বইশূন্য হয়ে যেত। তবুও আশার কথা হলো, পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে একুশে বইমেলায় যে পরিমাণ বই বিক্রি হয় সেটাই বা কম কিসে? ঐ যে কথায় বলে না ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো’। মামা তো আছে- এটাই স্বস্তি, এটাই আনন্দের। একুশে বইমেলা আছে বলেই আমরা প্রমাণ করতে পারি বই ভালোবাসি। বইয়ের প্রতি আমাদের অনেক দরদ, অনেক মায়া, অনেক ভালোবাসা। আবার একথাও সত্য, বই কিনলেই যে ভালোবাসা উতলে পড়বে সেটা বলা যাবে না। সবাই কী বই কেনে? বই দেখে। বই দেখতে আসাও তো বড় ব্যাপার। সত্যটা বড় কঠিন। তবুও বলি। একুশে বইমেলায় প্রতি বছর শত শত কবি, লেখকের হাজার হাজার নতুন বই প্রকাশ হয়। তারাও কী সবাই বই কিনেন? একজন কবি, লেখক পাঁচটা করে বই কিনলেও তো একটা কাজের কাজ হয়। অধিকাংশ কবি-লেখক নিজে বই কিনেন না। আবার অনেকে আছেন নিজেকে ছাড়া অন্যকে লেখকই মনে করেন না। ‘ও কিসের লেখক? পাতার পর পাতা ‘ছাই পাস’ লিখলেই কী লেখক হওয়া যায়? আমিই শ্রেষ্ঠ লেখক। আমাকেই পড়ো। সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন বিশিষ্ট মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, মেলা মানেই বিপুল মানুষের সমাগম। মানুষ বেশি হলেই আমরা বলি মেলা জমে উঠেছে। বইয়ের মেলায় প্রচুর মানুষ এলো। হৈ চৈ পড়ে গেল। কিন্তু বইয়ের স্টলে বই পড়ে থাকলো তাতে বইমেলার অর্জনটা কোথায়? আমরা কী দিনে দিনে খুব বেশি আনুষ্ঠানিক হয়ে যাচ্ছি? অনুষ্ঠানে যাই। কিন্তু অনুষ্ঠানের উপলক্ষ কী সেটা বুঝি না। বুঝতেও চাই না। সবাই যায়। আমি আমরা না গেলে লোকে কী বলবে? বলিস কী তুই এখনো একুশের বুক ফেয়ারে যাসনি? তুই ব্যাটা একটা খ্যাত। চল বইমেলায় যাই। অনেক ‘চিল’ হবে। মাস্তি হবে। এভাবেই মেলায় যাইরে... আনন্দে বিভোর হয়ে ওঠেন অনেকে। ফলে বইমেলায় বইয়ের প্রতি অনেকেরই খুব একটা আগ্রহ থাকে না। বইমেলা একটি বাৎসরিক উৎসব। তাই আনন্দ ফুর্তি করতেই অনেকে আসেন। 

একজন বিশিষ্ট লেখক বললেন, একুশে বইমেলা আমাদের সাহিত্যের উৎকর্ষতায় প্রতি বছর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর একুশে বইমেলায় এক মাসে কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। হ্যাঁ একথা সত্য ফেব্রুয়ারির পর বইয়ের প্রতি আর কারও ভালোবাসা থাকে না। ‘বইয়ের প্রতি এক মাসের প্রেম। এগার মাসের বিরহ’ এটাই বাস্তব সত্য। একুশে বইমেলা না থাকলে তো ওই এক মাসের প্রেমও থাকতো না। কাজেই একুশে বইমেলা সত্যিকার অর্থে বাংলা সাহিত্যের জন্য বিরাট একটি অনুপ্রেরণা। হোক এক মাসের প্রেম। কিন্তু প্রেম তো! 

এটা হলো তর্কের কথা। সান্ত্বনার কথা। শুধু পাঠককে দোষ দিলে তো হবে না। পাঠকের প্রতি অভিমান করলে চলবে না। এক মাসের প্রেম তো অন্যরাও করেন। একুশে বইমেলা নিয়ে প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা বিশেষ ভাবে প্রশংসা যোগ্য। দেশের প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা প্রতিদিন বইমেলার খবর যত্ন করে প্রকাশ করে। টিভি চ্যানেলগুলো নিয়মিত খবর, প্রতিবেদন প্রচার করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইমেলার খবর প্রচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। মেলা মাঠ থেকে প্রতিদিন একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার করে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে বইমেলার জন্য প্রচার মাধ্যমকে এত তৎপর থাকতে দেখা যায় না। আমাদের ভাষা আন্দোলনের শক্তি ও আবেগের সঙ্গে একুশে বইমেলার শক্তি ও আবেগ নিবিড় ভাবে জড়িয়ে আছে। সে জন্যই একুশে বইমেলার জন্য প্রচার মাধ্যমকে দাওয়াত দিতে হয় না। চিঠি পাঠাতে হয় না। সবাই নিজের গরজে বইমেলায় আসে। না এলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয় থাকে। ওরা বইমেলার সরাসরি খবর দেখাচ্ছে কাজেই আমাদেরও দেখাতে হবে। ওরা বইমেলা নিয়ে টকশো করছে, আমাদেরও টকশো করতে হবে। ওরা কবি-লেখকদের গুরুত্ব দিচ্ছে আমাদেরও দিতে হবে। ওরা বিশেষ কমিশনে বইয়ের খবর ছাপতে শুরু করেছে আমাদেরও তাই করতে হবে। তা না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। 

বইমেলা শেষ হলে প্রচার মাধ্যমেও বইয়ের খবর, কবি-লেখকের খবর খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এখানেও এক মাসের প্রেম, ১১ মাসের বিরহ। অথচ প্রচার মাধ্যম অর্থাৎ সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো ইচ্ছা করলেই বইয়ের প্রতি এক মাসের প্রেমটাকে ১২ মাসে নিতে পারে। সারা বছর বইয়ের খবর প্রচার, প্রকাশের ক্ষেত্রে একুশে বইমেলার বিশেষ ছাড়কে গুরুত্ব দিলে প্রেমটা সারা বছরই বেঁচে থাকার শক্তি পাবে। প্রচারেই প্রসার। প্রচার মাধ্যমে সারা বছর বইয়ের খবর গুরুত্ব পেলে পাঠকেরও দৃষ্টি থাকবে বইয়ের ওপর। তবে এক্ষেত্রে পাঠকেরও দায় কম নয়। শুধুমাত্র বইমেলা এলেই অনেকের বইয়ের প্রতি প্রেম উতলে ওঠে। ফেব্রুয়ারি বই কেনার মাস। বছরের বাকি সময়টায় বইয়ের প্রতি ভালোবাসা না দেখালেও চলবে। বই না কিনলেও চলবে। এই মানসিকতা ঠিক নয়। 

বই পড়া নিয়ে প্রকৃতপক্ষে আমাদের ভাবনাটা কেমন? পরিবারকে বলা হয় প্রথম পাঠশালা। পরিবারের বাবা-মা যেমন সন্তানেরাও তেমনই হয়। বাবা-মায়ের বই পড়ার ক্ষেত্রে যদি আগ্রহ না থাকে তাহলে সন্তানদের আগ্রহ তৈরি হয় না। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন শিশুকালে প্রত্যেকের আইডল হয়ে ওঠেন বাবা-মা। হতে চাই বাবা মায়ের মতো। বাবা-মায়ের ভালো- মন্দ সব কিছুই সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক পরিবারে বাবা-মা বই পড়ার ক্ষেত্রে মোটেই আগ্রহী নয়। তারা বরং আগ্রহী ফেসবুক অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি। ফলে বাবা-মায়ের দেখাদেখি কোমলমতি সন্তানেরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে উঠছে। অবুঝ বাচ্চাকে খাবার খাওয়ার জন্য রাজি করাতে অনেক বাবা-মা তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। অনেকে আবার গর্ব করে বলেনও, আমার ছেলেটা ফোনে গান শোনা ছাড়া খেতেই চায় না। সেই গান দেশের গান হলে না হয় একটা কথা ছিল। গান হতে হবে ধুমধাড়াক্কা। বাচ্চা গানের তালে নাচে আর খায়। বাবা-মায়েরা তখন তৃপ্তির হাসি হাসে। অথচ বই হতে পারে শিশুর প্রিয় বন্ধু। বাবা-মায়ের হাতে বই দেখলে সন্তানেরাও বই হাতে নেয়ার আগ্রহ পায়। 

বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঘুম যাতে হয় সেজন্য অনেকে ঘুমের ওষুধ খায়। অথচ বই পড়ার অভ্যাস থাকলে কাউকে ঘুমের ওষুধ খেতে হবে না। বই পড়তে পড়তে ঘুম এসে যাবে। একটি ভালো বই একজন ভালো বন্ধুও বটে। বই পড়লে সাধারণত অন্যায় চিন্তা, অশুভ চিন্তা, ক্ষতিকর প্রবণতা মাথায় আসে না। বই পড়ার জন্য খুব যে টাকা পয়সা খরচ করতে হয় তাও নয়। কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল বইও এখন হাতের মুঠোয়। ইচ্ছাটাই হলো আসল। 

একুশে বইমেলা এবার আরও বেশি সুন্দর হয়েছে। সুশৃঙ্খল ভাবে সেজেছে এবারের একুশে বইমেলা। স্টল, প্যাভিলিয়নের সাজসজ্জা অন্যান্যবারের চেয়ে এবার অনেক আলাদা, অন্যরকম। ছবির মতো দেখতে। রাতের ঝলমলে আলোতে দূর থেকে বইমেলাকে দেখলে অপরূপ লাগে। গর্ব হয়। হ্যাঁ, গর্ব করার মতোই আমাদের একুশে বইমেলা। পৃথিবীতে আর কোথাও এমন মাসব্যাপী বইমেলার নজির নেই। শুধুমাত্র মাতৃভাষায় লেখা এমন চিরসবুজ বইয়ের মেলা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় না। 
প্রশ্ন হলো, কোয়ালিটি আগে না কোয়ানটিটি আগে? ঝলমলে বইমেলার বেশি প্রয়োজন, নাকি বইয়ের প্রতি অধিকহারে ভালোবাসার বইমেলা প্রয়োজন? শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারিতেই কী আমরা বই কিনবো? বাকি ১১ মাস বইকে ভুলে যাবো? তাহলে কী বইমেলা এক মাসের প্রেম, এগার মাসের বিরহের মাঝেই থেকে যাবে?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ/ তাসে কি তবে টোকা লেগেছে?

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status