ঢাকা, ৪ মার্চ ২০২৪, সোমবার, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২২ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

মত-মতান্তর

রক্তাক্ত বড়দিন, ২০২৩

ড. মাহফুজ পারভেজ

(২ মাস আগে) ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩, সোমবার, ২:১৩ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

মুসলমানের ঈসা নবী (আ.) আর খ্রিস্টানের যিশুর জন্মতিথি তথা বড়দিন বিশ্ববাসীকে আহ্বান করে হৃদয়-মন বড় করতে; উদার হতে, নিজেকে সংকীর্ণতা, স্বার্থের ও হিংসার কবল থেকে মুক্ত করতে। বড়দিনে প্রার্থনা করা হয়: সব সংঘাত, হানাহানি ও যুদ্ধ বন্ধ হোক, এই ধরাতে নেমে আসুক স্বর্গীয় শান্তি। প্রত্যেকের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, একতা ও সম্প্রীতি।

এমন একটি মহত্তম দিন গণহত্যার পাশবিক হামলায় রক্তাক্ত হলে সভ্যতার ইতিহাস কলঙ্কিত হয়। যখন খোদ যিশুর জন্মজনপদে ঠিক তাঁর জন্মদিনেই মৃত্যু ও রক্তের বন্যা চলে, তখন মানবতা স্তব্ধ, বিমূঢ় ও বোবা হয়ে যায়। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এমনই নারকীয় ঘটনার সাক্ষী হলো সভ্যবিশ্ব আর চলে যাওয়ার আগে ২০২৩ সালে চিহ্নিত হলো এক রক্তাক্ত বড়দিন, যা মানব ইতিহাসে অভাবনীয়।  

প্রতিবছরই বড়দিনে গির্জার ঘণ্টাধ্বনিতে মুখর হয় ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের বেথলেহেম। বড়দিন ঘনিয়ে এলে ইসরায়েল অধিকৃত শহরটিতে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় থাকে। আনন্দ-উল্লাস, জমকালো সব আয়োজন থাকে গির্জা ঘিরে। কিন্তু এ বছর এর ছিটেফোঁটাও নেই। যিশুখ্রিষ্টের জন্মস্থান বেথলেহেম এখন প্রায় জনশূন্য।

বিজ্ঞাপন
বাসাবাড়িতেও নেই কোনো আনন্দ।

এরই মধ্যে গাজায় এবার যিশুকে উপস্থাপন করা হয়েছে ইনকিউবেটরে থাকা শিশু হিসেবে। অবরুদ্ধ গাজার শিশুদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এ শিল্পকর্ম করেছেন ফিলিস্তিনি শিল্পী রানা বিশারা এবং ভাস্কর সানা ফারাহ বিশারা। কারণ, গির্জার ঘণ্টাধ্বনির পরিবর্তে অবরুদ্ধ গাজায় এখন বোমার বিকট শব্দ। মুহুর্মুহু হামলায় কেঁপে উঠছে পুরো গাজা। ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মভূমিতে খ্রিষ্টধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিনেও অর্থাৎ স্থানীয় সময় রোববার (২৪ ডিসেম্বর) বিমান হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলি সেনারা। গাজার হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৭৮ জন নিহত হয়েছে ঠিক বড়দিনেই। সব মিলিয়ে ক্ষুদ্র জনপদে মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে।  

পশ্চিমারা, যাদের অধিকাংশই ইসরায়েলের ধামাধরা অনুগত স্তাবক, তারা কখনও গাজাকে অবরুদ্ধ করে রাখা কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে যেতে চায় না। ক্ষতি, জমিচুরি, বঞ্চনা, অমর্যাদা, অপমান আর জাতিবিদ্বেষী রাষ্ট্রের প্রাণঘাতী হামলা সহ্য করে যে লাখ লাখ মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম গাজায় কোনও রকমে বেঁচে আছে, তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টাও করেননি পশ্চিমা মিডিয়া। তারা যা করছেন তা হলো, জটিল একটি গল্পকে কালো ও সাদাদের মধ্যকার বিরোধের মতো করে অনভিজ্ঞ ও ভূগোলের জ্ঞান না থাকা বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন। তাদের বয়ানের মোদ্দা কথা হলো, ইসরায়েলিরা খুবই ভালো মানুষ, সব সময় নিষ্পাপ, তারা ভুক্তভোগী আর পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনিরা সব সময় দোষী, ষড়যন্ত্রকারী, সন্ত্রাসী। কাজেই জীবন বাঁচাতে যা দরকার—খাবার ও পানি—অবরুদ্ধ গাজায় প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া তাদের বিবেচনায় ‘যথার্থ’। বাসাবাড়ি ও হাসপাতালে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়াও ‘সঠিক’। জাতিসংঘের যে স্কুলগুলোতে দিশাহারা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো বোমা হামলা থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের ওপর বোমাবর্ষণ করাও ‘বৈধ’। বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন শিশুদের নিয়ে অন্ধকার হাসপাতালের দিকে ছোটা অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ‘অমানবিক’ নয়।  ইসরায়েল সাদা ফসফরাস বর্ষণ করুক, যেন ফিলিস্তিনিদের হাড় পর্যন্ত পুড়ে যায়, তা-ও ‘জায়েজ’। গণহত্যাকে আড়াল করতে ‘বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালানো হচ্ছে’ মর্মে মিথ্যা ভাষ্য সচিত্র সহযোগে প্রচার করাও তাদের কাছে ‘বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’। তারা এখন ২০২৩ সালের রক্তাক্ত বড়দিন দেখেও চুপ থাকবেন?

২০২৩ সালের শেষ মাসে গাজাকে ২০০৫ সালের ফালুজাতে রূপান্তরের চেষ্টার সত্যটি পশ্চিমের কেউ উচ্চারণ করে নি। ‘গাজা’ নামক জনপদকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও জীবন্ত কারাগারের রূপান্তর করে এর ফটক শক্ত ভাবে বন্ধ করে দিয়ে অসহায় মানুষদের ইদুরের মতো আটকে রাখাকেও কেউ নিন্দা করে নি। ইসরায়েল ও তার সহযোগীরা আসলে চেয়েছে গাজাবাসী যেন এই দমবন্ধ-বন্দিদশা থেকে মুক্তি না পায়। অবরুদ্ধ হয়ে অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষের সামনে কোনও আশা যেন না থাকে।

এখানেই শেষ নয়। ১০ লাখের ওপর মানুষকে গাজা ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হলো, এই আদেশ পালন না করলে মৃত্যু নিশ্চিত। আর এসবই করেছেন পশ্চিমের চোখে ‘ভালো মানুষের’ চেহারা নিয়ে বসে থাকা ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট. মন্ত্রীসভা, সৈন্যবাহিনী। এদের অপকর্মের পশ্চিমা সমর্থকগণ একটি চোখ বন্ধ করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি হামলাকে না দেখে অন্য চোখে দেখা ইসরায়েলিদের হামলাকে আত্মরক্ষা নাম দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞকে প্রশংসা ও গণহত্যাকে স্বাগত জানিয়েছে।

ফলত, কিছু কিছু মানুষের তরফে হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আর্জি জানিয়ে দেশটিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কাকুতি-মিনতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কারণ আইসিসি জানে, ওয়াশিংটন ডিসিতে বসে থেকে যাঁরা এই মিথ্যার বেসাতি করছেন, তাদের মনে আঘাত দেওয়া ঠিক হবে না, উচিত নয় এবং তাদের পক্ষে সম্ভবও নয়। অথচ যে নেতানিয়াহু—কয়েক সপ্তাহ আগেও দুর্নীতি, ঘুষ এবং বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে যার কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, যার শরীরে কর্তৃত্ববাদের ডিএনএ আছে, সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তার অনুগত সমর্থকের দল আবার নেতানিয়াহুকেই পুনর্বাসিত করেছেন। তারা বললেন, এই নেতানিয়াহু নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ‘সহনশীলতা’ ও ‘নৈতিকতা’র পরম পরাকাষ্ঠা।

এমনই রোগাক্রান্ত নৈতিক চেহারা ওয়াশিংটন এবং লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, ব্রাসেলস, ক্যানবেরা ও অটোয়ায় অবস্থিত ইসরায়েলি মিত্রদের।  কিন্তু এতে বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু নেই। বর্বর ঔপনিবেশিকেরা, যাদের নিজেদেরই নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার, তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলার এবং জবরদখল ইতিহাস আছে, তারা ফিলিস্তিনে অপর একটি দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তির হত্যা, নির্যাতনকে সমর্থন করবে, এটাই স্বাভাবিক।

ইসরায়েল ও তার মিত্ররা বিশ্বে এখনও যে লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরোধিতা করছেন, তাদের পক্ষে কথা বলছেন না। পরাশক্তিকে উপেক্ষা করে মানবিক বিশ্ব কিন্তু ঠিকই ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবির প্রতি ধারাবাহিকভাবে তাদের সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিমের ‘সবুজ সংকেত’ পেয়ে ইসরায়েলে যতই আঘাত হানুক ও রক্তাক্ত বড়দিন উপহার দিক, মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিরা ভেঙে পড়ছেন না। তারা টিকে আছেন। হয়তো হানাদার উপদ্রুত সঙ্কুল পরিস্থিতি পেরিয়ে ফিরে আসাটা কঠিন, সময়সাধ্য। তথাপি তারাই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে নিজেদের আবার পুনর্নির্মাণ করবেন। যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অর্জন করবেন অধিকার, মুক্তি। এবং ২০২৩ সালের রক্তাক্ত বড়দিনের বিপরীতে রচনা করবেন শান্তি ও মানবিকতার ইতিবৃত্ত।

ড. মাহফুজ পারভেজ, লেখক ও গবেষক। প্রফেসর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

   

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবদলই সরকার সমর্থিত / ভোটের মাঠে নেই সরকারি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বিরোধীদল

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status