ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

মত-মতান্তর

‘Local Government’ কীভাবে ‘স্থানীয় শাসন’!

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

(২ মাস আগে) ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩, রবিবার, ৩:০৩ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১০:১২ অপরাহ্ন

mzamin

সংবিধান যে কোনো দেশ বা জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লিখিত দলিল। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশেরও বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ একটি সংবিধান নামক লিখিত দলিল আছে। এটির স্থান অন্যসব বিদ্যমান ও প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে। খোদ সংবিধান [৭(২) অনুচ্ছেদ] স্পষ্ট করে ঘোষণা দিয়েছে “…..এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে৷”

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতার পর আমাদের সংবিধান প্রণেতারা অনেক চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবিধান যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেন যা ১৯৭২ সালে কন্সটিটুয়েন্ট এসেম্বলী (Constituent Assembly) দ্বারা গৃহীত হয়। তাই এত আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংবিধান সম্পর্কে ব্যাখ্যা বা কথা বলতে হলে ঐতিহাসিক পেক্ষাপট, স্পিরিট, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। দুঃখ লাগে যখন কেউ কেউ সংবিধানকে দেশ ও জাতির বৃহত্তর দৃষ্টিকোণের পরিবর্তে তাদের সংকীর্ণ ব্যক্তি ও দলীয় বা গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যাখ্যা দেন বা দেয়ার চেষ্টা করেন।

সংবিধানকে সঠিকভাবে অনুসরণ, সংবিধানে উল্লেখিত সরকারের বিভিন্ন অঙ্গগুলোর দায়িত্ব অনুধাবন, সংবিধানে বর্ণিত অধিকারগুলো জনগণের জন্য নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ ও জনসাধারণের মধ্যে টেকসই (sustainable) সম্পর্ক তৈরি করার জন্য সংবিধান ও তার অনুবাদ হওয়া উচিৎ সহজপাঠ্য, সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ (consistent)। কিন্তু সংবিধানের ৩য় পরিচ্ছেদের (Third Chapter) অন্তর্গত ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ পড়ে তা হয়েছে বলে মনে হয় না। বরং এখানে অর্থ ও অনুবাদকে বিকৃত করা হয়েছে।

তৃতীয় পরিচ্ছেদের ইংরেজি শিরোনাম (Title) এবং ৫৯ অনুচ্ছেদের উপ-শিরোনাম (Sub-title) হচ্ছে “Local Government” যার বাংলা অর্থ হবে “স্থানীয় সরকার”। কিন্তু সংবিধানে এটির বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে “স্থানীয় শাসন”। ঠিক অনুরূপভাবে ৬০ অনুচ্ছেদের ইংরেজি উপ-শিরোনাম হচ্ছে “Power of local government bodies” যার সহজ বাংলা অনুবাদ হওয়ার কথা “স্থানীয় সরকারের অঙ্গসমূহের ক্ষমতা”।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু সংবিধানে এটির বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে “স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা”। লক্ষ্য করার বিষয় যে ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ যেখানেই “Local Government” টার্মটি লেখা হয়েছে সেখানেই তার বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে “স্থানীয় শাসন” হিসেবে।

আবার মজার ব্যাপারে হচ্ছে, যে ৫৯ অনুচ্ছেদ ব্যবহৃত ইংরেজী “Administration” এবং “Administrative” শব্দদ্বয়ের সঠিকভাবে বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে যথাক্রমে “প্রশাসন” ও “প্রশাসনিক”। যেমন অনুচ্ছেদ ৫৯(২)(ক) বলেছে “administration and the work of public officers” যার বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে “প্রশাসন ও সরকারী কর্মচারীদের কার্য”। একইভাবে অনুচ্ছেদ ৫৯(১) ও ৫৯(২) - এ ব্যবহৃত “administrative unit” -এর ইংরেজি টার্মেরও সঠিকভাবে বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে “প্রশাসনিক একাংশ”।

সত্যিকার অর্থে “local government” এর বাংলা অনুবাদ হবে “স্থানীয় সরকার” আর “local administration” এর বাংলা অনুবাদ হবে “স্থানীয় শাসন”। সংবিধানের ভুল অনুবাদে “Local Government” হয়ে গেল “স্থানীয় শাসন”! আর এর ফলে জনগণের সেবার ব্রত নিয়ে হওয়া সিভিল সার্ভেন্টরা নিজেদেরকে ভাবতে লাগলেন অনেকটা জনগণের প্রভু হিসেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রচিন্তকরা ব্যাপারটি ভাল করে বুঝবেন এর সুদূর প্রসারী impact ও influence। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি  মোহাম্মদ আব্দুর রউফের সঙ্গে এ নিয়ে বেশ লম্বা আলাপ হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে যখন তিনি লন্ডনে সফর করছিলেন। তিনিও একমত যে ভুল অনুবাদ করে “Local Government” তথা “স্থানীয় সরকার”কে ”স্থানীয় শাসন” হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায় “আমলা সাহেবরা সুকৌশলে মতলবি অনুবাদ করে জনগণকে সেবার পরিবর্তে তাদেরকে শাসন করছেন।”

অনেকে মনে করেন ভুল করে নয় বরং ইচ্ছাকৃতভাবে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই এমন অনুবাদ করা হয়েছে। আর এ কাজটি করেছেন আমলারা তাদের নিজেদের কোটারী স্বার্থ বা কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করতে বা বজায় রাখতে। জনগণের নয় বরং সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে জনগণকে শাসন করার নিমিত্তে সুচতুরতার সাথে জেনেশুনেই এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনুবাদ করা হয়েছে। কথাগুলে একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়।

“স্থানীয় সরকার” ও “স্থানীয় শাসন” টার্ম দুটির ভাবার্থ ও চেতনা (spirit) মোটেই এক বা সমান নয়। “স্থানীয় সরকার” কনসেপ্টে আসে নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালনা করার নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা। উন্নত গণতন্ত্রে স্থানীয় সরকারগুলো পরিচালিত হয় নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা সেখানে আমলাদের কোনো দৌরাত্ন্য বা আধিপত্য থাকে না। যেমন বৃটেনে বিভিন্ন সিটি, মেট্রোপলিটন ডিস্ট্রিক্ট, ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল, পারিস কাউন্সিল, সিটি অব লন্ডন, কাউন্টি কাউন্সিল ও লন্ডন বারা কাউন্সিল নিয়ে স্থানীয় সরকার (local government) গঠিত। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ইউনিট জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি তথা মেয়র, এসেমব্লী মেম্বার, লিডার ও কাউন্সিলর দ্বারা পরিচালিত হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রশাসন পরিচালনার জন্য একঝাঁক দক্ষ সিভিল সার্ভেন্ট থাকে যাদের নেতৃত্বে আছেন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ডাইরেক্টবৃন্দ এবং তাদের সবার উপরে আছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তথা Chief Executive Officer (CEO)। তবে বাংলাদেশের ইউএনও বা ডিসিদের মতো বৃটেনের local government -এর Director বা CEO -দের জনগণের উপর প্রাধান্য (prominency) নেই, আধিপত্যও (dominance) নেই।

অপরদিকে, “স্থানীয় শাসন” কনসেপ্ট আসে শাসন করার রেওয়াজ ও মানসিকতা থেকে। আমলা সাহেবরা কত সুক্ষ ও সুনিপূনভাবে টার্মগুলোকে আমাদের সমাজে তাদের মতো করে প্রচলন করেছেন যার সঠিক জিনিষগুলো শুনতে ও বলতে হয়তো নতুন নতুন লাগবে। যেমন ধরুন - ডিসি’র পূরো অর্থ বা মিনিং হচ্ছে “ডেপুটি কমিশনার” তথা “উপ কমিশনার”। এই ডিসি’র সংক্ষিপ্ত রূপকে কেন “জেলা প্রশাসক” বলে চালানো হচ্ছে তা বোধগম্য নয় যেমনটি ইংরেজিতে লেখা সংবিধানের ৩য় চ্যাপ্টারের অন্তর্গত ৫৯ অনুচ্ছেদে Local Government’কে বাংলায় “স্থানীয় সরকার” এর পরিবর্তে “স্থানীয় শাসন” হিসেবে চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও ও জেলা পর্যায়ে ডিসিরা প্রচণ্ড প্রভাবশালী, প্রতাপশালী ও ক্ষমতাশালী। অথচ এ দুটি পজিশন যথাক্রমে এডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডারের ক্রমানুসারে একেবারে নীচু বা মাঠ পর্য়ায়ের ও মধ্যম সারির। ইউএনও-এর পজিশন সহকারী সচিব থেকে বড়জোর সিনিয়র সহকারী সচিব পদ মর্যাদার। অপরদিকে ডিসি’র পজিশন হলে উপ-সচিব মর্যাদার। তার উপরে আরো চারটি ধাপ রয়ে গেছে: যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব ও সিনিয়র সচিব। প্রশাসনের একেবারে নীচু ও মধ্যম সারির ক্যাডার হওয়ার পরও ইউএনও ও ডিসিরা জনগণের উপর প্রচণ্ড প্রভাব ও আধিপত্য খাটাতে পারেন। অথচ তাদেরকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। সত্যিকার অর্থে স্থানীয় সরকারের ইউনিট দুটি তথা উপজেলা ও জেলাতে প্রশাসনগুলো পরিচালিত হওয়া উচিৎ ছিল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা যারা থাকবে জনগণের কাছে দ্বায়বদ্ধ এবং জনগণ তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ জণপ্রতিনিধিদের ভূমিকা হবে মূখ্য আর সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে ইউএনও ও ডিসিদের ভূমিকা হবে গৌন, পরোক্ষ ও সেবা দেয়ার মনোভাবসম্পন্ন (customer service mentality)।

জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে সংবিধানের ইচ্ছাকৃত অনুবাদের বদৌলতে ইউএনও ও ডিসিরা local government-এ শাসন করছেন। অথচ তারা হলেন সিভিল সার্ভেন্ট - মানে জনগণের সেবক। জনগণের সেবা করাই তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য। বাস্তবতা হচ্ছে তারা করছেন শাসন, অনেকটা প্রভু হয়ে বা প্রভু মনে করে। তাইতো সেবক হিসেবে জনগণকে যেখানে তাদের “স্যার” সম্মোধন উচিৎ ছিল বরং সেখানে দেখি আমরা উল্টো। অনেক জায়গায় ইউএনও ও ডিসিদের “স্যার” সম্মোধন না করায় নাজেহাল হতে হয়েছে সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের। সাধারণ নাগরিকদের সাথে অহরহ কী আচরণ করা হয় তা বলাই বাহুল্য। অথচ গণতন্ত্রের সুতিকাগার বৃটেনে সাধারণ জনগণ যখন সেবা নেয়ার জন্য স্থানীয় সরকারে কর্মরত সিভিল সার্ভেন্টের কাউন্টার থেকে সর্বোচ্চ পদ চীফ এক্সিকিউটিভের অফিসে যান তখন তাদের উদ্দেশ্যে সিভিল সার্ভেন্টদের প্রথম বাক্যই থাকে “How can I help you Sir”? আর আমাদের সরকারি অফিসগুলোতে যেন সিভিল সার্ভেন্টরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন যে তাদেরকে সাধারণ জনগণ এসেই “স্যার” বলে ডাকবে! কদাচিৎ “স্যার” সম্মোধন না করলে বা করতে ভুলে গেলে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়, ক্ষেত্র বিশেষ নাজেহাল বা লাঞ্ছিত করা হয়। এই হলো আমাদের সিভিল সার্ভেন্টদের মন-মানসিকতা।

সময় এসেছে সংবিধানের বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভুলটি সংশোধন করে “Local Government” এর অনুবাদ “স্থানীয় শাসন” এর স্থলে “স্থানীয় সরকার” প্রতিস্থাপন করা। এর সাথে সংবিধানের স্পিরিট অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ইউনিট জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে আমলাদের দৌরাত্ম বা অহেতুক আধিপত্য হ্রাস পাবে। ফলে তাদের মধ্যে জনগণের সেবা করার মনোভাব ও মাইন্ডসেট তৈরি হবে বা বৃদ্ধি পাবে।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রচিন্তক এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: [email protected]

পাঠকের মতামত

যথার্থই বলেছেন, কিন্তু যত সহজে বলা গেল ততো সহজে সমাধান নেই। কাঠামোগত পরিবর্তন আনার জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও জনগণের অধিকার সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু আমরা বেশির ভাগ ই বাকা পথে কাজ আদায় করতে চাই আর আমলা/সরকারী কর্তাব্যক্তিরা এ সুযোগে নিজেদের অনৈতিক সুযোগ সুবিধা/ অবস্থান করে নেয়।

abu-mahtab
১৭ ডিসেম্বর ২০২৩, রবিবার, ৭:০৫ পূর্বাহ্ন

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবদলই সরকার সমর্থিত / ভোটের মাঠে নেই সরকারি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বিরোধীদল

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status