ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মঙ্গলবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

মত-মতান্তর

এমন নীরবতায় ওসমানীর ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যায় না

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন

(৫ মাস আগে) ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, শনিবার, ১২:০৩ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৮ পূর্বাহ্ন

mzamin

শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংগ্রামেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। এ দেশের জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছিল। একটি আধুনিক সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর সাথে সমর যুদ্ধ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো বিক্ষিপ্ত জনযুদ্ধ ছিল না। সামরিক পরিকল্পনায় যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। অধিনায়ক ছাড়া সামরিক যুদ্ধ হয় না। আমাদের যুদ্ধেরও একজন অধিনায়ক ছিলেন। বাঙালি জাতীর মুক্তিযুদ্ধের সামরিক প্রধান ছিলেন এম এ জি ওসমানী। যুদ্ধ করে জাতীর জন্য বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনার বিরল গৌরব তিলক অর্জন ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।

১ সেপ্টেম্বর ছিল মরহুম জেনারেল ওসমানীর ১০৫তম জন্মবার্ষিকী। মহান মুক্তিযুদ্ধের এ সমরনায়ককে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণের কোনো উদ্যোগ কোথাও নেই।

বিজ্ঞাপন
গদিরক্ষা আর গদি থেকে টেনে নামানোর সংগ্রামই আমাদের শেষ হচ্ছে না। এরমধ্যে ফাউন্ডিং ফাদার্সদের স্মরণ করার অবকাশ আমাদের নেই। এমন আয়োজন কে করবে?  আমাদের রাজনীতির কঠিন সব সমীকরণের মধ্যে!
ফাউন্ডিং ফাদার্সদের মধ্যে মরহুম তাজউদ্দিন আহমদকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হয় না। উপেক্ষাই করা হয়। মহান স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নামেই, তাঁর আহ্বানেই দেশটা স্বাধীন হয়েছে। এতো কোনো দূরের ইতিহাস নয়।
একজন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বই মরহুম এম এ জি ওসমানী সত্তরের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কৈশোরে একজন এম এ ওসমানীর জনসভায়ই প্রথম 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়েছি। সত্তরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এ কর্নেল জনগণের সাথে মিশে গিয়েছিলেন। সামন্ত পরিবারের সন্তান আর ব্রিটিশ আভিজাত্যের সামরিক খোলস ফেলে এম এ জি ওসমানী সত্তরের নির্বাচনে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
পাকিস্তানের বৈষম্য নীতির কথা মরহুম ওসমানী বলতেন দৃঢ়তার সাথে। সামরিক, বেসামরিক সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের নাগপাশ থেকে মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর আহ্বান তিনি পৌঁছে দিয়েছেন গ্রামবাংলার মাঠে ঘাটে। সিলেটের প্রত্যন্ত এক গ্রামের বাজারে সত্তরের নির্বাচনে এম এ জি ওসমানীর তেজোদীপ্ত বক্তৃতা শুনে উদ্দীপ্ত হয়েছি।  
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে  এম এ জি ওসমানী হাল ধরেছিলেন সামরিক বাহিনীর। পাকিস্থান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করা সেনাদের ঐক্যবদ্ধ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কাজটি এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বেই হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদ্যনাথতলা গ্রামের নামকরণ হয় মুজিবনগর। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রথম বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে এখানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
মুজিব নগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মুজিব নগর সরকারের ১৫টি মন্ত্রণালয় তখনই কার্যক্রম শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অধীনে ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি করা হয় এম এ জি ওসমানীকে। যুদ্ধরত অঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রতিটিতে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ওসমানী শুধু ভারতে অবস্থান করে সামরিক অভিযানেরই নেতৃত্ব প্রদান করেননি। সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের কাছে সেসময় যুদ্ধের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন। এম এ জি ওসমানীর কাজিন রফিক উদ্দিন আহমেদ, পাখি মিয়া ছিল তাঁর পারিবারিক নাম। রফিক উদ্দিন আহমেদ পেশায় ছিলেন তড়িৎ প্রকৌশলী। মহাকাশচারীদের অ্যাপোলো ১১ নভোযান থেকে চাঁদে নিয়ে যায় যে লুনার মডিউল, সেটার নকশা প্রণয়ন ও কারিগরি কাজে যুক্ত ছিলেন রফিক উদ্দিন আহমেদ।
২০১৭ সালে নিউইয়র্কের স্মিথটাউন শহরে আমেরিকার চন্দ্রাভিযানের গল্প শুনতেই স্মিথটাউনে গিয়েছিলাম। ঝাপসা স্মৃতি হাতড়ে তিনি শুনিয়েছিলেন অ্যাপোলো ১১-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার সেই গৌরবের গল্প। প্রথম জেনেছিলাম মানব জাতির প্রথম চন্দ্রাভিজানের সাথে আমাদের একজন বঙ্গসন্তানও জড়িত ছিলেন। রফিক উদ্দিনই জানিয়েছিলেন, একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমেরিকা থেকে বেতারযন্ত্র পাঠায়েছিলেন। এম এ জি ওসমানীর সাথে তিনি তখন চিঠিপত্র বিনিময়ের গল্প করেছিলেন অহংকারের সাথে।

আমাদের রাজনীতি সরল রেখায় যায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সাথে এম এ জি ওসমানীর মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বাকশাল কর্মসূচী কতোটা ভালো উদ্যোগ ছিল সে এক ভিন্ন আলোচনা। ওসমানী বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আসার বিরোধিতা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ থেকে, সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওসমানী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ভোটে বিজয়ী হয়ে ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রিত্ব এবং আওয়ামী লীগ সদস্য পদ ত্যাগ করেন।
পঁচাত্তরের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ওসমানীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। যে বঙ্গবন্ধুকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন ওসমানী, তাঁর হত্যাকাণ্ডে তিনি কেন গর্জে উঠেননি? ২৯ আগস্ট ১৯৭৫ সালে মোশতাক আহমেদের মন্ত্রিসভায় ওসমানী প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পদত্যাগ করেন।
মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় উপদেষ্টা হিসেবে কেন যোগদান করেছিলেন ওসমানী? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক বা সামারিক ষড়যন্ত্রের সাথে দুরত্বতম কোনো সম্পর্ক তাঁর ছিল না।
১৯৭৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোটেই ওসমানী প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তখন অনেকটাই অভিভাবকহীন। নৌকা প্রতীক নিয়েই চষে বেড়িয়েছেন পুরো দেশ। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে দেশ চষে বক্তৃতা দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এম এ জি ওসমানী। সে নির্বাচনে তাঁর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়। জেনারেল ওসমানীর প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে আমার মতো এক অভাজনের কোন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। 
তবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখে নানা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক বাহিনীর লোকজন জেনারেল ওসমানীকে পিতৃ সমান ভক্তি করতে দেখেছি। কাউকেই কাছে দাঁড়িয়ে কিছু বলার সাহস করতে দেখিনি। অল্প কিছুদিন তাঁর সান্নিধ্যে থেকে এবং তাঁর কথাবার্তায় মনে হয়েছে, ১৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে, আশঙ্কায় পড়েছিলেন। ভারতীয় বাহিনী মার্চ করতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল তাঁর মধ্যে। বিশৃংখল হয়ে পড়া সামরিক বাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ রাখাকে জরুরি মনে করেছেন। ঘাতকদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া বা রুখে দাঁড়াতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন।
অবসরের দিনগুলোতে দিনের পর দিন টাইপ রাইটারে লিখে যেতেন জেনারেল ওসমানী। বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে পরবর্তী সময়ের অনেক গোপন বিষয়ের বিস্তারিত থাকবে তাঁর লেখায়। খুবই গোপনীয় অবস্থায় লিখে যেতেন দরজা বন্ধ করে। উৎসাহ দেখালে বলতেন, সব জানানোর জন্যই তিনি লিখে চলছেন।
১৯৮৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মরহুম ওসমানীর লেখা পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। সামরিক পাহারায় তাঁর দাফন হয়েছে। এ নিয়ে কেউ কেউ খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ পাণ্ডুলিপিটির খোঁজ পাননি। ধারণা করা হয়, এম এ জি ওসমানীর লেখা পাণ্ডুলিপি সামরিক তত্ত্বাবধানেই গায়েব করা হয়েছে। 
১৯৮২ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে। জেনারেল ওসমানী বিবৃতি দিয়েছিলেন, 'আইয়ুবের প্রেতাত্মা বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়া হাঁটিতে শুরু করিয়াছে।' দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ছাপা হওয়া বিবৃতি হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। নিজে সামরিক বাহিনীর লোক হলেও সামরিক শাসন তাঁর খুবই অপছন্দ ছিল। ব্রিটিশ গণতন্ত্রের ভাবাদর্শ লালন করতেন। যদিও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য খুবই অনুপযুক্ত বলে আমার মনে হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত সান্নিধ্য পেয়েও।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সমরনায়ক রাজনীতিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আমাদের অপ-রাজনীতির খানা খন্দকে পা বাড়িয়ে সফল হননি ঠিকই। একটি জাতীকে স্বাধীন করার সামরিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানী। তিনটি দেশের সামরিক বাহিনীতে কাজ করার বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন ছিল তাঁর। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে যেসব যোদ্ধারা, তাদের অধিনায়ক ছিলেন ওসমানী। মহান যুদ্ধের বিজয়ী সেনা নায়ককে কি মনে রেখেছে দেশের মানুষ? মৃত্যুর আগে সর্বস্ব দান করে গেছেন দেশের জন্য। নির্লোভ এ দেশপ্রেমিক বাংলার উর্বর মাটির এক বিরল খাঁটি  সন্তান ছিলেন।  
জেনারেল ওসমানীর জন্ম মৃত্যু দিবসে রাষ্ট্র নীরব থাকে, আমরা নাগরিকরাও নীরব থাকি। এমন নীরবতায় একজন ওসমানীর ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যায় না। ম্লান হয় আমাদের গৌরবগাঁথা।

-

নিউইয়র্ক । ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩
[email protected]

 

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবদলই সরকার সমর্থিত / ভোটের মাঠে নেই সরকারি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বিরোধীদল

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status