ঢাকা, ২৬ জুন ২০২২, রবিবার, ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৫ জিলক্বদ ১৪৪৩ হিঃ

মত-মতান্তর

বা জে ট প্রতিক্রিয়া

বাজেট প্রণয়নে জনগণের কোনো ভূমিকা নেই, এটা দুঃখজনক

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
১২ জুন ২০২২, রবিবার

এক বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। সারা বিশ্বও যাচ্ছে। কোনো কোনো দেশে অভিঘাতটা বেশি। যে দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে; অভিঘাত সহ্য করার ক্ষমতা বেশি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। সবাই একমত আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা জাল বিশেষ করে তিনটা সমস্যা বা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রথমত অনেক দিকে ছড়ানো ছিটানো। ২২ থেকে ২৩টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এ সমস্ত কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সংখ্যা হিসাবে কেউ বলছেন ৯৯টি; আবার কারুর হিসাবে ১২২টি। সমন্বয়হীনতা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয়ত, যাদের এই তালিকার মধ্যে থাকার কথা তারা এই তালিকাভুক্ত হননি। তৃতীয়ত, তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা না তিনি রাজনৈতিক বা অন্যভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।  গত ৩০ বছরে যে অগ্রযাত্রা হয়েছিল, কোভিডকালে তার বিপরীতমুখী পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন নতুন দারিদ্র্য তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের আগে থেকেই খাদ্য পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। জ্বালানি তেলের দামও বাড়ছে। 

 

জনগণের অর্থ। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের কি কোনো ভূমিকা আছে? নেই, এটা খুব দুঃখজনক। বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি বা বাজেট একটি অর্থবিল। আমরা সবাই জানি অর্থবিল নিয়ে কোনো কমিটিতে আলোচনা হয় না। অর্থবিল সংসদে পেশ করা হয়। এবার অবশ্য অন্যভাবে পেশ করা হয়েছে চিরায়ত প্রথার বাইরে গেছেন। যারা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে জানেন বা সংসদীয় আচার রীতি নিয়ে জানেন তারা বলতে পারবেন এ ধরনের বাজেট উপস্থাপন করা যায় কিনা।

 

একটা বড় রকমের জীবন যাত্রার ব্যয় নির্বাহে সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যভাবে বললে সমাজের মধ্যে বড় রকমের ভাঙন তৈরি হয়েছে।  বলা হয়, সামাজিক নিরাপত্তা জাল খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের তিন শতাংশের কাছাকাছি হবে। হিসাবটা ঠিকঠাক করলে দেখা যাবে এটি ১ দশমিক ৫ শতাংশ। বরাদ্দ কম কেন? মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় আমাদের কর আদায় অন্য দেশের তুলনায় একেবারে তলানির দিকে। অন্যদিকে এমন কতগুলো খাত আছে যেখানে দিন দিন বরাদ্দ বেড়েই চলছে। যেমন ঋণ পরিশোধের খাত, বেতন ভাতাদি। এবং শুভঙ্করের ফাঁকি সবার জানা। সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পেনশন বেতন ভাতাদিরই একটা অংশ হওয়ার কথা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অংশ হিসাবে দেখানো হয়। এর পরিমাণ অনেক বেশি। ভর্তুকি  অবশ্যই প্রয়োজন। কৃষকের দরকার, রপ্তানি বা উৎপাদন ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য পানি গ্যাসের বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়াই যেতে পারে। কিন্তু ভর্তুকি কী খানায় বা কারখানায় যাচ্ছে? যাচ্ছে কোথায়? যেমন, বিদ্যুৎ উৎপাদন করুন আর নাই করুন ক্যাপাসিটি চার্য দেয়া হচ্ছে। 

সুতরাং রাজস্ব ব্যয়ে শৃঙ্খলা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ রাজস্ব খাত থেকে অধিক বরাদ্দের মাধ্যমে নিষ্ক্রিতির আশা হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। একটি অনিশ্চয়তার সময় পার করছি। যখন অর্থনীতিতে ঝুঁকি থাকে; তা নিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়। মূল্যস্ফীতি হয়েছে; এই মূল্যস্ফীতি যদি মুদ্রা সরবরাহের কারণে ঘটতো, তাহলে বলা যেতো সুদের হার বাড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। কিন্তু এটা এমন এক ধরনের মূল্যস্ফীতি, অধিকাংশ জনগণের ওপরে বড় ধরনের অভিঘাত। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের সংকট। সরকারি হিসেবে নাই; বেসরকারি বিভিন্ন হিসাব বলছে নতুন করে দরিদ্র তৈরি হয়েছে। তার কারণ- বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দিন আনে দিন খায়।  মোট দেশজ উৎপাদনের ৪টি অংশ। কি পরিমাণে ভোগ করা হচ্ছে, দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ, তৃতীয়ত আমদানি রপ্তানির নিট এবং চতুর্থত সরকারি ব্যয়। বড় টান পড়েছে। যিনি তিন বেলা খেতেন তাকে  দুই বেলা খেতে হচ্ছে। খাবারের পরিমাণ সংকুচিত করতে হচ্ছে।  

অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কোভিড প্রাক্কালেই স্থবির ছিল এবং এমনিতেই কোভিডকালে সংকুচিত হয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়েনি। ঐ কারণে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি। আবার হার হিসাবে কর থেকে আয় বাড়েনি। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানও বড় চ্যালেঞ্জ।  ইতিহাসগত দিক থেকে চিন্তা করলে অন্তত উত্তরণের তিনটি মাইলফলক ধরা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে পুনর্গঠন। অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপের পুনরুদ্ধার। এবং ১৯৩০ সালের মহামন্দা থেকে উত্তরণ। ১৯৪৩ সালের জুন মাসে তার দেশের অর্থমন্ত্রীর জন্য লর্ড জন মেইনারড কেইন্স ‘মেইনটেন্স অব এমপ্লয়মেন্ট’ নামে একটা নোট প্রস্তুত করেন। 

 

 

এখানে দেখা যাচ্ছে উত্তরণের মূল পন্থা হচ্ছে কর্মসংস্থান। সবারই জানা প্রাক কোভিডকালে আমাদের বেকারত্ব বাড়ছিল। এর মধ্যে যুব বেকারত্ব বেশি বাড়ছিল এবং শিক্ষিত যুব বেকারত্ব আরও বেশি বাড়ছিল। কোভিডকালে দুই বছরেরও বেশি শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। তারা দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারতেন, আয় করতে পারতেন এবং তিনি যার ওপর নির্ভরশীল তাকে এক ধরনের দায় দিতে পারতেন। কোনোটাই পারেননি। আমরা সবাই চাই জনমিতিক লভ্যাংশ। সেখান থেকেও দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। সবাই কর্মসংস্থান তৈরিকারী একটা মেগা প্রকল্প চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম কর্মসংস্থান অধিকার ভিত্তিক ও আনুষ্ঠানিক খাতে হোক। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী আমরা দেখেছি আনুষ্ঠানিক খাতে ঋণাত্মক কর্মসংস্থান হচ্ছে। তার মানে যেটাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় বিশিল্পায়ন। শুভকর নয়। আমরা চাই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ুক। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়। যুক্তরাজ্যে তৈরি করেছিলেন লর্ড বেভারিজ। 

তিনি আমাদের এই রংপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস- রংপুর আজও আমাদের দেশের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের ঠিকানা। মহামন্দা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট কর বাড়ান এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের দেশগুলোর মানুষের হাতে টাকা পৌঁছিয়েছে। কিন্তু আমাদের কোনো তালিকা নাই। প্রতিবার প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে। বিভিন্ন নাম দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন তিনি ৫০ লাখ মানুষকে নগদ টাকা দেবেন। কিন্তু ৩৫ লাখের বেশি মানুষের কাছে টাকাটা পৌঁছাতে পারছেন না। কারণ তালিকাটা তৈরি হচ্ছে না। দ্বিতীয় মেগা প্রকল্প আমরা চেয়েছিলাম সার্বজনিন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। মানুষ অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে না পড়ে। ৩০ বছরে এক ধরনের দরিদ্র পরিস্থিতি থেকে উন্নতি ঘটেছে। ডিসেন্ট লিভিং নিশ্চয়তা দিচ্ছে কিনা তা’ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। এক ধরনের উত্তরণ তো ঘটছে।  তিন নম্বর মেগা প্রকল্প আমরা চাচ্ছিলাম সবসময়। আয়কর এক নম্বর খাত হোক। 

তাহলে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা হবে। যার আয় বেশি তিনি কর বেশি দেবেন। মূল্য সংযোজন করের মতো না যে সবার জন্য সমান। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে চাই। আমাদের আকাঙ্ক্ষাটা অনেক বড়। সেজন্য সরকারি ব্যয়টা বাড়াতে হবে। সেজন্য কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। আমরা দেখছি এডহক ইনক্রিমেনটালিসম। অর্থবিল হচ্ছে এবং এসআরও প্রতিনিয়ত আসছে। হোমওয়ার্ক দরকার। সরবরাহ ব্যবস্থা শৃঙ্খলার যে অবস্থা হয়েছে তাহলে কোন কোন খাতে প্রণোদনা দরকার। কোন কোন খাতে আমদানি বিকল্প হওয়া দরকার। মানুষকে আর পিছিয়ে না পড়তে হয়। অভিঘাত সহ্য করার ক্ষমতাটা থাকে। অর্থাৎ তিনি যদি মা হোন তিনি তার বাচ্চাকে প্রতিপালন করছেন তাহলে মাতৃকালীন ভাতা দরকার। যাতে তিনি শিশুকে মানুষ করতে পারেন। বেকারত্ব ভাতা দরকার। খেয়াল করলে দেখা যাবে এখন আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা চাই সমাজের এই ভাঙন থেকে অগ্রগতি হোক; আমরা বলতে পারি আমরা স্বাধীনতার চেতনায় সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  গড়ছি। 

এবং তরুণরা সেই বাংলাদেশের অগ্রবর্তী থাকবেন। তিনি যদি অধিকারযুক্ত পেশা থেকে আয় বেশি করেন; কর বাড়বে। কর বাড়লে রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়বে। রাষ্ট্র তখন সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করতে পারবে।  যখন সংশোধিত বাজেট আসে, তখন দেখা যায় বেতন ঠিকই থাকে, সুদ পরিশোধ ঠিকই আছে, ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে; কমে যায় স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং কৃষিতে ব্যয়। কেইন্স তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, উন্নয়ন বাজেট হবে একটি ‘মৌলিক ধারণা’ আর ঘাটতি অর্থায়ন এক ‘মরিয়া অনৈতিক সুবিধামাত্র।’ তার মানে একটা নতুন ধরনের ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। সেটা কি আমরা পেরেছি? আমরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি।  নজরদারি ও জবাবদিহিতা দরকার। এনবিআর বলছে আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটা তথ্য আর বাংলাদেশ ব্যাংক আরেক তথ্য দিচ্ছে। একটু খতিয়ে দেখি না ফাঁকিটা কোথায়। আদৌ কি টাকাটা পাচার হচ্ছে কিনা? কিন্তু দেখা যাচ্ছে একটা অপরাধকে এক ধরনের জায়েজ করার চেষ্টা। ন্যায্যতা হয়নি।  জনগণের অর্থ। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের কি কোনো ভূমিকা আছে? নেই, এটা খুব দুঃখজনক। বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি বা বাজেট একটি অর্থবিল। 

আমরা সবাই জানি অর্থবিল নিয়ে কোনো কমিটিতে আলোচনা হয় না। অর্থবিল সংসদে পেশ করা হয়। এবার অবশ্য অন্যভাবে পেশ করা হয়েছে চিরায়ত প্রথার বাইরে গেছেন। যারা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে জানেন বা সংসদীয় আচার রীতি নিয়ে জানেন তারা বলতে পারবেন এ ধরনের বাজেট উপস্থাপন করা যায় কিনা। অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উত্থাপন করেন সংসদ সদস্যরা এটা শুধু পাশ করে। আর কিছু করতে পারে না। তারা তাদের দলের বিপক্ষে যেতে পারবে না। বাংলাদেশের সংবিধানে দলের বাইরে যেয়ে ভোট দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়- জাতীয় বাজেট: কার জন্য, কেন এবং কীভাবে প্রবৃদ্ধি? 

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com