মত-মতান্তর
রিভলবার রিটার্ন- ছয় যুবকের ২৪ ঘণ্টার রহস্য যাত্রা!
যুক্তরাজ্য থেকে ডাঃ আলী জাহান
(১ মাস আগে) ২২ আগস্ট ২০২৩, মঙ্গলবার, ৯:৪৪ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

হ্যান্ডকাপস পরা এ যুবকদের ২৪ ঘণ্টার কোনো হিসেবে নেই
১. রিভলবার ফিরে এসেছে। শটগান এবং দুনলা বন্দুকের আবার আবির্ভাব হয়েছে। অনেকদিন পর এ দৃশ্য দেখলাম। লালবাগ কেল্লা রোডের একটি তিন তলা বাসা থেকে শুক্রবার খুব সকালে এ ছয় যুবককে সাদা পোশাকের লোকজন ধরে নিয়ে যায়। তারপর আর খবর নেই। ছয় যুবকের রহস্য যাত্রা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন হয়। বলা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু ওখান থেকে কোনো খবর আসে না। খবর আসে রোববার। ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয় এ ছয় যুবককে অস্ত্রসহ শনিবার গ্রেফতার করা হয়েছে।
২. ছয় ছয় যুবকের নাম কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় আমি প্রকাশ করছি না। তাদের বয়স ২৯ থেকে ৩২ বছরের ভেতরে। এদের ভেতরে চারজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরেকজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাদের প্রথম অপরাধ হচ্ছে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত থাকা।
৩. প্রথম কথা হচ্ছে তাদেরকে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ বাসা থেকে গ্রেফতার করেছে। সাদা পোশাকে কেন গ্রেফতার করা হবে? গ্রেফতার যদি করতেই হয় তাহলে কেন ইউনিফর্ম পরে নয়? যতদূর জানি সাদা পোশাকে গ্রেফতারে উচ্চ আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা আছে। আইন ভঙ্গ করলো কে?
৪. ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া জেসমিন বলছেন, সাদা পোশাকের ডিবি পুলিশ তাদের বাসায় শুক্রবার সকালে এসে ছয় ছাত্রকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। গ্রেফতারের সময় ওই বাসা থেকে একটি বই রাখার বাক্স এবং জিনিসপত্র নিয়ে যায়। নিয়ে যাওয়ার সময় চোখ বেঁধে নিয়ে গেছে। খেয়াল করে দেখুন, জেসমিন এবং অন্য ভাড়াটিয়ারা আটকের সময় কোনো অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেননি।
৫. হতে পারে পুলিশ তাদের পকেটে এ তিন রিভলবার পেয়েছে। ছবিতে রিভলবার গুলো অনেক বড় দেখাচ্ছে। পকেটে রাখা সম্ভব? সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন যে রিভলবারগুলোতে জং ধরে আছে। কতদিনের পুরনো? পুলিশ কর্তৃপক্ষ কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। কেউ সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারেনি যে, তাদেরকে চোখ বেঁধে কেন গ্রেফতার করা হল? চোখ বেঁধে ছাত্রদের গ্রেফতারের কোনো ব্যাখ্যা নেই।
৬. যেমনটা তারা ব্যাখ্যা করতে পারেননি যে, যুবকদের সাদা পোশাকের ডিবি পুলিশ শুক্রবার সকালে ধরে নিয়ে এসেছে, তারা শনিবার গ্রেফতার হয় কীভাবে? এ ২৪ ঘণ্টা তারা কোথায় ছিল? এ রহস্যের কোনো সমাধান আছে? ডিবি পুলিশ অফিসিয়ালি শনিবার তাদেরকে গ্রেফতার করলে শুক্রবার বাসা থেকে তাদেরকে ধরে নিয়ে আসলো কারা? নাকি এই যুবকগুলো ইচ্ছে করেই ২৪ ঘণ্টার জন্য নিজেদের লুকিয়ে রেখেছিল?
৭. নিকট অতীতে আমরা প্রায়ই দেখতাম ক্রসফায়ারে মানুষ মারা যাচ্ছে। যে ক’জন মারা যাচ্ছে তাদের প্রত্যেককেই আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে দেখা যেত। পুলিশের ভাষ্য মতে, একটি রিভলবার, শটগান বা দু নালা বন্দুক এবং কিছু গুলি উদ্ধারের দৃশ্য আমরা মনে করতে পারি। তারপর হঠাৎ করে কী হয়ে গেল। পশ্চিমা এক দমকা বাতাসে সব ক্রসফায়ার এবং গুলি এবং আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার অনেকদিন বন্ধ থাকলো। এখন দেখছি আবার আগ্নেয়াস্ত্র ফিরে এসেছে। যে ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা করার কথা, তারা এখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের জং ধরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে!
৮. Forensic Medical Examiner হিসেবে ব্রিটিশ পুলিশের সাথে কাজ করেছি পাঁচ বছর। আমি এখনো স্মরণ করতে পারছি না, কখনো পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য যেকোনো আলামত উদ্ধার করে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে উপস্থাপন করেছে। ওটা কোর্টের ব্যাপার, ওখানেই দেখানো হবে।কিন্তু বাংলাদেশে সংবাদ সম্মেলন করে আমজনতাকে দেখানো হচ্ছে। কেন? মানুষকে বিনোদন দেয়া তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ নয়।

এ জং ধরা রিভলবারগুলো প্রকাশ্যে রাখা হয়েছে। বলা হচ্ছে এগুলো যুবকদের কাছে পাওয়া গেছে
৯. এ অস্ত্রগুলো আসলেই ছাত্ররা বহন করছিল কি-না তা বের করার একটি সহজ পদ্ধতি আছে। এবং সে সহজ পদ্ধতিটি হচ্ছে রিভলবারের ডিএনএ/ফিঙ্গারপ্রিন্ট টেস্ট করা। আগ্নেয়াস্ত্রের গায়ে লেগে থাকা ধুলোবালির ডিএনএ টেস্ট করলেই কার হাতের ছাপ আছে ওখানে তা বুঝা যাবে। সে কারণেই উন্নত বিশ্বের পুলিশ যখন কোনো আলামত সংগ্রহ করে তা অবশ্যই গ্লাবস পরে করে এবং তা ফরেনসিক এভিডেন্স ব্যাগে সিলগালা করে রাখে যাতে কন্টামিনেশন না হয়। বাংলাদেশে এ নিয়ম কি মানা হয়? যদি মানাই হয় তাহলে ওপেন ডিসপ্লেতে রিভলবার এবং গুলি রাখা হলো কীভাবে?
১০. ছয় যুবকের নাম, ছবি, পরিচয় প্রকাশ করে তাদের জীবনকে আমরা দুর্বিষহ করে দিলাম। যদি তদন্ত করে চার্জশিটে তাদের নাম না আসে? চার্জশিটে আসলেও যদি আদালত তাদেরকে মুক্তি দেয়? তখন কী হবে? এই যুবকদের জীবন ধ্বংস করার জন্য যারা দায়ী তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে?

১১. রিভলবার রিটার্ন কারো জন্যই সুখকর হবে না। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অনেকের জীবনেই অন্ধকার নেমে আসবে। দোষী সাব্যস্ত হবার আগে কাউকে দোষী মনে করে প্রচার করা একটি অমানবিক এবং বেআইনি কাজ। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা প্রত্যেকটি মানুষেরই অধিকার। সে অধিকারকে রক্ষা করার জন্য পুলিশ এবং আদালতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা না হলে, আমাদের জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। অন্ধকার ভবিষ্যৎ। ভয়াবহ অন্ধকার।
ডা: আলী জাহান
যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশী চিকিৎসক
প্রাক্তন Forensic Medical Examiner, UK Police
পাঠকের মতামত
Even Yahya khan didnt do this to Bengali nation.
দেশতো হয়ে গেছে আওয়ামী মুল্লুক!!!
দেশ চলে আওয়ামী সংবিধানে কেন শুধু শুধু বাংলাদেশের সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন
দেশতো হয়ে গেছে আওয়ামী মুল্লুক!!!
সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ।
এটা স্পষ্টই সংবিধানের লংঘন। কারন একজন বিচারককে ফেনসিডিল সহ গ্রেফতারের পর উচ্চ আদালত স্বরণ করিয়ে দিয়েছিলো যতক্ষণ না সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষ কোন ব্যক্তির অপরাধ প্রমান না হবে ততক্ষণ তাকে অপরাধী হিসেবে মিডিয়ায় সামনে এনে উপস্থাপন করা সংবিধানের লংঘন। এ ছাড়া সংবাদ ব্রীফিং আটককৃতদের কোন বক্তব্য দেওয়ারও সুযোগ থাকে না।প্রতিনিয়ত এই সংবিধান লংঘন ও নাগরিকের চরিত্র হনন বা মানহানির কোন প্রতিকার নেই।সামাজিক ভাবে এদের হেয় করা হচ্ছে।অথচ আমরা আইনের শাসনের কথা বলি।ধিক এই সিস্টেম কে।
You are talking about "Law and Order" and citizen rights, very sorry, all this you can find in the museum! this is Smart BD !
মন্তব্য করুন
মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন
মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]