ঢাকা, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বৃহস্পতিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১১ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

প্রথম পাতা

পালে হাওয়া নেই মোকাব্বির খানের

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
১৮ মার্চ ২০২৩, শনিবার
mzamin

তুমুল নাটকীয়তা। তাহসিনা রুশদীর লুনাকে অভিনন্দন জানিয়ে সরে গেলেন মোকাব্বির খান। চলে যান লন্ডনে। নাটকীয়তার তখনো আরও কিছু অংশ বাকি ছিল। আইনের বেড়াজালে আটকে গেলেন লুনা। নির্বাচনেরও আর বাকি কয়েকদিন মাত্র। গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে কয়েক ঘণ্টার নোটিশে মোকাব্বির খান এলেন দেশে। অপ্রস্তুত অবস্থায় ফের নির্বাচনী মাঠে। দিনশেষে জয়ী হলেন তিনি। সূর্য মার্কা নিয়ে লড়ে তিনিই সংসদের একমাত্র এমপি।

বিজ্ঞাপন
ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের নেতা তিনি। অবশ্য তখন বিএনপি’র নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ড. কামাল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে নির্বাচনী চিত্র ছিল এমনই।

নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্ট্রের মতামত উপেক্ষা করেই শপথ নেন মোকাব্বির খান। এরপর বিএনপি’র টিকেটে নির্বাচিত পাঁচ এমপিও শপথ নেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেননি। পরে তার আসনে উপ-নির্বাচন হয়। এই উপ-নির্বাচনেও জয়ী হন বিএনপি প্রার্থী। পরে সংরক্ষিত একটি আসন ভাগে পায় বিএনপি। কিন্তু এমপি হওয়ার পর বদলে যান মোকাব্বির খান। তার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা চলতে থাকে সর্বত্র। দীর্ঘ চার বছর বিএনপি’র এমপিরা সংসদে নানা ইস্যুতে কড়া প্রতিবাদ জানান। কিন্তু মোকাব্বির খান ছিলেন প্রায় নীরব। চার বছর পর বিএনপি’র এমপিরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করলেও মোকাব্বির খান করেননি। এ নিয়েও কম সমালোচনা সইতে হয়নি তাকে। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়ে নিজের এলকায় গণফোরামের অস্তিত্ব জানান দিতে পারেননি মোকাব্বির খান। প্রায় ৫ বছর এমপি আছেন তিনি। তারপরও জনসম্পৃক্ততা শূন্যের কৌঠায়। উন্নয়ন নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে রয়েছে। এ কারণে একা হয়ে পড়েছেন তিনি। বিএনপি’র নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন- ২০১৮ সালের নির্বাচনে ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনার মনোনয়ন আটকে যাওয়ার পর আসন ধরে রাখাই ছিল চ্যালেঞ্জ। লন্ডন থেকে আনা হলো মোকাব্বির খানকে। তিনি কেবল শো-পিস ছিলেন। তাকে সামনে ধরে লড়াই করতে হয়েছে। বিএনপি’র নেতাকর্মীরাই জয় ছিনিয়ে আনেন। কিন্তু যতই দিন যায়, বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে থাকেন মোকাব্বির। শেষমেশ ইলিয়াসপত্নী লুনার সঙ্গেও যোগাযোগ ছেড়ে দেন। যে লুনা নিজের মনোনয়ন আটকে যাওয়ার পরও পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে মোকাব্বির খানের হয়ে নির্বাচনী মাঠে ভোট ভিক্ষা করেছেন। মোকাব্বির খানের এমন আচরণে বিএনপি দলীয় চেয়ারম্যান, মেম্বাররাও তার ধারে কাছে যান না। তবে- বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা বিশ্বনাথের সুহেল চৌধুরী, ওসমানীনগরের আব্দাল মিয়া, ইমরান রব্বানী সহ কয়েকজনকে নিয়ে বলয় গড়ে তুলেছিলেন একসময়। সেই বলয়ও বেশিদিন  টেকেনি। অনেকেরই সঙ্গে সর্ম্পক ছেদ হয়েছে। বলতে গেলে এখন তিনি প্রায় একাই।

বিগত ৫ বছরে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন নেই। এমপি’র নিয়মিত বরাদ্ধ দিয়ে চলেছেন। ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথে সরকারের দু’টি প্রকল্প নিয়ে আলোচিত হচ্ছেন তিনি। এ দু’টি প্রকল্প হচ্ছে  টেকনিক্যাল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প। ওসমানীনগরের আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকল্পের প্রায় চূড়ান্ত করেছিলেন। জায়গাও পাওয়া গিয়েছিল। এখানে বাগড়া দেন এমপি। মনোপুত হয়নি তার। ঢাকা-সিলেট রুটের কাগজপুরে তার উদ্যোগে জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেটিও হয়নি। ফলে এ প্রকল্প এখনো ঝুলে আছে। বিশ্বনাথের মীরেরচকে টেকনিক্যাল কলেজ স্থাপনের জন্য তার উদ্যোগ ছিল। কিন্তু স্থানীয় অনেকেই চেয়েছিলেন বিশ্বনাথ কলেজের আশপাশ এলাকায়। সেখানেও বাগড়া। দু’টি প্রকল্প এমপি’র সঙ্গে বিরোধেই আটকে আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথে দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই। নিজ উদ্যোগে কিছুই করতে পারেননি। তবে- বিশেষ বরাদ্দে সরকারি হিস্যায় কিছু কাজ করেছেন। সড়ক যোগাযোগ নিয়ে এন্তার অভিযোগ এমপির বিরুদ্ধে। সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী, শফিকুর রহমান চৌধুরী ও সর্বশেষ ইয়াহ্‌ইয়া চৌধুরী এহিয়া সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে কাজ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান এমপি মোকাব্বির খান তেমন কাজ দেখাতে পারেননি। দিনের পর দিন ঝুলে ছিল বিশ্বনাথ জগন্নাথপুর সড়ক ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তাজপুর থেকে বালাগঞ্জ সড়ক। সম্প্রতি অন্য জনপ্রতিনিধিরা পাশের আসনের এমপি পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নানের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করলে কিছু বরাদ্দ এসেছে। সেটি কেবল চলনসই বরাদ্দ। বাড়তি কিছু নেই। প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও বিরোধে জড়িয়ে পড়েন এমপি মোকাব্বির খান। এ কারণে ওসমানীনগরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তারের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে নানা দপ্তরে অভিযোগ দেয়ার পর সবশেষে ইউএনও’র বিরুদ্ধে সংসদে প্রকাশ্য অভিযোগ করেছিলেন। পরে ওসমানীনগর থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয় ইউএনওকে। এরপর থেকে প্রশাসনের সঙ্গে স্পষ্টত দূরত্ব রয়েছে তার। এজন্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে উন্নয়ন কাজ চালাচ্ছেন। বিশ্বনাথের উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এসএম নুনু মিয়া। তার সঙ্গে শুরু থেকেই দ্বন্দ্ব মোকাব্বির খান এমপি’র। নুনু মিয়া পরিকল্পনামন্ত্রীর মাধ্যমে এলজিইডি’র রাস্তার বরাদ্দ এনে কাজ করিয়েছেন। আবার টিউবওয়েল বরাদ্দ নিয়ে আলোচিত হয়েছেন এমপি মোকাব্বির। এ নিয়ে তিনি একাধিকবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হন। প্রবাসী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের টিউবওয়েল বরাদ্দ দিয়েছেন- এমন অভিযোগে তোলপাড় দেখা দেয় বিশ্বনাথে। সাবেক এপিএস’র নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। পরে অবশ্য তিনি এপিএস’কে সরিয়ে দেন। বিশ্বনাথে আওয়ামী লীগের বিরোধের মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে তার গাড়িতে জুতা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে। মিথ্যা মামলা সংক্রান্ত একটি ঘটনায় গোয়ালাবাজারে স্কুলের শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল করেছিল। এমপি মোকাব্বির খানের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরক্ত আওয়ামী লীগের নেতারাও। তারা জানিয়েছেন- এমপি ঢাকায় লবিং করে উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে এসে এলাকায় কাজ করবেন এটি হচ্ছে সবার চাওয়া। কিন্তু  মোকাব্বির খান তার বরাদ্দের বাইরে কোনো কাজ করতে পারেননি। বরাদ্দ করা কয়েকটি কাজেও দুর্নীতি হয়েছে। এসব অভিযোগও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে। ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান নাজলু জানিয়েছেন- তার কারণেই টেকনিক্যাল কলেজের কাজ ঝুলে আছে। কয়েকটি কাজের দুর্নীতির প্রতিবাদ করার কারণে তিনি ওই প্রকল্প শত্রুতামূলকভাবে ঝুলিয়ে রাখেন। তিনি জানান- ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথের মানুষ দুর্ভাগা। বিগত দুই টার্ম ধরে কোনো যোগ্য এমপি পাচ্ছেন না। এ কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। সেসব উন্নয়ন বরাদ্দ এসেছিলো; সেগুলো নানাভাবে এমপি আটকে দেন। এটা কোনো জনপ্রতিনিধির কাজ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্বনাথ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছয়ফুল হক জানিয়েছেন- ‘‘কী মন্তব্য করবো। কোনো বরাদ্দ নেই। কোনো কাজ নেই। এমপি আছেন কী, নেই- জানি না। তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন নেতা। বন্যা, করোনা কতকিছুই গেল; মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছিল। কোনো সময়ই এমপি’র দেখা মিলেনি।’’ ওসমনানীনগর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ও দয়ামীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসটিএম তাজ মো. ফখর উদ্দিন বলেন, এমপি মোকাব্বির খানের কাজ হচ্ছে গতানুগতিক। আর আমাকে তো কোনো বরাদ্দ দেয়া হয়নি। তিনি আমাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের লোক দিয়ে উন্নয়ন কাজ করাচ্ছেন। তবে- সেই কাজ দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন- সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি’র তরফ থেকে আমরা জান বাজি রেখে ভোটের মাঠে ছিলাম। এখন কালেভদ্রেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় না। বরং স্থানীয় নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এদিকে- গতকাল এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় সিলেট-২ আসনের এমপি মোকাব্বির খানের সঙ্গে। তিনি নিজেকে ‘সৌভাগ্যবান’ এমপি বলে দাবি করেন। জানান- মনোনয়নপত্র রেখে নির্বাচনী মাঠ থেকে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন। পরে ড. কামাল হোসেনের নির্দেশে তিনি দেশে এসে নির্বাচন করেন। তবে- তার নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের সমর্থন থাকলেও তিনি ফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন না। তার নির্বাচনে বিএনপি’র স্থানীয় নেতাদের কোনো ভূমিকা ছিল না বলেও মন্তব্য করেন। মোকাব্বির খান জানিয়েছেন- তিনি বিগত ৫ বছরে নিজের নির্বাচনী এলাকায় ৪-৫শ’ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করিয়েছেন। এর মধ্যে লামাকাজীতে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ, ওসমানীনগরের ভল্লবপুরে ৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ ছাড়াও জগন্নাথপুর সড়কে ২২ কোটি টাকার প্রকল্প, খাজাঞ্চি-কামালবাজার সড়কে ১০ কোটি টাকার প্রকল্প ও তাজপুর থেকে ময়নাবাজার রাস্তায় ৫ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ করিয়েছেন। এলাকায় উন্নয়ন হয়েছে। যাদের চোখ নেই, তারা দেখে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সংসদ থেকে পদত্যাগ না করা প্রসঙ্গে মোকাব্বির খান জানান- বিএনপি’র সব এমপিরা পদত্যাগ করলেও আমি পদত্যাগ করিনি। আমার পদত্যাগে কি সরকার পতন হয়ে যেতো- পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। বলেন- সার্বিক প্রেক্ষাপট, দলের সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী এলাকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই আমি পদত্যাগ করিনি। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সংসদে আছি এবং কাজ করছি।  মোকাব্বিরের কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষুব্ধ নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন- মোকাব্বির খান নির্বাচনের সময় আমার গাড়ি, আমার লোকজনকে ব্যবহার করেছেন। তিনি আমার বাসায় এসেছিলেন। আমার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর তাকে আমরা সমর্থন দেই। আমার ছেলে গিয়ে তার পক্ষে প্রচারণা করে। তিনি বলেন- নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি বেঈমানি করেছেন। এখন তো তিনি আমাদের জোটে নেই। তাকে নিয়ে এর বেশি মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেন লুনা।
 

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status