ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

ওমর খৈয়াম ও তার রুবাইয়াত

গাজী মিজানুর রহমান

(৪ মাস আগে) ১৮ মে ২০২২, বুধবার, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

“নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শুন্য থাক/ দুরের বাদ্য লাভ কি শুনে, মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক “-- এই পঙক্তির রচয়িতা ওমর খৈয়ামের  জন্ম খোরাসানের  বিখ্যাত  শহর  নিশাপুরে। তিনি ১০৪৮ সালের ১৮ মে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের আবির্ভাবের এক শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আবাসীয়রা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। উমাইয়াদের রাজধানী  ছিল দামস্কে।  ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে  দামেস্ক থেকে রাজধানী বাগদাদে  স্থানান্তরিত  হয় এবং  বাগদাদ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার একটা কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। খলিফা হারুনার রশিদের সময় থেকে ১২৫৮ সালে মঙ্গোল আক্রমণ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। এ সময়কালে   শাসনব্যবস্থায়  অন-আরব মুসলমানদের  ব্যপক অন্তর্ভূক্তির ফলে  ইসলামের পতাকাতলে আসা পারস্যের নানা স্থানে জন্ম নেয়া মনীষীদের মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। তাদের  উজ্জ্বল উপস্থিতি  ইসলামী জগতে  জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটায়। তৎকালীন ইরানের খোরাসান প্রদেশ এই অগ্রযাত্রায় প্রথম কাতারে সামিল ছিল। ওমর খৈয়াম ছাড়াও আরও অনেক  সাধুপুরুষ ও জ্ঞানতাপসের জন্ম হয়েছে এই খোরাসানে। 

খৈয়াম মূলত একজন অংকশাস্ত্রবিদ, জোতির্বিজ্ঞানী  ও দার্শনিক ছিলেন।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু তার গণিত ও  বিজ্ঞানকে ছাড়িয়ে গেছে তার কবিতা। তার  চার লাইনের রুবাই   একেকটি দার্শনিক চিন্তার  আকর। ওমর খৈয়ামের দর্শনের মুখ্য বিষয়বস্তু  হচ্ছে অতীতের জন্য আক্ষেপ নয় , ভবিষ্যতের জন্য হাহুতাশ নয় , বর্তমান নিয়ে বাঁচতে হবে। এ কারণে  তাকে সে সময়ের অন্যান্য সুফি কবিদের থেকে আলাদা করে দেখা হয়। সুফিবাদীরা যখন কবিতা লেখেন তখন সে কবিতা ধর্মীয় অনুশাসনের অনুগামী চিন্তাভাবনাশ্রয়ী হয়।  ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের মধ্যে মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব  , দুঃখ-যন্ত্রণা  , অদৃষ্টবাদ ও  ফ্রি-উইলের  দ্বন্দ্ব সম্পর্কে মাঝে মাঝে  যেসব চিন্তা  বিধৃত হয়েছে ,  তা ইসলামী শরিয়াতের সাথে পুরোপুরি যায় না।  কবি    ফরিদ উদ্দিন আত্তার , মাওলানা রুমি , শেখ সাদি , কবি হাফিজ শিরাজী , আব্দুর রহমান জামি প্রমুখ সুফি কবিদের সাথে  ওমর খৈয়ামের কিছু ব্যবধান রয়েছে। প্রগাঢ় ধর্মবিশ্বাস সুফি কবিদের কবিতার মূল সূর। সেক্ষেত্রে  ওমর খৈয়ামের কবিতার  জীবন ও জগত  সম্পর্কে রহস্য-সন্ধানী যুক্তিবাদিতা কিছুটা বেসুরো লাগে। 

খৈয়াম  লিখেছেন --

“এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর,
প্রিয়া সাকী, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার,
জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ,
এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ আমি,শাহনশার!”

তিনি যখন এসব কথা বলেন , তখন  মনে হয় , তিনি  বাস্তব জীবনকে উপভোগ করার কথাই  বলেন। এ দিক দিয়ে বিবেচনা করলে  ওমর খৈয়ামকে  একজন বাস্তববাদী  ও যুক্তিবাদী দার্শনিক-কবি বলতে হবে। 

ওমর খৈয়াম মানব জীবনেরর ক্ষণস্থায়ী  দিক তুলে ধরেছেন এভাবে -- “ছেড়ে দে তুই নীরস বাজে দর্শন আর শাস্ত্রপাঠ/ তার চেয়ে তুই দর্শন কর প্রিয়ার বিনোদ বেণির ঠাট/ওই সোরাহির হৃদয়-রুধির নিষ্কাশিয়া পাত্রে ঢাল/ কে জানে তোর রুধির পিয়ে কখন মৃত্যু হয় লোপাট।” এর পাশাপাশি উদ্ধৃত করা যায় তার বিখ্যাত রুবাই – “The Moving Finger writes; and, having writ,/ Moves on: nor all thy Piety nor Wit  / Shall lure it back to cancel half a Line,/ Nor all thy Tears wash out a Word of it.”  জীবন এক রহস্যময় লীলাক্ষেত্র। জীবনে যা ঘটে তার একটা বিন্দু-বিসর্গ পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই মানুষের। ওমর খৈয়ামের  এসব রচনার মধ্যে মানুষের অসহায়ত্ব   প্রকাশ পেয়েছে। এই অসহায়ত্ব এবং দুঃখ-যন্ত্রণার পিঠে সওয়ার হয়ে পরকালের সুখ ভোগের আকাঙ্ক্ষা ততটা দৃশ্যমান নয়। 

১৮৫৯ সালে এডওয়ার্ড  ফিতজেরাল্ড অনূদিত  ওমর খৈয়াম এর   ‘ রুবাইয়াত’ প্রকাশের  পর পাশ্চাত্যে ওমর খৈয়ামের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ইউ কে , ইউ এস এ  এবং জার্মানিতে ওমর খৈয়াম ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। বলা হয়ে থাকে যে,  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাংকারে বসে সৈনিকেরা খৈয়ামের লেখা কবিতা পড়তো। এর মধ্যে তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে তুড়ি দিয়ে উধাও করার আর অতীত আরাম-আয়েশকে ভুলে থাকবার যাদুর কাঠি পেয়েছিল। ফিতজেরাল্ড এর অনুবাদের মাধ্যমে  পাশ্চাত্যে ওমর খৈয়ামের যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে , তাতে তাকে একজন  ভোগবাদী মানুষ  বলে মনে হয়। কিন্তু ওমর  খৈয়াম একজন মিতাচারী এবং সৃষ্টিকর্তার  আস্তিত্বে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী  সুফি দার্শনিক  ছিলেন।  তিনি লিখেছেন – And fear not lest Existence closing your/ Account, and mine, should know the like no more;/ The Eternal Saki from that Bowl has pour'd / Millions of Bubbles like us, and will pour.  খৈয়ামের কবিতায় সুরা-সাকি-প্রেম এসব শব্দে বিভ্রান্ত  হয়ে   রোমান কবি  হোরেসের ‘আজকের দিনটিকে ভোগ করো’  বা  ‘কার্পে  ডিয়েম’  দর্শনের সাথে  খৈয়ামের দর্শনের মিল খুঁজে পাওয়ার  চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই বিচার  পুরোপুরি সঠিক নয়। সুরা-সাকি তিনি রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। ওমর খৈয়ামের মনে  সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে যে  প্রশ্ন  জাগে  , তা সন্দেহবাদিতার জায়গা থেকে নয়। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস আর অভিমানের জায়গা থেকে উচ্চারিত হয়। 

একথা অনস্বীকার্য যে , সুফি কবি ও দার্শনিকদের মধ্যে  ওমর খৈয়ামই হচ্ছেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী  চিন্তার স্বাধীনতার ( অনেকক্ষেত্রে যা ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক ) প্রবক্তা। তিনি এই ধারার  শেষ দার্শনিক ,  কারণ তার পরেই   ইমাম গাজ্জালী ( র)   ইসলামী  দর্শনের একচ্ছত্র প্রবক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।  তার   ইনটেলেকচুয়াল প্রভাব এত বেশি ছিল যে , অন্য মনীষী ,  যেমন  আল-ফারাবি ,  ইবনে সিনা  প্রমুখ দার্শনিকের    গ্রীক দর্শন-প্রভাবিত  চিন্তা  মুসলিম জাহান থেকে দূরীভূত  হয়।   পাশ্চাত্যের লোকেরা দাবী করে যে ইমাম গাজ্জালীর  কারণে ইসলামী বিশ্বে  যুক্তিবাদিতা এবং  বিজ্ঞান চর্চার ধারা  ব্যহত হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামিক  পণ্ডিতদের কথা হচ্ছে , চিন্তার স্বাধীনতার  নামে  অন-ইসলামিক দর্শন  ঢুকে ইসলামের যে ক্ষতি করতে  যাচ্ছিল , তা ইমাম গাজ্জালী (র) এর  কারণে রোধ হয়েছিল। পাশ্চাত্য  যে কারণে ইমাম গাজ্জালীকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করে , সেই  একই কারণে ওমর খৈয়ামের প্রতি তারা অনুরক্ত।

বাঙালি সংস্কৃতিতে ফার্সি  সুফি-দর্শনের  বিরাট প্রভাব পড়েছে। ত্রায়োদশ শতকে এদেশে সুফিদের আগমন  ঘটে। সুফি ধর্মগুরুদের মহানুভবতায় মুগ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুফিবাদের বিজ ছড়িয়ে পড়ে। কালের বিবর্তনে ও ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে সুফিদের অতীন্দ্রয়  চিন্তা-ভাবনা বাউল গান , মরমী গান , দেহতত্ত্ব গানের মধ্যে ভিন্ন আঙ্গিকে ঠাঁই পায়। লালনগীতি   , হাসন রাজার গান  ,  আব্দুল আলীমের মরমী গান – এসব গানের মধ্যে জীবন , জগত  ও পরজগত সম্পর্কে নানা  প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে , যা ওমর খৈয়ামের কথা মনে করিয়ে দেয়। আব্দুল আলীমের   “এই যে দুনিয়া , কিসের লাগিয়া এত যত্নে গাড়াইয়াছে সাঁই “ গানটিতে   যে ভাব প্রকাশিত হয়েছে , তার সাথে   ওমর খৈয়ামের  একটি চতুষ্পদীর খুবই   মিল লক্ষ্য করা যায়। 

খৈয়াম লিখেছেন --
“আমরা দাবার খেলার ঘুঁটি, নাইরে এতে সন্দ নাই!/ আসমানী সেই রাজ-দাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই?/ এই জীবনের দাবার ছকে সামনে পিছে ছুটছি সবই / খেলা শেষে তুলে মোদের রাখবে মৃত্যু-বাক্সে ভাই!”  ওমর খৈয়াম বা বাংলার বাউলদের গান অনেকক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার দয়ালু ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন তা কবিতা হিসেবেই বিবেচ্য হওয়া উচিত , তাকে ইসলামী সুফি দর্শন বলে চালানো যুক্তিযুক্ত নয়।  খৈয়াম-সহ অন্যসব  সুফি সাধক  ও কবিরা  মানবতা আর শান্তির যে অন্বেষণ করেছেন তার  প্রয়োজনীয়তা আজ  তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। যুদ্ধ আর  বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং  জিনিসপত্র আর ডলারের মূল্য বৃদ্ধির এই সংকটময় সময়ে সুফিদের শান্তির অমীয় বাণী এবং লোভ-লালসা বহির্ভূত জীবনের প্রতি আকর্ষণ বড় প্রয়োজন। ওমর খৈয়ামের জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধা। 

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status