ঢাকা, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, শুক্রবার, ২০ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১১ রজব ১৪৪৪ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

খোলা চোখে

১০ই ডিসেম্বর কী হচ্ছে, কী হবে?

লুৎফর রহমান
১ ডিসেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবারmzamin

আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বহু প্রাণ আর রক্তের বিনিময়ে এই মাসেই অর্জিত হয়েছিল চূড়ান্ত বিজয়। বিজয়ের এই মাসে বিজয় দিবসকে ঘিরে নানা আয়োজন থাকে সারা দেশেই। উৎসবের আমেজ বিরাজ করে দেশজুড়ে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করবে। ১০ই ডিসেম্বর বিএনপি যে সমাবেশ আহ্বান করেছে সেটি স্র্রেফ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবেই পালিত হবে এটি আমাদের প্রত্যাশা। এই সমাবেশ ঘিরে কোনো ধরনের সহিংসতা-সংঘাত কারোরই কাম্য নয়। আমরা আশা করবো বিএনপি এই সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা পর্যন্তই সমাবেশের আয়োজন সীমাবদ্ধ রাখবে। একই সঙ্গে গরম বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি দিয়ে সরকারের দলের পক্ষ থেকে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করাও কারও কাম্য নয়। এই মুহূর্তে যেকোনো ধরনের সংঘাত হিংস্রতার সূত্রপাত হলে এর দায় কিন্তু দুই দলের ওপরই পড়বে।

বিজ্ঞাপন
আর এর বড় শিকার হবে সাধারণ মানুষ।


১০ই ডিসেম্বর কী হবে, কী হচ্ছে। এমন প্রশ্ন চারদিকে। সারা দেশে ধারাবাহিক সমাবেশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সবশেষ ঢাকায় বিভাগীয় সমাবেশ ডেকেছে বিএনপি। বলা হচ্ছে, কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হবে এদিন। কেউ বলছেন, ১০ লাখ। কেউ বলছেন ৩০ লাখ নেতাকর্মী জমায়েত হবেন ঢাকায়। এই কর্মসূচির এক মাস আগে থেকে আলোচনায় সমাবেশকেন্দ্রিক নানা বিষয়। এখন চলছে অনুমতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি। ঢাকা মহানগর পুলিশ বিএনপিকে সমাবেশ করতে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি দিয়েছে। সঙ্গে ২৬টি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ডিএমপি’র পক্ষ থেকে এই অনুমতি দেয়ার পর বিএনপি’র পক্ষ থেকে সরাসরি ঘোষণা না দেয়া হলেও নেতারা বলছেন, তারা নয়াপল্টনে সমাবেশ করার অনুমতি  চেয়েছিলেন। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, এর আগেও নয়া পল্টনে দলের অনেক সমাবেশ হয়েছে। সেখানে শান্তিপূর্ণভাবেই সমাবেশ হয়েছে। যেহেতু নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জেলা থেকে আসবেন তাই নয়া পল্টনের আশপাশে আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেলসহ আরও অনেক সুবিধা পাবেন তারা।

 সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে হলে এসব সুবিধা তারা পাবেন না। এতে অনেকে সমস্যায় পড়তে পারেন। সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সমাবেশের স্থানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতারা নয়া পল্টনেই সমাবেশ করার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। এমন অবস্থায় বিএনপি আবার আবেদন করতে পারে নয়া পল্টনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে। ডিএমপি অনুমতি দেবে কি দেবে না সেটি নির্ভর করবে সরকারের মনোভাবের ওপর। তবে আপাত দৃশ্যে মনে হচ্ছে সরকার বিএনপিকে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানেই রাখতে চায়। বিএনপি যাতে সমাবেশ করতে পারে এজন্য আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ দুই দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সরকার বিএনপি’র সমাবেশে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের বাধা দিতে চায় না। তবে সমাবেশের লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও সমাবেশ ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয় তা সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে সোহ্‌রায়ার্দীতে সমাবেশ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। সমাবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

 পাশপাশি সমাবেশে আসা নেতাকর্মীরা যদি বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চান সেটাও সম্ভব হবে না। সরকার এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে বিএনপিকে সোহ্‌রাওয়ার্দীতে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো বিএনপি কি সরকারের দেয়া সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে নাকি তাদের ঘোষণা অনুযায়ী নয়াপল্টনেই সমাবেশ করবে। তবে বিএনপি এ পর্যন্ত কঠোর কোনো বার্তা দেয়নি। বলা হচ্ছে দলের স্থায়ী কমিটির সামনের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। ওই বৈঠকে সমাবেশের স্থানের বিষয়ে নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।  দুই দলের এই পাল্টাপাল্টির মধ্যে মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে নানা শঙ্কা। ১০ই ডিসেম্বরের সমাবেশ থেকে বিএনপি কী ঘোষণা দেবে। কী আল্টিমেটাম দেবে সেটা অবশ্য নেতারা গোপন রেখেছেন। তবে এটা স্পষ্ট যে, এই সমাবেশ থেকেই পরবর্তী দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছে দলটি। একইসঙ্গে অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে যুগপৎ আন্দোলন শুরুর ঘোষণাও আসতে পারে এই সমাবেশ থেকে। রাজনৈতিক দল হিসেবে কর্মসূচি ঘোষণা, আল্টিমেটাম দিতে পারেই যে কোনো দল। বড় দল হিসেবে বিএনপি তেমন কিছুই হয়তো করবে। কিন্তু সরকারের তরফে বার বার শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। সহিংসতা হলে জবাব দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। রাজধানীর পাড়ায় পাড়ায় দলীয় নেতাকর্মীরা পাহারা বসাবেন এমন কথা বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে ১০ই ডিসেম্বর খেলা হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এখন  ‘খেলা হবে’কে স্লোগানের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সভা-সমাবেশে তিনি প্রতিদিনই ‘খেলা হবে’- বলে স্লোগান দিচ্ছেন। সরকারের দলের পক্ষ থেকে নানা আশঙ্কা প্রকাশ, তাদের তরফে প্রতিরোধ বা প্রতিহত করার কথা বলার কারণেই বাড়ছে উত্তাপ-উত্তেজনা। 

 

 

সাধারণ মানুষের মনেও দানা বাঁধছে নানা শঙ্কা। আসলে ১০ই ডিসেম্বর কী হচ্ছে, কী হবে এমন প্রশ্ন করছে নানাজন।  গত অক্টোবর থেকে বিভাগীয় গণসমাবেশ শুরু করেছে বিএনপি। এ পর্যন্ত ৮টি সাংগঠনিক সমাবেশ করেছে দলটি। এসব সমাবেশ ঘিরেও হয়েছে নানা আলোচনা। একদিনের সমাবেশ গড়িয়েছে দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত। কুমিল্লার সমাবেশ ছাড়া প্রায় প্রতিটি সমাবেশের এক বা দুই দিন আগে থেকে গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে খোঁড়া অজুহাতে। একই দাবিতে একই বিষয়ে পরিবহন ধর্মঘট ঢাকা হয়েছে ঠিক বিএনপি’র সমাবেশের আগের সময়ে। এমন পরিবহন ধর্মঘট ডাকায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশকি তাহলে বিএনপি চালায়। বিএনপি’র সমাবেশের আগে ধর্মঘট দিয়ে দাবি আদায়ের আওয়াজ তোলা মানে বিএনপি’র কাছে দাবি করা। অথচ এই সময়ে আওয়ামী লীগও বিভিন্ন জেলায় সভা- সমাবেশ করলেও তাদের সমাবেশের আগে কোনো ধরনের পরিবহন ধর্মঘট ডাকতে দেখা যায়নি। এছাড়া সমাবেশের আগে দলীয় নেতাকর্মীদের ধরপাকড় ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেছে দলটি। কিন্তু হয়ে যাওয়া সমাবেশগুলোতে লোক সমাগম নিয়ে চাঙ্গা দলের নেতাকর্মীরা।

 তারা বলছেন, কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি জনস্রোত ঠেকাতে পারেনি। বিশেষ করে দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষ ব্যাপকহারে সমাবেশে অংশ নেয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নেতারা। এই ধারা সামনেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন তারা। হয়ে যাওয়া সমাবেশের বিষয় মাথায় রেখেই বিএনপি নেতারা ঢাকায় ব্যাপক লোকসমাগমের আশা করছেন। এজন্য তারা সে ধরনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।  এখন কথা হচ্ছে অন্যান্য বিভাগীয় সমাবেশের ক্ষেত্রে যে দৃশ্য দেখা গেছে ঢাকায়ও কী এমন কিছু দেখতে হবে। সমাবেশের আগে বাস বন্ধ হবে। হোটেল বন্ধ থাকবে। রাজধানীর প্রবেশ পথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মহড়া দেবেন। এ ধরনের চেষ্টা হলে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা কিন্তু বেড়ে যাবে। বিএনপি আগে থেকেই বলছে তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবে। বাইরেও বলাবলি ছিল। ১০ই ডিসেম্বর সমাবেশ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের রাস্তায় বসিয়ে দেবে। তারা সরকারের পদত্যাগ দাবি করে অবস্থান ঘোষণা করবে। এমন আলোচনা ও গুঞ্জনেরও জবাব দেয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে অন্যান্য বিভাগীয় সমাবেশের মতোই এই সমাবেশ হবে। এটি ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ।

 সমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।  বিএনপি’র সমাবেশে বাধা এবং আগে থেকে পরিবহন বন্ধ করার বিষটি সরকার এবং সরকারের দলের জন্য কোনো সুফল আসলে আনছে না। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এমনটি বলা হয়েছে। বরং আগে থেকে পরিবহন বন্ধ করায় বিএনপি’র সমাবেশে কোনো প্রভাব পড়ছে না। উল্টো সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দল এবং সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।  এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগের  নেতারাও বলছেন, বিএনপি’র শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কোনো বাধা দেয়া হবে না। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি’র সমাবেশে বাধা দেবে না সরকার। তাদের সমাবেশের আশেপাশেও যাবে না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে পাড়া- মহল্লায় সতর্ক পাহরায় থাকবেন দলের নেতাকর্মীরা।  গণমাধ্যমে আসা তথ্য অনুযায়ী দলের সর্বশেষ স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিএনপি’র সমাবেশে বাধা না দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের সমাবেশের আগে পরিবহন ধর্মঘট দেয়া নিয়েও তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ এবং সরকারের সমর্থন না থাকলে এই ধরনের ধর্মঘট দিয়ে মানুষের জন্য দুর্ভোগ ডেকে আনছে কারা। কারা কি উদ্দেশে এই ধর্মঘট দিচ্ছে।  

আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বহু প্রাণ আর রক্তের বিনিময়ে এই মাসেই অর্জিত হয়েছিল চূড়ান্ত বিজয়। বিজয়ের এই মাসে বিজয় দিবসকে ঘিরে নানা আয়োজন থাকে সারা দেশেই। উৎসবের আমেজ বিরাজ করে দেশজুড়ে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করবে। ১০ই ডিসেম্বর বিএনপি যে সমাবেশ আহ্বান করেছে সেটি স্র্রেফ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবেই পালিত হবে এটি আমাদের প্রত্যাশা। এই সমাবেশ ঘিরে কোনো ধরনের সহিংসতা-সংঘাত কারোরই কাম্য নয়। আমরা আশা করবো বিএনপি এই সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা পর্যন্তই সমাবেশের আয়োজন সীমাবদ্ধ রাখবে। একই সঙ্গে গরম বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি দিয়ে সরকারের দলের পক্ষ থেকে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করাও কারও কাম্য নয়। এই মুহূর্তে যেকোনো ধরনের সংঘাত হিংস্রতার সূত্রপাত হলে এর দায় কিন্তু দুই দলের ওপরই পড়বে। আর এর বড় শিকার হবে সাধারণ মানুষ।  

লেখক: মানবজমিন-এর নগর সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status