ঢাকা, ২২ মে ২০২২, রবিবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ শাওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

মত-মতান্তর

সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ ফকির মিসকিন হাসপাতাল হবে কবে?

যুক্তরাজ্য থেকে ডাঃ আলী জাহান

(১ মাস আগে) ১৯ এপ্রিল ২০২২, মঙ্গলবার, ৩:৩৩ অপরাহ্ন

১. বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আট বিভাগীয় শহরে আটটি নতুন সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল হচ্ছে। সেখানে শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের লোকজন চিকিৎসা নিতে পারবেন। সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল- এ আবার কী? বেসরকারি কর্মচারী হাসপাতাল আছে নাকি? তাহলে কেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল? নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য কি আলাদা ভাবে হাসপাতাল তৈরি করা যায়? এই সূত্র ধরে কেউ যদি এখন বলে, বাংলাদেশ খাওয়া-দাওয়া পার্টি হাসপাতাল নামে একটি হাসপাতাল করবেন যেখানে শুধু খাওয়া-দাওয়া পার্টির লোকজন ভর্তি হতে পারবে তাহলে প্রতিক্রিয়া কি হবে? অথবা বাংলাদেশ ফকির মিসকিন হাসপাতাল যেখানে শুধু ফকির মিসকিনরা ভর্তি হতে পারবেন। শুনতে খুব অবাক লাগছে? তাহলে আমার একটি অভিজ্ঞতা প্রথমে শেয়ার করে নেই।

২. ৮০ বছর বয়সী মার্গারেটকে ইংল্যান্ডের একটি general হাসপাতালে (বিভাগীয় শহরে) ভর্তি করা হয়েছে confusion নিয়ে। মেডিসিন বিভাগের ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তার এই confusion এর কোনো কারণ খুঁজে পাননি। তাদের কাছে মনে হয়েছে মার্গারেট Dementia তে ভুগছেন। মার্গারেট বাসায় একা থাকেন। এই কনফিউশনের কারণে মার্গারেটকে বাসায় ডিসচার্জ করা নিরাপদ মনে করছেন না।

 

তাই আমাদের (সাইকিয়াট্রিক টিম) কল করা হয়েছে। English law অনুসারে এটিকে Mental Health Act অ্যাসেসমেন্ট বলা হয়। দুজন সিনিয়র সাইকিয়াট্রিস্ট ও একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার এই অ্যাসেসমেন্ট করবে

বিজ্ঞাপন
আমিও তাদের একজন।

৩. মার্গারেট হাসপাতালে একটি ওয়ার্ডে আছেন। সে ওয়ার্ডে ১৬ জন রোগী। পাশাপাশি বিছানা, কিন্তু পর্দা দিয়ে আলাদা করার ব্যবস্থা আছে। সেই ছোট্ট এক কিউবিকলে মার্গারেট বিছানায় শুয়ে আছেন। পাশে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। পরিচয় দিলেন তিনি মার্গারেটের একমাত্র ছেলে। যেহেতু তার মা'র স্মরণশক্তি কমে গেছে, তাই তথ্য দেয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে আসার অনুমতি দিয়েছেন। এখন আমরা যদি অনুমতি দেই তাহলে তিনি তার মায়ের সমস্যা সম্পর্কে আমাদের সাথে কিছু কথা বলবেন। মার্গারেট হাতের ইশারায় বললেন, তার কোনো সমস্যা নেই। আমরা মার্গারেটকে এবং তাঁর ছেলেকে প্রশ্ন করতে থাকি। History থেকে মনে হচ্ছে মার্গারেট Alzheimer's Dementia তে আক্রান্ত। তাকে বাসায় ফেরত পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সম্ভবত হাসপাতালে (Psychiatric Hospital) ভর্তি করতে হবে। কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনার মাকে যদি আমরা বাসায় ফেরত পাঠাতে চাই, আপনি কি তার সাথে থাকতে পারবেন?' বললেন যে, আপাতত সম্ভব না যেহেতু তিনি রাজধানীতে থাকেন। তিনি তাঁর পরিচয় দিলেন। এখন কেন তার সাথে থাকতে পারবেন না তার কারণ ব্যাখ্যা করলেন। ক্ষমতাসীন দলের এমপি পরিচয় পেয়েও আমাদের বা হাসপাতালের নার্স বা ডাক্তারদের ভেতর আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না। আমরা মার্গারেটকে ভর্তি করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। ভদ্রলোক আপত্তি করেন না।


৪.  হাসপাতালের বেডে মায়ের সাথে যে ভদ্রলোক বসে আছেন তার একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে। তিনি ক্ষমতাসীন দলের ৩ বারের নির্বাচিত এমপি। তিনি তার পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। আমরা জিজ্ঞেস করার কারণে তিনি তাঁর পরিচয় দেন। সাথে অবশ্য কোনো সিকিউরিটি নেই। এমপি সাহেবকে বরণ করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বিশেষ আয়োজন নেই। সাধারণ একটি চেয়ারে সাধারণ বেডের পাশে মায়ের হাত ধরে তিনি বসে আছেন। তিনি বৃটিশ পার্লামেন্টের একজন নির্বাচিত এমপি। এমপি সাহেব জানেন যে, তিনি যদি অসুস্থ হন তার জন্য আলাদা কোনো হাসপাতাল নেই। এই হাসপাতাল বা এধরনের হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। এ হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা NHS. National Health Service এর দৃষ্টিতে চিকিৎসা নিতে আসা সব রোগী তাদের কাছে সমান। রোগী বাস ড্রাইভার হোক আর ট্যাক্সি ড্রাইভার হোক অথবা প্রধানমন্ত্রী হোন, সরকারি হাসপাতালে সবার জন্য চিকিৎসা সেবা একই মানের। হাসপাতালে যে বেডে একজন এমপি অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছেন তার পাশের বেডে হয়তো একজন ভবঘুরে ড্রাগ এডিক্ট রোগী শুয়ে আছে। সামাজিক মর্যাদা দিয়ে হাসপাতালের ভেতরে রোগীকে আলাদা করে চিকিৎসা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি হাসপাতালে এটি একটি অসম্ভব ব্যাপার। তবে বাংলাদেশে সম্ভব।

এই সুযোগ পেতে চাইলে আপনাকে বাংলা মুল্লুকে যেতেই হবে।


৫. ইতিমধ্যে ঢাকার ফুলবাড়ীয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের খুব কাছেই সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল আরেকটি হাসপাতাল আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করার সুবাদে অসংখ্যবার এই হাসপাতালকে আমি রাস্তা থেকে দেখেছি। তখন বুঝিনি, এখনো আমি বুঝতে পারছি না এই হাসপাতাল আসলে কাদের জন্য? সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা হাসপাতাল করার নৈতিক অধিকার কি সরকারের আছে?


৬. নিরাপত্তা এবং ট্রেনিং জনিত কারণে মিলিটারি, পুলিশ বা বিডিআর হাসপাতাল করার যৌক্তিকতা আছে, কিন্তু সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল? এ আবার কি? সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তা না হলে আপনি ওই হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন না। চিকিৎসা নিতে পারবেন না। সরকারি কর্মচারী হবার কারণে সরকার আপনাকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। এই বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য যে টাকার প্রয়োজন সে টাকা দিচ্ছে কারা?


৭. সে টাকা দিচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণ। ইনকাম ট্যাক্স, VAT আর বিভিন্ন নামে বেনামে আরোপ করা শুল্ক'র টাকা দিচ্ছে কারা? সেখানে কি সরকারি-বেসরকারি বিভাজন করা আছে? টাকাগুলো কি সবার কাছ থেকে নিচ্ছেন না? তাহলে সেই টাকা থেকে কেন সরকারি কর্মচারী, কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা দেবেন? বিশেষ করে সেই সুবিধা যদি হয় স্বাস্থ্য সেবা নিতে। পৃথিবীর কোথাও কি এই অদ্ভুত ব্যবস্থা আছে?


৮. সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হলে আপনাদের অনেক সুবিধা আছে। আমরা সেই সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। সরকার তার অধীনে কাজ করা কর্মচারী, কর্মকর্তাদের একটু আধটু সুবিধা দিতেই পারে। তাই বলে তাদের জন্য আলাদা হাসপাতাল? সে হাসপাতালে বেসরকারি চাকুরীজীবী খেটে খাওয়া মানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে না? সংবিধানের কোন ধারায় এর ব্যাখ্যা আছে?


৯. সরকারি হাসপাতালগুলোর (যেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা মিটফোর্ড হাসপাতাল) যে ভয়াবহ অবস্থা চলছে তার সমাধান না করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল তৈরির এই প্রস্তাবকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নেই? সংবিধানের দৃষ্টিতে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিক সমান। তাহলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল নির্মাণ কেন?

১০. মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার কত ভাগ সরকারী চাকুরী করেন? ১০ ভাগ? তার চেয়েও কম হবে। অবশিষ্ট ৯০ ভাগের মধ্যে ৩০-৪০ ভাগ ব্যবসা বা বেসরকারী চাকুরী করেন। প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ ফুটপাতে/বস্তিতে রাত কাটায়। বিশাল একটি অংশ কোনো চাকরি করার সুযোগ পান না। একটা অংশ ব্যবসা বা ছোটখাটো কাজ করেন যাকে হয়তো চাকুরী বলা যায় না। শতকরা ২০-৩০ ভাগ বেকারের কথা মনে আছে তো? বেসরকারি চাকরি করেন বা যারা বেকার তাদের বিশাল একটি অংশকে আমরা ফকির মিসকিন বলতে পারি। ফকির হলেন তাঁরা যারা প্রকাশ্যে হাত পাতেন। মিসকিন হচ্ছেন তারা যারা তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারেন না আবার অন্যের কাছে প্রকাশ্যে
সাহায্য চাইতে পারেন না। জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ এই মিসকিন ক্যাটাগরিতে আছেন। টিসিবির লম্বা লাইন দেখে নিশ্চয়ই আমার এ ধারণার সাথে একমত হবেন।


১১. শতকরা ১০ বা তার চাইতেও কম, যারা সরকারি চাকরি করেন এবং বিভিন্ন সুবিধা নিচ্ছেন তাদের চেহারায় একটা তেলতেলে ভাব আছে। কিন্তু তাদের বাইরে বিশাল একটি অংশ ফকির মিসকিনের মতো আছেন। এই ফকির মিসকিনদের জন্য কোনো হাসপাতাল করবেন না? জির্ণশীর্ণ এই ফকির মিসকিনরা আপনাদের কর দিচ্ছেন না? উনারা কি দেশের নাগরিক নন? তাহলে কেন তাদের নামে আলাদা ফকির মিসকিন হাসপাতাল হবে না?


১২. লেখার শুরুতে যে ভদ্রমহিলার কথা বলছিলাম তাঁর ছেলে বৃটেনের ক্ষমতাসীন দলের একজন এমপি। সামাজিক মর্যাদার কারণে এমপি সাহেবকে বা তার মাকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য সরকার আলাদা কোনো ব্যবস্থা করেনি বা কখনো করবে না। সরকারি চিকিৎসা নিতে আসা সকলেই এখানে সমান।


১৩. বলা হয় মানুষ যখন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকে, তখন তাদের আত্মসম্মানবোধ ধীরে ধীরে লোপ পায়। বাংলাদেশের ফকির মিসকিনদের অবস্থা কি সেই পর্যায়ে চলে গেছে? না হলে তারা তাদের জন্য আলাদা হাসপাতাল করার দাবি জানাচ্ছেন না? সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল করার যৌক্তিকতা থাকলে ফকির মিসকিনরা কেন তাদের দাবি জানাতে পারবেন না? আমি বাংলাদেশে প্রতিটি জেলা শহরে একটি করে ফকির মিসকিন হাসপাতাল তৈরি করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি!


পুনশ্চ- লেখক নিজে এবং তাঁর পিতা বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন চাকর তবে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের কোনো সুবিধা নেননি বা নেবার সুযোগ পাননি! গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে উপরে উল্লেখিত রোগীর কাহিনীতে স্থান-কাল-পাত্রে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

--
ডা: আলী জাহান

কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, যুক্তরাজ্য।

[email protected]

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com