ঢাকা, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, বুধবার, ২৫ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৬ রজব ১৪৪৪ হিঃ

শেষের পাতা

‘মানে মানে কেটে পড়ুন’

জাহিদ হাসান ও নূরে আলম জিকু, কুমিল্লা থেকে
২৭ নভেম্বর ২০২২, রবিবারmzamin

ছবি: জীবন আহমেদ

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে দেশের মানুষ নিরাপদ নেই। আওয়ামী সরকারের শাসনামলে পুরো জাতি আজ সংকটে। নিত্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দিশাহারা দেশের মানুষ। তাই সময় থাকতে মানে মানে কেটে পড়ুন। নইলে দেশের মানুষ বিদায় করতে বাধ্য হবে। গতকাল কুমিল্লা বিএনপি’র বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে, সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
সেই নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দেশে নির্বাচন হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত শেখ হাসিনা পদত্যাগ করবে না, সংসদ বিলুপ্ত করবে না ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এই দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। 

বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন,  জোর করে আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালে নির্বাচন করেছে। ২০১৪তে কেউ ভোট দিতে যায়নি। তিনি নাকি আবার নির্বাচন করবেন। যশোরে রাষ্ট্রীয় খরচে সমাবেশে শেখ হাসিনা  বলেছেনÑআওয়ামী লীগকে ভোট দিলে মানুষ শান্তিতে থাকে। অথচ দেশের মানুষ শান্তিতে নাই। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আজ মানুষ ভাতের জন্য, ভোটের অধিকারের জন্য জীবন দিতে হচ্ছে। আমাদের ছেলেদেরকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। দেশের মানুষের চোখে এখন আগুন জ্বলছে। এই দেশের জনগণ শেখ হাসিনার ভাঙা নৌকায় উঠতে চায় না। তাই সময় থাকতে আপনারা কেটে পড়ুন। অন্যথায় কীভাবে বিদায় করতে হয়, তা এ দেশের মানুষ জানে।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের জামানত থাকবে না। তাই আবারো ফন্দিফিকির করছে, ইভিএম দিয়ে ভোট নিতে চাচ্ছে। আবার সেই গায়েবি মামলা শুরু করেছে। রাজশাহীতে ১১টি গায়েবি মামলা হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণ মামলা হয়েছে। কিন্তু কেউ ককটেল বিস্ফোরণের আওয়াজই পায়নি। তিনি বলেন, গত ২২ তারিখ থেকে ১০৪টি মামলা দিয়েছে ঢাকাসহ সারা দেশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, ঢাকায় যাতে ১০ই ডিসেম্বর সমাবেশ বন্ধ করতে পারে। তবে আমাদের কোনো সমাবেশ বন্ধ হবে না। ৮টি বিভাগে হয়েছে।  রাজশাহীতে সফলভাবে সমাবেশ হবে। ঢাকার নয়াপল্টনেও গণসমাবেশ হবে। এই সরকার সমাবেশ করতে দিতে বাধ্য হবে। 

আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আগুন সন্ত্রাসের কথা বলেন, আরে অগ্নিসন্ত্রাস তো করেন আপনারা। আওয়ামী লীগের চুরির কথা বলতে গেলে দিনরাত পার হয়ে যাবে। এখন ট্রেজারিতে টাকা নেই। শেখ হাসিনা বলছেন-রিজার্ভ কি চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছি? আমরা বলতে চাই রিজার্ভ আপনারা গিলে খেয়ে ফেলেছেন। আগামী তিন মাস আমদানির টাকা পরিশোধের রিজার্ভ নেই। একটি সংস্থা থেকে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে ৮৬ লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। বিদ্যুতের জন্য ৭৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে। আওয়ামী লীগ চুরি করে করে ফুলে ফেঁপে মোটা হচ্ছে। গত ১৪ বছর ধরে এই দানবীয় সরকার আমাদের সমস্ত অর্জনগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদেরকে ভাতে মারছে, পানিতে মারছে। আওয়ামী লীগের অত্যাচারে গোটা দেশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।  এখান থেকে দেশের মানুষ মুক্তি চায়। আমরা মুক্তি চাই। আমাদের সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালের মতো আরেকটি যুদ্ধ করতে হবে। তার মধ্যদিয়ে এই সরকারকে পরাজিত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবো ইনশাআল্লাহ।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারা বিনাভোটে সরকার। এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। গত ১৪ বছরে শুধু সংসদই নয়, স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ ভোট দিতে পারেনি। সারা দেশে ৬০০ গুম, ১০০০ বেশি নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। বিএনপি’র বিভাগীয় সমাবেশ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১০০-এর বেশি মামলা করেছে। যাতে বিএনপি সমাবেশ সফল করতে না পারে।  তিনি বলেন, এই অবৈধ সরকার বিচার বিভাগকে ধ্বংস করেছে। তারা গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে আছে। 

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, শেখ হাসিনা বলেছেন দেশে দুর্ভিক্ষ আসবে। হাসিনা তো দুর্ভিক্ষই চাইছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইসলামী ব্যাংকের টাকার লুট করে নিয়ে গেছে। টাকা পয়সা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এমন হলে দেশের মানুষ কীভাবে দুর্ভিক্ষ বাঁচাবেন। শেখ হাসিনা অনেক করেছেন, এবার থামুন।  দেশের জনগণ প্রস্তুত হয়ে গেছে। এই দৈত্যকে সরাতে হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, নয়নকে প্রচারপত্র বিতরণকালে পুলিশ সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। তার পরিবার এখানে আসছে,  গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের চোখে আমি আগুন দেখছি। প্রতিটি মানুষের চোখে এখন আগুন দেখছি। শেখ হাসিনা সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তারা বিএনপি’র সমাবেশের জবাব দিতে চায়। 
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বিএনপি’র এই সমাবেশ সরকারের হৃদকম্পন বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের ছোট ভাই নয়নকে খুন করেছে। নয়নের রক্ত বৃথা যেতে দিব না। তার রক্তের বদলা হিসেবে দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করে ছাড়বো। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক আমিনুর রশিদ ইয়াসিনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপেদষ্টা অধ্যাপক ডা. শাহিদা রফিক, মনিরুল হক চৌধুরী, উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া, কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়া, বিএনপি নেতা কাউসার জামান বাপ্পী প্রমুখ। গণসমাবেশ পরিচালনা করেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক উদবাতুল বারী আবু এবং সদস্য সচিব ইউসুফ মোল্লা টিপু।

সমাবেশস্থলে ব্যাপক উপস্থিতি: বিএনপি’র অন্যান্য বিভাগীয় সমাবেশের মতো কুমিল্লা সমাবেশেও আগেই অংশ নিয়েছেন নেতাকর্মীরা। পরিবহন ধর্মঘট না থাকলেও ১/২ দিন আগেই মাঠে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। সমাবেশস্থলে শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করেন তারা। আগে আসা নেতাকর্মীরা বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নেন। কেউ কেউ সমাবেশস্থলে রাতযাপন করেন। তবে শুক্রবার রাত থেকেই শহরের টাউন হল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে। সমাবেশের দিন ভোর থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসেন কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকার নেতাকর্মীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতির কারণে কান্দিরপাড় এলাকায় জনস্রোতের সৃষ্টি হয়। এতে আশপাশের সড়কগুলোতে অবস্থান নেন সমাবেশে আসা মানুষ। অনেকেই বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও উঁচু ভবনের ছাদ, বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্য শুনেন। এদিকে অন্য বিভাগীয় সমাবেশগুলোর মতো কুমিল্লাতেও ২টি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। চেয়ার দু’টিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি রাখা হয়।  

মঞ্চে ঠাঁই পাননি বহিষ্কৃত সাক্কু-কায়সার: কুমিল্লার সমাবেশ সফল করতে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে সরব ছিলেন কুসিকের সাবেক মেয়র ও  বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র যুগ্ম-সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কু। সমাবেশ ঘিরে নেতাকর্মীদের থাকা-খাওয়া ও বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার, ফেস্টুন বিতরণ করেছেন তিনি। তবে সমাবেশের দিন সমাবেশস্থলে উপস্থিত থাকলেও মঞ্চে ঠাঁই হয়নি তার। গতকাল সমাবেশ চলাকালীন সময়ে সাক্কু নিজের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মাঠের পূর্ব পাশে অবস্থান  নেন।  অন্যদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়া স্বেচ্ছাসেবক দলের কুমিল্লা মহানগর সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কৃত নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সারও সমর্থকদের সারিতে বহর নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি থেকে আমাকে বহিষ্কার করলেও আমি দল ছাড়িনি।

 

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status