ঢাকা, ১৭ মে ২০২২, মঙ্গলবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

শেষের পাতা

উরাংদের ২০ কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে শঙ্কা

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
১৪ মে ২০২২, শনিবার

বালুচরের চন্দন টিলা। সিলেটের আদিবাসী উরাং সম্প্রদায়ের সর্বশেষ চিহ্ন। এই টিলা আঁকড়ে ধরে বসবাস করছে মাত্র ১৩ পরিবার। টিলায় ভূমি প্রায় ৪৫০ শতক। টাকার হিসাবে দাম হবে প্রায় ২০ কোটি টাকা। এই সম্পত্তি নিয়ে নানা ঘটনা ঘটছে সিলেটে। ফের আলোচনায় এসেছেন বালুচরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মছব্বির ও আবুল বশর। তাদের নামে গত ১লা মে শাহপরাণ থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশের খাতায় তারা এখন পলাতক। বালুচরের উরাং জনগোষ্ঠী

বিজ্ঞাপন
এক সময় বালুচরেই ছিল তাদের আধিপত্য। কয়েকশ’ পরিবারও ছিল। ২০০২ সালে সমরা উরাং ছিলেন উরাংয়ের রাজা। অপহরণের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পর উরাং সম্প্রদায় চুপসে যায়।  তখন ভয়ে অনেকেই জমি ছেড়ে এলাকা ছাড়েন। কেউ গেছে শ্রীমঙ্গলে, কেউ কুলাউড়ায়। আবার কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী দলদলির বাগানে গিয়ে আশ্রয় নেন। এখন উরাং সম্প্রদায় এলাকায় নিরীহ জনগোষ্ঠী। কামলা খেটে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করেন। 

স্থানীয় মিলন উরাং মানবজমিনকে জানিয়েছেন- বালুচরের ভেতরের চন্দন টিলা হচ্ছে উরাংদের আদিস্থান। এখানে মন্দির, শ্মসান সবই রয়েছে। এখনো জীবিত এক সময়ের সমাজপতি বা রাজা সমরা উরাং। বয়োঃবৃদ্ধ হওয়ার কারণে চলাচলে অক্ষম। ফলে তার সন্তানরাই এখন চন্দন টিলায় বসবাসকারী ১৩ পরিবারকে নেতৃত্ব দেন। এই টিলায় ভূমির পরিমান প্রায় ৭ একর। এরমধ্যে অনেকেই জোরপূর্বক দখলে নিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করে ফেলেছেন। প্রায় ৪৫০ শতক ভূমি রয়েছে এখন। এগুলোতে উরাংরাই বসবাস করেন। দখলও উরাংদের। এই জমি নিয়ে গত প্রায় ১৬-১৭ বছর ধরে বালুচরের প্রভাবশালী আব্দুল মছব্বির ও তার ভাই আবুল বশরের সঙ্গে স্বত্ব মামলা চলছে। উরাংদের পক্ষ থেকে মন্দির ও শ্মশানের সেবায়েত হিসেবে ২০০৬ সালে ও  ২০০৯ সালে আরও একটি স্বত্ব মামলা করা হয়েছিল। এই মামলাগুলো সিলেটের আদালতে চলমান রয়েছে।

 এই অবস্থায় ভূমিখেকো মছব্বির ও বশর বিরোধপূর্ণ ভূমি বিক্রি করে দিচ্ছে। যারা ভূমি ক্রয় করছে তারাও একে একে বাড়ি তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। উরাং সম্প্রদায় যে টিলার উপর বসবাস করে সেই টিলার ভূমি গত এক মাস ধরে কাটা হচ্ছিল। এই টিলা কেটে নিলে উরাংদের আর বসবাসের জায়গা নেই। গত ২৯শে এপ্রিল টিলা কাটায় বাধা দিলে উরাংদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। শ্রমিক দিয়ে উরাংদের মারধর করে টিলা থেকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন মিলন উরাং। এ ঘটনায় আগের রাজা সমরা উরাংয়ের নাতি শিপা উরাং বাদী হয়ে শাহপরান থানায় মামলা করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সেনপাড়ার বাসিন্দা আবুল বশরকে। এছাড়া মামলায় টুলটিকর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মছব্বির, শ্রমিক আলিম উদ্দিন, মঈন উদ্দিন ও জসিম মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে শিপা উরাং দাবি করেন- গত ১৫ই এপ্রিল সন্ত্রাসী পাঠিয়ে চন্দন টিলা থেকে তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর শাহপরান থানায় উরাং সম্প্রদায়ের পক্ষে মিলন উরাং শাহপরান (রহ.) থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। 

ঘটনার দিন ২৯শে এপ্রিল সারতি ও শিতা উরাং শ্রমিকদের পাহাড় কাটতে বাধা দিলে হামলা চালানো হয়। রিপন ও সজিত উরাংকে মারধর করা হয়েছে। এ ঘটনায় রিপন উরাংসহ কয়েকজনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে- মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিরা পলাতক রয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার এসআই স্নেহাশীষ পৈত্য। তিনি জানিয়েছেন, আসামিদের মধ্যে দু’জন ইতিমধ্যে জামিন নিয়েছেন। অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। মামলার বাদী শিপা উরাং জানিয়েছেন, ‘যুগ যুগ ধরে একটি ভূমিখেকো চক্র উরাংদের জমি দখল করেই যাচ্ছে। এতে করে আমরা উচ্ছেদ আশঙ্কায় আছি। আমাদের শেষ স্মৃতি চিহ্ন দখল হয়ে গেলে বালুচরে আর উরাং সম্প্রদায় থাকবে না। 

এদিকে- মামলায় অভিযুক্ত আবুল বশর মানবজমিনকে জানিয়েছেন- প্রায় ৯ বিঘা জমির মালিক তিনি ক্রয় সূত্রে। যেসব জমি তারা বিক্রি করছেন সেগুলোতে কোনো মামলা নেই। আর যেসব ভূমিতে মামলা রয়েছে সেগুলো তারা বিক্রি করছেন না। সাম্প্রতিক উরাংদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান তিনি। তবে মিলন উরাং দাবি করেছেন- আবুল বশর মিথ্যাচার করছেন। তিনি মামলা চলমান থাকা অবস্থায় পাহার, টিলা কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর তিনি শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছিলেন। এই লুটপাটে উরাং সম্প্রাদায়ের কারও কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভূমিখেকোদের লোলুপ দৃষ্টির কারণেই উরাংরা বালুচর থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। ঘটনাস্থলে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ: বালুচরে ভূমিখেকো চক্রের কবল থেকে আদিবাসী উড়াং সমপ্রদায়ের পৈতৃক ভূমি রক্ষার জন্য প্রশাসনসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। 

গত সোমবার বিকাল ৩টায় ‘উরাং জনগোষ্ঠী, ভূমি রক্ষা কমিটি, সিলেটের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে এই আহ্বান জানান। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা জাসদ সভাপতি লোকমান আহমদ, আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্ল্যাহ শহিদুল ইসলাম, সাম্যবাদী দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক কমরেড ধীরেন সিংহ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সিকান্দর আলী, বাসদ (মার্ক্সবাদী) আহ্বায়ক উজ্জ্বল রায়, বাসদ সমন্বয়ক আবু জাফর, সিপিবি জেলা সাধারণ সম্পাদক খায়রুল হাছান, গণতন্ত্রী পার্টি জেলা সহ-সভাপতি গুলজার আহমদ, সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক সুশান্ত সিনহা সুমন, বাপা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী দিপনসহ নাগরিক প্রতিনিধিরা। পরিদর্শনকালে নেতৃবৃন্দ বলেন- বাংলাদেশের অপরাপর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মতো সিলেটের উরাং সম্প্রদায়ও একটি নিরীহ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। 

সিলেট মহানগরীর বালুচর এলাকায় তাদের আদি নিবাস। প্রকৃতির সন্তান এই নিরীহ নৃ-গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্টকে ধারণ করে শত শত বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাসরত আছে। গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে ওই এলাকায় বসবাসরত চিহ্নিত একটি ভূমিদস্যু দুর্বৃত্তচক্র উরাং সম্প্রদায়ের সমূহ সহায়-সম্পত্তি আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে নানাবিধ কুকর্মের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়। ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক উরাং সমপ্রদায়ের পরিবার-পরিজন ও তাদের সমুদয় সহায় সম্পত্তি ও বসতভিটা থেকে অন্যায় ও নৃশংসতার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০টি পরিবার অত্যন্ত বিপদজনক ও মানবেতর জীবনযাপনের মাধ্যমে সেখানে টিকে আছে। কিন্তু চিহ্নিত ও ঘৃণিত ওই ভূমিদস্যু দুর্বৃত্তচক্র এবং তাদের লেলিয়ে দেয়া গুন্ডাবাহিনী অতি সমপ্রতি উরাং সমপ্রদায়ের অসহায় মানুষদের তাদের বসতভিটা থেকে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। উরাং সম্প্রদায়ের পরিবার সমূহের স্বত্ব দখলীয় সহায় সম্পত্তি, শ্মশান ও দেবালয়সহ ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমি ভয়-ভীতি প্রদর্শন, নানান ধরনের যোগাযোগী ও জাল দলিলাত সৃষ্টি করে তাদেরকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করার ঘৃণ্য বর্বরোচিত হামলার চেষ্টা করছে। নেতৃবৃন্দ সময়ক্ষেপণ বা কালবিলম্ব না করে রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিরীহ নৃ-গোষ্ঠী উরাং সম্প্রদায়ের অসহায় মানুষদের রাষ্ট্রের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার, ক্ষমতা ও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।

 

পাঠকের মতামত

আমি বাংলাদেশে ক্ষমতাসিন দলের নেতৃবৃন্দের নিকট অনুরোধ করছি সময়ক্ষেপণ বা কালবিলম্ব না করে রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিরীহ নৃ-গোষ্ঠী উরাং সম্প্রদায়ের অসহায় মানুষদের রাষ্ট্রের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার, ক্ষমতা ও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি ।

sadaik Md Iqball Hos
১৩ মে ২০২২, শুক্রবার, ৯:৫৪ অপরাহ্ন

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com