ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবার, ১৭ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৮ রজব ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

নদীর নাম কুশিয়ারা, 'বিন্দুতত্ত্ব', ওয়াটার পলিটিক্স

ড. মাহফুজ পারভেজ

(৪ মাস আগে) ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার, ৮:৫২ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৩:৩৫ অপরাহ্ন

mzamin

১. বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতে পা দেওয়ার আগেই তিনটি বিষয়ে খুবই উদ্বেগের ভাষায় চর্চা করেছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়া। বিশেষজ্ঞরাও তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে সরব হয়েছিলেন। এক) তিস্তা। দুই) সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা। তিন) রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমার যাতে ফিরিয়ে নেয় তার জন্য ভারতের ভূমিকা নেওয়া। তিনটিরই উল্লেখ যৌথ বিবৃতিতে আছে প্রতিশ্রুতি হয়ে। কিন্তু কাগজ থেকে তা মাটিতে কবে নেমে আসবে তার কোনও সময়রেখা দেওয়া নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে কুশিয়ারা নদীর পানি ভাগাভাগি কিংবা ভারত থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল কেনার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও তিস্তা, সীমান্ত সংঘাত কিংবা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো ইস্যুতে জটিলতা রয়েই গেল।

২. কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে জোর আলোচনা না থাকলেও বিষয়টি  সামনে চলে এসেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার আর বন্যা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে যে সমস্যার মুখোমুখি হয় বৃহত্তর সিলেটের, বিশেষত জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ এলাকার মানুষ, তা কারো অজানা নয়। ভারতের একতরফা পানিব্যবস্থাপনার কারণে ওই এলাকায় চাষাবাদ যেমন ব্যাহত হয় তেমনি অকাল বন্যায় ভেসে যায় সিলেটের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

বিজ্ঞাপন
সফরকালে স্বাক্ষরিত সাতটি 'এমওইউ' বা সমঝোতাপত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল কুশিয়ারা নদীর রহিমপুর পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশকে ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের বিষয়।

৩. ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির পর এই প্রথম ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কোনও অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগিতে রাজি হল। বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে ৫৪টি যৌথ নদী রয়েছে সেগুলোর পানি বণ্টন প্রসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ দিনের অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। সেগুলো নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। সাধারণত তিস্তার পানি বণ্টনের প্রসঙ্গটি ঘুরে ফিরে সবচেয়ে বেশি এলেও এবারের সফরে এই একটি নদী কুশিয়ারার পানি বণ্টনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো এই যে, "দেশের ভেতরে কুশিয়ারা নদী থেকে ১৫৩ কিউসেক পানি তুলতে ভারতের অনুমতি নেয়ার চুক্তি করে একটি ভুল ও খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। এ চুক্তির কারণে এখন থেকে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ নদীগুলো থেকে বাংলাদেশ পানি উত্তোলন করতে চাইলে ভারত হস্তক্ষেপ করতে পারে। কুশিয়ারা নদীর পানি প্রত্যাহারে ভারতের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের যৌক্তিকতাও নেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিশ্লেষণমূলক সাময়িকী 'সর্বজনকথা' আয়োজিত ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নদী, সীমান্ত ও বিদ্যুৎ’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা এসব মন্তব্য করেন।" 

৪. বিশিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরাও কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে হওয়া চুক্তিকে "সমুদ্রের জলের একটি ফোঁটা মাত্র" বলে উপহাস করেছেন। এটি দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪ টি জলপথের মধ্যে একটি ছোট জলপথ মাত্র। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন যে,  "নতুন চুক্তি আদপে 'বিশাল সমুদ্রে একবিন্দু জলকণা মাত্র'। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারত,   বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করতে নারাজ বলে তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন ।" JRC-র একজন প্রাক্তন কারিগরি সদস্য এবং বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের  অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেছেন, ''আমি ব্যক্তিগতভাবে কুশিয়ারার জন্য MOU -কে  বিশেষ বলে মনে করি না । উভয় দেশ ইতিমধ্যেই সেচের জন্য নদীর মাঝখান থেকে জল ব্যবহার করছে— যা একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় সমস্যা রয়েছে যা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপন করেছে, কিন্তু বিষয়টি ভারতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।'' বাংলাদেশ হিমালয় থেকে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্য দিয়ে বাহিত পলি দ্বারা গঠিত একটি সক্রিয় ব-দ্বীপ। দুই প্রতিবেশী দেশ এই ধরনের অন্তত ৫৪ টি নদী ভাগ করে নেয়, JRC অনুসারে, তাদের মধ্যে গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র সবচেয়ে বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। 

৫. বাংলাদেশ-ভারতের ৫৪টি যৌথ নদীর পানি বণ্টনের প্রসঙ্গে এলে তিস্তা সবসময় গুরুত্ব পায়। এটি এই দুই দেশের অমীমাংসিত অনেক পুরনো একটি ইস্যু এবং ভারত বহুদিন যাবত তিস্তা ইস্যুতে শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবার তিস্তা নদীর চাইতে কুশিয়ারাই প্রাধান্য পেয়েছে। প্রাচীন কালের স্বাধীন রাজ্য মণিপুরের আঙ্গামীনাগা পাহাড়ের ৩০০ কি.মি. উঁচু স্থান থেকে বরাক নদীর উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থান হতে ৪৯১ কি.মি. অতিক্রম করে সিলেটের সীমান্তে এসে বরাক নদী দুই শাখায় সুরমা ও কুশিয়ারা নামে ৩০০ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদী গঠন করে। উল্লেখিত নদী দুটো সিলেট বিভাগের বেষ্টনী হিসেবে ধর্তব্য। সিলেটের সীমান্ত হতে উত্তরে প্রবাহিত স্রোতধারাকে সুরমা নদী এবং দক্ষিণে প্রবাহিত স্রোতধারাকে কুশিয়ারা নামে অবহিত করা হয়। বরাক হতে কুশিয়ারার বিভক্তির স্থান হতে বদরপুর হয়ে অমলসিদ নামক স্থানে এসেছে। অমলসিদ হতে বাহাদুরপুরের নিকট দিয়ে কুশিয়ারা নদী নবীগঞ্জের ভেতর প্রবেশ করে দিরাই হয়ে আজমিরীগঞ্জ হয়ে দিলালপুরের নিকটে মেঘনা নদীর সৃষ্টি করে। কুশিয়ারা নদীর আবার ছোট ছোট বিভিন্ন শাখায় সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাহিত আছে। যা কোথাও কোথাও বিবিয়ানা, ধলেশ্বরী, খোয়াই ও কালনী নামে অবহিত হচ্ছে।
 

৬. বরাক নদী ভারতের আসাম রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের পর্বত থেকে উদ্ভূত হয়ে কিছু দূর পর্যন্ত নাগাপাহাড় ও মণিপুর রাজ্যের মধ্যে সীমারেখা রচনা করেছে। এর পর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে কাছাড় জেলার শিলচর থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ২৪°৫৩´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°৩২´ দক্ষিণ দ্রাঘিমাংশ বরাবর বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অমলসিদ নামক স্থানে বরাক দুটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমের ধারাটি সুরমা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের ধারাটি কুশিয়ারা। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ উপজেলার মারকুলী নামক স্থানে কুশিয়ারা পুনরায় সুরমার সঙ্গে মিলিত হয়ে কালনী নাম ধারণ করে দক্ষিণ দিকে ভৈরব উপজেলার ভৈরববাজার পর্যন্ত প্রবাহিত হওয়ার পর সুরমার অপর শাখা ধনুর সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে প্রবাহিত হয়েছে। মারকুলীর উজানে কুশিয়ারা কিছুটা জায়গা জুড়ে বিবিয়ানা নদী নামেও পরিচিত।

৭. মেঘনা নদীর প্রবাহের বেশিরভাগ পানি কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়। কালো রঙের মায়াময় জলের স্রোত বয়ে চলা সুগভীর কুশিয়ারা দৃশ্যত এক রহস্যময় নদী। সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা থেকে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলাকে পৃথক করেছে এই নদী।

কুশিয়ারা নদী এক দিন বিপুল ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল। শুশুক, ইলিশসহ বহু প্রজাতির মাছ এখানে খেলা করত। উত্তাল স্রোতে চলতো পাল তোলা নৌকা। লঞ্চ, স্টিমার ও মালবাহী জাহাজ চলতো সারা বছর। ঘাটে ঘাটে ছিলো নৌকার ভিড়। ছিলো কুলি-শ্রমিকদের কোলাহল। কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে বালাগঞ্জ বাজার, শেরপুর ঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার ছিলো সদা কর্মতৎপর সচল নৌ-বন্দর। বিস্তীর্ণ জনপদে কুশিয়ারা নদীর সেচের পানিতে হতো চাষাবাদ। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল এই কুশিয়ারা। কিন্তু এখন নদীর দিকে তাকানো যায় না। দিন দিন যেন সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে তার গতিপথ। অথৈ পানির পরিবর্তে কেবল কান্নার সুরই যেন ভেসে আসে কুশিয়ারার বুক থেকে।
 

৮. এমনই মায়াবী নদী, সুরমার দুহিতা কুশিয়ারা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কুশিয়ারা নিয়ে সমঝোতা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের পটভূমিতে একদিকে যেমন 'বিন্দুতত্ত্ব' নামক প্রপঞ্চ উন্মোচিত হয়েছে, অন্যদিকে 'ওয়াটার পলিটিক্স' বা 'পানি রাজনীতি'র পদধ্বনিও শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। পানির রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এশিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি ইস্যুতে এশিয়ার দেশগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে না গেলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। দীর্ঘদিনের পানি সংকটের কারণে এ অবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু তাই নয়, এর ফলে এ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ অনিশ্চিত পরিণতির দিকে চালিত হতে পারে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির জটিল সমীকরণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাতি বর্তমানে যেভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছেন; তা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিদ্যমান পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে, যদিও পানি নিয়ে নির্মম রাজনীতি করার বিষয়টিও উপেক্ষণীয় নয়।

৯. দক্ষিণ এশিয়ার পানির রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান হারে একচেটিয়া ভূমিকা পালন করছে চীন ও ভারত। এর অন্যতম একটি কারণ হলো, তিব্বতের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল শাসন করছে চীন। এছাড়া এন্টার্কটিকা ও সুমেরু অঞ্চলের পর সবচেয়ে বেশি বরফ ও তুষার রয়েছে হিমালয় পর্বতমালায়, যার সুফল কব্জা করে উজানের দেশ চীন ও ভারত।

পানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে, এমন একটি নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের সংগঠনের বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত সংঘাতের সূচনা পানি ঘাটতি নিয়ে নয় বরং প্রাপ্তির হার নিয়ে হবে। এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক বলছে, বিশ্বে পানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক এলাকা হচ্ছে এশিয়া, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া।
 

১০. বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি আছে, অর্থনীতি আছে এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলোর পাশাপাশি আছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত লেনদেনজনিত বহুবিধ বিষয়াবলি। সবকিছুকে ছাপিয়ে কুশিয়ার নদীর ইস্যুটি সামনে চলে আসায় 'ওয়াটার পলিটিক্স' বা 'পানি রাজনীতি'র প্রসঙ্গটিই যেন সবার সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

ড. মাহফুজ পারভেজ, অধ্যাপক ও বিশ্লেষক।

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: news@emanabzamin.com
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status